“কাফের কে কাফের না বললে কাফের হয়ে যাবে” এই মূলনীতির ব্যাখ্যা রয়েছে ।

এখানে ৭ টি প্রকার রয়েছেঃ

১ম প্রকারঃ যে ব্যক্তি ইহুদি, খৃষ্টান বা পৌত্তলিক জাতিকে বা তাদের কোনো সদস্যকে কাফের বলে না সে কাফের। কারন সে এর মাধ্যমে শরিয়তের অকাট্য দলীলকে অস্বীকার করেছে।

২য় প্রকারঃ যে ব্যক্তি পূর্ববর্তী ধর্মে প্রত্যাবর্তনকারীকে কাফের বলে না- যেমন কেউ ইহুদি, খৃষ্টান বা মাজুসী ধর্মে ধর্মান্তরিত হলো, তাকে যে কাফের  মনে না করবে, সে কাফের। কারন সে অকাট্য দলীলকে অস্বীকার করেছে।

৩য় প্রকারঃ যে ব্যক্তি কাফের হয়েছে ঈমান ভঙ্গের সর্বস্বীকৃত কর্ম করে; অতঃপর এই কর্মটি কুফরি তার উপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং সংশয় নিরসন হয়েছে। যদি এই ব্যক্তিকে সন্দেহের কোন কারন বা ব্যাখ্যার আশ্রয় ছাড়া শুধুমাত্র মনের খাহেশাতের কারনে অথবা গুরুত্বহীনতার কারনে কেউ কাফের মনে না করে, সে এই মূলনীতির আওতাভুক্ত হবে “যে কাফেরকে কাফের  মনে  করে না সে কাফের”।

৪র্থ প্রকারঃ ঈমান ভঙ্গের কোন কর্মে লিপ্ত কাফের ব্যক্তিকে কেউ এই কারনে কাফের মনে করছে না যে, এই কর্মটির দ্বারা ঈমান ভঙ্গের ব্যাপারে তার সংশয় রয়েছে অথবা তার বিশ্বাস সেই ব্যক্তির সামনে প্রমান (হুজ্জাহ) প্রতিষ্ঠা হয়নি অথবা তার ক্ষেত্রে কাফের হওয়ার শর্তসমূহ পরিপূর্ণ উপস্থিতুরণ, তাহলে এমতাবস্থায় সর্বসম্মতিক্রমে এমন কাফেরকে কাফের না বলার কারনে সে কাফের হবে না।

৫ম প্রকারঃ কেউ কাফেরকে কাফের মনে করছে না নিজের কোন বিদআতি মতবাদের কারনে, যেমন মুরজিয়া- যে কিনা ঈমান ভঙ্গের কারণকে সীমিত করে রেখেছে জুহুদ (বিশ্বাস) অথবা তাকযীব (অস্বীকার) অথবা ইস্তিহলাল (হারাম কে হালাল বানানো) এর মধ্যে। সবার ঐকমত্য রয়েছে যে, সে কাফের নয় ।

কারন তাকে কাফের বলা হলে এমন বিদআতি আক্বীদাহ পোষণকারী দলগুলো যেমন মুরজিয়া, আশায়িরা, কাররামিয়া, সালেমিয়া সব ফিরকাকেই কাফের বলতে হবে। অথচ কেউ এমন বলে না।

৬ষ্ট প্রকারঃ ঈমান ভঙ্গের মত কর্মে জড়িত ব্যক্তি বা শ্রেণী যেমন, ইচ্ছাকৃত নামাজ তরককারি, যাদুকর ইত্যাদিকে যে কাফের বলে না ।

এদের কে কাফের না বলার দুই অবস্থা।

একটি হলো এগুলোকে আমলের পর্যায়ভুক্ত বলে সংশ্লিষ্টদের কাফের না বলা, এটা বিদআতি মতাদর্শের লোকদের বক্তব্য । এদেরকে কাফের বলা হবে না। এ ক্ষেত্রেও দ্বিমত নেই ।

দ্বিতীয় অবস্থা হলো, দলীলসমূহের পারস্পরিক ভারসাম্য বিধান করতে গিয়ে কাফের না বলা। এই ব্যক্তিকেও সর্বসম্মত ভাবে কাফের বলা যাবে না  ।

কারন এই ব্যক্তিকেও যদি কাফের বলা হয়  তাহলে আইম্মায়ে আরবায়া (চার ইমাম) সহ পূর্ববর্তী অনেক আলেম যেমন, ইমাম যুহরি; তাদেরকে কাফের বলতে হবে।

এই কারনেই সালাফদের মাঝে খারেজিদের ব্যাপারে মতানৈক্য হয়েছে; তারা মুতাযিলাদের ব্যপারে মতানৈক্য করেছেন, পূর্ববর্তী ইমামদের মাঝে হাজ্জাজের মত ব্যক্তি বিশেষদের ব্যাপারেও মতভিন্নতা ছিল; এতদসত্বেও তারা একে অপরকে কাফের বলেননি এমনকি একে অন্যকে বিদআতিও বলেননি; কারন এটি হয়েছে তাদের ইজতিহাদ এবং ব্যাখ্যার আলোকে।

এই তো সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে খারেজিদের ব্যাপারে মতপার্থক্য হয়েছে; এক্ষেত্রে কাফের আখ্যাদান কারীগন-  যারা কাফের বলেন না তাদেরকে মুরজিয়া বলেন নি, আবার যারা খারেজিদের কাফের বলেন না তারা কাফের আখ্যাদান কারীদের খারেজি বলেন নি। 

এই যে হাসান বসরি, উমার ইবনে আব্দুল আজীজ, মুজাহিদ প্রমুখ সালাফ হাজ্জাজকে কাফের মনে করতেন আর মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন এবং আরো একদল তাকে কাফের মনে করতেন না।

এতদসত্বেও তারা একে অপর কে বিভ্রান্ত বলতেন না, একে অন্যকে কাফেরও বলেন নি। কারন এটি ছিল ইজতিহাদী বিষয়, যেহেতু প্রত্যেকেই এই অভিমত পোষণ করতেন যে, আসলে তার মধ্যে কুফরি সাব্যস্ত হওয়ার মত যথেষ্ট দলীল সমূহ পাওয়া যাচ্ছে না বা কুফর সাব্যস্ত হওয়ার দলীল সমূহ পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান নেই।

এই ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে মতানৈক্য হয়েছে এজন্য কেউই অন্যকে কাফের বলেন নি বরং বিদআতিও বলেন নি। একে অপরের মর্যাদাহানি-ও করেন নি, বিদআতি বলা তো বহুদূর। কাফের বলা তো আরো দূরের বিষয়।

৭ম প্রকারঃ কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্ষেত্রে সর্বসম্মতভাবে কুফরি সাব্যস্ত হয়েছে , এখন কেউ সেই শ্রেণির কাফের হওয়ার ব্যাপারে নয় বরং শ্রেনির ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে কুফরির বিধান প্রয়োগে মতানৈক্য করছে, বলা যায়- সে শ্রেনির কাফের হওয়া (আ’ম) স্বীকার করছে কিন্তু এই শ্রেণির প্রতিটি ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট ভাবে কাফের (খাস) এটা স্বীকার করে না, আর ইজমা সংঘটিত হয়েছিল শ্রেণির কুফরের ক্ষেত্রে, প্রতিটি সদস্যের ক্ষেত্রে নয়। 

বিধায় তাকে কাফের বলা যাবে না। কারন সে অকাট্য বিষয়কে অস্বীকার করেনি আর এখানে কাফের আখ্যাদানের শর্তসমূহের মধ্যে এটিও একটি যে, অকাট্য বিষয়ের অস্বীকার সাব্যস্ত হতে হবে। এখানে অকাট্য বিষয় হলো শ্রেনী; ব্যক্তি নয় ।

হ্যাঁ! যেখানে ব্যক্তি বিশেষের পর্যায়ে কাফের আখ্যা না দেওয়া হলে অকাট্য বিষয়ের অস্বীকার সাব্যস্ত হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষকেও কাফের না বলা হলে কাফের হয়ে যাবে। যেমন- দ্বিতীয় প্রকারে। এমনিভাবে তৃতীয় প্রকারের কাফেরদের ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষকে কাফের না বললেও নিশ্চিত বিষয়ের অস্বীকার সাব্যস্ত হয়ে যায়।