বর্তমান সময়ের কাফেরদের সীমালঙ্ঘনের বাস্তবতা, তাদের অশ্লীলতা ও নৈতিক অধঃপতন সম্পর্কে যিনি অবগত এবং মুসলিম নারীদের সম্মান-সম্ভ্রম রক্ষায় যিনি সচেতন, তিনি মুসলিম নারীদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে যুদ্ধ, জিহাদ, সাংগঠনিক কার্যক্রম কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো কাজে সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবেন না—বিশেষত যখন কাজগুলো পুরুষদের দ্বারাই সম্পন্ন করা সম্ভব।

অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও অতীতের কাফিররা সম্মানবোধ ও শিষ্টাচারের জন্য পরিচিত ছিল। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্ট এক সম্প্রদায় যখন লুত (আলাইহিস সালাম)-এর অতিথিদের প্রতি কামনাবশত তাঁর বাড়িতে ছুটে এসেছিল, তখন লুত (আলাইহিস সালাম) তাদের বলেছিলেন, 

“হে আমার সম্প্রদায়! এই যে আমার কন্যারা, তারা তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র।” [সূরা হুদ, ১১:৭৮]

তারা জবাব দিয়েছিল, 

“আপনি তো জানেনই, আপনার কন্যাদের প্রতি আমাদের কোনো অধিকার নেই!” [সূরা হুদ, ১১:৭৯]

অর্থাৎ, তারা অশ্লীলতা ও নোংরা কাজে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কন্যাদের অধিকারকে সম্মান করেছিল। এর কারণ হতে পারে, তাঁরা তাদেরই সম্প্রদায়ের একজন ব্যক্তির কন্যা ছিলেন; অথবা তারা জানত যে ওই নারীরা তাদের জন্য বৈধ নয়, যদিও তারাও ছিল কাফের।

লুত (আলাইহিস সালাম) হয়তো তাঁর অতিথিদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কিংবা অন্য কোনো কারণে তাঁর কন্যাদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা সীমালঙ্ঘন, অন্যায় ও নৈতিক অধঃপতনে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তাঁর কন্যাদের ওপর আক্রমণ করেনি; বরং তাদের অধিকারকে সম্মান করেছিল। কারণ, তারা জানত যে ওই নারীদের ওপর তাদের কোনো অধিকার নেই।

একইভাবে, কুরাইশের মুশরিকরা যখন নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হত্যা, বন্দি কিংবা তাঁর বাড়ি থেকে বহিষ্কারের ষড়যন্ত্র করছিল, তখন তাদের এক মূর্খ ব্যক্তি তাঁর ঘরে অনুপ্রবেশের প্রস্তাব দিয়েছিল। কাফেরদের নেতা আবু জাহল তখন এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা ও নিন্দা করে বলেছিল, 

“তোমরা কি চাও, আরবরা আমাদের এই বলে নিন্দা করুক যে আমরা মুহাম্মাদের কন্যাদের আতঙ্কিত করেছি?”

তাদের একজন কবি বলেছিলেন,

“আমার (নারী) প্রতিবেশী যখন আমার সামনে উপস্থিত হয়, তখন আমি দৃষ্টি অবনত রাখি; যতক্ষণ না সে নিজ গৃহে আড়াল হয়ে যায়।”

অন্য একজন কবি বলেছিলেন,

“যদি বাতাসে আমার (নারী) প্রতিবেশীর ঘরটি বেঁকে যায়, তবে ঘরটি যতক্ষণ না তার হেলে পড়া দিকটি আড়াল করে নেয়, ততক্ষণ আমি তা নিয়েই উদ্বিগ্ন থাকি।”

কিন্তু আমাদের সময়ের কুফ্ফাররা মুমিনদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা চুক্তির বন্ধনকে সম্মান করে না। তারা চায়, মুমিনদের মধ্যে বিকৃত যৌনাচার ছড়িয়ে পড়ুক।[১] তারা নিরপরাধ ও সতীসাধ্বী নারীদের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ তোলা এবং মুমিন নারী-পুরুষের সম্মানহানি করার কাজে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

তাই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো, মুসলিম নারীদের এসব (চরিত্রহীন) মুশরিকের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা। যে কাজগুলো পুরুষদের দ্বারাই সম্পন্ন করা সম্ভব, সেগুলোতে নারীদের সম্পৃক্ত করে কাফেরদের তাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেওয়া উচিত নয়। বিশেষত এমন কোনো কাজে তাদের যুক্ত করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে আল্লাহর শত্রুরা তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারে।

আমাদের সময়ে এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। এর কিছু কিছু দেখা যায় বিভিন্ন বিক্ষোভ মিছিল ও দলীয় সংঘাতগুলোর  সামনের সারিতে। অনেক পথভ্রষ্ট গোষ্ঠী এ ধরনের কাজ করে থাকে। তারা নারীদের সামনে এগিয়ে দেয়, ফলে মানুষ দেখতে পায়- আল্লাহর শত্রুরা মুসলিম নারীদের লাঠি দিয়ে আঘাত করছে কিংবা কুকুর লেলিয়ে তাদের তাড়া করছে। কখনো কোনো নারী পুলিশকে সতর্ক করতে গেলে তাকে অত্যন্ত অশ্লীল জবাব ও কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজের সম্মুখীন হতে হয়। তারা এমন এক নির্লজ্জ সম্প্রদায়, যাদের মধ্যে লজ্জাবোধ কিংবা সম্মানবোধের কোনো অস্তিত্ব নেই।

কখনো কখনো নারীদের ওপর সাংগঠনিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, অথবা কিছু সরঞ্জাম, অস্ত্র কিংবা অর্থ তাদের হেফাজতে রাখা হয়। যেসব বিষয় প্রকাশ পেলে নারীদের জোরপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হতে হয়। অসভ্য ও হীন চরিত্রের লোকেরা তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে তাদের সম্মানহানি করে, তাদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে এবং এমনভাবে গালিগালাজ করে, যা কোনো মুসলিম কিংবা স্বাধীনচেতা সম্মানবোধসম্পন্ন মানুষের কাছে নিজের মর্যাদার প্রতি চরম অবমাননা বলে বিবেচিত হবে। আর বিষয়টি যদি আল্লাহর শত্রুদের নিকৃষ্টতম ও সবচেয়ে ঘৃণ্য আচরণের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

পরিস্থিতি এরপর তাদের অমুসলিম আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে। তখন মুসলিম নারীদের ছবি টেলিভিশনে প্রচার এবং সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশ করা হতে পারে। এমনকি তাদের যৌনকর্মী ও অন্যান্য দুশ্চরিত্রা নারীদের সঙ্গে একই নোংরা কারাগারেও নিক্ষেপ করা হতে পারে।

যে বিবেকবান মুসলিম আল্লাহর শত্রুদের অশ্লীলতা ও নৈতিক অধঃপতন সম্পর্কে জানেন, তিনি কখনোই অন্তঃসারশূন্য আবেগের বশবর্তী হয়ে মুসলিম নারীদের এমন বিপজ্জনক পথে ঠেলে দেবেন না, যার পরিণামে তারা এসব ঘৃণ্য লোকের কবলে পড়তে পারে—বিশেষত যখন পুরুষদের পক্ষেই নারীদের সহায়তা ছাড়া কাজগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব।

আল্লাহর নির্ধারিত বিপদাপদে কোনো মুসলিম নারী আক্রান্ত হয়েছেন; এমন ঘটনাকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বৈধতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। কারণ, কোনো নারী কেবল মুসলিম হওয়ার কারণে আল্লাহর শত্রুদের হাতে নিপীড়িত হওয়া এবং ইসলামের দাঈ কিংবা মুজাহিদদের উদাসীনতার কারণে শত্রুপক্ষের হাতে তার নিপীড়িত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা; এ দুটির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

প্রথম ধরনের ঘটনা ইসলামের প্রাথমিক যুগের কিছু দুর্বল ও নিপীড়িত মুসলিম নারীর ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই এমন নারীর সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা নিজের নিরাপত্তার জন্য বা সাহায্য করার জন্য কাউকে পাননি। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ইসলামের দাঈ কিংবা মুজাহিদদের উদাসীনতা শত্রুপক্ষকে একজন নারীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয় এবং তার পর্দা অপসারণ কিংবা নিন্দনীয় পরিণতি ডেকে আনতে পারে; এমন কর্মকাণ্ডে তাকে সম্পৃক্ত করার অজুহাত জোগায়।

বরং যে বিবেকবান মুসলিম নিজের পরিবারের নারীদের সম্মান রক্ষা করতে চান, তাঁর উচিত জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা এ ধরনের পরিস্থিতিতে আল্লাহর শত্রুদের সামনে তাদের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকা। এমন কোনো কাজের দায়িত্বও তাদের দেওয়া উচিত নয়, যা শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের মতো পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।

এর উদ্দেশ্য হলো, কাফেররা যেন তাদের অনুসরণ, খোঁজখবর নেওয়া কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ না পায়; তাদের অপমান করা বা গ্রেপ্তার করার সুযোগ তো আরও দূরের কথা। কারণ, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তারা এমন নীচ ও হীন প্রকৃতির লোক, যাদের প্রতি সম্মানবোধ কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে আস্থা করা যায় না।

সারকথাঃ

মুসলিম নারীদের নিষ্ফল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, জিজ্ঞাসাবাদের ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া কিংবা এমন দায়িত্ব অর্পণ করা, যা পুরুষদের দ্বারাই সম্পন্ন করা সম্ভব—এমন কোনো বিষয় নয়, যা বিবেকবান ও স্বাধীনচেতা কোনো মুসলিমের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। বিশেষত দুর্বলতার এমন এক সময়ে, যখন মুসলিমদের নিজস্ব কোনো রাষ্ট্র বা ভূখণ্ড নেই, যেখানে তারা আশ্রয় নিতে পারে এবং যা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের সম্মান রক্ষা ও প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে।

যদি এমন একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যার বিপুলসংখ্যক সৈন্য পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে কোনো মুসলিম নারীর আর্তনাদের প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত থাকে, তাহলেও মুসলিম নারীদের এ ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে দূরে রাখা উচিত। তাদের এমন ক্ষেত্রগুলোতে নিয়োজিত রাখাই উত্তম, যেগুলো বিশেষভাবে নারীদের শৃঙ্খলা ও ইসলামের দাওয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আর যদি কোনো মুসলিম নারীর সম্মান আক্রান্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধীদের নিবৃত্ত করা এবং এই ধরনের অন্যায় করার আকাঙ্ক্ষা পোষণকারীদের জন্য সুস্পষ্ট প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত স্থাপনের উদ্দেশ্যে মুজাহিদদের কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক প্রতিক্রিয়া জানানো কর্তব্য।

মুজাহিদদের সর্বদা স্মরণ রাখা উচিত–যেমন তাদের শত্রুদেরও স্মরণ রাখা উচিত–যে, কা’ব ইবন আশরাফ এমন একটি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা তার রক্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার রক্তপাতের অনুমতি দিয়েছিলেন। এই দ্বীনের সাথীদের মধ্য থেকে একজন যুবক তাকে হত্যা করেছিল। এবং মুসলিম নারীদের কারও প্রতি তার প্রেমের ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যের কারণে [মুসলিমরা দৃষ্টান্তস্বরূপ] তার মাথা তরবারির ওপর উঁচু করে ধরেছিল।

পরিশেষে, তাদের এ কথাও স্মরণ রাখা উচিত যে, মুসলিমদের আক্বীদাহ ও বিশ্বাস অনুযায়ী,

“যে ব্যক্তি নিজের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে, সে একজন শহীদ।”

এভাবেই বর্ণনা করেছেন সেই সত্যবাদী, যাঁকে বিশ্বাস করা হয়। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। 


----------------------------

[১] সূরা আত-তাওবা, আয়াত ৮ এবং সূরা আন-নূর, আয়াত ১৯ দ্রষ্টব্য।


[শায়খের “وقفات مع ثمرات الجهاد” নামক কিতাব থেকে সংগৃহীত]