ভূমিকা
তাওফীক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই। 

الحمد لله وكفى والصلاة والسلام على عبده ورسوله المصطفى وآله وصحبه ومن لنهجهم قفا.

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার জন্য এবং তিনি যথেষ্ট! সালাত ও সালাম তাঁর বান্দা ও নির্বাচিত রাসূল ﷺ-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর, তাঁর সাথীবর্গের ওপর এবং যারা তাদের পথে চলবে তাদের সকলের ওপর!

হামদ ও সালাতের পর - 

প্রিয় ভাইদের জ্ঞাতার্থে বলছি, ঈমান, সঠিক পথ, তাকওয়া ও পূণ্যময় কাজের জন্য হিদায়াত ও তাওফীক একমাত্র আল্লাহ ﷻ-এর মালিকানাধীন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যাকে ইচ্ছা তাকে নিজের দয়া, কৃপা ও অনুগ্রহ দান করেন আর যাকে ইচ্ছা তাকে এ থেকে বঞ্চিত করেন। তাই তো নবী মুহাম্মাদ ﷺ সৃষ্টিকুলের মাঝে আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত ও প্রিয়ভাজন হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ জাল্লা ওয়ালা তাঁকে বলছেন:

اِنَّکَ لَا تَہۡدِیۡ مَنۡ اَحۡبَبۡتَ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَہُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُہۡتَدِیۡنَ

“আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, আল্লাহ তা’আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভালো জানেন।” [1]

আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন:

فَمَنۡ یَّہۡدِیۡ مَنۡ اَضَلَّ اللّٰہُ

“আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে হিদায়াত দেয়ার কে আছে?” [2]  

তিনি আরো ইরশাদ করেন:

اِنۡ تَحۡرِصۡ عَلٰی ہُدٰىہُمۡ فَاِنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِیۡ مَنۡ یُّضِلُّ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ

“আপনি তাদেরকে সুপথে আনতে আগ্রহী হলেও আল্লাহ যাকে বিপথগামী করেন (তাকে পথ দেখানো হয় না) এবং তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই।” [3]

ইমামুল কিরাত নাফে’- সহ অন্যান্যদের মতে يَهْدِى   মাজহুল [4] হবে। 

ذٰلِکَ ہُدَی اللّٰہِ یَہۡدِیۡ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَمَنۡ یُّضۡلِلِ اللّٰہُ فَمَا لَہٗ مِنۡ ہَادٍ

“এটাই আল্লাহর পথ নির্দেশ, এর মাধ্যমে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।” [5]

وَمَنۡ یُّضۡلِلِ اللّٰہُ فَمَا لَہٗ مِنۡ ہَادٍ - وَمَنۡ یَّہۡدِ اللّٰہُ فَمَا لَہٗ مِنۡ مُّضِل

“আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। আর আল্লাহ যাকে পথপ্রদর্শন করেন, তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই।” [6]

وَلَوۡ شَآءَ رَبُّکَ لَاٰمَنَ مَنۡ فِی الۡاَرۡضِ کُلُّہُمۡ جَمِیۡعًا ؕ اَفَاَنۡتَ تُکۡرِہُ النَّاسَ حَتّٰی یَکُوۡنُوۡا مُؤۡمِنِیۡنَ - وَمَا کَانَ لِنَفۡسٍ اَنۡ تُؤۡمِنَ اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِ ؕ وَیَجۡعَلُ الرِّجۡسَ عَلَی الَّذِیۡنَ لَا یَعۡقِلُوۡنَ

“আর তোমার রব যদি চাইতেন, তবে পৃথিবীর বুকে যারা রয়েছে, তাদের সবাই ঈমান নিয়ে আসতো সমবেতভাবে। তুমি কি মানুষের উপর জবরদস্তী করবে ঈমান আনার জন্য? আর কারো ঈমান আনা হতে পারে না, যতক্ষণ না আল্লাহর হুকুম হয়। পক্ষান্তরে তিনি অপবিত্রতা আরোপ করেন যারা বুদ্ধি প্রয়োগ করে না তাদের উপর।” [7]

وَلَوۡ شِئۡنَا لَاٰتَیۡنَا کُلَّ نَفۡسٍ ہُدٰىہَا وَلٰکِنۡ حَقَّ الۡقَوۡلُ مِنِّیۡ لَاَمۡلَـَٔنَّ جَہَنَّمَ مِنَ الۡجِنَّۃِ وَالنَّاسِ اَجۡمَعِیۡنَ

“আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেককে সঠিক দিক নির্দেশ দিতাম; কিন্তু আমার এ উক্তি অবধারিত সত্য যে, আমি জিন ও মানব সকলকে দিয়ে অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করব।” [8]

কুরআনে এমন বহু আয়াত রয়েছে। যেসব বিষয় বিশ্বাস করা, স্বীকারোক্তি দেওয়া এবং আল্লাহ জাল্লা ওয়ালার ব্যাপারে যেসব বিষয়ে অন্তরে স্থির ধারণা পোষণ করা সর্বাগ্রে প্রণিধানযোগ্য, এটি তেমনি একটি বিষয়। বান্দা যখন এই বিষয়গুলো পালন করবে, তখন তার এসব সুদৃঢ় ধারণা ও বিশ্বাসের দাবি এটাই হবে, সে যেন তার রবের প্রতি মনোনিবেশ করে, হিদায়াতের আশায় তার কাছেই ফেরে, ব্যাকুল হয়ে তার কাছে হিদায়াত কামনা করে এবং অবিরত তার রহমতের দুয়ারে করাঘাত করতে থাকে। একই সঙ্গে সে যেন ভীতসন্ত্রস্ত এবং বিনয়ী হয়। নিজের অক্ষমতা, দারিদ্র্য, দুর্বলতা, নিজের যুলুম-অত্যাচার আল্লাহর সামনে পেশ করে। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আল্লাহ তা’আলার এই উক্তি যেন সে স্মরণ করে:   

“হে আমার বান্দারা! তোমরা প্রত্যেকেই পথভ্রষ্ট কেবল ওই ব্যক্তি ব্যতীত যাকে আমি হিদায়াত দান করি। অতএব তোমরা আমার কাছে হিদায়াত কামনা করো, আমি তোমাদেরকে হিদায়াত দান করব।”

আর মুখে হিদায়াত কামনা করার চাইতে নিজের অবস্থার দ্বারা হিদায়াতের আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর কাছে প্রকাশ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বান্দা এভাবে বলবে:

‘হে আল্লাহ যদি তুমি আমাকে হিদায়াত দান না করো তবে কে আমাকে হিদায়াত দেবে? যদি তোমার রহমত দ্বারা আমাকে ঢেকে না নাও, যদি তোমার অনুগ্রহের চাদরে আমাকে জড়িয়ে না নাও, যদি হিদায়াতের নিয়ামত আমাকে দান না করো, তবে তো আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাব! আমি তো ধ্বংস হয়ে যাব!’

অতঃপর যে মুমিন বান্দাকে আল্লাহ তা’আলা হিদায়াতের প্রাথমিক স্তরে উপনীত হওয়ার তাওফীক দান করেছেন, তাকে জানতে হবে যে, হিদায়াতের অনেক পর্যায় ও স্তর রয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:

وَالَّذِیۡنَ اہۡتَدَوۡا زَادَہُمۡ ہُدًی وَّاٰتٰہُمۡ تَقۡوٰىہُمۡ

“যারা সৎপথ প্রাপ্ত হয়েছে তাদের সৎপথ প্রাপ্তি আরো বেড়ে যায় এবং আল্লাহ তাদেরকে তাকওয়া দান করেন।” [9]

وَیَزِیۡدُ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اہۡتَدَوۡا ہُدًی

“যারা সৎপথে চলে আল্লাহ তাদের পথ প্রাপ্তি বৃদ্ধি করেন।” [10]

একারণেই আল্লাহ জাল্লা ওয়ালা আমাদের জন্য ওয়াজিব করে দিয়েছেন, যেন আমরা প্রতিদিন কয়েকবার তাঁর কাছে হিদায়াত কামনা করি। আর এটি হচ্ছে এমন একটি দু’আ, যা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। তাই তো আল্লাহ তা’আলা আমাদের সালাতগুলোতে সূরা ফাতিহা পাঠ করাকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন আর তাতে রয়েছে এই আয়াত:  

اِہۡدِنَا الصِّرَاطَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ

“আমাদেরকে সিরাতে মুস্তাকিম তথা সরল পথের হিদায়াত দিন।” [11]

এই আয়াতটি সুরা ফাতিহার মূল অংশ। কারণ এর আগের আয়াতগুলো হচ্ছে ভূমিকা ও সূচনাস্বরূপ। সেখানে আল্লাহর হামদ, সানা, মহিমা ব্যঞ্জনা অতঃপর সবিনয় প্রার্থনা এসেছে। আর এই আয়াতের পরের আয়াতগুলোতে সিরাতে মুস্তাকিমের অর্থ ব্যাখ্যা করার মধ্য দিয়ে এই দু’আর পরিশিষ্ট আনা হয়েছে। সেখানে আল্লাহর নির্বাচিত পূণ্যবান যেসব বান্দাদেরকে তিনি হিদায়াত দান করেছেন, অনুগ্রহ করেছেন এবং যাদেরকে তিনি সাফল্য দান করেছেন, তাদের ওপর তাঁর নিয়ামত বর্ষণের আলোচনা করা হয়েছে।   

নিঃসন্দেহে পরিপূর্ণরূপে হিদায়াত লাভের কিছু মাধ্যম রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার তাওফীক এবং তার প্রতি মনোনিবেশের পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, বিশুদ্ধ পন্থায় সৎ উদ্দেশ্যে উপকারী ইলম অর্জন করা এবং দ্বীনের ব্যাপারে গভীর জ্ঞান লাভ করা; কল্যাণ প্রত্যাশী হওয়া এবং সর্বদা উত্তম থাকতে চেষ্টা করা। এমনিভাবে মহিয়ান আল্লাহর ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, তিনি দ্বীনকে সহজ-সরল করে দিয়েছেন যেমনটি তিনি ইরশাদ করছেন:

یُرِیۡدُ اللّٰہُ بِکُمُ الۡیُسۡرَ وَلَا یُرِیۡدُ بِکُمُ الۡعُسۡرَ

“আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না।” [12]

তিনি আরো ইরশাদ করেন:

وَلَقَدۡ یَسَّرۡنَا الۡقُرۡاٰنَ لِلذِّکۡرِ فَہَلۡ مِنۡ مُّدَّکِرٍ

“আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?” [13]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দ্বীন ও শরীয়তের শাখাগত বিষয়গুলোর সামষ্টিক বিবেচনা এ কথাই প্রমাণ করে যে, আল্লাহর দ্বীন খুবই সহজ-সরল, এতে কোন প্রকার অস্পষ্টতা বা সাধ্যাতীত চাপের কিছুই নেই। না আছে কোন প্রকার জটিলতা, দুর্বোধ্যতা বা কৃত্রিমতা। তাইতো আল্লাহ জাল্লা ওয়ালা ইরশাদ করেন:

وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَاَعۡنَتَکُمۡ

“আর যদি আল্লাহ চাইতেন তবে অবশ্যই তোমাদেরকে কষ্টে ফেলতে পারতেন।” [14]

অর্থাৎ তিনি চাইলে তোমাদেরকে পেরেশানি ও সংকীর্ণতার মাঝে পতিত করতে পারতেন কিন্তু তিনি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করে এমনটি করেননি। বরং তোমাদেরকে সহজতা দান করেছেন, তোমাদের জন্য সরলতা ও প্রশস্ততাকে পছন্দ করেছেন। এমনিভাবে নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন:

هَلَك المُتَنَطِّعونَ

“বাড়াবাড়ি করা লোকেরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে”

এটি তিনি তিনবার বলেছেন। ইমাম মুসলিম সহ অন্যান্য ইমামগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদীসে বাড়াবাড়িকারী বলতে বোঝানো হয়েছে ওই সমস্ত লোকদেরকে, যারা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করে এবং কথা ও কাজের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে। এমনিভাবে যারা দার্শনিকদের পন্থায় সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয় নিয়ে পড়ে থাকে।

অতএব মুমিন বান্দার এই স্থির বিশ্বাস অর্জন করতে হবে যে, এই দ্বীন ও আক্বীদাহ আল্লাহর রহমতে খুবই সহজ ও সরল। ইলমুল কালামের লোকেরা এবং শরীয়তের পথ থেকে বিচ্যুত, শরীয়তের ব্যাপারে উদাসীন, অতীত ও বর্তমানের ভ্রান্ত দার্শনিকেরা (ফালসাফাহ) দ্বীনকে যেভাবে কঠিন করে উপস্থাপন করেছে, তেমনটা নয়।  

অতএব আল্লাহ তা’আলার (মহিমাময় যার নামসমূহ) ব্যাপারে, তাঁর ফেরেশতাদের ব্যাপারে, তাঁর রাসূলগণের ব্যাপারে, তাঁর কিতাবসমূহ, দ্বীন ও শরীয়তের ব্যাপারে, অতীত-বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ তথা আখিরাতের সমস্ত গায়েবী বিষয়সমূহের ব্যাপারে, আল্লাহর সমস্ত মাখলুক এবং সেগুলোর মধ্যে আনুগত্যশীল ও অবাধ্য মাখলুকগুলোর মাঝে স্তরবিন্যাসের ব্যাপারে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কর্তৃক লিখিত তাকদীরের ব্যাপারে আমাদেরকে অনিবার্যভাবে কী আক্বীদাহ পোষণ করতে হবে, তার সবকিছুই কিতাব ও সুন্নাহ তে বর্ণিত হয়েছে—সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত আকারে।

এখন সংক্ষিপ্ত বর্ণনাগুলো যে ব্যক্তি পুরোপুরি ভাবে মেনে নিয়েছে, আল্লাহর রহমতে সে নাজাতপ্রাপ্ত ও সফলকাম। আর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে যে ব্যক্তি বিস্তারিতভাবে এগুলোর জ্ঞান অর্জন করেছে, সে অধিক মর্যাদার অধিকারী। আর আল্লাহ তা’আলা তাঁর আদেশের অনুগত বান্দাদের মধ্যে যাকে যতটুকু ইলম, তাঁর মহত্ত্বের পরিচয় ও তাঁর প্রতি আনুগত্য এবং সৎকাজের তাওফীক দান করবেন, সে শরীয়তের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্পর্কে ততটা জানতে পারবে।


আক্বীদাহর ইলম ও এর প্রকারভেদ

এখন কথা হল, আক্বীদাহ-বিশ্বাসের শাখাগত বিষয়াদি; যেগুলোর জ্ঞান অর্জন করা এবং যেগুলো জানার জন্য সচেষ্ট হওয়া মুমিন বান্দার জন্য ওয়াজিব, সেগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও পরিসীমা কী? এটি আসলে এমন একটি মাসআলা, অল্প কথায় যার অকাট্য এবং যুৎসই সমাধান করা খুবই কঠিন। বস্তুতঃ আল্লাহই সর্বজ্ঞ! তবে আমরা মোটাদাগে কিছু সূত্র উল্লেখ করতে পারি, যা মূল বিষয় বুঝতে সহায়তা করবে। সে লক্ষ্যে আমরা বলতে চাই:

আমরা সকলেই জানি, এককথায় উপকারী ইলম বলা হয় ঐ ইলমকে: যে ইলম অর্জন করা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক, আর এই ইলমকেই ফরজে আইন ইলম বলে। আবার ইলমের মাঝে কিছু অংশ রয়েছে যা ফরজে কিফায়া। উলামায়ে কেরাম রাহিমাহুমুল্লাহ এগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যে ইলম অর্জন করা ব্যক্তির জন্য আবশ্যক, তা এমন ইলম হতে হবে, যা অর্জন করা ছাড়া ইসলাম ও ঈমান বিশুদ্ধ হয় না। যার ওপর ইসলামের সব আবশ্যিক দায়িত্ব পালন এবং সর্বপ্রকার আমল কবুল হওয়া নির্ভর করে। শরীয়ত তাফাক্কুহ ফিদ্দীন (দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করা) অর্জনের নির্দেশ দিয়েছে এবং এ বিষয়ে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। আর আল্লাহর দ্বীনের মাঝে অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমণ্ডিত বিষয় হচ্ছে আক্বীদাহ, ঈমান ও তাওহীদের বিষয়টি। কামালাত অর্জনকারী কলব (আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী অন্তর)  ইলম অর্জনের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে, বিশেষ করে ইলমে আক্বীদাহ।

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন:

“যার অন্তরে ইলমের প্রতি সামান্য আগ্রহ, ভালোবাসা অথবা ইবাদাতের প্রবল ইচ্ছা রয়েছে, তার জন্য এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এবং এক্ষেত্রে সত্য উদ্ঘাটন করে তা উপলব্ধি করা জীবনের শ্রেষ্ঠ আকাঙ্ক্ষা ও মাকসাদ। এখানে আমি সেসব বিষয় বোঝাতে চাচ্ছি, আক্বীদাহ হিসেবে যেগুলোকে অন্তরে স্থান দেয়া জরুরি। মহান রব ও তাঁর সিফাতের কাইফিয়্যাত (ধরণ) জানার কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। যাই হোক, বিশুদ্ধ মনের কেউ উপরোক্ত জরুরি বিষয় থেকে বিমুখ হয়ে অন্য কোন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে না।”

এতে কোন সন্দেহ নেই, আক্বীদাহ সংক্রান্ত এমন কিছু মাসআলা রয়েছে, যেগুলো জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। যে ব্যক্তি সে বিষয়ে জানে না তার জন্য তা জানা একান্ত জরুরি। সেগুলো এমন বিষয়, যেগুলোর দ্বারা ঈমানে মুজমাল (অর্থাৎ ঈমান তথা বিশ্বাস এবং ইসলাম তথা আনুগত্যের মূলকথা) অর্জিত হয় এবং নিফাক বা কপট ঈমান থেকে মুক্তি লাভ হয়। পূর্বে আমি এমনটি ইশারা করেছি। এ বিষয়ে শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব রহিমাহুল্লাহ ‘উসূলুস সালাসা’ পুস্তিকাটি রচনা করেছেন এবং তাতে বলেছেন:  

“প্রকাশ থাকে যে—আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন—মুসলমান প্রতিটি নারী-পুরুষের ওপর এই তিনটি মূলনীতি জানা এবং এগুলোর উপর আমল করা ওয়াজিব”

অতঃপর তিনি সেগুলো বর্ণনা করে বলেন:

“অতএব এখন যদি বলা হয়, সেই তিনটি মূলনীতি কী যেগুলো জানা প্রতিটি ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব? তখন বলতে হবে, বান্দার জন্য তার রবের ইলম অর্জন করা, তার রবের দ্বীন সম্পর্কে জানা এবং তার নবী মুহাম্মাদﷺ-এর পরিচয় লাভ করা।”

শায়খের বক্তব্য দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হলো, মোটাদাগে এ তিনটি বিষয়ে সঠিক জ্ঞান লাভ করা। আর আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:

فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا اللّٰہُ وَاسۡتَغۡفِرۡ لِذَنۡۢبِکَ وَلِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ مُتَقَلَّبَکُمۡ وَمَثۡوٰىکُمۡ

“জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। ক্ষমাপ্রার্থনা করুন, আপনার ক্রটির জন্যে এবং মুমিন পুরুষ ও নারীদের জন্যে। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত।” [15]

আল্লাহ জাল্লা ওয়ালা আরো ইরশাদ করেন:

وَالۡعَصۡرِ - اِنَّ الۡاِنۡسَانَ لَفِیۡ خُسۡرٍ - اِلَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَتَوَاصَوۡا بِالۡحَقِّ ۬ۙ وَتَوَاصَوۡا بِالصَّبۡرِ

“কসম সময়ের! নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ! কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে উপদেশ করে সত্যের এবং উপদেশ করে সবরের।” [16]

যে সকল বিষয় ব্যক্তির ঈমানের শক্তি বৃদ্ধির কারণ হয়; যেগুলো ঈমানকে পরিশুদ্ধ করে এবং আল্লাহ তা’আলার তাওহীদ, তাঁর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি, ত্রুটি-বিচ্যুতি, পদস্খলন ও বিভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়া থেকে হিফাযত করে–নিঃসন্দেহে তেমন প্রতিটি বিষয়ের জ্ঞান অর্জন মুমিন বান্দার একান্তই কাম্য এবং এই ইলম অর্জন কখনো মুস্তাহাব থাকে আবার কখনো ওয়াজিব হয়ে যায়। অতএব মুসলিম ব্যক্তি ইলমে তাওহীদ, ইলমে আক্বীদাহ ও ইলমে ঈমান অর্জন করবে কয়েকটি উদ্দেশ্যে:

নিজের আক্বীদাহকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। কারণ আক্বীদাহর কারণে আমল বিশুদ্ধ হয়, ঈমান বিশুদ্ধ হয় এবং বৃদ্ধি লাভ করে। তাওহীদ, আক্বীদাহ ও ঈমানের পাঠ সেজন্যই নেবে যাতে তাওহীদের ওয়াজিব ও মুস্তাহাব সকল শাখা সে অর্জন করতে পারে এবং যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তি, শিরক অথবা কুফর (নাউজুবিল্লাহ) থেকে সে নিরাপদ থাকতে পারে। একারণেই উলামায়ে কেরামের মাঝে অনেকেই যখন বিভিন্ন শাস্ত্রীয় বিষয়ের স্তরবিন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন, তখন তাওহীদ, আক্বীদাহ সংক্রান্ত ইলম এবং ঈমানের মাসআলাগুলোকে সর্বোত্তম ইলম ও শাস্ত্রীয় বিষয় বলে অভিহিত করেছেন। আর এটি সঠিক হবার বিষয়টি স্পষ্ট। অতএব আক্বীদাহ ও তাওহীদ সংক্রান্ত শাখাগত বিষয়টির মাঝে কিছু আছে ওয়াজিব আবার কিছু আছে মুস্তাহাব।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বাতিল আক্বীদাহ পোষণ করা জায়েয নয় এবং সাধ্যমত নিষিদ্ধ বিষয় দূর করা ওয়াজিব। তবে স্থান-কাল-পাত্রভেদে এটির মাঝে তারতম্য হয়ে থাকে। সংশয়বাদী ব্যক্তি সে কখনোই ওই ব্যক্তির মতো নয় যার ঈমান নিরাপদ। এমনিভাবে যে ব্যক্তির জন্য উচ্চস্তরের ইলম অর্জন ও শিক্ষাদান, আল্লাহর পথে দাওয়াত ও নেতৃত্বদান ইত্যাদি বিষয়ের দ্বার উন্মোচিত করা হয়েছে, সে কখনোই সাধারণ অন্য কারো মতো নয়।

আমরা আল্লাহ তা’আলার কাছে কামনা করি যেন তিনি আমাদেরকে এবং আমাদের সকল ভাইকে হিদায়াত ও সঠিক পথ দান করেন আর আমাদেরকে সর্বপ্রকার ফিতনা ও বিভ্রান্তিকর বিষয় থেকে হিফাযত করেন!

“উপকারী কিতাব কোনগুলো?”

এমন প্রশ্নকারী এক ব্যক্তির জবাবে শায়খ ইমাম তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন: 

“উম্মাহ ইলমের প্রতিটি শাখায় এবং সবকটি শাস্ত্রে প্রয়োজনাতিরিক্ত মেধা ব্যয় করেছে। এখন আল্লাহ যার অন্তরকে আলোকিত করতে চান, তাকে তন্মধ্যে উপকারী বিষয়গুলো চয়ন করার তাওফীক দান করেন। আর যাকে অন্ধ করেন, এত এত কিতাব তার জন্য পেরেশানি ও বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না। তাই তো নবীজি ﷺ লাবিদ আনসারীকে বলেছিলেন: ‘ইহুদি-নাসারাদের কাছে কি তাওরাত এবং ইঞ্জিল নেই? এতে তাদের কি উপকার হয়েছে?’

যাই হোক আমরা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে এই প্রার্থনা করি, যেন তিনি আমাদেরকে হিদায়াত ও সঠিক পথের দিশা দান করেন। তিনি যেন আমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন, নফসের অনিষ্ট থেকে আমাদেরকে হিফাযত করেন। আমাদেরকে হিদায়াত দানের পর এবং তাঁর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য রহমতের ফয়সালা করার পর আমাদের অন্তরগুলো বক্র করে না দেন! নিশ্চয়ই তিনিই মহান দাতা।”  

আমি আশা করছি আমার লিখিত এই ভূমিকা সত্যকে পরিচয় করিয়ে দিতে সহায়ক হবে। এ পর্যায়ে আমি প্রশ্নের জবাব আরম্ভ করছি। আল্লাহর সাহায্য নিয়ে আমি বলতে চাই:

তাওহীদের পতাকাতলে সমবেত সকলেই আল্লাহ তা’আলার রহমতে দ্বীন ইসলাম এবং তার চিরাচরিত আক্বীদাহ ও মানহাজের উপর ঐক্যবদ্ধ। আর তা হচ্ছে মুহাম্মাদ ﷺ যা কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলোর প্রতি ঈমান আনা, ভক্তি-ভালোবাসা ও সম্মান সহকারে সেগুলো অনুসরণ করা। নবী ﷺ এর ফায়সালায় অনুগত থাকা এবং তাঁর শরীয়ত ও শরীয়ত সমর্থকদের পক্ষে থাকা। আর এটাই হলো ঈমান ও ইসলাম। ইসলাম পাঁচটি বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত: এই সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমজানের সিয়াম পালন করা এবং সাধ্য থাকলে বাইতুল্লাহ্’র হজ্জ আদায় করা। আর ঈমানের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তা’আলার প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাব সমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলগণের প্রতি, শেষ দিবসের প্রতি এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করা।

এবার আসি শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সংক্রান্ত আলোচনায়—যেগুলোর ব্যাপারে মানুষেরা বিভিন্ন সময়ে জিজ্ঞাসা করে থাকে। আমার মনে হয় প্রশ্নকারী এখানে সেগুলোর কথাই বলতে চাচ্ছেন। মুসলিম উম্মাহর ভেতর আল্লাহর দ্বীন নিয়ে অনেক মতবিরোধ, মতানৈক্য এবং সেগুলোকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার অনেক ঘটনা ঘটেছে। পূর্ববর্তী উম্মতগুলোর ভেতরেও তাই ঘটেছিল। বস্তুত এটি উম্মাহর বিভক্তি প্রসঙ্গে সত্যবাদী ও সত্যায়িত নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর হাদিসের বাস্তবায়ন। হাদীসটিতে তিনি ইরশাদ করেন:

افترقت اليهود على إحدى وسبعين فرقة، فواحدة في الجنة وسبعون في النار، وافترقت النصارى على ثنتين وسبعين فرقة فإحدى وسبعون في النار وواحدة في الجنة، والذي نفس محمد بيده لتفترقن أمتي على ثلاث وسبعين فرقة واحدة في الجنة وثنتان وسبعون في النار، قيل يا رسول الله من هم؟ قال الجماعة

“ইহুদিরা একাত্তর দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তন্মধ্যে কেবল একদল জান্নাতি আর অবশিষ্ট সত্তর দল জাহান্নামী। আর খ্রিষ্টানরা বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সেগুলোর ভেতর একাত্তর দল জাহান্নামী কেবল একটি দল জান্নাতি। ঐ সত্তার কসম যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। তন্মধ্যে কেবল একটি দল জান্নাতে যাবে আর ৭২ দল জাহান্নামে যাবে।

বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল! তারা কারা?  

তিনি বললেন: ‘আল-জামাআহ’।” [17] 

আল্লাহর প্রশংসা এবং শুকরিয়া! নিঃসন্দেহে আমরা আশা করছি এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, যাতে মুক্তিপ্রাপ্ত সেই দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি, পূর্বোক্ত হাদিসে যাদের বর্ণনা এসেছে— আর সেটি হচ্ছে জামাআহ। এখানে জামাআহ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, উম্মাহর প্রথম জামাআহ অর্থাৎ বিপথে যাবার আগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত জামাআহ। আলিম সাহাবী ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু মহান তাবেঈ আমর ইবনে মাইমুন রহিমাহুল্লাহকে এমনটাই বলেছেন যে,  

يا عمرو بن ميمون قد كنت أظنك من أفقه أهل هذه القرية؛ تدري ما الجماعة؟ قلت لا، قال : إن جمهور الناس فارقوا الجماعة، وإن الجماعة ما وافق الحق وإن كنت وحدك.

“হে আমর ইবনে মাইমুন! আমি তো অত্র এলাকায় তোমাকে সবচেয়ে বড় ফকীহ মনে করতাম। তুমি কি জানো জামাআহ কী?” উত্তরে তাবেঈ বলেন: না। তখন তিনি ইরশাদ করেন: “নিশ্চয়ই অধিকাংশ মানুষ জামাআহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। আর জামাআহ তো হলো সেটাই যা সত্যের অনুকূল হয় যদিও তাতে তুমি একাই হও না কেন।” 

অন্য বর্ণনায় রয়েছে: (তাবেঈ বলেন) ইবনে মাসউদ আমার রানে চাপড় দিয়ে বললেন:

ويحك إن جمهور الناس فارقوا الجماعة وإن الجماعة ما وافق طاعة الله تعالى

“তোমার জন্য আফসোস! নিশ্চয়ই অধিকাংশ মানুষ জামাআহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। আর জামাআহ হলো সেটাই যা আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যের অনুকূল হয়।”

নুয়াইম বিন হাম্মাদ বলেন:

إذا فسدت الجماعةُ فعليك بما كانت عليه الجماعةُ قبل أن تفسد وإن كنت وحدك فإنك أنت الجماعة حينئذ

“অর্থাৎ যখন জামাআহ বিপথে চলে যাবে, তখন তোমার কর্তব্য হলো, বিপথে যাবার আগে জামাআহ’র যে আদর্শ ছিল তা আঁকড়ে ধরে থাকা। যদিও তুমি একাই হও তবুও নিঃসন্দেহে ওই সময়ে তুমিই জামাআহ।” [18]

জামাআহ’র ব্যাখ্যা এভাবে এসেছে, জামাআহ হচ্ছে সেটি যা রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তার সাহাবীদের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে এই ব্যাখ্যাও পূর্বোক্ত ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মারফু’ সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার যে হাদীসটি ইমাম তিরমিজি বর্ণনা করেছেন, তাতে এমনটাই এসেছে যে,

আবদুল্লাহ ইবনে ‘আমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

ليأتين على أمتي ما أتى على بني إسرائيل حذوَ النعل بالنعل حتى إن كان منهم من أتى أمَّهُ علانيةً لكان في أمتي من يصنع ذلك، وإن بني إسرائيل تفرقت على ثنتين وسبعين ملة، وتفترق أمتي على ثلاث وسبعين ملة؛ كلهم في النار إلا ملة واحدة. قالوا ومن هي يا رسول الله؟ قال ما أنا عليه وأصحابي

“বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উম্মাতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মাত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামী হবে।

সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! সে দল কোনটি?

তিনি বললেনঃ ‘আমি ও আমার সাহাবীগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত’।” [19]

ত্বইফা আল-মানসুরা; যাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ সংবাদ দিয়েছেন, আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হবার ব্যাপারে আশাবাদী এবং এর জন্য আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও প্রয়াস পেতে প্রস্তুত–সাহায্যপ্রাপ্ত এই দলের ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস বিভিন্ন শব্দে মুতাওয়াতির (যুগ পরম্পরাগত) সূত্রে সহিহাইন, বিভিন্ন সুনান গ্রন্থ সহ বহু হাদীস গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। তেমনি একটি বর্ণনা রয়েছে সহিহ মুসলিম গ্রন্থে। হাদীসটি মারফু’ সূত্রে সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন—

لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق لا يضرهم من خذلهم حتى يأتي أمر الله وهم كذلك

“নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার উম্মতের একটি দল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যারা তাদেরকে ব্যর্থ করতে চেষ্টা করবে তারা তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর নির্দেশের আগ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকবে।”

আর মারফু’ সূত্রে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন:

لا تزال طائفة من أمتي يقاتلون على الحق ظاهرين إلى يوم القيامة

“নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার উম্মতের একটি দল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে কিয়ামাত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।”


আক্বীদাহ অধ্যয়নের গুরুত্ব ও এর উদ্দেশ্য

এবার আসি আক্বীদাহর বিভিন্ন সংক্ষিপ্ত বিষয়কে উম্মাহ অধ্যায়ভিত্তিক যেভাবে বিভক্ত করেছে এবং সুবিন্যস্তভাবে সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করেছে, তার আলোচনায়। তো এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলব, নিঃসন্দেহে আমরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এবং আহলুল হাদীস আন-নববী আশ-শরীফ এর মাযহাবের উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা ঐ সমস্ত লোক যারা রাসূলে কারীম ﷺ এবং তাঁর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত সাহাবীবর্গ ও হিদায়াতপ্রাপ্ত পুণ্যবান খলিফাদের সুন্নাহ অনুসরণ করে থাকেন।   

অতএব কুরআন ও সুন্নাহর মূলপাঠগুলোতে যে বিষয় সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, আবার সাহাবায়ে কেরাম যে বিষয়ে একমত, সেটাই এই জামাআহ’র পথ এবং তা থেকে সরে দাঁড়াবার কোনো সুযোগ নেই। আর যে বিষয় সন্দেহপূর্ণ; উলামায়ে কেরামের মাঝে যা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেই বিষয়ে আমরা আহলে ইলম রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের পদ্ধতিতে দলিল প্রমাণ ও সত্যাসত্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে কোন একটি সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল ‘আলামীন!

এ পর্যায়ে আমরা বলতে চাই, পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে, আক্বীদাহ শুদ্ধ করা একান্ত আবশ্যক। তবে এ বিষয়ে এটা মনে রাখতে হবে যে, কেবল আক্বীদাহ শুদ্ধ করার দ্বারা অন্তরের আমল বিশুদ্ধ হয়ে যায় না। এমন কতজনকে আমরা দেখেছি, যারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র আক্বীদাহর ব্যাপারে অবগত; গবেষণা করে সেগুলো তারা আত্মস্থ করেছেন, এগুলোর পক্ষে তারা বিভিন্ন বিতর্ক লড়েছেন; কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনকারী, আমানতের ব্যাপারে গাফেল, বিভিন্ন ওয়াজিব ও আবশ্যকীয় বিষয় যেমন জিহাদ, আমর বিল মা’রুফ, নাহি আনিল মুনকার, সত্যের পথে সাহায্য-সহযোগিতা, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মেহনত ইত্যাদি কাজের ব্যাপারে নিস্পৃহ। আমরা দেখেছি এজাতীয় লোকেরা যিন্দিক তাগুত শাসকবর্গের ক্রোড়ে প্রতিপালিত। ক্ষমতাসীনদের খাবারের টেবিলে তারা আমন্ত্রিত। তাগুতদের উপঢৌকনে তারা সজ্জিত। বাতিলের বিষাক্ত ফল আহার করে তারা বাতিলের গুণকীর্তন করে অথচ তাদের প্রকৃত অবস্থা এসব আলিমের অজানা নয়।

এগুলো তারা করে যাচ্ছে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা, পার্থিব সাজসজ্জা, পদের মোহ এবং বৈষয়িক স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। আর এভাবেই তারা কখনো নিজেদের ইলমের দ্বারা পুরোপুরি উপকৃত হতে পারে না। এ কারণেই গবেষণা ও তাত্ত্বিকভাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র আক্বীদাহ সম্পর্কে তাদের এই জানাশোনা, নিজেদেরকে এই দলের অন্তর্ভুক্ত দাবি করা, এই জামাআহ’র আক্বীদাহগুলোকে শব্দে শব্দে মুখস্থ করা এবং তাদের কিতাবগুলো আত্মস্থ করা—এই সবকিছুই মূলত অস্থায়ী দুনিয়া এবং তার ক্ষয়িষ্ণু সাময়িক তেতো স্বাদকে চিরস্থায়ী পূর্ণাঙ্গ আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেয়ার ফসল। মনের মাঝে ইচ্ছাশক্তি, অটল বিশ্বাস ও সহিষ্ণুতার অভাবেই তাদের এই অবস্থা। এক কথায়, এমন পরিণতি আল্লাহ তা’আলার তাওফীক থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে হয়ে থাকে। আল্লাহ তা’আলা এমন ব্যক্তিকে ব্যর্থ করে দেন এবং সৎপথ থেকে হটিয়ে দেন। আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, যেন তিনি আমাদের দোষ ত্রুটি গোপন করেন এবং আমাদেরকে আফিয়াত দান করেন!

এ কারণেই আক্বীদাহর পাঠ গ্রহণের মাধ্যমে ধারণা ও বিশ্বাস বিশুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা একান্ত কর্তব্য:-  

অন্তরের পরিশুদ্ধি, তাতে জীবনী শক্তি সঞ্চার, ঈমানের হাকীকত তথা আল্লাহ তা’আলার মা’রিফাত ও পরিচয়, তাঁর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা, তাঁকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন, তাঁর মহিমা প্রকাশ, তাঁর বিধিনিষেধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাঁর আয়াতসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, ভক্তি ভালোবাসা সহকারে তাঁর ভয় অন্তরে লালন, এমনিভাবে তাঁর পাকড়াওয়ের ভয় করা, তাঁর সঙ্গে নৈকট্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, তাঁর প্রতি আশা রাখা, আন্তরিকভাবে তাঁর শাসন ও হুকুম-আহকামের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা, তার যিকির ও শোকর আদায় করা, তাঁর ইবাদাতে অধ্যাবসায়ী হওয়া, তাঁর অবাধ্যতা পরিহারে ধৈর্যশীল হওয়া, তাঁর তাকদীরের উপর ধৈর্য ধারণ করা, তাঁর প্রতি মনোনিবেশ করা, তাঁর কাছে তাওবা করা, তাঁর প্রতি আস্থা রাখা, তাঁর উপর নির্ভর করা, তাঁর ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করা, নিজের সকল বিষয় তাঁর হাতে ন্যস্ত করা, তাঁর বন্টন ও সবরকম ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া সুসংবাদ ও হুশিয়ার-বাণীসমূহের ব্যাপারে স্থির বিশ্বাস স্থাপন করা। একইভাবে নবীজি ﷺ যতরকম গাইবি বিষয়ের সংবাদ এনেছেন সব কিছুর প্রতি সুদৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য অকৃত্রিম নিষ্কলুষ আন্তরিকতা নিয়ে আমল করা, ইখলাসের সঙ্গে তাঁর ইবাদাত করা, এমনিভাবে অন্তর সংশ্লিষ্ট আরো বিভিন্ন আমল যেগুলো তাকওয়া ও আমানতদারীর মূল ভিত্তি; যেগুলো বাহ্যিক পরিশুদ্ধির প্রথম শর্ত তথা আত্মিক ও আভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধির জন্য নিয়ামক শক্তি, তেমন প্রতিটি কর্ম পালনে উদ্যোগী হওয়া। কারণ তাকওয়া এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এর পরিচয় দিতে গিয়ে তাবেঈ তলাক ইবনে হাবীব রহিমাহুল্লাহ খুব সুন্দর বলেছেন:

“তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী আল্লাহর কাছে থাকা সওয়াবের আশায় তাঁর ইবাদাত করা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া হিদায়াত অনুযায়ী আল্লাহর আযাবের ভয়ে আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিহার করা।”

নিঃসন্দেহে গোটা শরীয়তের প্রধান লক্ষ্য এবং তা শিক্ষা করা ও তদনুযায়ী আমল করার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন করা, যাতে মুমিন ব্যক্তি সেসব তাকওয়াবান লোকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন:

اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللّٰہُ مِنَ الۡمُتَّقِیۡنَ

“আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের কাছ থেকে কবুল করে থাকেন।” [20]

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:

اَلَاۤ اِنَّ اَوۡلِیَآءَ اللّٰہِ لَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ - الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَکَانُوۡا یَتَّقُوۡنَ - لَہُمُ الۡبُشۡرٰی فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَفِی الۡاٰخِرَۃِ ؕ لَا تَبۡدِیۡلَ لِکَلِمٰتِ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکَ ہُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ

“মনে রেখো যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয় ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং ভয় করতে রয়েছে। তাদের জন্য সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে। আল্লাহর কথার কখনো পরিবর্তন হয় না। এটাই হল মহা সফলতা।” [21]

তিনি আরো ইরশাদ করেন:

وَالۡعَاقِبَۃُ لِلتَّقۡوٰی

“শুভ পরিণাম নিহিত তাকওয়ার মাঝে।” [22]

আরো ইরশাদ হচ্ছে:

وَالۡعَاقِبَۃُ لِلۡمُتَّقِیۡنَ

“মুত্তাকীদের জন্য শুভ পরিণাম।” [23]

তিনি আরো সংবাদ দিচ্ছেন, ওই জান্নাত যার প্রস্থ হল আসমানসমূহ থেকে যমীন পর্যন্ত,

اُعِدَّتۡ لِلۡمُتَّقِیۡنَ 

“তা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।” [24]

তিনি আরো ইরশাদ করেন:

تِلۡکَ الۡجَنَّۃُ الَّتِیۡ نُوۡرِثُ مِنۡ عِبَادِنَا مَنۡ کَانَ تَقِیًّا

“এটা ঐ জান্নাত যার অধিকারী করব আমার বান্দাদের মধ্যে মুত্তাকীদেরকে।” [25]

তিনি আরো ইরশাদ করেন:

وَالْآخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلۡمُتَّقِیۡنَ

“আর পরকাল আপনার পালনকর্তার কাছে তাদের জন্যই যারা ভয় করে।” [26]

আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেছেন:

وَمَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ وَیَخۡشَ اللّٰہَ وَیَتَّقۡہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহকে ভয় করে তার শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে তারাই কৃতকার্য।” [27]

তিনি আরো জানিয়েছেন যে,

يُحِبُّ الْمُتَّقِیۡنَ

“তিনি মুত্তাকীদেরকে ভালোবাসেন।” [28]

আরো জানাচ্ছেন,

مَعَ الْمُتَّقِیۡنَ

“তিনি মুত্তাকীদের সঙ্গে রয়েছেন।” [29]

তিনি আরো ইরশাদ করেন:

اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا وَّالَّذِیۡنَ ہُمۡ مُّحۡسِنُوۡنَ 

“নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন যারা পরহেযগার এবং যারা সৎকর্মশীল।” [30]

আর এটাই হল সেই বিশেষ সঙ্গদান যার অর্থ হচ্ছে— সাহায্য সহযোগিতা, শক্তি, সহায়তা ও তাওফীক প্রদান। আর এই সবকিছুই মুহাব্বাত-ভালোবাসা ও সন্তুষ্টির কথা বোঝায়।


তাকওয়া অর্জনে করণীয়

তাকওয়ার মূলকেন্দ্র হচ্ছে অন্তর। তাকওয়ার দ্বারা অন্তর যখন আবাদ হয় তখন তাতে কল্যাণ সাধিত হয়। আর অন্তর যখন কল্যাণময় হয়, তখন ব্যক্তির সকল কাজকর্ম কল্যাণকর হয়ে যায় এবং ইস্তিকামাত তথা ব্যক্তির দৃঢ়তা অর্জন হয়। সহিহ মুসলিম সহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এমনটাই ইরশাদ করেছেন যে,

التقوى ههنا، التقوى ههنا، التقوى ههنا

“তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে।”

এ সময় তিনি নিজ বক্ষের দিকে ইঙ্গিত করেন।

একইভাবে সহিহাইন সহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে নবীজি ﷺ থেকে বর্ণিত নুমান ইবনে বশীর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর হাদীসে এসেছে:  

ألا وإن في الجسدِ مضغةً إذا صلحت صلح الجسدُ كله، وإذا فسدت فسد الجسدُ كله، ألا وهي القلب

“জেনে রাখ শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরো রয়েছে। তা যখন ঠিক হয়ে যায় গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায় গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, গোশতের সেই টুকরোটি হল কলব (অন্তর)।

এর জন্য সহায়ক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপায়ের ভেতর সংক্ষেপে কয়েকটি নিম্নরূপ:

●       চিন্তা ফিকিরের ইবাদাত। যেসব ইবাদাতের নির্দেশ আল্লাহ তা’আলা দিয়েছেন এবং যেগুলো পালন করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত হল এটি। অধিকাংশ মানুষই এ বিষয়ে গাফেল এবং এক্ষেত্রে তাদের রয়েছে চরম শিথিলতা।

●       গুরুত্বসহকারে তাযকিয়া আত্মশুদ্ধি ও ইসলাহ সংক্রান্ত বিভিন্ন কিতাবাদি পাঠ করা। সেসব কিতাব এমন হতে হবে, যেগুলো অন্তরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তাতে থাকা রোগ নির্ণয়ের পর যথাযথভাবে তার চিকিৎসা করতে পারে। সেসব কিতাবে আলোচনা থাকবে, কেমন করে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হয়, উত্তম গুণাবলী ও পূণ্যময় বিভিন্ন আদব-শিষ্টাচারের মাধ্যমে কীভাবে অন্তরকে সজ্জিত করা যায়।

●       ইবাদাতের একটি নির্বাচিত অংশ আদায়ে অন্তরকে অভ্যস্ত করে তোলা। আর তা হচ্ছে গুরুত্ব সহকারে ফরজ ও ওয়াজিব আদায় করা, বেশি বেশি নফল ও মুস্তাহাব পালনের চেষ্টা করা এবং প্রত্যেকেরই নিজের এমন কিছু ইবাদাত থাকা যেগুলো একান্তই সঙ্গোপনে হয়েছিল।

●       সালফে সালেহীন, আমাদের পূণ্যবান পূর্বসূরী, আইম্মায়ে কেরাম এবং এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে অবগতি লাভ করা। এজন্য তাদের বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থ, সিরাত ও মালফুজাত পাঠ করা। এতে করে তাদেরকে অনুসরণ করার এবং তাদের মত হওয়ার আগ্রহ-উদ্দীপনা জাগ্রত হয়।

●       গুরুত্বসহকারে আল্লাহ তা’আলার আসমাউল হুসনাহ শেখা, এই নামগুলো মুখস্ত করে ফেলা, এগুলার অর্থ জানা এবং তদ্দ্বারা প্রভাবিত হতে চেষ্টা করা। আর এর জন্য বিশেষভাবে পাঠের ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং এই ইলম শিখতে আগ্রহী হওয়া। এ বিষয়ে অতীতে ও সাম্প্রতিককালে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ রয়েছে। সমকালীন আলিমদের রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার গ্রন্থগুলোর একটি হচ্ছে—শায়খ সাঈদ আল-কাহতানী রচিত “কুরআন-সুন্নাহ’র আলোকে আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ” গ্রন্থটি। [31] এছাড়াও বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে, হাদিসের ভাষ্য গ্রন্থ সহ আরও বিভিন্ন গ্রন্থে এ বিষয়ে অধিক পরিমাণে আলোচনা রয়েছে।

●       প্রত্যেকেরই নিজের জানা বিষয়ের উপর আমল করা। যখনই কেউ যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে সঠিক পন্থায় ফিকহ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আখলাক ও শামায়েল ইত্যাদি বিষয় থেকে উপকারী ইলম অর্জন করবে, তখন সেটা যত অল্পই হোক না কেন, তার ওপর আমল করতে আরম্ভ করা। এতে করে অজানা আরো অনেক বিষয়ের ইলম এবং তদনুযায়ী আমলের জন্য আল্লাহ তা’আলা তার পথ খুলে দেবেন।

ইরজা

আমাদের আক্বীদাহ কী তা এখন প্রশ্নকারীদের সামনে স্পষ্ট হয়ে গেল। অতএব এখন স্পষ্টভাবে আমরা একথা বলতে পারি যে, আমরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র উসূল অনুযায়ী এ কথা বিশ্বাস করি,

“দ্বীন ও ঈমান হচ্ছে—বলা ও করা; অন্তর ও মুখের বলা এবং অন্তর, মুখ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা করা। আনুগত্যের দ্বারা ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং নাফরমানির দ্বারা ঈমান কমে যায়।”

আমরা সর্বপ্রকার এবং সব ধরনের ইরজা মুক্ত। সত্য কথা হচ্ছে, ইরজা এমন নিকৃষ্ট একটি বিষয়, যার রয়েছে নানা রূপ, নানান ধরন, বৈচিত্র্যময় নানা রং। বিভিন্ন চটকদার কারুকার্যখচিত কথা ও বক্তব্যের মাধ্যমে এটি বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। স্থান-কাল-পাত্রভেদে এটির রকমফের হয়। ভয়াবহতার দিক থেকে এটির বিভিন্ন স্তর রয়েছে। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহ আনীত হক্বপন্থা যে ব্যক্তি চিনতে পারবে, সাহাবা, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনদের আদর্শ যে ব্যক্তি উপলব্ধি করতে পারবে, আল্লাহর দ্বীনের ফিকহী জ্ঞান যে ব্যক্তি অর্জন করতে পারবে, ইন শা আল্লাহ সেই ব্যক্তি এই বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকতে পারবে।


ইরজা’র বিভিন্ন প্রকার

আমরা বুঝতে পারলাম, ইরজা’র বিভিন্ন প্রকার ও ধরণ রয়েছে। এর বৈচিত্র্যময় এমন অনেক চেহারা রয়েছে যেগুলো পূর্বকালে ও বর্তমান কালের উলামায়ে কেরাম বর্ণনা করে দিয়ে এর থেকে বিরত থাকতে তাগিদ দিয়েছেন। কদর্যতা ও বিভ্রান্তির দিক থেকে এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। এখানে স্পষ্ট করে যে কয়টি ধরণ নিয়ে মোটামুটি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সহকারে আলোচনা করা আমার জন্য সহজ হয় সেগুলো আমি নিম্নে উল্লেখ করছি, যাতে এগুলো থেকে বেঁচে থাকা এবং এগুলো পরিহার করা সম্ভব হয়।

১। ইরজা’র সবচেয়ে জঘন্য প্রকার, যা চরম সীমালঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে হয়ে থাকে, তা হচ্ছে একথা বলা যে, মা’রিফাতের নামই হচ্ছে ঈমান। মা’রিফাত বলতে অন্তরের দ্বারা চেনা বুঝায়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অন্তর থেকে আল্লাহকে চিনতে পারবে যদিও সে অন্তর থেকে আল্লাহকে সত্যায়ন করে না (যদিও এটি খুবই কঠিন তবে এটি ওই অবস্থায় সম্ভব যদি সে পরিচয় লাভ ও সত্যায়নের মাঝে পার্থক্য করাকে সম্ভব মনে করে) তবে কেবল এই পরিচয় লাভের মাধ্যমে ব্যক্তি মুমিন হয়ে যাবে।

এই জাতীয় মুরজিয়াদের মতে স্থির বিশ্বাস (তাসদীক), স্বীকারোক্তি, ইসলাম ও ঈমানের বিভিন্ন আলামত মুখে উচ্চারণ করা এমনিভাবে মুসলমানদের মতো কাজকর্ম করা এগুলো কোনটাই ঈমানের সংজ্ঞার ভেতর পড়ে না। আর এটাই হল জাহমিয়া ফিরকার বক্তব্য। তাদের কথার অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি কেবল পরিচয় (মা’রিফাত) লাভ করবে, সেই মুমিন বলে গণ্য হবে। এমতাবস্থায় সে নিজের মুখ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা কী কথা ও কাজ প্রকাশ করছে তার দিকে তাকানো হবে না। এমনকি সে যদি নিজের মুখ দ্বারা কুফরি প্রকাশ করে, তখনো যতক্ষণ পর্যন্ত সে একথা জানবে যে আল্লাহ তা’আলাই একমাত্র আসল উপাস্য, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মুমিন থাকবে।  

তাদের এমন অবস্থান মেনে নিলে এটাই বলতে হয়, শয়তান, ফির’আউন, কারুন, হামান, আবু জাহেল এবং এদের মত সকলেই মুমিন। আমরা আল্লাহর কাছে কুফরি ও পথভ্রষ্টতা থেকে আশ্রয় কামনা করছি! তাদের এমন অবস্থান নিঃসন্দেহে কুফরি। এর দ্বারা ব্যক্তি মিল্লাতে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। এই মাযহাব কুরআনের সুস্পষ্ট বাণীর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এবং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ আনীত আদর্শের বিরোধী।

২। আরেক প্রকার মুরজিয়া গোষ্ঠীর বক্তব্য হল, ঈমান হচ্ছে কেবল মুখে স্বীকার করার নাম। অতএব যে ব্যক্তি মুখের দ্বারা ঈমানের স্বীকারোক্তি দেবে সে মুমিন বলে গণ্য হবে। এমতাবস্থায় তার অন্তরে কি রয়েছে সে দিকে তাকানো হবে না। নাউজুবিল্লাহ!

এটি এমন একটি গোষ্ঠীর বক্তব্য যাদেরকে কারামিয়া বলা হয়। (মুহাম্মাদ ইবনে কারাম সিজিস্তানী নামক এক ব্যক্তির দিকে সম্বন্ধ করে তাদেরকে এই নাম দেয়া হয়েছে) এদের মতে মুনাফিকরা দুনিয়াতে কামিল ঈমানদার বলে গণ্য হবে, কারণ তারা তাদের মুখের দ্বারা ঈমানের স্বীকারোক্তি দিয়েছে। কিন্তু আখিরাতে তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।

আমরা আল্লাহর কাছে আফিয়াত ও সালামত কামনা করছি। কোন সন্দেহ নেই যে, এটি একটি ভ্রান্ত ও স্ববিরোধী মাযহাব। এটি কুরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত হক্বের বিপরীত। যদিও কোন সন্দেহ নেই যে, মুনাফিকরা অন্তরের দিক থেকে কাফির, মুমিন নয়। তবে দুনিয়াতে তারা মুসলমান বলে গণ্য হয় এবং তাদের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধি-বিধান প্রযোজ্য হয়। তাই এভাবে বলা যেতে পারে, তারা ওই ব্যক্তির দৃষ্টিতে মুসলমান যে তাদের নিফাক তথা আভ্যন্তরীণ কুফরি সম্পর্কে অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে অবগত নয়। আর এটি সেসব অবস্থার একটি যেসব অবস্থায় ইসলাম ও ঈমানের মাঝে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৩। আরেক প্রকার ইরজাগ্রস্থ বক্তব্য হচ্ছে, ঈমান কেবল অন্তর দ্বারা বিশ্বাস করার নাম। অর্থাৎ মুখের স্বীকারোক্তি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা কর্ম সাধন কোনটাই ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর এটাই হল আশ’আরী-মাতুরিদিদের অনেক মুতাকাল্লিমদের (কালামশাস্ত্রবিদের) বক্তব্য।

এবং তারা বলেছেন, নিশ্চয়ই মুখের স্বীকারোক্তি কেবল দুনিয়াতে ইসলামের বিধি-বিধান প্রযোজ্য হবার শর্ত। এটি মূল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের এমন বক্তব্য যে বাতিল এবং কুরআন-সুন্নাহর দলিলাদি ও সালফে-সালেহীনের সর্বসম্মত পন্থার বিরোধী, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এসব জামাআহ’র মধ্যে সবারই বক্তব্য হচ্ছে, গুনাহের দ্বারা ঈমানের কোন ক্ষতি হয় না। ঈমান বাড়ে ও কমে এমনটা মেনে নিতে তারা রাজি নন। আমরা আল্লাহর কাছে বিভ্রান্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

৪। ইরজা’র আরেকটি প্রকার হচ্ছে, একথা বলা— ঈমান হচ্ছে অন্তর দ্বারা বিশ্বাস করা (সত্যায়ন করা) এবং মুখের দ্বারা স্বীকার করার নাম। এটুকুই। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা আমল করা মূল ঈমানের (ঈমানের সংজ্ঞার) অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে তারা এ কথা বলেন, নিশ্চয়ই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা আমল করা ঈমানের জন্য একান্ত আবশ্যক।

আমাদের আহলুস সুন্নাহর উলামায়ে কেরামের নিকট এটি ‘ফুকাহায়ে কেরামের ইরজা’ হিসেবে পরিচিত। এই বক্তব্য সম্বন্ধিত করা হয় ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ এবং তার শায়খ আহমাদ ইবনে আবু সুলাইমান রহিমাহুল্লাহ সহ আরো কারো কারো প্রতি।

কোন সন্দেহ নেই যে এটি ভুল। কুরআন-সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন মূলপাঠ এবং এ মতের প্রবক্তাদেরও পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের ইজমা দ্বারা যা প্রমাণিত হয়, তা কখনই এমনটা নয়। তবে পূর্বোল্লিখিত সকল ভ্রান্ত মতের তুলনায় এই মতটির বিভ্রান্তি অতি সামান্য। এমনকি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র একদল আলিম এমনটাও বলেছেন যে, তাদের সঙ্গে আহলুস সুন্নাহর মতপার্থক্য কেবল বাহ্যিক ও লফযী।  


ইরজা’র আধুনিক রূপ

ইরজা’র বিভিন্ন নব্য রূপ আদতে জাহমিয়্যাহ এবং তাদের বিভিন্ন দলসমূহের ঐসব নিকৃষ্ট আক্বীদাহ সমূহের বহিঃপ্রকাশ যা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এগুলো বর্তমান যুগের বিভিন্ন বিদআতী ও প্রবৃত্তিপূজারীরা পুনর্জীবিত করেছে, প্রচার করেছে এবং সুসজ্জিত করে পেশ করেছে। এদের অধিকাংশই হল তাওয়াগীত এবং শাসকদের অনুগত নির্বোধ ও তোষামোদকারী, এবং দ্বীনের বিনিময়ে দুনিয়া অর্জনকারী। যেমন পূর্ববর্তী অনেক সালাফ ইরজা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন যে,

“ইরজা হল এমন দ্বীন যা শাসকের পছন্দনীয়।”

যেমন তারা (নব্য ইরজাগ্রস্থরা) বলে থাকে -

●       জুহুদ (ইচ্ছাকৃত অস্বীকার) ছাড়া কুফর নেই।

●       তাকযীব (মিথ্যা প্রতিপন্ন করা) ছাড়া কুফর নেই। অর্থাৎ কুফর শুধু এই প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

●       ইস্তিহলালের (অর্থাৎ কুরআন-সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন মূল পাঠ দ্বারা অথবা ইজমা দ্বারা প্রমাণিত কোন হারাম বা কুফরি কাজকে হালাল সাব্যস্ত করা) সাথে হওয়া ব্যতিত কুফর নেই।

●       ইতিকাদের (অন্তরের বিশ্বাস) সাথে না হলে তা কুফর হবে না। কুফর শুধুমাত্র ইতিকাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এমন কোন কাজ নেই, যা স্বতন্ত্রভাবে কুফরে আকবার এবং স্বয়ং সেই কাজটি ব্যক্তিকে মিল্লাত থেকে বের করে দেয়। কেবল সেই কাজ যখন ইতিকাদের সাথে হবে তখন তা কুফরি হবে। আর ইতিকাদের সাথে যেটা হয়, সেটা হল তাকযীব (মিথ্যা প্রতিপন্নকরণ) ও জুহুদ (ইচ্ছাকৃত অস্বীকার) অথবা ইস্তিহলাল ।

●       ব্যক্তি যদি কুফরের ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য না করে তাহলে কাজ কুফর হবে না। অর্থাৎ কেউ মন থেকে কাফির হতে চাইলে এবং কুফরির ব্যাপারে তার বক্ষ উন্মোচিত হয়ে গেলে তবেই সে ব্যক্তি কাফির হবে।

●       কোন কাজ সত্তাগতভাবে কুফরে আকবার নয়। বরং সেই কাজটি যদি শারঈ দলিল দ্বারা কুফরে আকবার বলে সাব্যস্ত হয় তাহলে তার অর্থ হচ্ছে, কাজটি অন্তরে (কলবে) কুফর থাকার প্রমাণ।

সুতরাং এই সবগুলো প্রকার-ই হচ্ছে ইরজা’র নিকৃষ্ট প্রকার, যা থেকে আমরা বারাআত ঘোষণা করছি। এবং সবকটি থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

আহলুস সুন্নাহর আক্বীদাহ

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ—আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করুন, তাদেরকে ইজ্জত দান করুন, তাদের জনবল বৃদ্ধি করে দিন—এর আক্বীদাহ হচ্ছে:

“ঈমান হচ্ছে বলা, কার্য সম্পাদন করা ও নিয়ত করার নাম। ঈমান বাড়ে ও কমে। আর ঈমানের বিপরীত হচ্ছে কুফরি যা আক্বীদাহ পরিবর্তন, সন্দেহ পোষণ, কথা, কাজ এবং পরিহারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকে। তাই কখনো মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কারণে কুফরি হয়ে থাকে, কখনো অস্বীকারের কারণে হয়ে থাকে, কখনো সন্দেহের কারণে হয়ে থাকে, কখনো অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশের কারণে হয়ে থাকে, কখনো বিমুখ হওয়ার দ্বারা হয়ে থাকে, এমনকি কখনো অজ্ঞতার কারণেও হয়ে থাকে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ বলে থাকেন, শারঈ দলিল দ্বারা যে বিষয় মিল্লাতে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত করে দেয়ার মত কুফরি বলে প্রমাণিত হয়েছে, সে বিষয়টি আসলেই কুফরি এবং একে কুফরি-ই বলা হবে।

(শারঈ দলিল দ্বারা কুফরি বলে প্রমাণিত) কাজের ব্যাপারে এমনটা বলা যাবে না যে, এমন ব্যক্তির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যাচাই করতে হবে সে ঐ কাজটিকে কুফর বলে বিশ্বাস করে কিনা, তার আগে এ কাজটিকে কুফরি বলা যাবে না। অথবা, সে এই কুফরি কাজকে হালাল মনে করে কিনা, সেটা দেখার আগে এই কাজকে কুফরি বলা যাবে না। অথবা, সে আসলেই অবিশ্বাসকারী ও অস্বীকারকারী কিনা, সেটা দেখার আগে এই কাজকে কুফরি বলা যাবে না।

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ বলে, শারঈ দলিল দ্বারা যে বিষয় মিল্লাতে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত করে দেয়ার মত কুফরি বলে প্রমাণিত হয়েছে, সে বিষয়টি আসলেই কুফরি এবং একে কুফরি-ই বলা হবে।”

আল্লাহ তা’আলার কাছে আমাদের প্রার্থনা, যেন তিনি হিদায়াতের পথে আমাদেরকে অবিচল রাখেন এবং বিভ্রান্তকারী ফিতনা থেকে আমাদেরকে আশ্রয় দান করেন।


একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা

জানা আবশ্যক যে, আহলুস সুন্নাহর কতিপয় উলামা কখনো এমন কথা বলে থাকেন, যা পূর্বোক্ত ইরজা-আক্রান্ত কিছু কিছু বক্তব্যের সঙ্গে কখনো কখনো মিলে যায় এবং তাতে সামান্য পর্যায়ের ও অস্পষ্ট রকমের ইরজা পাওয়া যায়। যদিও তারা সামগ্রিক বিবেচনায় আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র আক্বীদাহর উপর প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তবুও সেসব ক্ষেত্রে তারা ভুলের শিকার। ইজতিহাদের পর তারা এমন কিছুকে সঠিক বলে ধরে নিয়েছেন, যা মুরজিয়া গোষ্ঠীর কথার সঙ্গে মিলে যায়।

এমন ব্যক্তিদেরকে আমরা তাড়াহুড়ো করে মুরজিয়া বলে আখ্যায়িত করবো না। এমতাবস্থায় যদি ব্যাপারটা এমন গুরুতর হয় যে, তার এই পদস্খলনের কথা প্রকাশ করে মানুষকে তা থেকে বিরত রাখা একান্ত জরুরি, তবে সেক্ষেত্রে এভাবে বলতে হবে,

“অমুক মাসআলায় তিনি ভুল করেছেন এবং মুরজিয়াদের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন; তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন যা পরিণতিতে মুরজিয়া গোষ্ঠীর বক্তব্য হয়ে দাঁড়ায় আর তা হচ্ছে এই এই এই…।”

আসলে মানুষকে তার বাহ্যিক ও সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করেই কোন কিছুর দিকে সম্পর্কিত করা উচিত। এককথায় এসব ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই, সর্তকতা অবলম্বন এবং কাউকে বিদআতী বলে আখ্যা দেয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা একান্তই জরুরি। বিশেষ করে উলামায়ে কেরামের ক্ষেত্রে, যাদের ফজিলত সকলের সামনে স্পষ্ট। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যারা কল্যাণের পথে ও সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত। যারা সুন্নাহ কে দৃঢ়ভাবে ধারণকারী, সুন্নাহর প্রতি অতি আগ্রহী, সুন্নাহর পক্ষে প্রতিরক্ষাকারী এবং সুন্নাহ অনুসরণে সবচেয়ে বেশি যত্নশীল বলে সমাজে পরিচিত।


তাকফীর

এবার আসি প্রশ্নকারীর কাছে। তিনি বলেছেন, তাকফীরের মাসআলায় আপনাদের বক্তব্য কী?

আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা সহকারে এর জবাব লিখতে আরম্ভ করছি। তাকফীরের মাসআলাটি ইসলাম ও ঈমান সংক্রান্ত মাসআলার একটি শাখা আলোচনা। কারণ কুফর ঈমানের বিপরীত। আর আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা যা তাওহীদের বিপরীত সেটিও একপ্রকার কুফর। আল্লাহর প্রশংসা যে, আমরা প্রতিটি অধ্যায়েই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র মাযহাবের উপর প্রতিষ্ঠিত। পূর্বে আমরা সে বিষয় উল্লেখ করেছি। তো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র মাযহাবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হচ্ছে ঈমানের মাসআলা অর্থাৎ

●       ঈমানের সংজ্ঞা কী?

●       ঈমানের পরিচয় কী?

●       ঈমানের বিপরীত ও ঈমান বিধ্বংসী বিষয়গুলোর পরিচয় কী?

●       আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের তাওহীদ কাকে বলে?

●       তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ কী?

●       তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ কী?

●       আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে তাওহীদ কী রূপ?

●       এসব ক্ষেত্রে তাওহীদ বিধ্বংসী এবং এর বিপরীত বিষয়গুলো কী কী?

●       সেই বিষয়গুলো কী যেগুলোর দ্বারা কাফির ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হয়ে মুসলমান বলে গণ্য হয়?

●       সেই বিষয়গুলো কী কী যেগুলোর দ্বারা মুসলমান ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে কাফির মুরতাদ হয়ে যায়? (নাউজুবিল্লাহ মিন যালিক)

এই সকল বিষয়ে আমরা আমাদের উলামায়ে কেরাম এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র ইমামদের মাযহাবের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাকফীরের মাসআলা এবং এই নিয়ে কথা বলার জন্য আক্বীদাহ, ঈমান ও তাওহীদ সংক্রান্ত কিতাবাদি এবং ফিকহের কিতাবে ফুকাহায়ে কেরাম রিদ্দাহ—আল্লাহ আমাদেরকে এবং আপনাদেরকে এর থেকে হিফাযত করুন— সংশ্লিষ্ট পরিচ্ছেদগুলোতে রিদ্দাহর বিধি-বিধান ও মুরতাদের হুকুম-আহকাম নিয়ে যা কিছু বলেছেন, সেই সব কিছুর সংক্ষিপ্তসার আমাদের সামনে থাকতে হবে।

এ কারণেই আমরা সর্বদা ওই ব্যক্তির ব্যাপারে সতর্ক করে থাকি, যে কেবল-ই তাওহীদ ও আক্বীদাহ সংক্রান্ত কিতাবের উপর ভিত্তি করেই তাকফীরের মাসআলা ও এতদসংক্রান্ত বিধি-বিধান বুঝতে গিয়ে ভুলের শিকার হয়। ঈমান-আক্বীদাহ সংক্রান্ত কিতাব থেকে তারা কিছু অংশ জেনে নিয়ে ফিকহের জ্ঞানলাভ করা ছাড়াই এবং ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য, তাদের পথ ও পন্থা এবং তাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দিকে না তাকিয়েই ঢালাওভাবে হুকুম দিতে আরম্ভ করে।

সাম্প্রতিককালে এই মাসআলার ওপর বেশকিছু পুস্তিকা রচিত হয়েছে। এমনিভাবে ইসলাম বিধ্বংসী বিভিন্ন উক্তিমূলক বা কার্যমূলক ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের ওপর পুস্তিকা রয়েছে। কিছু আছে খুবই চমৎকার আবার কিছু আছে তেমন মানসম্মত নয়। তালিবুল ইলমের দায়িত্ব হচ্ছে, সেগুলো থেকে উপকৃত হওয়া, নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের দিকনির্দেশনা লাভ করা, অস্পষ্ট জায়গাগুলো তাদের কাছে গিয়ে বুঝে নেয়া, কিতাবাদির আধিক্যের ব্যাপারে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ থেকে বর্ণিত যে ফায়দার কথা পূর্বে আলোচিত হয়েছে, তা গ্রহণ করতে সচেষ্ট হওয়া।

রাসূলুল্লাহ ﷺ যে দু’আ দিয়ে রাতের সালাত শুরু করতেন সে দু’আ খুব বেশি বেশি পাঠ করা আর তা হচ্ছে— 

اللهُمَّ رَبَّ جَبْرَائِيلَ، وَمِيكَائِيلَ، وَإِسْرَافِيلَ، فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ، اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ، إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيم

আর তাওফীক তো একমাত্র আল্লাহরই হাতে।


তাকফীরের মাসআলায় বক্তব্য

এ পর্যায়ে আমি তাকফীরের মাসআলার ওপর কয়েকটি কথা বর্ণনা করবো যা ইন শা আল্লাহ উপকারী হবে:

প্রথম কথা: তাকফীর বলা হয় কোন ব্যক্তির কুফরির ব্যাপারে হুকুম দেয়াকে। আর এই অর্থটিই বহুল ব্যবহৃত। তবে কখনো কখনো কোন কাজকে কুফরি হিসেবে বর্ণনা করার ক্ষেত্রেও তাকফীর শব্দ প্রয়োগ করা হয়। তখন এর অর্থ দাঁড়ায়, শরীয়তের বিধি-বিধান প্রযোজ্য এমন লোকদের কার্যকলাপের মধ্যে অমুক কাজটি (সেটা হতে পারে কোন কিছু করা বা ছেড়ে দেয়া, হতে পারে কোন উক্তি অথবা বিশ্বাসের পরিবর্তন, যার মাঝে রয়েছে সংশয়-সন্দেহ) আমাদের দ্বীন ও শরীয়তে এমন কুফরি বলে পরিগণিত যা ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিস্কৃত করে দেয়—এরূপ হুকুম দেয়া। পরিভাষায় একে তাকফীরে মুতলাক (অনির্দিষ্ট বা সাধারণ তাকফীর) বলা হয়।

দ্বিতীয় কথা: তাকফীর চাই সেটা মুতলাক হোক (অর্থাৎ কোন কিছু করা, কোন কিছু পরিহার করা, কোন উক্তি অথবা কোন ধরনের বিশ্বাস—সংশয় সন্দেহ বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত—এগুলোর ব্যাপারে কুফরির হুকুম দেওয়া) অথবা মুআইয়্যান (অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির ব্যাপারে কুফরির হুকুম প্রয়োগ করা এবং এভাবে বলা যে, সে মিল্লাতে ইসলাম থেকে বহিস্কৃত কাফির; সে মুসলমান নয়), তা একটি শারঈ হুকুম। অন্যান্য শারঈ হুকুম-আহকামের মতোই এর অবস্থা। আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে আসা দলিল ব্যতিরেকে এ বিষয়ে কথা বলা জায়েজ নয়। অর্থাৎ এ বিষয়ে কথা বলতে হলে পূত-পবিত্র শরীয়তের সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা লাগবে। অতএব কুরআন সুন্নাহর বিশুদ্ধ দলিল এবং এ দুটোর আলোকে শরীয়তের কোন মূলনীতির দ্বারা যদি প্রমাণিত হয়, ‘অমুক কাজটি কুফরি’ তাহলে আমরা বলবো, সেটি আসলেই কুফরি। এরপর আমরা হুকুম বর্ণনার জন্য এবং সর্তকতা, সচেতনতা ও ভীতি প্রদর্শনের জন্য শর্তহীনভাবে এভাবে বলব: ‘যে ব্যক্তি এ কাজটি করবে সে কাফির’।

এরপর সুনির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি অর্থাৎ, অমুকের ছেলে অমুক যার দ্বারা এমন কাজ সংঘটিত হয়েছে, তার ব্যাপারে তখনই আমরা কুফরির হুকুম প্রয়োগ করব, যখন তাকফীরের সকল শর্ত পাওয়া যাবে এবং তাকফীরের প্রতিবন্ধক বিষয়সমূহের মধ্যে কোনটি উপস্থিত থাকবে না। আর একেই বলা হয় তাকফীর আল মুআইয়্যান (সুনির্দিষ্ট তাকফীর)।

তৃতীয় কথা: যখন আমরা জানতে পারলাম তাকফীর একটি শারঈ হুকুম; প্রমাণিত হওয়ার দিক থেকে শরীয়তের অন্যান্য হুকুম-আহকামের মতোই এর অবস্থা, অতএব এর মধ্যে কিছু এমন রয়েছে যেগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণিত। যেমন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কাফির হওয়া, মূর্তি পূজকদের কাফির হওয়া, যেমন আরবের সেসব মুশরিকের অবস্থা যাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রেরিত হয়েছিলেন। এমনিভাবে বর্তমান সময়ে ভারতবর্ষের হিন্দু সম্প্রদায় যারা গো-পূজারি, এমনিভাবে বুদ্ধের অনুসারী বৌদ্ধরা, এমনই ইসলাম ভিন্ন অন্য যত ধর্মমত ও মতবাদ রয়েছে সেগুলোর অনুসারীরা। 

আরো ব্যাপকভাবে বললে, এমন প্রতিটি শ্রেণি, যারা কখনোই ইসলামে দীক্ষিত হয়নি এবং ইসলামের দিকে নিজেদেরকে সম্বন্ধিত করেনি, তারা সকলেই অকাট্যভাবে কাফির। এদের অবস্থা থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করছি! তো এদের কুফরি অর্থাৎ তারা যে কাফির সেটা অকাট্য ও জরুরিয়্যাতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। তাদেরকে জানে এমন প্রতিটি মুসলমানের জন্য তাদেরকে কাফির বলে বিশ্বাস করা ওয়াজিব।  

তাকফীর সংক্রান্ত আলোচনার মাঝে কিছু আছে যা পূর্বোক্ত আলোচনার সঙ্গে সংযোজিত। যেমন ওই মুরতাদের অবস্থা যে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মিল্লাতে ইসলাম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য ধর্ম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। যেমন ঐ সমস্ত লোক যারা (নাউজুবিল্লাহ) খ্রিষ্টানহয়ে গিয়েছে, দ্বীন ইসলামের প্রতি কুফরি করার ঘোষণা দিয়েছে এবং ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। এদের অবস্থার কাছাকাছি হচ্ছে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদারদের অনুসারীদের কুফরি। যেমন মুসাইলামাতুল কাযযাব (আল্লাহর লা’নত তার উপর)-এর অনুসারীরা এবং যুগে যুগে বিভিন্ন দাজ্জাল ও নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদারদের অনুগামী ব্যক্তিরা।

অতঃপর—ঐ ব্যক্তি যে প্রকাশ্যে সুস্পষ্ট কুফরি করেছে, দ্বীনকে গালি দিয়েছে এবং এমন সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর দ্বীনের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে যাতে কোন সন্দেহ নেই। বিশেষ করে এই ব্যক্তির অবস্থা তখন অকাট্য রূপ ধারণ করে, যখন সে একই কাজ বারবার করে। এদের মাঝে কারও কারও কুফরি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কুফরি অপেক্ষা অধিক মারাত্মক ও জঘন্য। এমনিভাবে এর বিভিন্ন প্রকার রয়েছে।

তাকফীরের কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো উপরোক্ত বিষয়গুলো অপেক্ষা হালকা ধরনের। যেমন কোনো যোগ্য ফকীহের ফায়সালাকৃত ইজতিহাদী হুকুম। যেমন কোন শাসকের ব্যাপারে এই ফায়সালা দেয়া যে, সে শরীয়তের দ্বারা বিচার ফায়সালা না করার কারণে কুফরি করেছে। তো এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। 

যেমন ঐ ব্যক্তি যে মূলগতভাবে এই শরীয়ত প্রত্যাখ্যান করেছে; শরীয়তের কোন হুকুমই সে বাস্তবায়ন করে না। অথবা ঐ ব্যক্তি যে শরীয়তের কিছু হুকুম প্রয়োগ করে আবার কিছু হুকুম ছেড়ে দেয়। তার ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা থাকে, সে নিজে দাবি করবে অথবা তার পক্ষ থেকে এই দাবী করা হবে যে, যেসব ক্ষেত্রে সে শরীয়তের হুকুম প্রয়োগ করতে পারেনি সেসব ক্ষেত্রে তার কোন ওযর বা তাওয়ীল আছে। কিছু লোক আছে যাদের ব্যাপারে সংশয়-সন্দেহ অথবা তাওয়ীলের সম্ভাবনা রয়েছে, আবার এমন অনেক আছে যাদের ব্যাপারে তেমন কোনো সংশয় সন্দেহ নেই। এরকম বিভিন্ন স্তর এক্ষেত্রে থাকতে পারে। 

যেমন ঐ ব্যক্তি, যে এমন কোন কাজ করলো, যার দরুন তাকে কাফির বলা যাবে কিনা এ নিয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। যেমন এক ব্যক্তি ক্রুশ ঝোলালো অথবা একেবারে পুরোপুরিভাবে সালাত ত্যাগ করল ইত্যাদি, এসব ক্ষেত্রে কেউ কেউ তাকে কাফির বলার মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। 

আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহিমাহুল্লাহ বলেন: 

“তাকফীরের উৎস তথা যে দলিলের ভিত্তিতে তাকফীর করা হয়, সেটা কখনো ধারণাপ্রসূত হতে পারে। এর দৃষ্টান্ত হলো, জিহাদ অবস্থায় যখন কোন ব্যক্তির ব্যাপারে সংশয় দেখা দেবে, সে মুসলমান কিনা, তখন অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এমনটা মনে করা উচিত হবে না, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকফীর করা বা না করা অকাট্যভাবে সঠিক হতে হবে। বরং তাকফীর একটি শারঈ হুকুম।

এই হুকুমের দ্বারা প্রাণ ও সম্পদ হালাল হয়ে যায় এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার ফায়সালা করা হয়। অতএব এটির দলিল অন্যান্য সকল শারঈ হুকুম-আহকামের মতই। অতএব কখনো অকাট্য দলিলের মাধ্যমে তাকফীর করা হবে, কখনো প্রবল ধারণার ভিত্তিতে, আবার কখনো এতদুভয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে থেকে তাকফীর করা হবে। আর যেখানেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেবে সেখানে তাকফীর থেকে বিরত থাকাটাই উত্তম।” [32] 

চতুর্থ কথা: শরীয়তের মুকাল্লাফ ব্যক্তিদের কার্যকলাপের মধ্যে কোনটি কুফরি কোনটি কুফরি নয়, সে বিষয়ে হুকুম দেয়ার ক্ষেত্রে যেমন যেমনভাবে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ হতে পারে, একইভাবে তাকফীর আল মুআইয়্যান তথা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ওপর কুফরির হুকুম প্রয়োগের ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। আর এর কারণ মূলত তাকফীরের শর্তাবলী, প্রতিবন্ধক বিষয়সমূহ এবং সেগুলো পাওয়া যাওয়া না যাওয়া নিয়ে পর্যবেক্ষণের ভিন্নতা।

পঞ্চম কথা: পূর্বের আলোচনার উপর ভিত্তি করে বলবো, আহলে ইসলামের মধ্য থেকে, অর্থাৎ আগে থেকে যে ব্যক্তি মুসলমান বলেই গণ্য এবং তার ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত, তাঁর বিরুদ্ধে আল্লাহ তা’আলার শরীয়তের সুনির্দিষ্ট দলিল পাওয়ার আগে পর্যন্ত এমন ব্যক্তিকে কাফির বলা যাবে না। আর তাছাড়া তাকফীরের হুকুম একটি শারঈ হুকুম। স্পষ্টতা ও প্রমাণিত হওয়া না হওয়ার দিক থেকে এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে যেমনটা আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি।


তাকফীরের বিভিন্ন স্তর

সবচেয়ে স্পষ্ট স্তর হল, সকল মুসলমান অথবা অধিকাংশ মুসলমান কিংবা মধ্যম স্তরের মুসলমানেরা যা বুঝতে পারে। এই স্তরটি বোঝার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলিম ও সাধারণ যেকোন ব্যক্তি সমান হয়ে থাকে। যেমন ইতিপূর্বে কিছু উদাহরণ দেয়া হয়েছে। 

উদাহরণ স্বরুপ আরো বলা যায়, এমন ব্যক্তি যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে গালি দিয়েছে, তাঁর দ্বীনকে গালি দিয়েছে এবং এমন সুস্পষ্টভাবে এর সঙ্গে ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছে যে তাতে কোন প্রকার অস্পষ্টতা নেই। বিশেষ করে ওই ব্যক্তি যখন একই কাজ বারবার করে। তো এমন ব্যক্তিকে কাফির বলার জন্য কোন আলিমের ফাতওয়ার প্রয়োজন হয় না। কারণ সাধারণ মানুষ সকলেই তার উক্ত কাজকে এমন কুফরি বলে মনে করে যা মিল্লাতে ইসলাম থেকে বহিস্কৃত করে দেয়। অতএব যে ব্যক্তি কাউকে এমন কাজ করতে দেখবে, আর সে বাধ্যও নয়, (যেমন কোন তাগুত তাকে জেলের ভেতরে এ কাজ করতে বাধ্য করছে অথবা এ কাজ না করাতে তাকে শাস্তি দিচ্ছে), পাগলও নয়, (কারণ মুসলমান পাগল সর্বাবস্থায় মুসলমান বলেই গণ্য হবে এবং তার রিদ্দাহ সহিহ হবে না) তবে এমন ব্যক্তির কুফরির হুকুম দিয়ে দেয়া যাবে।

এবার আসি অস্পষ্ট ক্ষেত্রের আলোচনায়। যেসব ক্ষেত্রে আহলে ইলমের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে যে, আলোচ্য কাজটি কুফরি কি কুফরি না? অথবা এ বিষয়ে মতপার্থক্য ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে, কেউ অমুক কাজ করলে তাঁকে কাফির বলা যাবে কিনা? অর্থাৎ তার কোন ওযর আছে কিনা; তার বেলায় তাকফীরের সকল শর্ত পাওয়া গিয়েছে কিনা? অথবা তাকফীরের প্রতিবন্ধক বিষয়সমূহের সবগুলোই তার বেলায় অনুপস্থিত কিনা?

সেসব ক্ষেত্রের মাসআলা উলামায়ে কেরামের জন্য রেখে দেয়া উচিত এবং আহলে ইলমের বাইরে কারো এ নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। কারণ এখানে ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। আর বিশেষ করে তাকফীরের এই বিষয়টিতে ভুল খুবই মারাত্মক এবং তার পরিণতি খুবই কঠিন। কারণ শরীয়তে অন্যায়ভাবে কোন মুসলমানকে কাফির বলার জন্য অগ্রসর হতে এবং তাড়াহুড়া করে কাউকে তাকফীর করতে নিষেধ করা হয়েছে। এ কাজে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। তাই দ্বীন সচেতন ও পরকালে মুক্তি পেতে আগ্রহী মুমিন ব্যক্তির উচিত, তাকফীরের যোগ্য নয় এমন ব্যক্তিকে তাকফীর করে কঠোর হুঁশিয়ারি অমান্য করতে সে যেন ভয় করে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ! আমরা আল্লাহ তা’আলার কাছে কামনা করি যেন তিনি আমাদেরকে এবং আমাদের ভাইদেরকে হিদায়াত ও সঠিক পথের দিশা দান করেন! 


এদেশের প্রেক্ষাপট

এবার আসি এদেশ এবং তার প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে। আসলে এর জন্য বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। প্রতিটি মাসআলা পৃথকভাবে আলোচনা ও আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পূর্বের আলোচনার আলোকে আমরা বলবো, এখানকার সাধারণ ভাইদের কর্তব্য হলো, উলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করা। কিতাবাদিতে উলামায়ে কেরামের লিখিত বাক্যাবলী পাঠ করে নিজেদের মতো বুঝেই নিজেরা তাড়াহুড়ো করে মানুষকে তাকফীর না করা। কারণ এতে তারা জঘন্য ভুলের শিকার হবেন। কারণ একজন সাধারণ ভাই সেসব কিতাব থেকে যা বুঝবেন তাই প্রয়োগ করবেন। এক্ষেত্রে কখনো তার বোঝার ভুল হতে পারে, কখনো প্রয়োগের ভুল হতে পারে আবার কখনও উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ভুলের শিকার হতে পারেন। এতে বিরাট ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টি হবে।

এজন্য বারংবার আমরা এই নসিহত করছি, তাকফীরের মাসআলাগুলো যেন উলামায়ে কেরামের জন্য রেখে দেয়া হয়। যুবক ভাইদের এটি জেনে রাখা উচিত:

তাকফীরের অধিকাংশ মাসআলা ইজতিহাদী, যাতে মতপার্থক্যের সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব কেউ যেন নির্দিষ্ট কোন উক্তি, নির্দিষ্ট কোন শায়খ অথবা নির্দিষ্ট কোন জামাআহকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে। নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি, নির্দিষ্ট কিছু লোক অথবা নির্দিষ্ট কোনো জামাআহকে—যাদেরকে তাকফীরের বিষয়টি ইজতিহাদী—তাকফীর করার ক্ষেত্রে সৃষ্ট মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে তারা যেন পরস্পরে শত্রু মনোভাবাপন্ন হয়ে না থাকে। বরং তালিবুল ইলমদের মধ্যে যদি কারো সামনে গবেষণা ও যাচাই-বাছাইয়ের দ্বারা সত্যটি উন্মোচিত হয়ে থাকে এবং সে বিষয়ে তার স্থির বিশ্বাস অর্জিত হয়, তবে সে তদনুযায়ী আমল করবে। আর যার সামনে স্পষ্ট হবে না সে সর্তকতা অবলম্বন করবে। কিন্তু প্রত্যেকেই ভিন্নমতের ভাইয়ের অপারগতা বুঝতে চেষ্টা করবে। এটাই সঠিক পন্থা। এ পন্থা অনুসরণ করা ছাড়া কখনই কল্যাণ সাধিত হতে পারে না এবং পরিশুদ্ধি আসতে পারে না। যুবকেরা কখনো কখনো অনর্থ সৃষ্টির কাজে লেগে যায়, তারা দ্বীন থেকে এবং আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয় আর ভাবে যে, তারা ভালো কাজ করছে এবং আল্লাহর দ্বীনের সহায়তা করছে! এতে তারা কঠোর হুঁশিয়ারি, অমান্যকারী বলে সাব্যস্ত হয়। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:

وَلَا تَتَّخِذُوۡۤا اَیۡمَانَکُمۡ دَخَلًۢا بَیۡنَکُمۡ فَتَزِلَّ قَدَمٌۢ بَعۡدَ ثُبُوۡتِہَا وَتَذُوۡقُوا السُّوۡٓءَ بِمَا صَدَدۡتُّمۡ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۚ وَلَکُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ

“তোমরা স্বীয় কসমসমূহকে পারস্পরিক কলহ দ্বন্দ্বের বাহানা করো না। তা হলে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পা ফসকে যাবে এবং তোমরা শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করবে এ কারণে যে, তোমরা আমার পথে বাধা দান করেছ এবং তোমাদের কঠোর শাস্তি হবে।” [33]

ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ উক্ত আয়াতের তাফসীরে লিখেন:

“আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদেরকে নিষেধ করে দিচ্ছেন যাতে তারা নিজেদের কসমসমূহকে পারস্পরিক কলহ দ্বন্দ্বের বাহানা না বানায় অর্থাৎ তাদের কসমগুলো যাতে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের কারণ না হয় এবং দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যাতে পা ফসকে না যায়। এটি দিয়ে তুলনা করা হয়েছে ওই ব্যক্তির অবস্থা, যে সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল অতঃপর তা থেকে সরে এসেছে এবং হিদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। আর তার কারণ হচ্ছে, সেসব কসম যেগুলো ভঙ্গ করা হয়েছিল যার দরুন আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরানোর কাজ সংঘটিত হয়েছে। কারণ কাফির যখন দেখবে, মুমিন ব্যক্তি তার সঙ্গে ওয়াদাবদ্ধ হয়েছে অতঃপর বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তখন দ্বীনের প্রতি তার কোন আস্থা অবশিষ্ট থাকবে না। এতে করে সে ইসলামে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকবে।”

এখন কসম নিয়ে ছেলেমানুষি করা এবং একে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের কারণ বানানোয় যদি এভাবে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে সরিয়ে দেয়া হয় আর তার ওপর এতটা কঠোর হুঁশিয়ারি এসে থাকে, তবে তাকফীরের হুকুম-আহকাম নিয়ে ছেলেখেলা করার দ্বারা অজ্ঞতা, বাড়াবাড়ি, অন্ধ অনুসরণ ও তাড়াহুড়ো করে তাকফীর ঘনিষ্ঠ কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার দ্বারা মানুষ কতটা আল্লাহর দ্বীন থেকে দূরে সরে যেতে পারে তা কি চিন্তা করা যায়! নিশ্চয়ই দ্বিতীয় বিষয়টি প্রথমটির চাইতেও মারাত্মক। এটি আমরা সকলেই জানি। অতএব যুবক মুজাহিদ এবং আল্লাহর পথের দাঈদের এ থেকে অতি গুরুত্ব সহকারে বেঁচে থাকা উচিত। আর আল্লাহ তায়ালাই তাওফীকদাতা!


নির্বাচন সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর

এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে কথা। এ বিষয়ে প্রথম কথা হচ্ছে, এটি জায়েজ নয়। কারণ এতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাকে শক্তিশালী ও সমর্থন করা হয়। আর এই অংশগ্রহণ—যদিও সেটা বাহ্যিক ভাবেই হোক না কেন—এই কুফরি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণেরই নামান্তর। তাছাড়া এদেশীয় বাস্তবতা ও এ জাতীয় অন্যান্য প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে অংশগ্রহণের দ্বারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে—কিংবা বলা যায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই—কাফির দলগুলোর মধ্য থেকে কোন একটিকে শক্তিশালীকরণ অথবা কুফরি পার্লামেন্টের প্রধানমন্ত্রী বা কোন সদস্যকে নির্বাচন করা হয়ে থাকে।

আর যেহেতু এই নির্বাচন সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের জন্যই হয়ে থাকে, তাই এতে অংশগ্রহণ করে ভোট দেয়া এমন ব্যক্তিকে সমর্থনদান, নির্বাচন ও শক্তিশালীকরণের প্রকারান্তর, যে শিরকি মাজলিসে অংশগ্রহণ করে আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে আইন প্রণয়ন করে। আর নিঃসন্দেহে এমন কাজ কুফরি। অতএব নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়।


‘মন্দের ভালো’ নীতির প্রয়োগ সম্পর্কে

সমকালীন কতক আলিম গবেষণার জন্য নতুন আরেকটি মাসআলা বের করেছেন আর তা হচ্ছে: দুজন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী রয়েছে। একজন এমন কোন দলের প্রার্থী যে দলকে ইসলামী দল হিসেবে গণ্য করা হয় অথবা সে এমন কোন জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী যে দল আল্লাহর দ্বীনের প্রতি শত্রুতা প্রকাশ করে না, আল্লাহর দ্বীনের প্রতি যাদের ঘৃণা তেমন তীব্র নয়, যারা দ্বীনদারদের প্রতি সদয়। অপরপ্রার্থী একজন সেক্যুলার বা সমাজতান্ত্রিক প্রার্থী, যে ইসলাম ও শরীয়তের প্রতি খোলামেলা শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, ইহুদি-খ্রিষ্টানও অন্যান্য কাফির গোষ্ঠীর সঙ্গে যার রয়েছে আন্তরিক সম্পর্ক। এই দুই প্রার্থীর মাঝে নির্বাচনী লড়াই হচ্ছে। এক্ষেত্রে কী হবে?  

একইভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের অবস্থার ব্যাপারেও প্রশ্ন আসে। এখন এখানে মূল জিজ্ঞাসাটি হচ্ছে: ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য যে দল বা প্রার্থী তুলনামূলক কম ক্ষতিকর তাদেরকে ভোট দেয়া মুসলমানদের জন্য জায়েজ কিনা, যাতে তারা তুলনামূলক বড় অনিষ্ট প্রতিরোধ করতে পারে? যদিও মুসলমান সকলেই একথা ভালোভাবে জানেন যে, এই প্রার্থীরা সকলেই কাফির। তারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয় দিয়ে বিচার ফয়সালা কখনোই করবেনা। মুসলমানদের প্রতি কখনই তারা সন্তুষ্ট হবে না এবং কোন অবস্থাতেই শাসক হিসেবে মুসলমানদেরকে তারা গ্রহণ করবে না। এতদসত্ত্বেও মুসলমানরা একটি পক্ষকে এজন্যই ভোট দিবে, যাতে তুলনামূলক ছোট অনিষ্ট মেনে নিয়ে বড়টি প্রতিরোধ করা যায়। এখন এ কাজ করা জায়েজ কিনা?

এই জিজ্ঞাসার সবচেয়ে সমুচিত ও সত্যঘনিষ্ঠ জবাব আমরা এটাই মনে করি যে, এমন অবস্থায়ও মুসলমানদের জন্য ভোট দেয়া জায়েজ হবে না। কারণ এ বিষয়টি সুসাব্যস্ত যে, কাফিরকে ভোট দেয়ার দ্বারা তাকে সমর্থন করা হয় এবং তার দলের কুফরি প্রোগ্রাম ও ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হয়। আর এটাই যদি ভোটদাতার ইচ্ছা হয়ে থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে তা কুফর। এমতাবস্থায় বড় অনিষ্ট প্রতিরোধের এমন অজুহাত দেখিয়ে কোন কুফরি কাজের দিকে পা বাড়ানো কিছুতেই জায়েজ নয়। তাছাড়া বড় অনিষ্ট প্রতিরোধের এই অজুহাতও গ্রহণযোগ্য নয়; বরং এটি একটি অনিশ্চিত বিষয়। কথিত ইসলামী দলের মুসলিম দাবিদার প্রার্থীরা ক্ষমতায় গেলে আরো বড় অনিষ্ট সাধিত হবে না তার কী নিশ্চয়তা আছে?

আবার ইসলামের জন্য অধিক ক্ষতিকারক ও খোলামেলাভাবে শরীয়তের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন পক্ষ জিতে গেলেও কখনো-কখনো পরিণতি বিচারে তা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণই বয়ে আনে। কারণ তখন মানুষকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করা এবং চ্যালেঞ্জ নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করার সুযোগ তৈরী হয়ে যায়। জনসাধারণকে জাগিয়ে তোলা এবং বিপ্লবের অনুকূলে জনমত তৈরিতে দাঈ ও বিপ্লবীদের সামনে অনেক পথ খুলে যায়। তবে উপরোক্ত অজুহাত ও ব্যাখ্যা যারা গ্রহণ করবে সর্বাবস্থায় তাদেরকে তাকফীর করা যাবে না। আর এটাই আমার এই মাসআলা বর্ণনা করার মূল উদ্দেশ্য।

তাই যুবকদের কর্তব্য হলো, এজাতীয় লোকদেরকে তাকফীর করা থেকে বিরত থাকা। কারণ তারা এমনটি করলে গুনাহগার হবেন। তাদের দ্বারা অনিষ্ট সাধন হবে। তারা ব্যর্থ হয়ে যাবেন এবং আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়ার কারণ হবেন। কেবল যিনি ইলম হাসিল করেছেন এবং তাফাক্কুহ ফিদ্দীন (দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করা) অর্জন করেছেন, তিনি মানুষের সামনে সত্য প্রকাশে, তাদেরকে বিশুদ্ধতার আহ্বান জানাতে এবং তাদের জন্য দ্বীনকে ব্যাখ্য-বিশ্লেষণ করতে উদ্যোগী হতে পারেন। আর তাওফীক তো একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে।


জনগণের ব্যাপারে

আমরা সামগ্রিকভাবে অন্য সব দেশের মুসলিম জনসাধারণের মতই এদেশীয় মুসলিম জনসাধারণকে বিবেচনা করি। আমরা কোন সীমাবদ্ধতা ব্যতিরেকে এ বাক্য ব্যবহার করি: “বাংলাদেশী মুসলিম জাতি” ইত্যাদি। তারা আমাদের দৃষ্টিতে অন্যান্য মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর মতই। আমাদের এমন অবস্থান আসল ও প্রধান অবস্থার বিবেচনায়। কারণ কোন সন্দেহ নেই, এদেশের জনসাধারণের মূল অবস্থান—তারা মুসলমানের সন্তান মুসলমান। তারা বেড়ে ওঠার সময়কাল থেকেই ইসলামের বাণী কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে এবং সর্বদা এর উপরেই তারা প্রতিষ্ঠিত থাকে। তারা ইসলামকে নিজেদের ধর্ম হিসেবে স্বীকার করে।   

আর অধিকাংশের বিবেচনায় “বাংলাদেশী মুসলিম জাতি” বলার যৌক্তিকতা হলো, আমরা মনে করি অধিকাংশ বাংলাদেশী নাগরিক আল্লাহর রহমতে সত্যিকার অর্থে মুসলমান। যদিও বিভিন্ন খ্রিষ্টান, ইহুদি, জিন্দিকদের মতো কাফিররা, দ্বীন থেকে পুরোপুরি বিচ্যুত প্রগতিশীল মুক্তমনা নাস্তিক গোষ্ঠী ও সেক্যুলারদের মত মুরতাদরা, মুসলিম দাবিদার আরো বিভিন্ন কাফির গোষ্ঠী যেমন কাদিয়ানিরা, কবর পুজারী কট্টর সুফি এবং দ্বীন বিকৃতকারী মুলহিদ গোষ্ঠীসহ এ জাতীয় আরো অনেক গোষ্ঠী এদেশের জাতিসত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তথাপি শহরে-বন্দরে, গ্রামেগঞ্জে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অধিকাংশ জনসাধারণ যারা অন্যদের তুলনায় সংখ্যায় সবচেয়ে বড়—তারা ইসলামকে বুকে ধারণ করে সহিসালামতে ঈমানের বেষ্টনীতে টিকে আছে। আল্লাহ তা’আলাই সর্বজ্ঞ!

যদি ধরা হয়, মুসলমানদের অংশটি সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, তবুও কখনো এটা প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় হবে না যে, আমরা নিখুঁত পরিসংখ্যানের মাধ্যমে এমন ফলাফল বের করে আনব, যার দ্বারা কাফিরদের সংখ্যা ও জনবল অধিক দেখা যাবে। বরং আমরা মূলগত অবস্থা ও স্বাভাবিক প্রাধান্য বিবেচনার যে মূলনীতি আলোচনা করেছি, তা অনুসরণ করে বাহ্যিক অবস্থায়ই ক্ষান্ত দেব। পাশাপাশি আরও একটি কারণ হচ্ছে, আমরা সুলক্ষণ গ্রহণ করতে চাই। এছাড়াও সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনা থাকলেও “বাংলাদেশী মুসলিম জাতি” কথাটাকে তার অতীত ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে যৌক্তিক প্রমাণ করা সম্ভব। অতএব ভাষাগত দিক থেকেও থেকে এটি আপত্তিকর নয়। আর রাজনীতির জন্যেও এমনটি বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। আল্লাহ তা’আলা সর্বজ্ঞ এবং নির্ভুল ফায়সালাদাতা! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল ‘আলিয়্যিল ‘আযিম!  


উলামায়ে কেরাম ও জনগণের প্রতি নাসিহাহ

এরপর আপনারা জানতে চেয়েছেন: এদেশের আলিম-উলামা ও জনসাধারণের প্রতি আমাদের নাসিহাহ কী? এর উত্তরে আমরা বলব: নিশ্চয়ই আমরা উলামায়ে কেরামকে তাদের দায়িত্ব পালনের উপদেশ দিই। আল্লাহ তা’আলাই তো তাদেরকে এ আদেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন:

وَاِذۡ اَخَذَ اللّٰہُ مِیۡثَاقَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ لَتُبَیِّنُنَّہٗ لِلنَّاسِ وَلَا تَکۡتُمُوۡنَہٗ

“আর আল্লাহ যখন আহলে কিতাবদের কাছ থেকে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করলেন যে, তা মানুষের নিকট বর্ণনা করবে এবং গোপন করবে না।” [34]

আমরা তাদেরকে সে দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে সাবধান করছি যাদের ব্যাপারে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنَ الۡاَحۡبَارِ وَالرُّہۡبَانِ لَیَاۡکُلُوۡنَ اَمۡوَالَ النَّاسِ بِالۡبَاطِلِ وَیَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ وَالَّذِیۡنَ یَکۡنِزُوۡنَ الذَّہَبَ وَالۡفِضَّۃَ وَلَا یُنۡفِقُوۡنَہَا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ فَبَشِّرۡہُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ

“হে ঈমানদারগণ! পন্ডিত ও সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে চলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখছে। আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।” [35]

তাদের প্রতি নাসিহাহ হলো, তারা যেন উপলব্ধি করেন যে, মানুষ তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে; যদি তারা সরল পথে থাকেন তাহলে মানুষ সরল পথে থাকবে আর যদি তারা বিপথে চলে যান তাহলে মানুষও বিপথে চলে যাবে। নিঃসন্দেহে এটি অনেক বড় আমানত। অতএব তাঁরা যেন ইলম, দাওয়াত, বক্তৃতা, লেখনী— সব কিছুর মাধ্যমে আল্লাহর পথে জিহাদ করেন। সত্য এবং সত্যপন্থীদেরকে তারা যেন সাহায্য করেন। আল্লাহর পথে কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় যেন তারা না করেন। ইলমের পথে থাকা প্রত্যেকেরই স্মরণে রাখা উচিত, আলিমদের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। শরীয়তের প্রমাণাদি এবং অভিজ্ঞতার আলোকে এমনটাই আমরা দেখতে পাই।

একপ্রকার আলিম হচ্ছেন যারা আল্লাহর দ্বীন ও আখিরাতের পক্ষে। তাঁরা আল্লাহর কাছে থাকা প্রতিদানকে প্রাধান্য দেন। আল্লাহর ভয় তাঁদেরকে খারাপ কাজ করতে বারণ করে। তাঁদের ইলম আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালনে তাঁদেরকে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁরাই সফল ও সৌভাগ্যবান। আল্লাহর সঙ্গে তাঁদের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। তাঁরা আল্লাহকে সাহায্যকারী এবং তাঁর কাছে থাকা প্রতিদানের ব্যাপারে আশাবাদী।

আরেকদল দুনিয়াদার উলামা। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে, নিজেদের ইলমের মাধ্যমে পার্থিব সুযোগ-সুবিধা লাভ করা। তারা দুনিয়াবী লোভ-লালসা চরিতার্থ করার জন্য ইলম ও দ্বীনকে ব্যবহার করে। ধন-সম্পদ উপার্জন, সুস্বাদু আহার্য ও পানীয়, দামি বাসস্থান ও মূল্যবান পোশাক ইত্যাদির ভেতর ডুবে থাকে তারা। কিংবা উচ্চতর পদ-পদবী লাভ করে যমীনের বুকে অহংকারী হিসেবে বেঁচে থাকে তারা।

এই দ্বিতীয় প্রকারের আলিমের সংখ্যাই বেশি। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষকে সন্তুষ্ট করা, তাদের প্রিয়ভাজন হওয়া এবং প্রসিদ্ধি ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন করা। তাই উলামায়ে কেরামের প্রতি আমার নাসিহাহ হলো, তাঁরা যেন সাফল্যের অধিকারী প্রথম প্রকারের আলিমদের অন্তর্ভুক্ত হতে সচেষ্ট থাকেন। ক্ষণস্থায়ী এসব ভোগ্য সামগ্রীর ওপর তাঁরা যেন আল্লাহর কাছে থাকা প্রতিদানকে প্রাধান্য দেন।

আর জনসাধারণের প্রতি আমাদের নাসিহাহ হলো, তারা যেন এ কথা স্মরণ রাখেন যে, আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। অকারণে তিনি তাদেরকে দুনিয়ার বুকে প্রেরণ করেননি। নিঃসন্দেহে তাদের কাঁধে বিরাট দায়িত্বের বোঝা চেপে আছে। সে দায়িত্বের ব্যাপারে তারা জিজ্ঞাসিত হবেন। অতএব তারা যেন একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব মেনে নেন এবং আল্লাহ তা’আলার ইবাদাত বন্দেগীর উপর অটল অবিচল থাকেন। তারা যেন এ কথা স্মরণ রাখেন, যেদিন গোপন বিষয়াদি পরীক্ষিত হবে, প্রতিটি বান্দা একাকী তার রবের কাছে উপস্থিত হবে, কিয়ামাতের বিভীষিকাময় দিনে কেউই একথা বলে পার পাবে না যে, আমি অমুক বড় ব্যক্তিকে অনুসরণ করেছি! আমি অমুক সরদারের অনুগামী হয়েছি! আমি অমুক নেতার, অমুক শায়খের, আমি আমার পিতৃপুরুষের পথে চলেছি! উদ্ভ্রান্ত, বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট, সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত এবং পথের পথিক হয়ে গেলে কিয়ামাতের দিন এজাতীয় অজুহাত কাজে আসবে না। কারণ আল্লাহ তা’আলা রাসূলের মাধ্যমে, দ্বীন ইসলামের মাধ্যমে, কুরআনের মাধ্যমে মানুষের জন্য তার দলিলকে পূর্ণতা দান করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সৃষ্টিকুলের জন্য অজুহাত দেখানোর পথ বন্ধ করে দিয়েছেন।

অতএব মুসলিম জনসাধারণ যেন ইলমে দ্বীন অর্জন করে, কুরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে থাকা সত্যবাদী সৎকর্মশীল লোকদেরকে অনুসরণ করে এবং তাদের সঙ্গ গ্রহণ করে। তারা যেন আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা সম্পর্কে, তাঁর হুকুম-আহকাম সম্পর্কে বিজ্ঞজনদের কাছে জিজ্ঞাসা করে এবং দ্বীনী জ্ঞান ও ফিকহী জ্ঞান অর্জন করে। সর্বোপরি তারা যেন আল্লাহর, আল্লাহর দ্বীনের এবং আল্লাহভীরু দ্বীনদার মুসলমানদের সাহায্যকারী হয়ে যায়।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তা’আলা এই জাতিকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। তারা যখন ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে তখন আল্লাহ তা’আলা এর দ্বারা তাদেরকে বরকতময় করেছেন। অতএব তাদের সেই হারানো গৌরব তখনই পুনরুদ্ধার লাভ করবে, যখন তারা নতুন করে ইসলামের পথে ফিরে এসে ইসলামকে পুরোপুরি ভাবে আঁকড়ে ধরবে। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের কোলে প্রতিপালিত হয়ে কিছুতেই তারা নিজেদের সম্মান ফিরিয়ে আনতে পারবে না। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাকার কুফরি মতবাদ অনুসরণ করে কখনোই তারা সফল হতে পারবে না। কারণ সকল মতবাদ একপাশে আর ইসলাম যা কিনা আল্লাহর দ্বীন; যা হলো স্বাধীনতার, সম্মানের, গৌরবের, মর্যাদার, ইহকালীন সৌভাগ্যের এবং পরকালীন সাফল্যের ধর্ম, সেটি অন্যপাশে। বস্তুতঃ আল্লাহ যাকে চান তাকে সিরাতে মুস্তাকিমের দিকে হিদায়াত করেন। 


শায়খ আসিম আল বারকাউয়ীর বক্তব্যের ব্যাপারে মন্তব্য  

ভাইদের আরেকটি জিজ্ঞাসা: শায়খ আসিম আল বারকাউয়ী হাফিযাহুল্লাহ্’র সেই বক্তব্য যা তিনি الرسالة الثلاثينية গ্রন্থে এনেছেন; যে বক্তব্যের দ্বারা তিনি তাকফীরের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন এবং কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াই নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণকারী জনসাধারণকে তাকফীরের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন—শায়খের সেই বক্তব্যকে আপনারা কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

শায়খের বক্তব্য:

“এ কারণে হুজ্জত কায়েম করার আগে এবং সংসদ সদস্যদের কাজের প্রকৃতি এবং এগুলো যে দ্বীন ইসলাম ও রাব্বুল ‘আলামীনের তাওহীদের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক, এ বিষয়গুলো তাদেরকে জানানোর আগে তাদেরকে তাকফীর করা হালাল হবে না। এরপরেও যদি তারা তাদেরকে নির্বাচিত করার ব্যাপারে অনড় থাকে তখন তাদেরকে তাকফীর করা হবে।”

শায়খের এমন বক্তব্যের ব্যাপারে আমরা বলবো, আমরা সর্বতোভাবে এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত এবং একে আমরা যথার্থ বলে মনে করি। তবে এটা সাধারণ অবস্থায়; কোন বিশেষ পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়ে। এখন কথা হল নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোন ব্যক্তির উপর যদি হুজ্জত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়; যদি কখনো এমনটা বলা যায় যে, তার উপর হুজ্জত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তার সংশয় নিরসন হয়েছে, এখন এজাতীয় ব্যক্তি আদতেই তাকে শোনানো এ সংক্রান্ত আলোচনা বুঝতে ও অনুধাবন করতে পেরেছে কিনা, সেটি নির্ণয়ের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুসন্ধান এবং যারপরনাই যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।

এমন যেন না হয়, কেউ শুধু দাবি করে বসলো যে, অমুক অমুক ব্যক্তির উপর হুজ্জত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কারণ সে সবকিছু উপেক্ষা করে অহংকারবশত দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছে; এরপর সে দাবির ওপর ভিত্তি করে কাউকে তাড়াহুড়ো করে তাকফীর করে দেয়া হলো! কারণ এগুলো অপরিণামদর্শিতা ও আবেগের তাড়না ছাড়া আর কিছুই নয়—বিশেষত এই স্পর্শকাতর মাসআলায়। কারণ পরিস্থিতি আজ এতটাই ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, অনেক আলিমই অধিক যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা জায়েজ এমনকি ওয়াজিব পর্যন্ত বলেছেন। এ বিষয়গুলো সর্বত্র প্রসিদ্ধ; আমরা সকলেই জানি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর!


উপসংহার

আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে কামনা করি, যেন তিনি আমাদেরকে এবং আমাদের সকল ভাইকে সব রকম কল্যাণ দান করেন, মুসলমানদের জন্য সম্মানের এমন মাইলফলক সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত করে দেন, যা তার অনুগত ইবাদাতকারী বান্দাদেরকে গৌরবের পথে পরিচালিত করবে; যা পাপিষ্ঠদেরকে অপদস্থ করবে এবং আমর বিল মা’রুফ ও নাহি আনিল মুনকারের দিকে পথ নির্দেশ করবে। আগে-পরের সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের জন্য! আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ- এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর এবং তাঁর সাহাবীদের ওপর।



[1] সূরা কাসাস: ৫৬

[2] সূরা রুম: ২৯

[3] সূরা নাহল: ৩৭

[4] এটি আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রের একটি পরিভাষা, যার বিপরীত হচ্ছে মা’রুফ। অর্থাৎ يَهْدِى   মা’রুফ ও মাজহুল দুইভাবেই পড়া যাবে।

[5] সূরা যুমার: ২৩

[6] সূরা যুমার: ৩৬-৩৭

[7] সূরা ইউনুস: ৯৯-১০০

[8] সূরা সাজদাহ: ১৩

[9] সূরা মুহাম্মাদ: ১৭

[10] সূরা মারইয়াম: ৭৬

[11] সূরা ফাতিহা: ৬

[12] সূরা বাকারা: ১৮৫

[13] সূরা ক্বামার: ১৭

[14] সূরা বাকারা: ২২০

[15] সূরা মুহাম্মাদ: ১৯

[16] সূরা আল আসর: ১-৩

[17] হাদীসটি ইবনে মাজাহ সহ অন্যান্য মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন এবং আল-আলবানী এটিকে সহিহ বলেছেন।

[18] ‘আল বায়ীস ‘আলা ইনকারিল বিদা’য়ি ওয়াল হাওয়াদিস’ গ্রন্থে ইবনে শাম্মা উক্তিটি উল্লেখ করেছেন। আর হাফিয আবু বকর বাইহাকী রহিমাহুল্লাহ তার ‘মাদখাল’ গ্রন্থে উক্তিটি সংকলন করেছেন।

[19] আবূ ‘ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান গারীব ও মুফাসসার। এই সনদসূত্র ব্যতীত উপরোক্ত প্রকৃতির কোন বর্ণনা প্রসঙ্গে আমাদের জানা নেই। শায়খ আল-আলবানী প্রমুখ হাদীসটিকে সহিহ বলেছেন।

[20] সূরা আল-মায়িদাহ: ২৭

[21] সূরা ইউনুস: ৬২

[22] সূরা ত্বহা: ১৩২

[23] সূরা আ’রাফ: ১২৮

[24] সূরা আলি ইমরান: ১৩৩

[25] সূরা মারইয়াম: ৬৩

[26] সূরা যুখরুফ: ৩৫

[27] সূরা নূর: ৫২

[28] সূরা আলি ইমরান: ৭৬, সূরা তাওবাহ: ৪, সূরা তাওবাহ: ৭

[29] সূরা বাকারা: ১৯৪, সূরা তাওবাহ: ৩৬, সূরা তাওবাহ: ১২৩

[30] সূরা নাহল: ১২৮

[31] শায়খ সাঈদ আল কাহতানী রচিত شرح أسماء الله الحسنى في ضوء الكتاب والسنة (শারহু আসমা-ইল্লাহিল হুসনা ফি দওয়িল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ) কিতাব টি বাংলা ভাষায় পেনফিল্ড পাবলিকেশন থেকে কুরআন-সুন্নাহ’র আলোকে আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ: মূলনীতি, ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য নামে প্রকাশিত হয়েছে। শায়খ সাঈদ আল কাহতানী বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিসনুল মুসলিম’ এর লেখক। তিনি হিজরি ১৪৪০ সাল মোতাবেক ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

[32] ‘ইকফারুল মুলহিদিন ফি জরুরিয়্যাতিদ্ দ্বীন’ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত এবং সেখানে ইমাম গাযযালী লিখিত ‘তাফরিক্বা’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।

[33] সূরা নাহল: ৯৪

[34] সূরা আলি ইমরান: ১৮৭

[35] সূরা তাওবাহ: ৩৪