প্রশ্নঃ সম্মানিত শায়খ! আহলুস সুন্নাহর নিকট ঈমানের সংজ্ঞা কী? 


উত্তরঃ 

১. ঈমানের সংজ্ঞা: কথা ও কাজের সমন্বয়

কুরআন ও সুন্নাহর দলিল-প্রমাণে সুস্পষ্ট যে, ঈমান হলো কথা ও কাজ অর্থাৎ অন্তরের কথা, জবানের কথা এবং অন্তর, জবান ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ। ঈমান বৃদ্ধি পায়, আবার হ্রাসও পায়। সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়িন এবং আহলুস সুন্নাহর সকল ইমাম এ বিষয়ে একমত। ‘অন্তরের কথা’ বলতে বোঝানো হয় অন্তরের বিশ্বাস ও স্বীকৃতিকে, আর ‘অন্তরের কাজ’ বলতে বোঝানো হয় নিয়ত ও ইখলাসকে।

ইমাম শাফিঈ رحمه الله সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়িন এবং তাঁর সাক্ষাৎপ্রাপ্ত পরবর্তী আলিমদের ইজমা বর্ণনা করে বলেন, 

“ঈমান হলো কথা, কাজ ও নিয়ত; এই তিনটির একটিও অপরটির বিকল্প হতে পারে না।”

ইমাম বাগাভি رحمه الله বলেন,

“সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়িন এবং তাঁদের পরবর্তী আহলুস সুন্নাহর আলিমগণ এ বিষয়ে একমত যে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা বলেছেন: ঈমান হলো কথা, কাজ ও আক্বিদাহ; আনুগত্যের মাধ্যমে তা বৃদ্ধি পায় এবং পাপাচারের মাধ্যমে হ্রাস পায়। কুরআনে ঈমান বৃদ্ধির কথা এবং নারীদের ঈমান হ্রাসের ব্যাপারে হাদিসে তার প্রমাণ এসেছে।‌”

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এ বিষয়ে একমত যে, যে ব্যক্তি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলের গোটা শ্রেণিটিই পরিত্যাগ করে, সে কাফির। কাজেই কেবল অন্তরের বিশ্বাস ও জবানের স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলও অপরিহার্য।

ইমাম আজুররি رحمه الله তাঁর আশ-শারিয়াহ গ্রন্থে বলেন,

“জেনে রাখুন, অন্তরের জ্ঞান ও বিশ্বাস তখন পর্যন্ত যথেষ্ট নয়, যতক্ষণ তার সঙ্গে জবান দ্বারা ঈমানের স্বীকৃতি না থাকে। আবার অন্তরের জ্ঞান ও জবান দ্বারা স্বীকৃতিও ততক্ষণ যথেষ্ট নয়, যতক্ষণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল না থাকে। যখন এ তিনটি বৈশিষ্ট্য কোনো ব্যক্তির মধ্যে পূর্ণ হয়, তখন সে মুমিন। কুরআন, সুন্নাহ এবং আলিমদের বক্তব্য এর প্রমাণ।” 

তিনি আরও বলেন,

“অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল হলো অন্তর ও জবান দ্বারা সম্পাদিত ঈমানের সত্যায়ন। যে ব্যক্তি পবিত্রতা অর্জন, সালাত, জাকাত, সিয়াম, হজ, জিহাদ এবং এ ধরনের অন্যান্য আমলের মাধ্যমে তার ঈমানকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সত্যায়িত করে না, বরং কেবল জ্ঞান ও কথায় সন্তুষ্ট থাকে সে মুমিন নয়। তার জ্ঞান ও কথা তার কোনো কাজে আসবে না; আমল পরিত্যাগ করা তার ঈমানের প্রতি মিথ্যারোপেরই শামিল। আর আমরা যেসব আমলের কথা উল্লেখ করেছি, সেগুলো পালনই তার ঈমানের সত্যায়ন।”


২. আমল সম্পূর্ণ পরিত্যাগ: কুফরের কারণ

ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ رحمه الله সালাত পরিত্যাগকারীকে কাফির গণ্য করার ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরামের ইজমা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“সালাত কায়েম করো এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা আর-রূম, ৩০:৩১)

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“মানুষ ও শিরক-কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত পরিত্যাগ করা।”

হাদিসটি জাবির رضي الله عنه থেকে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন আল-আমাশ–আবু সুফিয়ান–জাবির সূত্রে, এবং ইবনু জুরাইজ–আবু যুবাইর–জাবির সূত্রে।

সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা رحمه الله বলেন,

“মুরজিয়ারা ফরজ আমল পরিত্যাগ করাকে হারাম কাজ করার মতোই একটি গুনাহ বলে গণ্য করেছে। অথচ এ দুটো এক নয়। হারাম কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে করা যদি তাকে হালাল মনে না করা হয়,তা গুনাহ; কিন্তু কোনো অজ্ঞতা বা ওজর ছাড়াই ফরজ আমল পরিত্যাগ করা কুফর।”

তিনি এর ব্যাখ্যায় আদম, ইবলিস এবং সেই ইহুদি আলিমদের ঘটনা উল্লেখ করেন, যাঁরা জবান দ্বারা নবী ﷺ-এর আগমনের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর শরিয়ত অনুযায়ী আমল করেননি।

ইসহাক رحمه الله বলেন,

“মুরজিয়ারা এমন পর্যায়ে বাড়াবাড়ি করেছে যে, তাদের কেউ কেউ বলে, যে ব্যক্তি ফরজ সালাত, রমজানের সিয়াম, জাকাত, হজ এবং অন্যান্য অধিকাংশ ফরজ কোনোটি অস্বীকার না করেই পরিত্যাগ করল, আমরা তাকে কাফির বলব না; সে যেহেতু এগুলোর স্বীকৃতি দেয়, তার বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেব। এরা এমন লোক, যাদের মুরজিয়া হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।”

খাল্লাল তাঁর আস-সুন্নাহ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর رحمه الله থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 

“আমি জানতে পেরেছি, কিছু লোক বলে, যে ব্যক্তি সালাত, জাকাত, সিয়াম ও হজের স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু এগুলোর কোনোটিই আমল না করে মৃত্যুবরণ করে অথবা কিবলার দিকে পিঠ দিয়ে সালাত পড়তে থাকে তবুও সে মুমিন; যতক্ষণ সে এগুলো অস্বীকার না করে এবং ফরজ ও কিবলামুখী হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে।”

হুমাইদি বলেন, তখন আমি বললাম,

“এটি আল্লাহর প্রতি সুস্পষ্ট কুফর এবং আল্লাহর কিতাব, তাঁর রাসুলের সুন্নাহ ও মুসলিমদের কর্মপদ্ধতির বিরোধিতা।”

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“তারা যেন সালাত কায়েম করে এবং জাকাত প্রদান করে; আর এটাই সঠিক দ্বীন।” (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, ৯৮:৫)

হুনাইদ বলেন, আবু আবদুল্লাহ আহমাদ ইবনু হাম্বল رحمه الله কে বলতে শুনেছি,

“যে ব্যক্তি এ কথা বলে, সে আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করেছে এবং আল্লাহর নির্দেশ ও তাঁর রাসুল যা নিয়ে এসেছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছে।”

এটিই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর সর্বসম্মত বক্তব্য। কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে তাঁরা একমত যে, যে ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল পরিত্যাগ করে, সে আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করে এবং ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়।


৩. জাহমিয়া-মুরজিয়াদের বাড়াবাড়ি ও তার খণ্ডন

শায়খুল ইসলাম মুহাম্মদ ইবনু আবদিল ওয়াহহাব رحمه الله তাঁর কাশফুশ শুবুহাত গ্রন্থের শেষাংশে বলেন,

“এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, তাওহিদ অন্তর, জবান ও আমলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। এগুলোর কোনো একটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ব্যক্তি মুসলিম থাকে না।” 

এ বিষয়ে জাহমিয়া ও মুরজিয়াদের চরমপন্থীরা বিরোধিতা করেছে। তারা দাবি করে, যে ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে আমলের মূল শ্রেণি পরিত্যাগ করে, তাকে কোনো অবস্থাতেই কাফির বলা যাবে না; যা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার সুস্পষ্ট বিরোধিতা, ইতিপূর্বে যার অসারতা প্রমাণিত হয়েছে।

তারা আরও দাবি করে, কেউ এমন কথা বললে বা এমন কাজ করলে যা সুস্পষ্ট কুফর, তবুও সে কাফির হবে না যতক্ষণ না সে তা অস্বীকার করে বা হালাল মনে করে। এ বক্তব্য বাতিল; এর পক্ষে সামান্যতম ইলমি প্রমাণও নেই। কুফরের কারণ কখনো কখনো নিছক সেই কথাই, যা ব্যক্তি উচ্চারণ করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলে, তারা কিছু বলেনি। অথচ তারা অবশ্যই কুফরের কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরি করেছে।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৭৪)

“তুমি যদি তাদের জিজ্ঞেস করো, তারা অবশ্যই বলবে, ‘আমরা তো কেবল কথাবার্তা ও খেল-তামাশা করছিলাম।’ বলো, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে বিদ্রূপ করছিলে? অজুহাত পেশ করো না; তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।’” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৬৫-৬৬)

আলিমগণ এ বিষয়ে একমত যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ কে গালি দেওয়া কুফর। এর জন্য অন্তরে ঘৃণা পোষণ বা তাকে হালাল মনে করার শর্ত নেই। তাঁরা আরও একমত যে, মূর্তির সামনে সিজদা করা কিংবা কবরকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ করা কুফর । এখানেও হালাল মনে করার শর্ত নেই। তাঁরা একমত যে, ইচ্ছাকৃতভাবে মুসহাফকে অপবিত্র স্থানে নিক্ষেপ করাও কুফর; এর জন্যও হালাল মনে করার শর্ত নেই।

এসব দৃষ্টান্ত জাহমিয়া ও মুরজিয়াদের মূলনীতিকে খণ্ডন করে এবং ঈমান সম্পর্কে তাদের বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করে।


তথ্যসূত্র:

১] আল-লালাকাঈ, শরহু উসূলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, ৫/৮৮৬-৮৮৭; ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ঈমান, পৃ. ১৯৭।

২] ইমাম বাগাভি, শরহুস সুন্নাহ, ১১/৩৮-৩৯।

৩] ইমাম আজুররি, আশ-শরিয়া, ২/৬১২।

৪] ইমাম আজুররি, আশ-শরিয়া, ২/৬১৩

৫] শাইখুল ইসলাম মুহাম্মদ ইবনু আবদিল ওয়াহহাব, কাশফুশ শুবুহাত, পৃ. ১৩১