"হে রব! আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দাও; তারা জানে না।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি ও মুসলিম রাহি.)
'আল-হিলমু' এর আভিধানিক অর্থ 'ধীরস্থিরতা'। তার থেকে حلم (হলুমা), ح বর্ণ পেশযোগে। অর্থ: সে সহনশীল হলো। تحلم (তাহাল্লুমা) অর্থ সহনশীলতা প্রদর্শন করল। আর تحالم অর্থ: এমন ব্যক্তি, যে নিজের মধ্যে সহনশীলতা দেখাল, অথচ এটা তার মধ্যে নেই। আর পরিভাষায় 'হিলম' হলো, যে আপনার প্রতি জুলুম করে, তাকে আপনার পক্ষ থেকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং মন্দের জবাব ভালোর দ্বারা দেওয়া। আর কেউ বলেন, হিলম হলো, তীব্র ক্রোধের সময় প্রশান্ত থাকা। এর গুরুত্ব প্রথমটি থেকে কম নয়। তাই একজন মুসলিম নেতার অবশ্যই এ গুণে গুণান্বিত হতে হবে। যাতে তার সহনশীলতা ক্রোধের ওপর, নম্রতা কঠোরতার ওপর এবং ক্ষমা শাস্তির ওপর বিজয়ী হয়। এ গুণে গুণান্বিত হওয়ার ফলাফলগুলো চিন্তা করলে আমাদের নিকট এর গুরুত্বটি স্পষ্ট হবে। তাই এর ফলাফলগুলো নিম্নে প্রদত্ত হলো:
১. নেতার মাঝে মামুরদের ভালোবাসা সৃষ্টি করে। কোনো কোনো মহলে ধারণা করা হয় যে, এটা তার ভয় ও গাম্ভীর্য কমিয়ে দেয়, কিন্তু এ ধারণা ভুল। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কওমের পক্ষ থেকে সীমাহীন কষ্ট ও কঠোরতা সহ্য করা সত্ত্বেও তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সহনশীলতা ও দয়া প্রদর্শন করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করা হলো, আপনার কি উহুদের দিনের চেয়ে কঠিন দিন কোনোটি অতিবাহিত হয়েছে? তিনি বললেন, "আমি তোমার কওম থেকে যার সম্মুখীন হয়েছি, তা কতই না কঠিন ছিল। আমি তাদের থেকে সর্বাধিক কঠিন যে অবস্থার শিকার হয়েছি, তা হলো আকাবায় দিনে। আমি আবদে ইয়ালিল ইবনে আবদে কুলালের নিকট নিজেকে উপস্থাপন করি। আমি তার থেকে যা চাইলাম, সে তাতে সাড়া দিল না। তাই আমি ফিরে চললাম। আমি তখন খুব বিষণ্ণ চেহারা নিয়ে ছিলাম। কিন্তু তারপরে আমি শুধু এতটুকু মনে করতে পারি যে, আমি কতগুলো শিয়ালের খপ্পরে পড়েছিলাম। অতঃপর আমি মাথা তুলে দেখি, আমি একখণ্ড মেঘের নিচে, যা আমাকে ছায়া দিয়ে রেখেছে। আমি তাকিয়ে দেখলাম, সেখানে জিবরাঈল উপস্থিত। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেন: আপনার কওম আপনাকে যে জবাব দিয়েছে ও যা বলেছে, আল্লাহ তা শুনেছেন। তাই আল্লাহ আপনার নিকট পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন, আপনি তাদের ব্যাপারে তাকে যেকোনো আদেশ করতে পারেন। অতঃপর পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাক দিয়ে সালাম দিয়ে বলল, হে মুহাম্মাদ! এটা আপনার ইচ্ছা; আপনি যদি চান, তবে আমি তাদের ওপর দুই পাহাড়কে চাপিয়ে দেব। তখন নবী (সা.) বললেন: বরং আমি আশাবাদী, আল্লাহ তাদের বংশধরদের থেকে এমন লোক বের করবেন, যারা আল্লাহর ইবাদত করবে। তার সাথে কাউকে শিরক করবে না।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি রাহি.)
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে চলছিলাম। তাঁর গায়ে একটি নাজরানি চাদর ছিল। যার প্রান্তগুলো ছিল মোটা। অগত্যা এক গ্রাম্য লোক এসে তাঁর চাদর ধরে তাকে এত জোরে টান দিল যে, আমি দেখলাম, সজোরে টান দেওয়ার ফলে চাদরের কোণটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাঁধের ওপর দাগ সৃষ্টি করে ফেলেছে।
অতঃপর উক্ত লোকটি বলল, আল্লাহ তোমাকে যে মাল দিয়েছে, তার থেকে কিছু আমাকে দিতে আদেশ কর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। অতঃপর তাকে দান করতে আদেশ করলেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি ও মুসলিম রাহি.)
মুসলিম নেতার পরিপূর্ণ চেষ্টা থাকতে হবে তাঁর প্রজাদের ব্যাপারে এই গুণ অবলম্বন করার এবং তাঁকে এটা ও বিবেচনায় রাখতে হবে যে, মানুষ সংকীর্ণ জীবন-যাপনের কারণে দুঃখ-কষ্ট ও মানসিক নিপীড়নের শিকার, যা অনেক সময় তাদের থেকে মন্দ কর্মকাণ্ড ও আচরণ প্রকাশ করতে পারে।
২. নেতার ভুল হলে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মত সাহস হয়। আর এটা বলা বাহুল্য যে, উম্মাহর শক্তিকে কেন্দ্রীভূত রাখতে এর ভূমিকা অপরিসীম। কারণ, শাসক যখন স্বীয় সহনশীলতার দ্বারা প্রতিটি মুসলিমকে উম্মাহর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেবেন, তখন এটা প্রতিটি মুসলিমের মাঝে স্বীয় উম্মাহর প্রতি দায়িত্বশীলতা ও উম্মাহর সাথে নিজের সম্পৃক্ততার অনুভূতি বৃদ্ধি করবে। কিন্তু এর বিপরীত হলো, নেতা যদি এর বিপরীত গুণের অধিকারী হয়, তাহলে তা প্রজাদের অন্তরে ঘৃণা ও ভয়ের বীজ বপন করবে। যা বর্ণিত বিষয়গুলোতে তাদের ভূমিকাকে পদদলিত করবে। ফলে এটা অনেক নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে। এমনকি সবশেষে বিদ্রোহও সৃষ্টি করতে পারে। আমরা বিগত শতাব্দীতে উম্মাহর শাসকদের থেকে দেখেছি, তারা উম্মাহকে কর্তৃত্বাধীন রাখার নামে নিজ জনগণের প্রতি বিভিন্নমুখী আগ্রাসন ও কঠোরতা করেছে, যা কোনো মুসলিমের নিকটই অস্পষ্ট নয়। কিন্তু ঐ সকল লোকেরা জানেনা যে, এই আগ্রাসনই তাদের আশঙ্কাকে ত্বরান্বিত করবে।
৩. দলে দলে মানুষ আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। একারণেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি, যিনি বকরি চরাননি। যেহেতু বকরি শৃঙ্খলভাবে চলে না; বরং মন যেদিকে নিয়ে যায় সেদিকেই যায়। একজন রাখাল এতে যে কষ্টের সম্মুখীন হয়, তা তার সহনশীলতা বৃদ্ধি করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“সর্বনিকৃষ্ট রাখাল হলো নির্যাতনকারী। তাই তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাক।” (বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিম রাহি.)
অনেক রাখাল আছে, যাদের মাঝে সহনশীলতা নেই। এ ধরণের রাখালকে দেখবেন, যখনই তার কোনো একটি বকরি এদিক ওদিক যায় বা বিশৃঙ্খল হয়ে যায় বা দূরে চলে যায়, সে বকরিটিকে পেয়ে মাথায় তুলে সজোরে যমীনে আছাড় মারে। যদি সকল রাখালরাই তার মত করত, তাহলে নিশ্চয়ই অল্প সময়ের মধ্যে সব বকরি শেষ হয়ে যেত। এ হলো একটি বকরির পালের রাখালের উদাহরণ। তাহলে যে ব্যক্তি লক্ষ লক্ষ মানুষকে দেখাশোনা করে, তার অবস্থা কেমন হবে বলে ধারণা করতে পারি? আমরা দেখতে পাই, একেক জন শাসকের একেক রকম চিন্তা ভাবনা ও ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা, বিশেষত: আমাদের যুগে, যে যুগ বহু চিন্তা ও বহু মতবাদ অবলোকন করছে।
সুতরাং এমতাবস্থায় অবশ্যই দায়িত্বশীলকে এমন সহনশীল ও প্রশস্তহৃদয় হতে হবে, যার ফলে সে সমাজকে এমন কাঠামোতে পরিচালনা করতে পারে, যা মানুষের জন্য সম্মানজনক জীবনে নিশ্চয়তা প্রদান করে; তাদের প্রতি কষ্ট আরোপ করে না। বিশেষত: এখন তো উম্মাহ এমন এক নেতৃত্বের প্রয়োজন বোধ করছে, যে তাদের হাল ধরবে। আমরা আজ সবচেয়ে বেশি এমন একটি সহনশীল নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী, যে নেতৃত্ব উম্মাহকে পরিচালনা করবে, তাদের শান্তির জন্য কাজ করবে এবং তাদের বিরুদ্ধবাদীদের ওপর আমাদের শরীয়তের নির্দেশ বাস্তবায়ন করবে; নিজ প্রবৃত্তির নির্দেশে বাস্তবায়ন করবে না।
৪. শত্রুতাকে ভালোবাসায় রূপান্তরিত করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন:
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ. وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وََا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ
‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। তুমি মন্দকে প্রতিহত কর এমন পন্থায়, যা হবে উৎকৃষ্ট। ফলে যার ও তোমার মধ্যে শত্রুতা ছিল, সে সহসাই হয়ে যাবে তোমার বন্ধু। আর এ গুণ কেবল তাদেরকেই দান করা হয়, যারা সবর করে এবং এ গুণ কেবল তাদেরকেই দান করা হয়, যারা মহাভাগ্যবান।’ (ফুসসিলাত: ৩৪, ৩৫)
এমন আয়াত অনেক রয়েছে, যেগুলো মুসলমানদেরকে এই মহান গুণে গুণান্বিত হতে আহ্বান করে ও উৎসাহ দেয়, সমতা আচরণ করতে বা মন্দের মোকাবেলা মন্দ দ্বারা করতে নিষেধ করে এবং উত্তম কথার দ্বারা জবাব দিতে, কষ্ট এড়িয়ে চলতে ও মন্দ ব্যবহার ক্ষমা করে দিতে উৎসাহ দেয়। তন্মধ্যে একটি হলো আল্লাহর বাণী-
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষকে ক্ষমাকারী। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন।’ (আলে ইমরান: ১৩৪)
কোন লোক নিজের মাঝে এই তিনটি ভিত্তির সমন্বয় ঘটালে কেবল সহনশীল হতে পারবে; অন্যথায় নয়। আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সহনশীলতা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন:
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهٌ مُنِيبٌ
‘নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল আল্লাহভিমুখী ও সহনশীল।’
আমরা সবাই জানি, হযরত ইবরাহীম (আ:) তাঁর কওমের থেকে কতটা কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন। তারা তাকে আগুনে নিক্ষেপ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পুত্র ইসমাইলকেও এ গুণের সাথে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ
‘অতঃপর আমি তাকে একটি সহনশীল সন্তানের সুসংবাদ দিলাম।’
অনুরূপ আল্লাহর নবী হুদ আলাইহিস সালামের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন: সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার মাঝে নির্বুদ্ধিতা নেই। বরং আমি সকল জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একজন বার্তাবাহক। তিনি সে সময় সবর করেছিলেন, যখন তাঁর কওম তাকে গালি দিচ্ছিল, তাঁর সাথে বিদ্রূপ করছিল। তিনি এসবের মোকাবেলা করেছেন তাওহীদের দাওয়াতের মাধ্যমে। তাদের নিকট তাঁর মূল বিষয়টি তথা তাঁর রিসালাতটিই স্পষ্ট করেছেন এবং তাদের সুমতি হওয়ার আশায় উত্তমভাবে তাদেরকে উপদেশ দিয়েছেন। সহনশীলতা ও গোস্বা না করার ব্যাপারে রাসূল (সা.) থেকে অনেক বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত রয়েছে।
তন্মধ্যে একটি হাদিসে রয়েছে: তিনি আব্দুল কায়সের প্রতিনিধি দলের নেতার উদ্দেশ্যে বলেন: নিশ্চয়ই তোমার মধ্যে এমন দু’টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো আল্লাহ ভালোবাসেন: তা হলো সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি রাহি.)
আরেক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট উপদেশ চাইতে আসল। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন: তুমি ক্রোধান্বিত হয়ো না। লোকটি একই আবেদন বারে বারে করল। রাসূল (সা.) ও প্রতিবারই বললেন: তুমি ক্রোধান্বিত হয়ো না। বর্ণনাকারী সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন একথা বলেছেন, তখন আমি চিন্তা করে দেখলাম, ক্রোধ সকল অনিষ্টকে একত্রিত করে। ক্রোধের সময় বিবেক হ্রাস পায়। ফলে তা অন্যায় কথা বলা ও সত্য গোপন করার দিকে নিয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি দু’আ ছিল:
"হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ক্রোধের সময় ও খোশ হালে সঠিক কথা বলার তাওফিক প্রার্থনা করি।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম নাসাঈ রাহি.)
নবী (সা.) আরও বলেন:
"কোনো বিচারক যেন ক্রোধান্বিত অবস্থায় দু’ব্যক্তির মাঝে ফয়সালা না করে।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি ও মুসলিম রাহি.)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট তার ঋণ চাইতে আসল। লোকটি কঠোরভাবে কথা বলল। তখন তাঁর সাহাবীগণ তার ওপর আক্রমণ করতে উদ্যত হলো। রাসূল (সা.) বললেন: তাকে ছাড়। কারণ পাওনাদারের বলার অধিকার আছে। তারপরে বললেন, তাকে তার দাঁতের মত একটি দাঁত দাও। সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো তার দাঁতের চেয়ে উত্তম দাঁত ছাড়া অন্য কিছু পাচ্ছি না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তা’ই দাও। কারণ তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো, সর্বোত্তম বিচারকারী। (বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিম রাহি.)
অন্য হাদিসে নবী (সা.) বলেন:
“বান্দা এমন কোনো ঢোক গিলে না, যা আল্লাহর নিকট ক্রোধের ঢোক থেকে উত্তম, যা সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সংবরণ করে।” (বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ ও ইবনে মাজাহ)
রাসূল (সা.) আরও বলেন:
"আছাড় দেওয়ার দ্বারা বীর হয় না। বীর হলো, ঐ ব্যক্তি, যে ক্রোধের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারে।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি ও মুসলিম রাহি.)
সুতরাং সহনশীলতা হলো, শক্তি ও দৃঢ়তার আলামত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
“নিশ্চয়ই যে সবর করে ও ক্ষমা করে দেয়, (তার) এটা দুঃসাহসিকতার কাজ।” (শূরা: ৪৩)
সহনশীলতার শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সাহাবাদের থেকে অনেক উক্তি বর্ণিত রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো: উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে:
"যেকোনো কল্যাণকর কাজে চিন্তা-ভাবনা করতে হয়। তবে যেগুলো পরকালের বিষয় সেগুলো ব্যতীত।"
হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে:
"তোমার সম্পদ ও সন্তান বেড়ে যাওয়া কল্যাণের বিষয় নয়; বরং কল্যাণের বিষয় হলো তোমার ইলম বৃদ্ধি পাওয়া এবং সহনশীলতা ব্যাপক হওয়া। আল্লাহর ইবাদত করে মানুষের সাথে বড়াই না করা। সৎকর্ম করলে আল্লাহর প্রশংসা কর আর গুনাহ করলে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর।" (আবু নুআইম হিলইয়াতুল আউলিয়াতে উল্লেখ করেন)।
তিনি আরও বলেন:
"যার কথা নম্র হয়, তার ভালোবাসা অবধারিত হয়ে যায়। নির্বোধের ওপর তোমার সহনশীলতা তার ওপর তোমার সহযোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়।"
মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) বলেন:
"বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না, যতক্ষণ না তার সহনশীলতা অজ্ঞতার ওপর এবং ধৈর্য প্রবৃত্তির ওপর প্রাধান্য পায়। সে একমাত্র সহনশীলতার শক্তি দ্বারাই এ স্তরে পৌঁছাতে পারে।" (বর্ণনা করেছেন আবুল কাসেম আত তাবারানি রাহি.)
মুআবিয়া (রা.) আরাস ইবনে আউসকে বলেন: হে আরাস! তুমি কিসের দ্বারা তোমার কওমের সরদার হয়েছো? আরাস বলল, হে আমীরুল মুমিনিন! আমি তাদের অজ্ঞদের প্রতি সহনশীল ছিলাম, তাদের আবেদনকারীকে দান করতাম এবং তাদের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করতাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পরে উম্মাহর এই সকল নেতৃবৃন্দের জীবনেও এ গুণটি কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা এসকল বর্ণনাগুলোই স্পষ্ট করে। এই গুণই তাদেরকে উম্মাহর নেতা বানিয়েছে। আর তারা উম্মাহকেও এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উপদেশ দিতেন। যেমনটা পূর্বে বর্ণনা করেছি। আর এই মহান গুণে গুণান্বিত হওয়ার ফলাফল কী?! আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন এরূপ ব্যক্তিকে ডেকে স্বাধীনতা দেবেন, আন্তনয়না হুরদের মধ্য হতে যা ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারি।
মুয়াজ ইবনে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"যে ব্যক্তি ক্রোধ সংবরণ করে, অথচ সে তা বাস্তবায়ন করতে পারত, আল্লাহ তা‘আলা তাকে কিয়ামতের দিন সকল সৃষ্টির সামনে ডাকবেন, অতঃপর তাকে হুরদের থেকে যা ইচ্ছা নেওয়ার স্বাধীনতা দেবেন।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ রাহি.)