প্রশ্ন :

আমরা জানি যে, আপনারা গণতন্ত্র অর্থাৎ জনগণের কর্তৃত্বকে শিরক মনে করেন। একইভাবে তাগূতের কাছে ফয়সালা গ্রহণকেও। আর আপনারা মনে করেন যে, আইনপ্রণয়ন পরিষদ বা পার্লামেন্ট সামসময়িক মূর্তিপূজার দুর্গ।

আপনারা এ বিষয়গুলোর ওপর লেখা রচনাবলিতে কয়েকটি কুফরি কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে সংসদ-সদস্যদের তাকফিরের কথাও উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু নির্দিষ্ট প্রশ্ন হলো, আপনারা কি ইসলামি দলের সাথে সম্পৃক্ত সংসদসদস্যদেরও তাকফির করেন, তাদের তাওয়িলকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না? 

উত্তর :

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসুলের ওপর। যে ব্যক্তি শিরকি পার্লামেন্টের বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত, সে জানে যে সেখানে একজন সংসদ-সদস্য একাধিক কুফরি কাজে লিপ্ত হয়। আমি আমার লেখালেখিতে এর কিছু উল্লেখ করেছি। যেমন, শিরকি সংবিধানকে সম্মানের শপথ করা, আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ব্যতীত শাসনকারী রাষ্ট্রপতি, রাজা বা আমিরের প্রতি আনুগত্যের শপথ করা। 

আর এটি সুপরিচিত যে, আল্লাহ আমাদেরকে তাগূতকে অস্বীকার করতে এবং তার থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হতে আদেশ করেছেন। সেই তাগূত হোক মানবরচিত আইন বা সে অনুযায়ী শাসনকারী শাসক, কিংবা আইনপ্রণয়নকারী। এই ভিত্তিতে সংসদ-সদস্য সংবিধানের ধারা অনুযায়ী আইনপ্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই দায়িত্ব গ্রহণ করা অর্থাৎ যা সম্পূর্ণভাবে সংবিধানের পাঠ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং যার ওপর দ্বীনের কোনো শর্ত আরোপিত নেই তা সুস্পষ্ট কুফর। এর প্রমাণাদি পরিচিত। আর তা আমরা বিভিন্ন স্থানে ব্যাখ্যাও করেছি।

বরং এটি সেই মূল কুফরি কাজেরই চর্চা, যার মাধ্যমে আমরা তাগূতকে তাকফির করি। বাস্তবিকই আল্লাহর শরিয়াতের বিপরীত আইন যারা গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টিতে সংসদ-সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন প্রভু, যারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া দ্বীনের মাঝে আইনপ্রণয়ন করেছে। সংসদ-সদস্যের কর্মকাণ্ডও অনুরূপ। সব কর্মকাণ্ড-বক্তব্যে সংবিধান ও রাষ্ট্রের মানবরচিত আইনের কাছে ফয়সালা গ্রহণ করা। এমনকি সরকারকে জবাবদিহি করানোর সময়ও সে সংবিধানের পাঠ অনুযায়ী করে এবং সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করে। এটা তাগূতের কাছে ফয়সালাগ্রহণ। এ ছাড়াও রয়েছে আরও স্পষ্ট কুফরি কার্যাবলি। কোনো দ্বিধা ছাড়াই এই দায়িত্ব ও এই কাজকে কুফরি কাজ হিসেবে গণ্য করার জন্য যেকোনো একটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আমরা অন্যান্য স্থানে ব্যাখ্যা করেছি যে, আল্লাহর পাশাপাশি আইনপ্রণয়ন করা সুস্পষ্ট কুফর। আর যে তা গ্রহণ করে, তার জন্য সেটা প্রকাশ্য শিরক। একইভাবে তাগূতের কাছে ফয়সালাগ্রহণসহ কাফির, তাগূত ও মুশরিকদের সঙ্গে বন্ধুত্বস্থাপন কুফর।

এটা হচ্ছে এই কাজটির ওপর হুকুম। আর ব্যক্তির ওপর হুকুম দেয়ার চেয়ে কাজের ওপর হুকুম দেয়া সহজ। এটা সুপরিচিতও। কারণ, ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত শর্ত ও প্রতিবন্ধকতা বিবেচনা করতে হয়। আমার ‘আর-রিসালাতুস সালাসিনিয়াহ ফিত-তাহযির মিনাল গুলু ফিত-তাকফির’ বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

তবে এ বিষয়ে সতর্ক করা জরুরি যে, সংসদ-সদস্যদের মাঝে এমন লোকও রয়েছে, যারা তাগূতের ঘনিষ্ঠ সহচর—হোক তারা সাবেক মন্ত্রী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা প্রমুখ। এরা তাগূতের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন এবং নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শন করে। তদ্রূপ সেসব লোকও যারা নির্বাচনে বিজয়ী দলের অনুসারী, বিশেষত সেসব রাষ্ট্রে যেখানে বিজয়ী দলই শাসন করে। সেখানে তাগূত কর্তৃক গঠিত দল, তার সদস্য, সহযোগী ও সমর্থকেরা একটি শক্তিশালী, অস্ত্রধারী প্রতিরোধী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। যারা তাদের আইন ও কুফরি শক্তির মাধ্যমে দেশ ও জনগণের ওপর কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়। এই শ্রেণির সংসদ-সদস্যদের শর্ত ও প্রতিবন্ধকতা বিবেচনা ছাড়াই নির্দিষ্টভাবে তাকফির করা হয়। কারণ, শক্তিসম্পন্ন যুদ্ধরত প্রতিরোধী গোষ্ঠীর সদস্যদের তাওবাহ আহ্বান করা হয় না। 

এরপর সাধারণ সংসদ-সদস্যরা থাকে। যে সংসদ-সদস্য প্রকাশ্যে তাগূতদের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রদর্শন করে, শরিয়াতের কোনো কিছুর তোয়াক্কা করে না, তার কাছে সব ধরনের আইনপ্রণয়ন পানি পান করার মতো, এর মাঝে কোনোই পার্থক্য নেই—সে ব্যক্তি নির্দিষ্টভাবে কাফির। সে তো স্বেচ্ছায়, জেনে-বুঝে, কোনো জবরদস্তি বা তাওয়িল ছাড়া স্পষ্ট শিরকের দরজাগুলোতে প্রবেশ করে।

১। এখন আসে সেই সংসদ-সদস্য, যাদের ব্যাপারে প্রশ্নকারী নির্দিষ্টভাবে জানতে চেয়েছেন। যাদের ‘ইসলামি সংসদ-সদস্য’ বলা হয়। ইসলামি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো সংসদ-সদস্য পূর্বোল্লিখিত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয়। যেমন সে নির্বিঘ্নে আইনপ্রণয়ন করে, সংবিধানের পাঠ অনুযায়ী কুফরি আইনপ্রণয়ন করে, সংবিধানের কাছে ফয়সালা গ্রহণ করে এবং অনেকেই তা প্রশংসা করে, এমনকি কেউ কেউ একে জনগণের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করে, যা সংরক্ষণ করা আবশ্যক। আর সেই ভিত্তিতে সরকারকে জবাবদিহি করায়।

এমনকি তাদের একটি দল ‘রাষ্ট্রদ্রোহ আইন’ নামে আইনপ্রণয়নের চেষ্টা করেছে এবং সংবিধান লঙ্ঘনকারীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রস্তাব করেছে। এগুলোকে তারা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জনগণের অর্জন, সম্পদ ও অধিকার রক্ষার প্রচেষ্টা মনে করেছে। অথচ এসব তাদের নিতান্তই তুচ্ছতা, যার মাধ্যমে তারা মূর্তিপূজার দুর্গে তাওহিদকে জবাই করে এবং দুনিয়াবি গৌণ স্বার্থকে সেই সর্বোচ্চ স্বার্থের ওপর অগ্রাধিকার দেয়, যার জন্য আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, রাসুল পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন। আর তা হলো তাওহিদ। এরা পূর্বোল্লিখিত শ্রেণিরই অন্তর্ভুক্ত। তাদের দাড়ি, ছোট পোশাক বা ইসলামি দলের সাথে সম্পৃক্ততা কোনো উপকারে আসবে না। এগুলো এ ধরনের সুস্পষ্ট কুফরের ক্ষেত্রে তাকফিররের গ্রহণযোগ্য প্রতিবন্ধকতা নয়।

২। এরপর থাকে ইসলামি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরেকটি দল। যাদেরকে সরকারগুলো বিরোধী হিসেবে গণ্য করে এবং যারা তাওয়িলের (ভুল ব্যাখ্যা) ভিত্তিতে পার্লামেন্টে প্রবেশ করে।

তাদের অনেকেই স্বীকার করে যে গণতন্ত্র শিরক, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া আইনপ্রণয়ন শিরক। আপনি দেখবেন, সংবিধান ও শাসকপ্রধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়ার সময় তারা শর্ত জুড়ে দেয় ‘আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে’ অথবা ‘যা শরিয়াতবিরোধী নয়’ ইত্যাদি।

এই শর্ত যুক্ত করা চিন্তা করলে যদিও হাস্যকর ও পরস্পরবিরোধী, কারণ বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়ায়—‘আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে’ বা ‘যা শরিয়াতবিরোধী নয়’ এর মাঝেও আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা বা কুফর করার শপথ করা।

এ সত্ত্বেও এটি প্রমাণ করে যে, তারা প্রথম দলের মতো সংবিধানকে সম্পূর্ণভাবে মেনে নেয় না, বরং তারা মনে করে যে সংবিধান ও আইনের মধ্যে এমন বিষয় আছে, যা শরিয়াতবিরোধী বা পরিপন্থী; যেগুলো থেকে সতর্ক থাকা এবং যেগুলোর প্রতি আনুগত্য ও সম্মান প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা জরুরি। 

অতএব, এরা যদি এমন হয় যে, তাদের কেউ কেবল সেসব বিষয়েই আইনপ্রণয়ন করে, যেগুলো সে শরিয়াতসম্মত মনে করে, অথবা সে মনে করে ব্যবস্থাপনাগত বিষয়ে আইনপ্রণয়ন বৈধ, অথবা সে তাওয়িল করে যে, সে সেসব কুফরি আইন ভাঙা ও বিরোধিতা করার জন্যই অবস্থান ব্যবহার করছে এবং রাষ্ট্র ও তার বাতিল ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে, কিংবা সে দাবি করে তার মূল দায়িত্ব তার এলাকার নাগরিকদের সেবা ও নির্বাচকদের স্বার্থ রক্ষা—কুফরি আইনপ্রণয়নের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই—তাহলে এই শ্রেণির লোকদের আমি নির্দিষ্টভাবে তাকফির করি না, যতক্ষণ না তাদের ওপর হুজ্জাহ কায়িম করা হয়, তাদের ভ্রান্ত তাওয়িল দূর করা হয় এবং তাদের অবস্থা যাচাই করা হয়।

৩। আরেকটি শ্রেণি রয়েছে ইসলামি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যারা শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রবেশ করে এবং জনগণ তাদের পরিচ্ছন্নতা, চুরি ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকার কারণে সমর্থন করে। এটি সেই প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলোতে, যেখানে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংবিধান পরিবর্তন করতে পারে এবং নিজেদের পছন্দমতো নীতি ও আইন দ্বারা শাসন করতে পারে। 

যদি ইসলামি দলের কিছু লোক বাস্তবেই থাকে এবং তারা এই নিয়াতে প্রবেশ করে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করবে, যার সংখ্যা অর্জনের ব্যাপারে তাদের প্রবল ধারণা রয়েছে, যাতে তারা আল্লাহর শরিয়াত অনুযায়ী শাসন করতে পারে—মানবরচিত আইনে অংশগ্রহণ বা সংবিধান অনুযায়ী আইনপ্রণয়নের নিয়াতে নয়—তাহলে এদের আমরা তাকফির করি না। 

অবশ্য কোনো সুস্পষ্ট কুফরি কাজে লিপ্ত হলে ভিন্ন কথা। কারণ, তাগূতি শাসনে অংশগ্রহণ করার জন্য নয় বরং শাসনব্যবস্থাকে পরাস্ত করার জন্য নির্বাচনকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাটা গণতন্ত্রের মূল, ভিত্তি ও সেই সুস্পষ্ট কুফর নয়, যার কারণে আমরা গণতন্ত্রকে তাকফির করি। অর্থাৎ জনগণের সার্বভৌমত্ব ও আইনপ্রণয়ন। বরং এটা গণতন্ত্রের একটি যান্ত্রিক পদ্ধতি ও উপায়, তার লক্ষ্য ও ফল নয়। 

আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এটা সেই পথ নয়, যা আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দ্বীন ও শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অনুসরণ করেছিলেন। এটি বিশেষত মুসলিমদের জন্য ফলপ্রসূ কোনো মাধ্যমও নয়। তবে এখানে আমরা এ বিষয়ে নয় বরং নির্দিষ্টভাবে সংসদ-সদস্যদের তাকফির প্রসঙ্গেই কথা বলছি।

এই সংক্ষিপ্ত বিশদ ব্যাখ্যা থেকে আপনি জানতে পারবেন যে, আমরা সব সংসদ-সদস্যকে নির্দিষ্টভাবে তাকফির করি না, বরং এই উল্লিখিত বিশদ অনুযায়ী প্রত্যেক সংসদ-সদস্যের অবস্থা দেখে নির্ধারণ করি। সে কোন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত সে অনুযায়ী তার সঙ্গে আচরণ করি। 

আমার প্রভৃতি লেখায় যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রয়েছে, সেগুলো এই বিশদের আলোকেই বুঝতে হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। আর আল্লাহ দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন আমাদের নবি মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার ও সকল সাহাবির ওপর।