আব্দুল কাদির বিন আব্দুল আজিজ।

ডক্টর ফাদল।

প্রকৃত নাম সাইয়িদ ইমাম শরিফ।

বিগত শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে নিয়ে এখন অবধি- সহিহ আকিদা, সালাফদের মানহাজ ও আপসহীন প্রতিরোধকে আঁকড়ে ধরা ব্যক্তিদের কাছে এক সুপরিচিত নাম। সোভিয়েত ও পশ্চিমা দখলদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মুজাহিদদের কাছে অনন্য কিতাব হিসেবে স্বীকৃত বই "আল-উমদা ফি ই'দাদ আল-উদ্দাহ" এর লেখক।

তিনি একজন আলেম ও তাত্ত্বিক হবার পাশাপাশি মিশরীয় সংগঠনের আমির ছিলেন। হিজরত ও জিহাদের ময়দানেও কাটিয়েছেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান থেকে সরে এসে কিছুটা গুলু ও তাকফিরের দিকে ঝুঁকে পরেন। পাশাপাশি সংশোধনবাদী চিন্তাধারাও উনার মাঝে অনুপ্রবেশ করে। যা উনার আল-জামে (الجامع في طلب العلم الشريف) কিতাবে ফুটে ওঠে।

এক পর্যায়ে অন্যান্য নেককার উলামা ও নেতাদের সাথে ডক্টর ফাদলের মতবিরোধ ঘটে। উনার সংশোধনবাদী, বাড়াবাড়িমূলক, জযবাতি অবস্থানের পক্ষাবলম্বন না করায় তৎকালীন মিশরীয় সংগঠনের অন্যতম নেতা হাকিমুল উম্মাহ ডক্টর আবু মুহাম্মাদের সাথে বিরোধ দেখা দেয়। এবং ডক্টর ফাদল সংগঠন ত্যাগ করেন।

২০০১ সালের অক্টোবরে তিনি ইয়েমেনে গ্রেফতার হোন এবং কয়েক বছর পর উনাকে মিশরীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মিশরের কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগরত অবস্থায়, ডক্টর ফাদলের 'বিখ্যাত' বই আত-তারশিদ প্রকাশ পায়। পুরো নাম (ترشيد العمل الجهادي في مصر والعالم)

যা 'আত-তারশিদ' বা সংশোধনবাদী বই হিসেবে পরিচিতি পায়।

১১০ পৃষ্ঠার এই বইয়ে তিনি নিজের পূর্ববর্তী অবস্থান পর্যালোচনা ও সংশোধন করেন। বইটিতে তিনি মিশর ও দুনিয়ার অন্যত্র ছড়িয়ে থাকা বিপ্লবী ইসলামী সংগঠনগুলোর চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিক পর্যালোচনা প্রকাশ করেন।

এই দলিলে তিনি স্পষ্টভাবে নিজের আগের বইগুলোতে ব্যক্ত করা অনেক অবস্থান থেকে দায়মুক্তি ঘোষণা করেন।

এই বই লেখার এনাম হিসেবে ডক্টর ফাদলের যাবজ্জীবন সাজা মওকুফ হয়। ২০১১ সালে তিনি মুক্তি পান। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে তার পরিবার সরকারের কাছে তার মুক্তির আবেদন জানিয়েছিল, এই কথা উল্লেখ করে যে -

"তার "তারশিদ" দলিলের সাথে একমত হওয়া শত শত বন্দী মুক্তি পেলেও তিনি এখনও কারাগারে।"

এই বইয়ের পাশাপাশি ক্যামেরা ও কলমের সাহায্যে তিনি সংশোধনবাদের প্রচারে লেগে থাকেন। অন্যান্য হকপন্থী উলামাদের, বিশেষত ডক্টর আবু মুহাম্মাদের সমালোচনায় তিনি সোচ্চার থাকেন।

ফা লিল্লাহিল হামদ। আল্লাহ তা আলা তার দীনের জন্য যথেষ্ট হওয়ায়  হীনবল বা ব্যাধিগ্রস্থ অন্তরের অধিকারী মানুষকে সাময়িক আনন্দ দেয়া ব্যতীত এজাতীয় উচ্ছিষ্ট তেমন কিছু অর্জন করতে পারেনি। বইটির বিশেষ কোনো প্রভাব উম্মাহর সচেতন ও নেককার অংশের উপর পরেনি।

বরং, সংশোধনবাদীদের সংবিধান "আত তারশিদ" বইয়ের প্রেক্ষিতে রচিত হয় সময়ের অন্যতম ইমাম ডক্টর আবু মুহাম্মাদের সুবিখ্যাত বই- "আত তাবরিয়া"। পুরো নাম - "التبرئة: رسالة في تبرئة أمة القلم والسيف من منقصة تهمة الخور والضعف"

বইটিতে "আত তারশিদ" গ্রন্থের সংশোধনবাদী চিন্তাধারাকে কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফদের মানহাজের আলোকে খন্ডন করা হয়। এছাড়াও স্পষ্ট করা হয় যে, সাইয়েদ ইমাম আসলে নতুন কিছু বলছেন না - তিনি এর আগে ১৯৯৩-৯৪ সালে "আল-জামি" বইয়ে অনেক জায়গায় একই ধরনের সংশোধনবাদী অবস্থান নিয়েছিলেন।

বাস্তবতা এটাই যে, সাইয়িদ ইমাম শরিফ আজ বিস্মৃত। অপদস্থরা ব্যতীত কেউ তার বইয়ের খোজও রাখেন। তার বাতলানো পথে উম্মাহ কিছু অর্জনও করেনি।

আর বিপরীতে, নববী মানহাজ আগের চেয়েও সুস্পষ্ট, উজ্জ্বল ও শক্তিশালী হয়ে দুনিয়ার দিকে দিকে ছড়িয়ে পরেছে। আত তাবরিয়া কিতাব হকপন্থীদের কাছে আলহামদুলিল্লাহ স্থায়ী ও ব্যপক অবস্থান নিশ্চিত করেছে।

সাইয়েদ ইমাম শরিফ ভারসাম্য ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় নিজের চিন্তা ও মেহনতকে বিকশিত না করে অতিউৎসাহী, ত্বরাপ্রবণ হয়ে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পেন্ডুলামের মত দোল খেয়েছেন। একই প্রবণতা আরো অনেকের ক্ষেত্রেই বিগত দশকগুলোতে আমরা দেখেছি।

এমনই আরেকজন হলেন মরক্কোর শায়খ মুহাম্মদ আল-ফিজাজি (محمد الفزازي)স্পষ্টভাষী হিসেবে খ্যাত এই আলেমও মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হোন। তিনিও "চিন্তাগত পর্যালোচনা" প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেন এবং আগের অবস্থান থেকে সরে এসে তথাকথিত মধ্যপন্থী অবস্থানে আসেন।

ফলত, নয় বছরের মাথায় মুক্তিলাভ করেন।

এই পরিবর্তন এতটাই 'চমৎকার' ছিল যে- ২০১৪ সালে স্বয়ং মরক্কোর রাজা তার পেছনে জুমুআর সলাত আদায় করে।

আলহামদুলিল্লাহ, যারা এপথের হাকিকত জানেন, তাদের কাছে এগুলো বিচলিত বা উদ্বিগ্ন করার মত কিছু না।

বাংলাদেশে এমনিতেই চরমপন্থী সংশোধনবাদীদের (গণতান্ত্রিক, সুফিবাদী) দৌরাত্ম্য অনেক প্রবল। তাদের বিদআত ও তারল্য উম্মাহর, বিশেষত যুবকদের উদ্যম, নিবেদন ও চিন্তাকাঠামোকে অনেক আঘাত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র সংশোধনবাদীদের (বিশেষত গণতান্ত্রিক শিবিরের) আগ্রাসন ও নোংরামী মোকাবেলা করে হকপন্থী উলামায়ে কেরাম ও দাঈগণ আলহামদুলিল্লাহ জোরদার মেহনত করে চলেছেন।

তার মধ্যে সম্প্রতি "চিন্তাগত পর্যালোচনা" আর "পরিপক্কতা"র নামে সংশোধনবাদের আরেক সংস্করণ নিয়ে জনপরিসরে বেশ তোলপাড় হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে 'নিজেকে হারিয়ে খুজে পাওয়ার' আদিম এই রোমান্টিক প্রবণতার বিষয়টি নিয়ে কিছু বলা দরকার মনে করায়, এতটুকু লেখা হলো।

মূলত, কোনো ভূমিতে রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক বিবেচনায় মতপার্থক্য বা improvisation আসা খুবই স্বাভাবিক। এবং হওয়া উচিৎও। স্থান-কাল-পাত্রভেদে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির তফাতের ব্যাপারে গাফিলতি করা বা আমলে না নেয়ার শক্ত নিন্দা উলামা-উমারারা করেছেন।

দায়েশ নামক দলটি ইরান, মিশর, তিউনিশিয়া বা বাংলাদেশের মত দেশগুলোকে যেভাবে আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন বা সিরিয়ার মতো বিবেচনা করে- ঢালাও ও অপরিকল্পিত সহিংসতা করেছে, তা সার্বজনীনভাবেই প্রত্যাখ্যাত ও নিন্দিত হয়েছে। এবং যে কারো আগে হকপন্থী উলামা, নের্তৃবৃন্দ্বরাই এধরণের চিন্তার সমালোচনা করেছেন।

কিন্তু, ঢালাওভাবে পরীক্ষিত মানহাজকে প্রত্যাখ্যান করা, সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া, বাতিল সাব্যস্ত করা, জিহাদ ও।শাহাদাতের চেতনাকে লঘু করে তোলা সন্দেহাতীতভাবেই সংশোধনবাদ।

প্রেক্ষাপট ও পটভূমি বিবেচনায় না নিয়ে সরলীকরণ কাম্য নয়। এদেশ দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের উপযুক্ত কি না - তা একটি রাজনৈতিক ও স্ট্র‍্যাটেজিক প্রসঙ্গ। এদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘেরাও আন্দোলন ও শহুরে গগণসমাবেশ, লং মার্চের মাধ্যমে অভ্যুত্থান হলেও- ১৯৭১ সালে অভ্যুদয় জনযুদ্ধের মাধ্যমেই হয়েছিল।

এমনকি সবদিক ঠিক থাকলে বিপ্লবী তরঙ্গোচ্ছাসে কোন ধরণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে পারে তা আগে থেকে বলে দেয়া যায় না। আমাদের দেশে আগস্টের ৫ তারিখ আওয়ামী সরকারের যদি পতন না হতো, নাহিদ ইসলামরা সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতেন তা তো প্রকাশ্যেই বলেছে!

কিন্তু এর মানে এটাও না যে, অভ্যুত্থান বা বিপ্লব সুনির্দিষ্ট একভাবেই হয়। বরং পুরো বিষয়টিই সামগ্রিক পরিস্থিতি, সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। কোনো সম্ভাবনাকে ঢালাওভাবে নাকচ করে দেয়া চিন্তাগত স্থুলতা বা চরম সংশোধনবাদ ছাড়া কিছুই না।

চলমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে দেখা যায়- মানুষের মাঝে ইসলামী ও বিপ্লবী চেতনায় ঘাটতি আছে, সরকার ইয়াহিয়া খান বা হাসিনার মত জনবিচ্ছিন্ন নয়, গণতান্ত্রিক কাঠামো পুরোপুরি অকার্যকর নয়, মানুষের মাঝে পরিবর্তনের জন্য আত্মত্যাগের মানসিকতা অনুপস্থিত ইত্যাদি বাস্তবতা রয়েছে।

অবশ্যই ইসলামপন্থীদের দীর্ঘমেয়াদী দাওয়াতি, তানজিমি, তরবিয়তি ও সিয়াসি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়া জরুরি। সন্দেহ নেই।

কিন্তু শান্তিপূর্ণ পালাবদলের আশায় দিনাতিপাত করে প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের চেতনাকে মিশিয়ে ফেলা সন্দেহাতীতভাবেই আত্মঘাতী।

সংশোধনবাদের সমস্যা থেকেই হোক আর প্রতিপত্তি হারানো বা কারাবাসের ভয়েই হোক- ডিগবাজিপ্রবণতা ইসলামের দাবী নয়। ব্যক্তিত্বের দাবীও নয়।

শায়খ আসিম আল বারকাউয়ি বলেন,

"সেরারাও এরাস্তার ধারে পরে থাকে।"

আল্লাহ তা আলা আমাদেরকে তাওহিদের উপর, নববী মানহাজের উপর আমৃত্যু অবিচল রাখুন। আমিন।