(১) যুগে যুগে কুফর, পাপাচার ও অশ্লীলতার জাহেলিয়্যাত মানবজাতির সামনে উপস্থিত হয়েছে নানা চেহারা নিয়ে। আর সবসময়ই সমাজের কর্তৃত্বে থাকা ব্যক্তিদেরকে দেখা গেছে কুফর ও জুলুমের পৃষ্ঠপোষকতা ও নেতৃত্ব দিতে। কেননা, সকল ক্ষেত্রে এক আল্লাহর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানেই ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া। নিজেদের ক্ষমতা, স্বার্থ আর আগ্রাসনের পূর্ণ অধিকার বজায় রাখতে ক্ষমতাসীনরা তাই আল্লাহ তা’আলার দ্বীনের বিরোধিতা করে এসেছে। জাহেলিয়্যাতের পতাকাবাহী নেতা ও তাদের দোসররা সবসময়ই ইসলামি দাওয়াহকে প্রতিরোধের জন্য কাজে লাগিয়েছে সাধারণ মানুষের আবেগ ও অজ্ঞতাকে। নিজেদের লক্ষ্য হাসিলে, অন্যায় কর্মকাণ্ডের বৈধতা আদায়ে জনমানুষের সামনে প্রভু হিসেবে তুলে ধরেছে মূর্তি, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র, আগুন, পাথর, নবী, নেককার পূর্বসূরী, ফেরেশতা, শাসক বা সমাজের অনুসরণীয় ব্যক্তিদের। যুগে যুগে বিভিন্ন মিথ্যা দ্বীন-ধর্মের আবির্ভাব ঘটলেও, স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে প্রতিটি মিথ্যা দ্বীনের ধ্বজাধারীদের লক্ষ্য ছিল- মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে জনগণকে সত্য থেকে দূরে রেখে, অন্ধানুসারী বানিয়ে রেখে শোষণ জারি রাখা। এই উদ্দেশ্যে মানুষকে ধোঁকা দিতে যুগে যুগে স্বেচ্ছাচারী ও ক্ষমতাসীনরা হাজির হয়েছে নানা বয়ান ও চটকদার স্লোগান নিয়ে। আর এই শ্রেণির মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো- বিশৃঙ্খলাকারী ও স্বেচ্ছাচারীদের ইমাম, আল্লাহদ্রোহীতা ও অহংকারের প্রতীকে পরিণত হওয়া ফির’আউন, যার ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, وَنَادَىٰ فِرْعَوْنُ فِي قَوْمِهِ قَالَ يَا قَوْمِ أَلَيْسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَٰذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِي مِن تَحْتِي ۖ أَفَلَا تُبْصِرُونَ “আর ফির’আউন তার সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘোষণা করে বলল, ‘হে আমার সম্পপ্ৰদায়! মিসর রাজ্য কি আমার নয়? আর এ নদীগুলো আমার পাদদেশে প্রবাহিত; তোমরা কি দেখছ না?’” أَمْ أَنَا خَيْرٌ مِّنْ هَٰذَا الَّذِي هُوَ مَهِينٌ وَلَا يَكَادُ يُبِينُ “নাকি আমি এ ব্যক্তি (মূসা আলাইহিস সালাম) হতে শ্রেষ্ঠ নই, যে হীন এবং স্পষ্ট কথা বলতেও প্রায় অক্ষম!” فَاسْتَخَفَّ قَوْمَهُ فَأَطَاعُوهُ ۚ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ “এভাবে সে তার সম্প্রদায়কে বোকা বানাল, ফলে তারা তার কথা মেনে নিল৷ নিশ্চয়ই তারা ছিল এক ফাসিক সম্প্রদায়।” দেখাই যাচ্ছে- আমাদের সময়ের বাতিলপন্থীদের মত ফির’আউনও তার সম্প্রদায়কে বোকা বানিয়েছিল নানা প্রবঞ্চনাময় বুলির আশ্রয় নিয়ে। একইভাবে প্রত্যেক যুগে, প্রতিটি জাতির ফির’আউনরা সমাজের মানুষ ও সম্পদ শোষণের উদ্দেশ্যে চটকদার কথার আশ্রয় নিয়ে এসেছে। আর সাধারণ মানুষ তা মেনে নিয়েছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। ঐতিহাসিক এ প্রবণতা আজও দেখা যায়। প্রায় তিনশ বছর আগে ইতিহাসের যে পর্যায়টি শুরু হয়েছিল ইউরোপের চিন্তাগত ও সামাজিক-রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তনের ওপর ভর করে, যে চিন্তাধারা সমাজ ও শাসনব্যবস্থাকে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের মাধ্যমে- আধুনিকতার নামে মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া লিবারেলিজমের দর্শন, সেক্যুলার চিন্তাকাঠামোর মাঝে আমরা ফির’আউনি কূটকৌশল আবার দেখতে পাই। আমরা দেখে আসছি- ফির’আউনের আধুনিক উত্তরসূরি সেক্যুলাররা মানুষকে হিদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুত করে অনায়াসে শোষণ, স্বেচ্ছাচারিতা, অশ্লীলতা ও জুলুমের রাজ কায়েম করেছে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, পরমতসহিষ্ণুতা বা ইনক্লুসিভিটির চটকদার বুলির আড়ালে। আগের কায়দাতেই নতুন বোতলে মানুষকে পুরোনো মদ গেলানো হয়েছে, হচ্ছে। আড়াইশো বছর ধরে ব্রিটিশরা ও তাদের লিবারেল উত্তরসূরীরা আমাদের ন্যায়ের শাসন, নৈতিক প্রগতি, বিজ্ঞানবাদ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর প্রযুক্তিগত উন্নতির বয়ান শুনিয়েছে। এসকল মিথ্যায় জনসাধারণকে দীক্ষিত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম আর সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মগুলো সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছে। লিবারেল বুদ্ধিজীবিদের দীক্ষাদান ও বয়ান, মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা আর রাষ্ট্রীয় নিষ্পেষণের সমন্বয়ে প্রথমে ব্রিটিশরা, আর পরবর্তীতে দেশীয় সেক্যুলারদের ধারাবাহিক চেষ্টায় মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে ভোগবাদ, পুঁজিবাদ, সেক্যুলারিজম, গণতন্ত্র, উগ্র-জাতীয়তাবাদ আর সমাজতন্ত্রের মতো বিষাক্ত কুফরি মতাদর্শ। ব্রিটিশরা চলে যাবার পর তাদেরই রেখে যাওয়া আদর্শ, আইনি কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাকে আজও টিকিয়ে রেখেছে স্বেচ্ছাচারী রাজনৈতিক নেতা আর পুঁজিপতিরা। ফির’আউনের সম্প্রদায়ের মতো আধুনিক নাগরিকেরাও অন্ধ আনুগত্যে বেখেয়াল জীবন কাটাচ্ছে গালভরা আওয়াজ আর ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতে প্রলুব্ধ হয়ে। ফলশ্রুতিতে, ক্রমান্বয়ে মানুষ থেকে দ্বীন-আদর্শ, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, আত্মত্যাগী মানসিকতা বা উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব কমে গেছে। রয়ে গেছে কেবল শূকরের মতো ক্ষুধা আর কুকুরের মতো যৌনচাহিদা। আত্মমর্যাদাপূর্ণ মুসলিমদের অনেক উত্তরসূরিরাই পরিণত হয়েছে ব্যক্তিত্বহীন আত্মউপাসকে! ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ময়দানে- তথা জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে আজ কুফর ও ফিসকের ছড়াছড়ি। আর যে জাহেলিয়্যাত নতুন করে সমাজের প্রতিটি স্তরে অরাজকতা ছড়িয়ে দিচ্ছে, তা হলো- ‘লিবারেলিজম’! ইউরোপে ক্যাথলিক ধর্মগুরু ও রাজার দ্বৈত শাসনামলে রাজনৈতিক-সামাজিক স্থবিরতা, ব্যাপক জুলুম ও ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে শুরু হয় খ্রিষ্টবাদের রিফর্মেশন আন্দোলন। শুরু হয় ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে প্রোটেস্ট্যান্টদের সংগ্রাম। তারপর তিনশ বছরব্যাপী নানা ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার সমাজ ও রাজনীতিতে ঘটে ধারাবাহিক বিবর্তন। ওয়েস্টফিলিয়া চুক্তি, গ্লোরিয়াস রেভ্যুলোশন, এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন, আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লব, এশিয়া ও আফ্রিকায় কলোনি স্থাপন, শিল্প বিপ্লব ইত্যাদি পর্যায় পার হয়ে বিংশ শতাব্দীতে এসে ‘লিবারেলিজম’ নামক এই নতুন দ্বীন বা জীবনদর্শন বর্তমান অবস্থায় পৌঁছায়। লিবারেলিজম বলতে একটি বৃহত্তর নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনকে বোঝানো হয়। যদিও লিবারেলিজমের ধারণা গড়ে ওঠে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের বিরোধিতা করতে গিয়ে, কিন্তু বাস্তবতা হলো লিবারেলিজম একসময় নিজেই একটি স্বতন্ত্র দ্বীনে রূপ নিয়েছে। ভাই হামজা আবদুর রহমানের বক্তব্য এখানে প্রাসঙ্গিক— “লিবারেল ব্যক্তি যেসব মূল্যবোধকে পবিত্র মনে করে, সেগুলোই চূড়ান্ত। নৈতিকতার মানদণ্ড তৈরি হবে সমাজের স্বাধীন ব্যক্তিদের স্বাধীন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। অন্য সকল নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে আধুনিক লোকদের ঠিক করা এই মূল্যবোধের আলোকে যাচাই করতে হবে। দ্বীন ইসলাম বা অন্যান্য দ্বীনকেও যাচাই করতে হবে আধুনিক লোকদের বাছাই করা এই মূল্যবোধের আলোকে। কাজেই অধিকাংশ লোক কোনো কিছুকে বৈধ বললে তা হবে বৈধ এবং অবৈধ বললে তা হবে অবৈধ। অধিকাংশরা কোনো কিছুকে ভালো বললে ওটা হবে ভালো। মন্দ বললে হবে মন্দ। বলাবাহুল্য, লিবারেলিজম-প্রভাবিত সমাজে অধিকাংশের চিন্তাভাবনা চালিত হয় ‘আধুনিকতা’র চিন্তাকাঠামোর ভেতরে। এই জীবনদর্শন কার্যত শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্র, ও সমাজ থেকে নৈতিকতাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের সকল বোধ জনপরিসর থেকে অপসারিত হয়। সেই জায়গা দখল করে ‘আধুনিক’ মূল্যবোধ। লিবারেলিজম তার নিজস্ব নৈতিকতা, মূল্যবোধ, শিল্প, ফ্যাশন, সাহিত্য, আইন এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।” বহু ‘মানবদেবতা’র চিন্তার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই দ্বীনের সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য বহু ঈশ্বরবাদী গ্রিক, রোমান কিংবা হিন্দু ধর্মের সাথে। এ-ধরনের ধর্মে পরিভাষাগত ধোঁয়াশা ও জটিলতা, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে মতভেদের পাশাপাশি আরও থাকে তীব্র পরস্পরবিরোধিতা। লিবারেলিজমের মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায়। লিবারেলরা তাদের আদর্শকে খণ্ডিতভাবে মানুষের সামনে পেশ করে। যাতে করে সম্পূর্ণ বাস্তবতা মানুষ বুঝতে না পারে। তাই লিবারেলিজমের যাজক ও অনুসারীরা লিবারেলিজম শব্দটির বদলে সাধারণত এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা (যেমন—পুঁজিবাদ, সেক্যুলারিজম, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি) নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করে থাকে। এজন্যই লিবারেলিজমের স্বরূপ বোঝা ও চিহ্নিত করা অনেকের কাছে বেশ দুরূহ হয়ে থাকে। লিবারেলিজমের ছাতার নিচে জমা হওয়া প্রতিটি মতবাদই কোনো-না-কোনোভাবে ইসলামের অবস্থান সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ এ মতবাদগুলো আজ প্রবেশ করেছে মুসলিম মানসের গভীরে। তাই লিবারেলিজমকে কুফর, শিরক বা জাহিলিয়্যাত যা-ই বলা হোক; একথা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, এটাই এ যুগের সবচেয়ে মারাত্মক ফিতনা। (২) লিবারেলরা একসময় যদিও যুক্তি ও বুদ্ধির অনুসরণের কথা বলত, এক পর্যায়ে তারা যুক্তি-বুদ্ধির পাশাপাশি আবেগ-অনুভূতি ও প্রবৃত্তির অনুসরণকেও সমাজ ও রাজনীতির মানদন্ড বানিয়ে নেয়। তাই দেখা যায় যে, তারা শুধু ঐ সবকিছুরই অনুসরণ করে, যা তাদেরকে আনন্দ পৌঁছায়। তাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা ভালো-মন্দ নির্ধারণের মূলনীতিই হয়ে দাঁড়ায়, সম্ভাব্য সকল উপায়ে ভোগবিলাসিতার সর্বোচ্চকরণ (maximisation of pleasure)। মহান আল্লাহ বলেন, وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَا أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ “আর সীমালঙ্ঘনকারী কেবল তারই অনুসরণ করে, যা তাদের আনন্দিত করে।” বিশেষত আমাদের দেশের স্বঘোষিত লিবারেলরা পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ করে মূলত নিজেদের পশুবৃত্তীয় চাহিদা আর খেয়ালখুশির বৈধতা আদায়ের জন্যে। وَتَرَىٰ كَثِيرًا مِّنْهُمْ يُسَارِعُونَ فِي الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَأَكْلِهِمُ السُّحْتَ ۚ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ “আর তাদের অনেককেই আপনি দেখবেন দৌড়ে গিয়ে পাপ, সীমালঙ্ঘন ও অবৈধ খাওয়াতে লিপ্ত হয়; তারা যা করে, তা কতই না নিকৃষ্ট।” সময় সাক্ষ্য দিচ্ছে, সেক্যুলার শাসক ও লিবারেল বুদ্ধিজীবীরা মানুষ ও সমাজকে মুক্তি দিতে পারে নি। বরং ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে গেছে ভ্রষ্টতা ও দুর্দশার মহামারি! দেবতা দানবে পরিণত হয়ে বিকৃতিকে নিয়ে গেছে অবক্ষয়ের অভূতপূর্ব মাত্রায়। লিবারেলিজম মানবজাতিকে উপহার দিয়েছে নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড, সমকামিতা, শিশুকামিতা, পশুকামিতা, গর্ভপাত, লুণ্ঠন, বৈষম্য, ধ্বংস আর গণহত্যা। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, শীতল যুদ্ধ ও ওয়ার অন টেররে পশ্চিমা লিবারেল দুনিয়া কি করেছে তা সবাই জানে। উদাহরণত, লিবারেলিজমের প্রভাব এদেশের পরিবারগুলোতে কিভাবে পড়েছে তার একটি চিত্র দেখা যায়। কালের কন্ঠ পত্রিকায় “ঢাকায় প্রতি ৩৮ মিনিটে ভাঙছে একটি বিয়ে” শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখিত, “ঢাকার দুই সিটির তথ্য বলছে, ৭৫ শতাংশ ডিভোর্সই দিচ্ছেন নারী। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ৪৫৬৫টি বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে, অর্থাৎ প্রতি মাসে ১১৪১টি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১০৪২। এই হিসাবে চলতি বছর প্রতি মাসে বেড়েছে ৯৯টি বিচ্ছেদ। গত বছরও নারীদের তরফে ডিভোর্স বেশি দেওয়া হয়েছে, ৭০ শতাংশ। বিচ্ছেদের প্রবণতা শুধু ঢাকায়ই নয়, সারা দেশেই বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ১৭ শতাংশ বিবাহবিচ্ছেদ বেড়েছে।” এটি দেশের ভয়ংকর বাস্তবতার অতি ক্ষুদ্র এক খণ্ডচিত্র। শুধু পূর্ব বাংলার ইতিহাসের দিকে তাকালেও এ-কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, বিগত আড়াইশো বছরে রাষ্ট্রীয় শোষণ, সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের যে মাত্রা এ অঞ্চল দেখেছে, তার তুলনা ইতিহাসে পাওয়া যায় না। কিন্তু হাঁপিয়ে ওঠা বিধ্বস্ত মানবজাতির দীর্ঘশ্বাস মেরুর হিমশীতল বরফ গলিয়ে ফেললেও, পশ্চিমাদের উচ্ছিষ্টভোগী সেক্যুলার সম্প্রদায়ের অন্তরগুলো গলাতে পারেনি! মিডিয়া, একাডেমিয়া আর ক্ষমতার মসনদে সওয়ার হয়ে লিবারেলরা প্রতিনিয়ত নানা লেবেলের নতুন বোতলে প্রবৃত্তিপূজার পুরোনো মদ মানুষের সামনে পরিবেশন করেই যাচ্ছে। প্রোপাগান্ডা ও কৌশলে অভিভূত হয়ে ইসলামপন্থীরাও খেই হারিয়ে ফেলেছে। ‘আধুনিক’ এই দ্বীনের ব্যাপারেও হুকুম সেই একই, যা অন্যান্য বাতিল দ্বীনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য- ‘ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণের অর্থই হলো ইসলাম ত্যাগ ও বিদ্রোহ।’ وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ “কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে, তা কখনো কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (৩) দুনিয়া জুড়ে লিবারেলিজমের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতির পেছনে ভূমিকা আছে পশ্চিমাদের সামরিক উত্থান, উপনিবেশ স্থাপন, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাট, স্থানীয় দালালদের স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকা, ইসলামী জাতির অধঃপতনসহ বেশ কিছু বিষয়ের। এর মধ্যে অন্যতম একটি ফ্যাক্টর বা চলক হলো— প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে ইউরোপীয়দের ‘আকস্মিক’ উন্নতি। যদিও বাস্তবতা হলো এ উন্নতি আকস্মিক ছিল না। এ উন্নতি ও শিল্প বিপ্লবের অনুঘটক হিসেবে সরাসরি ভূমিকা রয়েছে এশিয়া থেকে নগদ পাওয়া অঢেল অর্থ, কাঁচামাল ও প্রাচীন বিজ্ঞান-প্রযুক্তির (যেমন, চাইনিজ গান পাউডার, ইন্ডিয়ান মেডিসিন ইত্যাদি)। ভারতীয় লেখক ও রাজনীতিবিদ শশি থারুর বলেন, “তারা (পশ্চিমারা) আমাদেরকেই উল্টো অনগ্রসরতার জন্য দায়ী করে বলে যে, ‘আমাদের কোনো দোষ নেই, তোমরাই বরং শিল্পবিপ্লবের বাস ধরতে পারোনি।’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ। কারণ তোমরা আমাদেরকে সেই বাসের চাকার নিচে ছুঁড়ে ফেলেছিলে।’” বস্তুগত ও প্রযুক্তিগত উন্নতির চোখধাঁধানো প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে পশ্চিমারা তাদের বিষাক্ত ও ছোঁয়াচে দর্শনের পাইকারি প্রচারে বেশ ভালোভাবেই সক্ষম হয়। এর পেছনে নিয়ামক ভূমিকা রাখে পশ্চিমা রাজনীতিবিদ, আমলা ও পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীরা। কিন্তু, একটি সহজ কিন্তু উপেক্ষিত বাস্তবতা হলো, পশ্চিমা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি আর ‘লিবারেলিজম’-এর মোড়কে উপস্থাপিত বর্বর পশ্চিমা দর্শন ও মতবাদ—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একটি কার্যকর বলে অপরটিও কার্যকর, এটা একেবারেই ঢালাও ও বাতিল একটি দাবি। রবার্ট বয়েলকে আধুনিক বিজ্ঞানের জনকদের অন্যতম মনে করা হয়। বয়েলের তীব্র সমালোচক ছিলেন পশ্চিমা দর্শন তথা লিবারেলিজমের প্রবাদ-পুরুষদের একজন থমাস হবস। থবসের বক্তব্য ছিল, “ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করে প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের ব্যাপারে বাস্তবতা বোঝা গেলেও মানবীয় আচরণ বা প্রবণতার বাস্তবতা বোঝা সম্ভব না।” ব্রুনো লাতুর We Have Never Been Modern বইয়ে বলেন, “Representation of things through the intermediary of the laboratory is forever dissociated from the representation of citizens through the intermediary of the social contract.” অর্থাৎ, “পাহাড় থেকে একটি পাথর এনে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে বস্তুজগত সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে আনা পাথর যেভাবে বস্তুজগতের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, আধুনিক রাষ্ট্র বা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে থাকা সামাজিক চুক্তির ধারণাগুলো একইভাবে মানবীয় সম্পর্কের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।” বাস্তবতা হলো অজ্ঞ, প্রবৃত্তিপূজারী, অন্ধানুসারী, অদূরদর্শী অথবা বিভ্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া বোধসম্পন্ন কেউ লিবারেলিজমের স্রোতে গা ভাসায় না। বস্তুগত উন্নতি আর আত্মিক ও সামাজিক উৎকর্ষতাকে এক পাল্লায় মাপার মানেই হলো, নিজেকে জড়বস্তু বা পশুর স্তরে নামিয়ে নেওয়া। নিজেদের বানরের বংশধর মনে করে যারা উল্লসিত হয়, তাদের জন্যে কোনো আক্ষেপ নেই। আক্ষেপ তাদের জন্য, যারা নিজেদের আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সন্তান মনে করা সত্ত্বেও বস্তু ও ব্যক্তি, পশু ও মানুষের পার্থক্য করতে ভুলে যায়। মনে রাখতে হবে, প্রকৃত জ্ঞান হলো তাওহিদের জ্ঞান, ইসলামের জ্ঞান। মানবীয় গুণাবলি, সামাজিক শৃঙ্খলা ও আদল-ইনসাফের যথার্থতা নির্ণয়ের জ্ঞান। সৃষ্টির শুরু থেকেই এ কথা সত্য। আর আল্লাহ তা’আলা কিতাব নাযিল ও নবী-রাসুলদের প্রেরণ করেছেন এ লক্ষ্যেই, لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِالۡبَیِّنٰتِ وَاَنۡزَلۡنَا مَعَہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡمِیۡزَانَ لِیَقُوۡمَ النَّاسُ بِالۡقِسۡطِ “নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।” অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আরামদায়ক বাসস্থান, অধিক খাওয়া, ব্যাপক যৌনতা, গভীর ঘুম, দামি পোশাক তথা দুনিয়াবি ভোগবিলাসের উপকরণ অর্জনে অগ্রগামী হওয়া কিংবা প্রতিযোগিতা করার জ্ঞান অপ্রয়োজনীয় না, কিন্তু নিঃসন্দেহে অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের। আল্লাহ তা’আলা মূলত মানুষকে পরীক্ষার উদ্দেশ্যেই দুনিয়াবি উপকরণ কমবেশি করে দেন। এতে কাফিরদের উল্লসিত হবারও কিছু নেই, মুমিনদেরও দুঃখিত হবার কিছু নেই। وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ ۗ إِنَّ رَبَّكَ سَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ “আর তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং তোমাদের কাউকে কারও ওপর মর্যাদায় উন্নত করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তোমার রব শাস্তি প্রদানে দ্রুত; আর নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” وَلَا تَمُدَّنَّ عَیۡنَیۡکَ اِلٰی مَا مَتَّعۡنَا بِہٖۤ اَزۡوَاجًا مِّنۡہُمۡ زَہۡرَۃَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۬ۙ لِنَفۡتِنَہُمۡ فِیۡہِ ؕ وَرِزۡقُ رَبِّکَ خَیۡرٌ وَّاَبۡقٰی “আর তুমি কখনো প্রসারিত করো না তোমার দু’চোখ সে সবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের জাঁক-জমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি। যাতে আমি সে বিষয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারি। আর তোমার রবের প্রদত্ত রিয্ক সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিকতর স্থায়ী।” ‘ভোগবাদ’ তথা দুনিয়াবি ভোগবিলাসিতার সর্বোচ্চকরণকেই সফলতার মানদণ্ড ধরলেও- আধুনিক মানুষ আগেকার মানুষের চেয়ে অগ্রগামী ‘হয়েছে- তাও তো নয়! اَفَلَمۡ یَسِیۡرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ فَیَنۡظُرُوۡا کَیۡفَ کَانَ عَاقِبَۃُ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ ؕ کَانُوۡۤا اَکۡثَرَ مِنۡہُمۡ وَاَشَدَّ قُوَّۃً وَّاٰثَارًا فِی الۡاَرۡضِ فَمَاۤ اَغۡنٰی عَنۡہُمۡ مَّا کَانُوۡا یَکۡسِبُوۡنَ “তারা কি জমিনে ভ্রমণ করেনি, তা হলে তারা দেখত, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল? তারা জমিনে ছিল তাদের চেয়ে সংখ্যায় অধিক, আর শক্তিতে ও কীর্তিতে তাদের চেয়ে অধিক প্রবল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তা তাদের কোন কাজে আসেনি।” كَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ كَانُوا أَشَدَّ مِنْكُمْ قُوَّةً وَأَكْثَرَ أَمْوَالًا وَأَوْلَادًا فَاسْتَمْتَعُوا بِخَلَاقِهِمْ فَاسْتَمْتَعْتُمْ بِخَلَاقِكُمْ كَمَا اسْتَمْتَعَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ بِخَلَاقِهِمْ وَخُضْتُمْ كَالَّذِي خَاضُوا ۚ أُولَٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ “তোমাদের পূর্ববর্তীদের মতো—তারা তোমাদের চেয়ে শক্তিতে অধিক প্রবল ছিল এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে ছিল অধিক। অতঃপর তারা তাদের অংশ ভোগ করেছে; তোমরাও তোমাদের অংশ ভোগ করেছ, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের অংশ ভোগ করেছিল। আর তোমরাও তেমনি অনর্থক কথাবার্তা ও বিতর্কে লিপ্ত হয়েছ, যেমন তারা লিপ্ত হয়েছিল। তাদের আমল দুনিয়া ও আখিরাতে বিনষ্ট হয়েছে এবং তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” আর মানুষ তো উইপোকার চেয়েও অদক্ষ নির্মাতা, কচ্ছপের চেয়েও ক্ষণজন্মা, আত্মরক্ষায় সেপিয়ার চেয়ে দুর্বল, তিমির চেয়ে কম খাদ্যগ্রহণে সক্ষম, খরগোশের চেয়ে কম যৌনসক্রিয়, সিংহের চেয়ে কম নিদ্রা উপভোগকারী, শূকরের চেয়ে কম নির্লজ্জ। সুতরাং পশুপাখির সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া সেক্যুলারদের মানালেও, মুসলিমদের মানায় না। আসলে, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কোনো মানুষকেই মানায় না। লিবারেলিজমের মায়াজালে থেকে জাতিকে বের করে আনতে সবার আগে তাই আপামর মুসলিম জনতা, বিশেষত ইসলামপন্থীদের সজাগ হওয়া জরুরি। তাদেরকে বুঝতে হবে যে- ব্যক্তি, সমাজ ও রাজনীতি থেকে ইসলামকে অপসারণের অপরাধে ডানপন্থী, মধ্যমপন্থী ও বামপন্থী সকল লিবারেলই অপরাধী। ভিন্নতা কেবল তাদের নিয়ত, সংকল্প, ক্ষেত্র ও মাত্রায়। তাই, অগ্রসর ইসলামপন্থীদের জন্য লিবারেল জাহেলিয়্যাতের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করা, উম্মাহকে সেক্যুলার শাসনের করাল গ্রাস থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসা এবং গণমানুষকে তাওহিদের আক্বীদাহ’য় দীক্ষিত ও দিকনির্দেশ করার বিকল্প নেই।