(১)

উপমহাদেশে ইসলামী শাসনের অবসানের পর থেকে ইসলামপন্থীদের দ্বীনি ও রাজনৈতিক চেতনা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ার ফলস্বরূপ প্রকৃত ইসলামি দাওয়াহ ও রাজনীতির পরিবর্তে লেজুড়বৃত্তিক ও প্রতিক্রিয়াশীল মেহনতই এদেশে ইসলামি দাওয়াহ ও রাজনীতির মূল স্রোতে পরিণত হয়। বিশেষত ইমাম সাইয়িদ আহমাদ শহিদ (রহিমাহুল্লাহ), তিতুমীর (রহিমাহুল্লাহ)’র তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া আন্দোলন ব্রিটিশরা দমন করার পর বিকল্প শক্তি ও আন্দোলন গড়ে না ওঠায় ক্রমশই ইসলামপন্থীদের আক্বীদাহগত ও ঈমানি বিচ্যুতিও দেখা দেয়। যার দরুন আমরা তিক্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হই।

১৮৫৭ পরবর্তী সময়ে তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া আন্দোলনের চেতনা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পূর্বসূরীদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব পথে ইসলামকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা বাদ দিয়ে- সেক্যুলারদের সাথে গাটছড়া বাঁধার মূল্য ইসলামপন্থীদেরকে আজও দিতে হচ্ছে। 

মুসলিমদের মাঝে ঈমানী চেতনা ও রাজনৈতিক সচেতনতার সংকটকে অল্পসংখ্যক হকপন্থী উলামায়ে কেরাম ও বিচক্ষণ ইসলামপন্থীরা চিহ্নিত করেছেন। ঠিক একইভাবে এই দুর্বলতাকে চিনতে পেরেছে সুবিধাবাদী পপুলিস্ট, সেক্যুলার রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি ও এক্টিভিস্টরাও। 

১৭৭৬ ও ১৭৮৯ সালে যথাক্রমে আমেরিকান বিপ্লব ও ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের পর মূলত লিবারেল দর্শন ও রাজনীতির দুই ধারা সামনে চলে আসে, 

ক) ক্ল্যাসিকাল লিবারেল ধারা বা ডানপন্থা ও 

খ) প্রগ্রেসিভ লিবারেল ধারা বা বামপন্থা।

সাধারণত, পপুলিস্ট বলতে ক্ল্যাসিকাল লিবারেল বা ডানপন্থীদেরই বোঝানো হয়। একসময়ে কিছু কমিউনিস্টরা নিজেদের লিবারেল মানতে না চাইলেও, আদতে তারা বামপন্থী লিবারেলদের মাঝে বিলীন হয়ে গেছে।

উত্তর-উপনিবেশকালে শীতল যুদ্ধ চলাকালীন বামপন্থার উগ্র উত্থান ঘটে। পূর্ব-পশ্চিমের প্রায় সব দেশেই প্রগ্রেসিভ লিবারেল বা বামপন্থীদের ব্যাপক প্রভাব বাড়ে। এই বামপন্থী প্রগ্রেসিভ লিবারেলরা ক্ল্যাসিকাল লিবারেল বা ডানপন্থীদের মতো কেবল শাসনব্যবস্থা থেকে নয়; বরং সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তি পর্যায় থেকেও ট্র‍্যাডিশনাল মূল্যবোধ ও ধর্মের প্রভাব বিলোপে কাজ করা শুরু করে।

এমতাবস্থায়, বরাবরের ন্যায় তাওহিদবাদী ঈমানদারদের ক্ষুদ্র একটি অংশ ব্যতীত উম্মাহর বড় একটি অংশ উগ্র বামপন্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদাহ ও মানহাজের আলোকে স্বতন্ত্র  সংগ্রাম না করে- ডানপন্থী, পপুলিস্ট সেক্যুলারদের সাথে গাটছড়া বাঁধেন এবং প্রায় অন্ধ আনুগত্যের পথ বেছে নেন। এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামপন্থীদের বৃহৎ অংশটি ইলেকশন, পার্লামেন্ট, ছকবাঁধা বৈচিত্র্যহীন কর্মসূচি, আপসরফা এবং সেক্যুলার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার চোরাবালিতে আটকা পরে যান। 

বামপন্থার উত্থান ও ইসলামপন্থার দুর্বলতার সুযোগে মানুষের রাজনৈতিক চিন্তার দখল নিতে সক্ষম হয় ডানপন্থী সেক্যুলাররা। পপুলিস্ট ডানপন্থীদের চিন্তাধারা হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ-অনুভূতির বিরোধিতা না করে, তাদের সমর্থন আদায়কে সামনে রেখে রাজনীতি ও অ্যাক্টিভিজম করা। যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে পপুলিস্টরা মুসলিমদের স্বার্থ-চাহিদাকে প্রাধান্য দেয়। যেখানে হিন্দু বা খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে প্রাধান্য দেয় হিন্দু বা খ্রিষ্টানদের। সাধারণভাবে বললে, যাদেরকে ডানপন্থী হিসেবে আমরা জানি, তারা মূলত পপুলিস্ট রাজনীতিই করে থাকে। যেমন, ব্রিটেনের টোরি পার্টি, আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টি, ভারতের বিজেপি ইত্যাদি পপুলিস্ট ডানপন্থী সেক্যুলার ধারার রাজনৈতিক দল।

আমাদের দেশে বিএনপি, জামাতে ইসলামি, গণঅধিকার পরিষদ এ-ধরনের রাজনীতির পতাকাবাহী। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে তারা কট্টর বামঘেষা, সেক্যুলার শাসকগোষ্ঠীর বিরোধিতা করেছে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, শুধুমাত্র কোনো সুনির্দিষ্ট শাসকদলের পতন ইসলামপন্থীদের মূল লক্ষ্য হতে পারেনা; ইসলামি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য সেক্যুলার শাসনব্যবস্থার ক্ষয় ও প্রতিস্থাপন। 

আওয়ামী আমলে পপুলিস্ট, ডানপন্থী বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্টরা জানত,

ক) ইসলামপন্থীদের ব্যাপক সমর্থন ছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হোক, সামরিক প্রক্রিয়ায় হোক অথবা গণআন্দোলনের আকারে হোক- ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব না।

খ) ক্ষমতার কাঠামোর পুনর্বিন্যাস যে প্রক্রিয়াতেই (গণতান্ত্রিক, সামরিক ক্যু বা গণআন্দোলন) হোক না কেন- অসংগঠিত, অসচেতন, মধ্যবিত্ত মানসিকতায় আচ্ছন্ন ও বাগাড়ম্বরে অভ্যস্ত নেতৃত্বের অনুগত ইসলামপন্থীদের পক্ষে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে নিয়ামক ভূমিকা রাখা সম্ভব। ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার মতো সক্ষমতা তারা রাখে না। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তনের চূড়ান্ত ফলাফল যাবে পশ্চিমাপন্থী, পপুলিস্ট সেক্যুলার কোনো গ্রুপের পক্ষেই।

হ্যাঁ, এনাম অথবা কৌশল হিসেবে সাথে থাকা ইসলামপন্থীদের কাউকে কাউকে শিল্প, কৃষি, সমাজকল্যাণ বা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আলংকরিক পদ হয়তো দেওয়া হবে; যেমনটা আগেও হয়েছে। কিন্তু সাধারণত উক্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর তেমন কিছু করার সক্ষমতা থাকবে না, তাদের কাজ চালিত হবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়োজিত কোনো প্রভাবশালী সেক্যুলার সচিবের প্রভাবে। কথাগুলো জটিল মনে হলেও, সংক্ষেপে সম্ভাব্য সংকটের বাস্তব চিত্র এমনটাই।

এই মৌলিক বাস্তবতা জানে বলেই, পপুলিস্ট সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনীতিবিদরা ইসলামপন্থীদের আবেগ, অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষাকে এত বেশি গুরুত্ব দেয়। হতে পারে- নিজ ইচ্ছা বা আদর্শের প্রতি আন্তরিক হয়েই তারা তা করে। তবে তারা যে সেক্যুলার ফ্রেমওয়ার্কের বাইরে গিয়ে কিছু ভাবে কিংবা ইসলামী শাসনব্যবস্থার আশা বা কল্পনা করে, এমনটা নয়। 

অতএব, ইসলামপন্থীদের জন্য উচিত নয়,

ক) প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা ইতিহাসের সঠিক বয়ান জানতে গিয়ে সেক্যুলারদের আদর্শিক গোলামে পরিণত হওয়া।

খ) হিন্দুত্ববাদ ও উগ্র সেক্যুলারিজমের বিরোধিতা করতে গিয়ে, ইসলামপন্থা বাদ দিয়ে নিজের অজান্তেই পপুলিজমের মোড়কে আবৃত ডানপন্থী সেক্যুলারিজমকে আঁকড়ে ধরা বা শক্তিশালী করা।

উল্লেখ্য, ডানপন্থীদের সবাই-ই ক্ষমতালোভী, বিষয়টি এমন নয়। বিশেষ ব্যতিক্রম থাকতেই পারে, এমনকি কখনো ইসলামী শাসন কায়েম হলে তাদের অনেককে সহযোগী হিসেবেও পাওয়া যাবে হয়তো।

যেভাবে পপুলিজমের প্রতারণার শিকার হয়ে ইতিপূর্বে ইসলামপন্থীদের উন্মেষ ছিনতাই হয়েছিল জিন্নাহ-জিয়া-এরশাদের মতো অপরচুনিস্ট, ডানপন্থী সেক্যুলারদের হাতে, যেভাবে তাদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিল প্রবঞ্চিত ‘ইসলামী’ নেতৃবৃন্দ- ঠিক একই ঘটনা আবারও ঘটতেই থাকবে, যদি না ইসলামপন্থীরা যুগের দাবি মেটাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়।


(২)

পপুলিস্ট, ডানপন্থী সেক্যুলারদের চিন্তাধারা হচ্ছে, জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠের (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, সরলমনা মুসলিমদের) আবেগ-অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে, তাদের সমর্থন আদায়কে সামনে রেখে রাজনীতি করা। অনলাইন ও অফলাইনের অ্যাক্টিভিজমেও তা-ই দেখা যায়। 

রাষ্ট্র, মিডিয়া ও শিক্ষাব্যবস্থার বৈরী আচরণের ফলে, ইসলামপন্থীদের মাঝে রাজনীতি ও ইতিহাসের সঠিক বক্তব্যের ও প্ল্যাটফর্মের সংকট রয়েছে। ফলে জনমানুষের মাঝে ইতিহাস, রাজনীতি সম্পর্কে জানার আগ্রহের শূন্যতা পূরণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখছে পপুলিস্ট সেক্যুলার রাজনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্টরা। মানুষ সমস্যার সমাধান না পেলেও, সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুনতে, করতে এবং পরিশেষে সমস্যা চিহ্নিতকারীর প্রস্তাবনা দ্বারা প্রভাবিত হতে ভালোবাসে। বঞ্চিত, নিপীড়িত মুসলিম সমাজের আবেগকে সহজেই অবচেতনভাবে তাড়িত ও নিয়ন্ত্রিত করতে পপুলিস্ট রাজনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্টরা তাই শাসক শ্রেণির অন্যায়-অত্যাচারকে ক্রমাগত সামনে আনতে থাকে।

“Populism ask the right set of questions but does not provide a ready-made set of answers.” 

“পপুলিজম সমস্যাগুলো তুলে ধরে, কিন্তু তার কোনো গোছানো সমাধান নেই।”

এই কায়দায় ইসলামপন্থী ও সরলমনা মুসলিমদের ওপর ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করছে ফরহাদ মজহার, পিনাকী ভট্টাচার্য, ভিপি নূর, ডক্টর জাফরুল্লাহ ও জামাত-বিএনপিপন্থী অন্যান্য মতো পপুলিস্ট বা ডানপন্থী সেক্যুলাররা।

শাসকশ্রেণির অন্যায়ের সমালোচনা জরুরি ও কাম্য, এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নেই। কিন্তু আপত্তি হলো ন্যায়সংগত কথার অসংগত উদ্দেশ্য নিয়ে। সেক্যুলার পপুলিস্টরা বিদ্যমান সমস্যাবলির নানামুখী আলোচনা করলেও, সমাধান বা বিকল্পের ক্ষেত্রে ভাসা ভাসা বক্তব্য উপস্থাপন করে। ঠিক কীভাবে স্বৈরশাসনের পতনের পর অবস্থার উন্নতি ঘটবে, তা তাদের বক্তব্যে অনুপস্থিত। পপুলিস্ট অ্যাক্টিভিস্টদের মূল উদ্দেশ্য হলো, আপামর মুসলিম জনতাকে -শাসকদের অত্যাচারের বয়ান তুলে ধরে- প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে নিজ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা।

জনসাধারণকে প্রলুব্ধ করতে তাদের নিয়মিত হাতিয়ার হয়ে থাকে ডিস-ইনফরমেশন ও মিস-ইনফরমেশন। এসকল অ্যাক্টিভিস্ট, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মেহনতের ফলাফল শেষ অবধি এই দাঁড়ায় যে, জনসাধারণ ফির’আউনের কবল থেকে নমরূদের খপ্পরে গিয়ে পড়ে।

এ ধরনের পরিবর্তনের দুটি ধারা আছে।

ক. গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুযোগসন্ধানী পপুলিস্ট সেক্যুলাররা কথা ও লেখার জাদুতে মোহগ্রস্ত করে গণহারে সাধারণ, অচেতন মুসলিমদের ভোট বাগিয়ে নেয়। অথবা,

খ. চেপে বসা সামরিক শাসন বা স্বৈরশাসনের ফলে ক্ষমতায় আরোহণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সফল হবার কোনো সম্ভাবনা যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে জনসাধারণের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে সেক্যুলাররা বেছে নেয় গণআন্দোলন আর অভ্যুত্থানের পথ। যেমন, ‘৬৯ এ আইয়ুববিরোধী অভ্যুত্থান, ‘৭৫ এ খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভ্যুত্থান কিংবা ‘৯০ এর এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন। 

এভাবেই হয় ভোটের মাধ্যমে অথবা অভ্যুত্থান-বিপ্লবের মাধ্যমে জিন্নাহ, ভুট্টো, মুজিব, জিয়া ও এরশাদসহ অন্যান্য ডানপন্থীরা এদেশের মুসলিম জনতার আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সেক্যুলার শাসনের বৈধতা আদায় করে নিয়েছিল।

উল্লেখ্য, জনসমর্থন আদায়ের মাধ্যমে ভোট আদায়ের সমীকরণ সহজে বোধহম্য হলেও, অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের ক্ষেত্রে জনসাধারণকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে সেক্যুলাররা ক্ষমতায় আসে, তা অনেকের কাছেই পরিষ্কার না। কিন্তু এ বিষয়টি জানা ও বোঝা সাধারণ মুসলিম ও আন্তরিক ইসলামপন্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণত সেক্যুলারদের তত্ত্বগুলো খুব একটা সরল না। আবার বাঙালি মুসলিম মানস দীর্ঘ ও জটিল পাঠে সাবলীলও না। যার ফলে পপুলিস্ট গণতান্ত্রিকরা কেন ইসলামপন্থীদের ওপর রাজনৈতিক আধিপত্য চায়, এটা মোটাদাগে বোঝা গেলেও; বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের থিওরিতে বিশ্বাসী সেক্যুলারদের তত্ত্ব বোঝাটা তুলনামূলকভাবে কিছুটা জটিল। আপাতত আমি এমন দুটি বক্তব্য তুলে ধরছি, যা থেকে আশা করা যায় সাধারণ ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে,

১) বাংলাদেশে ৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের রূপকার, জাসদের মাস্টারমাইন্ড, কট্টর বাম-তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খান বলেন,

“বাট থিয়োরি স্ট্যান্ডস। ইভেন রিলিজিয়নকে কনালিফাই (নাকচ) করে তুমি সোশ্যালিস্ট টেকওভারে যেতে পারবে না। মানুষের মধ্যে যেটা আছে এবং থাকবে, সেটাকে তুমি তো ইগনোর করতে পারো না।

যেটা হওয়া উচিত না, সেটা হয়ে গেছে। সেটাকে তুমি অস্বীকার করতে পারো না।”

অর্থাৎ, ইসলামপন্থার প্রভাব যেহেতু সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, তাই একে উপেক্ষা করে বিপ্লব (সোশালিস্ট টেকওভার) সম্ভব না। তাই তাদেরকে সাথে না রাখার সুযোগ নেই।

২) ফরহাদ মজহারের বক্তব্য দেখুন,

(বন্ধনী-আবৃত বক্তব্য লেখকের)

“...এই মৈত্রীটাকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে। এই মৈত্রীর সাথে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যাদেরকে আমরা ইসলামপন্থী বলে বিদ্বেষী হয়ে যাই, মৌলবাদ বলে যাদেরকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিই, তাদের সাথে আমাদের মৈত্রীর প্রয়োজন আছে।

কারণ তারাও দেখা যাচ্ছে এই পরিবর্তনটা চায়।

...তারই আরেক ভাই মাদরাসায় যাইতেসে, কওমি করুক কি আলিয়া করুক। তার সাথে তুমি মৈত্রী চাবে না কেন?

...৩য় শিক্ষাটা আমরা যেখান থেকে নেবো, সেটা হচ্ছে কী করে একটা দলকে দিয়ে জনগণকে উদ্ভুদ্ধ করা এবং সমস্ত কিছু দলের অধীনেই (অর্থাৎ সেক্যুলারদের রাজনৈতিক দল) করতে হবে, দলের লোককে দিয়ে করতে হবে তা না। (অর্থাৎ, দলের বাইরের লোক দিয়েও করতে হবে)

...এবং তাদের কমিটির পরিচালনার অভিমুখটা ঠিক করে দেওয়া তাদের আন্দোলনের।

...এবং সহায়তা করা, যাতে আগামীতে আমরা একটা গণঅভ্যুত্থান করতে পারি। (অর্থাৎ, বিপ্লব কীভাবে হবে তার অভিমুখ ও ফলাফল নির্ধারণ করবে সেক্যুলারদের দল)

দ্বিতীয়ত, গণঅভ্যুত্থানের পরে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দাঁড়া করতে পারি। আপনি তার নাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিতে পারেন। অসুবিধা নাই।”

বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, আওয়ামী শাসন দীর্ঘ ও তীব্র। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল ডানপন্থী সেক্যুলারদের জন্য সুদূরপরাহত হওয়ায়, এদেশের পপুলিস্ট সেক্যুলারদের কাছে বিকল্প বাকি রয়ে যায়- সেনা অভ্যুত্থান কিংবা গণঅভ্যুত্থান। যেহেতু, পপুলিস্ট সেক্যুলাররা সেনাবাহিনীর একচেটিয়া শাসন চায় না আর জনসমর্থনহীন সেনাশাসন শেষ অবধি ব্যর্থ হয়- এই বিবেচনায় তাদের রাজনৈতিক লাইন হয়ে দাঁড়ায়— ‘সুনির্দিষ্ট সেক্যুলার গোষ্ঠীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে ইসলামপন্থীদের ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও গণআন্দোলন।’

কারণ,

ক. যদি সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের আশায় থাকতে হয়, সেক্ষেত্রেও এ-ধরনের পদক্ষেপের উপযোগী পরিস্থিতি (যেমন, জনগণের রাজপথে স্বতঃস্ফূর্ত অবস্থান বা প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল করে দেওয়া ইত্যাদি) প্রয়োজন। 

খ. আর যদি গণবিপ্লব ঘটাতে হয়, গত শতাব্দীর রাশিয়া, ইরান বা চীনের মতো, তবে কৃষক বা শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে আজকের বাংলাদেশে তা করা সম্ভব না। এক্ষেত্রে, দৃশ্যমান বিকল্প হলো ইসলামপন্থীদের কাজে লাগিয়ে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং অতঃপর অন্তর্বতীকালীন সরকার গঠন।

যদি এতে সফলতা আসে, তাহলে আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেহেতু আগে থেকেই সেক্যুলারদের হাতে ছিল, তাই নতুন শাসনকাঠামোতে নামেমাত্র অংশগ্রহণ ছাড়া ইসলামপন্থীদের আর কোনো প্রভাব থাকবে না। 

ফলাফল হবে, এক সেক্যুলারের বদলে আরেক সেক্যুলারের ক্ষমতায়ন!

কট্টর বামপন্থী সেক্যুলাররা যদি ইসলামপন্থীদের বুকে গুলি চালিয়ে, বন্দি করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়- তাহলে ছদ্মবেশী পপুলিস্ট ডানপন্থী সেক্যুলাররা চায় ইসলামপন্থীদের ধোঁকায় ফেলে, বন্দুকের নলের মুখোমুখি করে, রাস্তায় পরে থাকা লাশে পরিণত করে ক্ষমতা অর্জন করতে। কাজেই সুবিধাবাদী সেক্যুলারদের রাজনৈতিক প্রতারণার শিকার হয়ে নিজ জীবন, যৌবন, সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক নির্বুদ্ধিতা কখনই কাম্য নয়।

নিজের আদর্শকে আঁকড়ে না ধরে, নিজস্ব রাজনীতি নির্মাণ না করে- ঢালাওভাবে, একদেশদর্শীর ন্যায় আগের মত সেক্যুলারদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যর্থতার ঘানি বয়ে বেড়ানো কাম্য নয়। পাশাপাশি, নিজেদের লক্ষ্য ও রাজনীতি ঠিক না করে, সেক্যুলারদের (ডানপন্থী/বামপন্থী) আহ্বানে প্রতিক্রিয়াশীল কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা ও অন্যকে বিরত রাখাও জরুরি।

কেননা, নিঃসন্দেহে কেবলমাত্র আদর্শের ক্ষেত্রে আপসহীন এবং বিশুদ্ধ মানহাজের অনুসারী ইসলামপন্থী নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের ফলাফলই ইসলামের পক্ষে যাবে। অন্য কিছু নয়।