আল্লাহ তা'আলা বলেন: 

وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى وَمَا لِأَحَدٍ عِنْدَهُ مِنْ نِعْمَةٍ تُْزَى إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَى

"আর তা থেকে দূরে রাখা হবে পরম মুত্তাকীকে, যে আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য নিজ সম্পদ (আল্লাহর পথে) দান করে। অথচ তার ওপর কারোর অনুগ্রহ ছিল না, যার প্রতিদান দিতে হয়, বরং সে (দান করে) কেবল তার মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়।" (আল-লাইল: ১৭-১৯)

الجود (আল-জুদ) আভিধানিকভাবে جاد  থেকে উদগত। যেমন বলা হয়: غذاء السماء جادت (আসমান খাদ্য দান করেছে), অর্থাৎ আসমান প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ করেছে। অনুরূপ বলা হয়ে থাকে- الجواد الفرس (অধিক দানশীল ঘোড়া), অর্থাৎ "দ্রুতগামী ঘোড়া"। আল্লাহ তা'আলা জাওয়াদ। যেহেতু যেখানে আল্লাহ তা'আলার হিকমত অনুকূল হয়, সেখানে তিনি অনেক বেশি দান করেন। এর পারিভাষিক অর্থ হলো, চাওয়া ছাড়াই অনেক বেশি দান করা, অথবা যে সম্পদ ব্যয় করা উচিত তা কোনো বিনিময় ছাড়া ব্যয় করা।

দানশীলতা ঐ সকল কামেল লোকদের বৈশিষ্ট্য, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা কোনো একটি উদ্দেশ্যের জন্য নির্বাচিত করেছেন। তাই তাদের নিকট খরচ করাকে প্রিয় বানিয়ে দেন এবং তাদেরকে তাদের আন্তরিকভাবে দানবীর বানিয়ে দেন। এ সকল লোক তাদের এ কাজের মাধ্যমে তাদের আশেপাশের লোকদের অন্তরের মালিক হয়ে যায়। অন্তরের স্বভাবই তো এটা যে, যে তার প্রতি অনুগ্রহ করে, তাকে সে ভালোবাসে।

এজন্য নেতাই এ মহান গুণে গুণান্বিত হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত। বিশেষত: যে যামানায় লোভ ও প্রতারণা ব্যাপক হয়ে গেছে। উম্মাহর নেতৃত্ব অনেক দায়িত্বশীলতা দাবি করে। তাই এটি একটি চাপ; একটি ভার ও বোঝা; গৌরব নয়। এটি ব্যয় করা ও দান করার নাম, গ্রহণ করার নাম নয়। 

তাই একজন নেতাকে এগুলো লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রজাদের প্রয়োজন পূরণ করতে হবে। নিজ প্রয়োজনের ওপর তাদের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে হবে। ইলমী, সামাজিক, দাওয়াতী, অর্থনৈতিক, সামরিক, তথা প্রচলিত সকল ক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুযায়ী দান করতে হবে। তার দৃষ্টির সামনে থাকতে হবে রাসূল (সা.)-এর এই হাদীস:

"তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।"

তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে ইলমী খাতের প্রতি। ইলমে নিয়োজিতদের জন্য দান করবে। বিভিন্ন ইলমী ও গবেষণা কেন্দ্র খুলবে। যেন আলিমও তালিবে ইলমের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কারণ আমাদের যামানায় যে সমস্ত বেতনভোগী প্রশাসন আরব দেশগুলো ও মুসলিম সংখ্যাধিক্য দেশগুলো শাসন করছে, তারা ইলম ও আহলে ইলমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, আলিমগণকে কারাগরে ঢুকাচ্ছে। একারণে আলিমগণ সেখান থেকে পশ্চিমা কাফিরদের দেশে হিজরত করতে বাধ্য হন, যেন তাদের ইলমী অভিজ্ঞতার সংস্পর্শ পান এবং তাদের ঐ সমস্ত আবিষ্কৃত বস্তুসমূহকে সরাসরি ব্যবহার করেন, যা সবচেয়ে প্রয়োজন আমাদের।  

নবী (সা.) নবুয়াতের পূর্বেও সর্বাপেক্ষা দানশীল ছিলেন। যেমন, ওহী নাযিলের সময় তার গুণাবলী বর্ণনা প্রসঙ্গে খাদিজা (রা.) বলেন: আপনি আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা করেন, বোঝা বহন করে দেন, হারানো বস্তুকে খুঁজে বের করে দেন, মেহমানদের মেহমানদারী করেন, হক বিপদে সাহায্য করেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.); আর নবুয়াত লাভের পর রাসূল (সা.)-এর দানশীলতার বর্ণনা দিতে তো আমাদের ভাষাও ব্যর্থ হবে। তিনিই হলেন আখিরী নবী। 

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন:

"নবী (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দানশীল। আর তিনি আরও অধিক দানশীল হয়ে যেতেন রমজান মাসে, যখন জিবরাঈল (আ.) তাকে সাক্ষাৎ দিতেন। জিবরাঈল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তার সাথে কুরআন দাওর করতেন। তখন রাসূল (সা.) মুক্ত বাতাসের চেয়েও বেশি পরিমাণে দান করতেন।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.) 

রাসূল (সা.) কারো প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করতেন না। যেমন সাহল ইবনে সা'দ (রা.) বলেন: জনৈকা মহিলা একটি চাদর নিয়ে নবী (সা.) এর নিকট আসল। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এই কাপড়টি আপনাকে দিচ্ছি। রাসূল (সা.) তা গ্রহণ করলেন। আর রাসূল (সা.) এর তা প্রয়োজনও ছিল। অতঃপর তিনি কাপড়টি পরিধান করলেন। তখন জনৈক সাহাবী তা দেখতে পেয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কত সুন্দর এটি! এটা আমাকে পরতে দিন! রাসূল (সা.) বললেন: হ্যাঁ। অতঃপর যখন রাসূল (সা.) উঠে গেলেন, তখন সাহাবীগণ তাকে ভর্ৎসনা করল। তারা বলল, তুমি এটা ভাল করনি, তুমি দেখলে, রাসূল (সা.) নিজ প্রয়োজনে এটা গ্রহণ করেছেন, তারপরেও তুমি তার কাছে তা চাইলে। অথচ তুমি জান, রাসূলুল্লাহর নিকট কিছু চাইলে, তিনি নিষেধ করেন না। উক্ত সাহাবী বললেন, আমি যখন দেখলাম রাসূলুল্লাহ এটা পড়েছেন, তখন আমি এর বরকত লাভের আশা করলাম, যাতে আমাকে এটার মধ্যে দাফন করা হয়। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.)

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহর নিকট ইসলামের ভিত্তিতে কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই তা দিতেন। তিনি বলেন: অতঃপর তার নিকট এক ব্যক্তি আসল। তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গা ভর্তি বকরি দিলেন। লোকটি নিজ কওমের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, হে আমার কওম! তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, কারণ মুহাম্মাদ এত বেশি দান করে, যে দারিদ্র্যের ভয় করে না। (বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিম রাহি.)। রাসূল (সা.) চাওয়ার পূর্বেই দান করতেন এবং তিনি এটাকে অনেক বড় সৌভাগ্য মনে করতেন। 

রাসূল (সা.) বলতেন:

"আমার নিকট এটা আনন্দের বিষয় নয় যে, আমার নিকট উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকবে, আর আমার ওপর দিয়ে তিন দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও তার একটি দিনার আমার নিকট বাকি থাকবে, কিন্তু আমি তা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে বণ্টন করতে করতে বলব না, অমুক এত.. অমুক এত.. অমুক এত.. (এ বলে তিনি তার ডান দিকে, বাম দিকে এবং পেছনের দিকে ফিরলেন) তবে এমন কিছু বাকি থাকলে থাকতে পারে, যা আমি ঋণ পরিশোধ করার জন্য রেখে দেব।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.) 

ইবনে শিহাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ করলেন, অতঃপর সাথীদেরকে নিয়ে বের হলেন। হুনাইনের যুদ্ধ সংঘটিত হল। আল্লাহ তার দ্বীন ও মুসলমানদেরকে বিজয় দান করলেন। সেই দিন রাসূল (সা.) সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াহকে প্রথমে একশ উট, তারপরে একশ এবং তারপরে একশ উট দান করলেন।

ইবনে শিহাব বলেন: সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যিব আমাদের নিকট বর্ণনা করেন: সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াহ বলেছেন: আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে এত এত দান করেছেন। অথচ তিনি ছিলেন আমার নিকট সর্বনিকৃষ্ট মানুষ। কিন্তু তিনি সর্বদা আমাকে দিতে থাকেন, এমনকি একসময় তিনি আমার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় মানুষ হয়ে গেলেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিম রহ.)

তার উদারতার আরেকটি চিত্র: রুবাঈয়া বিনতে মুআওয়িয ইবনে আফরা (রা.) বলেন: আমি এক পাত্র খেজুর ও ছোট ছোট কয়েকটি তাজা শসা নিয়ে রাসূল (সা.) এর নিকট আসলাম। তিনি আমাকে তার মুষ্ঠি ভরে স্বর্ণালঙ্কার দিলেন। (অথবা স্বর্ণের কথা বলেছিলেন) তারপরে বললেন: তুমি এর দ্বারা অলঙ্কৃত হবে। (বর্ণনা করেছেন ইমাম তাবরানি রহ. আলমু'জামুল কাবিরে) 

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট বাহরাইনের সম্পদ আসল। এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট আগত সবচেয়ে বেশি পরিমাণ সম্পদ। তিনি বললেন এগুলো মসজিদে বণ্টন করে দাও। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.)

তিনি তার সাথীদেরকে এবং তার পরবর্তী উম্মতকেও দানের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। তিনি (সা.) বলেছেন: প্রতিদিন যখন বান্দা সকাল বেলা ওঠে, তখন দুই জন ফেরেশতা অবতরণ করে। একজন বলে, হে আল্লাহ দানকারীকে তার অনুরূপ সম্পদ দান কর। অপরজন বলে: হে আল্লাহ দানে কার্পণ্যকারীর মাল ধ্বংস করে দাও। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.)

আমরা এখানে সাহাবায়ে কেরামের দানের কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরব: আবু বকর (রা.) নবীদের পরে যে ব্যক্তি সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেছিলেন, তিনি হলেন আবু বকর (রা.)। 

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রাহি.) বলেন:

"আবু বকর (রা.) নবীদের পরে সর্বশ্রেষ্ঠ ওলি ও তাওয়াক্কুলকারী। তিনি তার সমুদয় সম্পদ খরচ করেছিলেন। রাসূল (সা.) তাকে বলেছিলেন, তুমি তোমার পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছ? তিনি বলেছেন, তাদের জন্য আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে রেখে এসেছি। এতদসত্ত্বেও তিনি কারো থেকে সাদাকা, গনিমতের অর্থ, মান্নতের অর্থ ইত্যাদি কোনো কিছু গ্রহণ করতেন না। তিনি নিজ উপার্জনে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু যে সমস্ত লোকেরা তাওয়াক্কুলের দাবি করে এবং আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর অনুসরণের দাবি করি: নিজের সমস্ত সম্পদ ব্যয় করে দেয়, অথচ আবার কখনো চেয়ে, কখনো চাওয়া ছাড়া মানুষ থেকে অর্থ গ্রহণ করে, তাদের এ অবস্থা কখনো আবু বকর (রা.) এর অবস্থার মত নয়। আবু বকর (রা.) এর ব্যাপারে নাজিল হয়েছে আল্লাহ তা'আলার বাণী: 

وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى

এ থেকে দূরে রাখা হবে খোদভীরু ব্যক্তিকে, যে আত্মশুদ্ধির জন্য তার ধনসম্পদ দান করে। (লাইল: ১৭,১৮)

ইবনুল জাওযি রাহি. বলেন: আলিমগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, এই আয়াতটি আবু বকর (রা.) এর ব্যাপারে নাজিল হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: কোনো সম্পদ আমাকে কখনো এতোটা উপকার করেনি, যতটা আবু বকরের সম্পদ আমাকে উপকৃত করেছে। একথা শুনে আবু বকর (রা.) কেঁদে ফেললেন এবং বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি ও আমার সম্পদ তো আপনার জন্যই! (বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ রাহি.)

উসমান (রা.) যিনি তাবুকের সৈন্যবাহিনীর খরচ বহন করেছিলেন, রুমাহ কূপ ক্রয় করেছিলেন এবং নিজের খাঁটি মাল দিয়ে মসজিদ সম্প্রসারণ করেছিলেন। 

সুমামাহ ইবনে হাযম আল কুশাইরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যেদিন উসমান (রা.) কে শহীদ করা হয়েছিল, সেদিন আমি দ্বারে উপস্থিত হই, তিনি তাদের দিকে উঁকি দিয়ে বললেন: তোমাদের সেই দুই সাথীকে আমার নিকট ডাক, যারা তোমাদেরকে আমার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করেছে। উক্ত দুইজনকে তার সামনে ডাকা হলো। তিনি বললেন: আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তোমরা কি জান, রাসূল (সা.) যখন মদিনায় আসলেন, তখন মসজিদে মুসল্লিদের সংকুলান হচ্ছিল না। তখন রাসূল (সা.) বললেন: কে নিজের খাঁটি মাল দিয়ে এই ভূমিটি ক্রয় করবে, অতঃপর তা মসজিদটির জন্য এমনভাবে দান করে দিবে যে, উক্ত ভূমিতে সেও অন্যান্য মুসলিমদের মতই হবে আর তার জন্য থাকবে জান্নাতে এর চেয়ে উত্তম বিনিময়, তখন আমি আমার খাঁটি মাল থেকে তা ক্রয় করে মুসলিমদের জন্য দান করেছিলাম, আর এখন তোমরা আমাকে সেখানে দু'রাকাত নামাজ পড়তে দিচ্ছ না। অতঃপর বললেন: আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তোমরা কি জান, রাসূল (সা.) যখন মদিনায় আসলেন, তখন সেখানে রুমাহ কূপ ছাড়া মিঠা পানির কোনো কূপ ছিল না, তখন রাসূল (সা.) বললেন: কে তার খাঁটি সম্পদ থেকে তা ক্রয় করবে, অতঃপর উক্ত কূপে তার বালতিও অন্যান্য মুসলিমদের বালতির মত হয়ে যাবে, আর তার জন্য থাকবে জান্নাতে এর চেয়ে উত্তম বিনিময়? তখন আমি আমার খাঁটি সম্পদ থেকে তা ক্রয় করি। আর এখন তোমরা আমাকে তার থেকে একটু পানি পান করতে বাধা দিচ্ছ না। অতঃপর বললেন: তোমরা কি জান, আমি সংকটের (তাবুকের) যুদ্ধের বাহিনীর সদস্য ছিলাম? তারা বলল, হ্যাঁ (এগুলো জানি)। (বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ রাহি.)

আব্দুর রহমান ইবনে সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উসমান (রা.) এক হাজার দিনার নিয়ে নবী (সা.) এর নিকট আসলেন। হাসান ইবনে ওয়াকি বলেন: আমার কিতাবের অন্য জায়গায় ছিল, যখন তিনি তাবুকের সৈন্যবাহিনীর খরচ দিয়েছিলেন, তখন তিনি তার আস্তিন থেকে এক হাজার দিনার নিয়ে রাসূল (সা.) এর নিকট আসেন। অতঃপর তা রাসূল (সা.) এর কোলে রাখেন। আব্দুর রহমান বলেন: আমি দেখলাম রাসূল (সা.) আমাদের দিকে তার কোলের দিকে ফেরাচ্ছেন আর বলছেন: আজকের পর উসমান যা আমলই করুক, তা তার কোনো ক্ষতি করবে না। ওটা তিনি দু'বার বলেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম তিরমিযি রাহি.)

আবু তালহা, যিনি তার সবচেয়ে প্রিয় মাল দান করেছিলেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আবু তালহা ছিলেন মদিনার আনসারদের সর্বাপেক্ষা বেশি খেজুর সম্পদের অধিকারী। তার নিকট তার সবচেয়ে প্রিয় মাল ছিল তার ‘বাইরুহা’ নামক খেজুর বাগানটি। এটা ছিল মসজিদের সামনের দিকে। রাসূল (সা.) তাতে প্রবেশ করতেন, তার স্বচ্ছ পানি পান করতেন।   

আনাস (রা.) বলেন:  অতঃপর যখন এই আয়াতটি নাজিল হল وَلَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ "তোমরা কিছুতেই পুণ্যের নাগাল পাবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু হতে (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর।" অতঃপর আবু তালহা (রা.) রাসূল (সা.) এর নিকট গিয়ে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট আমার সবচেয়ে প্রিয় মাল বাইরুহা। আমি সেটা আল্লাহর জন্য সদকা করে দিলাম। আমি আল্লাহর নিকট এর সঞ্চয় ও সওয়াব কামনা করি। তাই হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে যেখানে খরচ করতে বলেন, আপনি তা সেখানেই ব্যয় করুন। বর্ণনাকারী বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: বাহ! এ তো লাভজনক সম্পদ! এ তো লাভজনক সম্পদ! তুমি যা বলেছ আমি শুনেছি। আমার রায় হল, তুমি তা তোমার নিকটাত্মীয়দের মাঝে ব্যয় করবে। আবু তালহা বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাই করব। অতঃপর আবু তালহা তা তার নিকটাত্মীয় ও চাচাতো ভাইদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ.)

সাহাবায়ে কেরামের জীবনীর মধ্যে এরূপ দানশীলতার ঘটনা অনেক রয়েছে। কেউ আরও দেখতে চাইলে সিয়ারের কিতাবসমূহ দ্রষ্টব্য। বর্তমানে মুসলিমগণ তাদের শাসকদের দুর্নীতির বলি হয়েছে। তারাই নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে, বরং তাদের পশ্চিমা প্রভুদের স্বার্থে মুসলিমদের বিস্তৃত সম্পদসমূহ লুণ্ঠন করছে। অতঃপর ঐ সমস্ত লুণ্ঠিত অর্থের মাধ্যমেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আল্লাহর কসম! এরা মুসলিমদের মাঝে কি যে দারিদ্র্য-দুর্দশা ও অভাব সৃষ্টি করেছে, তার বর্ণনা দিতে ভাষা অক্ষম। তাদেরকে জীবিকা নির্বাহের সামান্য এক লোকমা খাবারের জোগাড়ের জন্য দিনের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম ও কষ্ট-ক্লেশে ব্যয় করতে কাটাতে বাধ্য করেছে। এভাবে তাদেরকে তাদের জাতি গঠনের ভূমিকার কথাই ভুলিয়ে দিয়েছে। তাদের অন্তরে তাদের দেশের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করেছে। কারণ এখান থেকেই তো তাদের কষ্টের পর কষ্ট করতে হয়। এভাবে যে জনগণের পক্ষ থেকে তাদের ওপর আক্রমণ আসার কথা ছিল, তারা তাদেরকে আত্ম-চিন্তায় ব্যস্ত করে দিয়েছে। কিন্তু এসব কিছু কার স্বার্থে করা হচ্ছে? এসবের অন্তরালে কে আছে? আপনারাই ফলাফল বের করুন! এজন্য শাসকের দানশীলতা ও তার কর্তৃক প্রজাদের স্বার্থের জন্য নিজ স্বার্থকে কুরবানি দেওয়ার কি অর্থ তা কি আপনারা বুঝেছেন? নিশ্চয়ই এটা সহজ নয়। একমাত্র যে আল্লাহকে ভয় করে তার পক্ষেই সম্ভব।

রাসূল (সা.) বলেন:

"হে আল্লাহ! যে আমার উম্মতের কোনো কিছুর দায়িত্বশীল হয়, অতঃপর সে তাদের ওপর কষ্ট আরোপ করে, তুমিও তার ওপর কষ্ট আরোপ কর। আর যে আমার উম্মতের কোনো কিছুর দায়িত্বশীল হয়, অতঃপর সে তাদের প্রতি দয়াশীল হয়, তুমিও তার প্রতি দয়াশীল হও।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.) 

আবু মারিয়াহ আল ইযদী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি: যাকে আল্লাহ মুসলিমদের কোনো কিছুর দায়িত্বশীল বানান, অতঃপর সে তাদের প্রয়োজন, অভাব ও দারিদ্র্য দূর করে না, আল্লাহ তা'আলাও কিয়ামতের দিন তার প্রয়োজন, অভাব ও দারিদ্র্য দূর করবেন না। একারণে মুয়াবিয়া (রা.) মানুষের প্রয়োজনীয়তা শোনার জন্য একজনকে নিয়োগ করেছিলেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু দাউদ, তিরমিযি, হাকিম, ইবনে সাদ ও বায়হাকি রহ.)

আজ আমাদের কত প্রয়োজন আলী (রা.)’র মত একজন মহান ব্যক্তির। যিনি তার গভর্নরদেরকে কোন এলাকায় পাঠানোর সময় বলতেন: “পাখিদের মাঝে মৌমাছি যেমন, তোমরাও মানুষের মাঝে তেমন হয়ে যাও। প্রতিটি পাখিই মৌমাছিকে দুর্বল পায়। কিন্তু পাখিরা যদি জানত, মৌমাছির পেটের মাঝে কি বরকত রয়েছে, তাহলে তারা কিছুতেই এরূপ করত না। তোমরা যবান ও শরীরের দিক দিয়ে মানুষের সাথে মিশবে আর তোমাদের আমল ও অন্তরের দিক দিয়ে তাদের থেকে দূরে থাকবে। কারণ প্রত্যেক মানুষ যা অর্জন করে, তা’ই পায় এবং কিয়ামতের দিন সে যাকে ভালবেসেছিল তার সাথেই থাকবে”। (বর্ণনা করেছেন ইমাম দারেমী) 

উমর ইবনে আব্দুল আযীযের মত লোকের কত প্রয়োজন আমাদের, যিনি বলতেন, তোমরা পাহাড়ের চূড়ায় গম ছিড়িয়ে দাও, যেন কারো একথা বলার সুযোগ না থাকে যে, মুসলিমদের দেশে একটি পাখিও ক্ষুধার্ত থেকেছে!

পরিশেষে হে মুসলিমগণ! আপনাদের উদ্দেশ্যে বলছি: আমরা আজ আপনাদের দানশীলতার মুখাপেক্ষী। আপনাদের ধনীদের অর্থের মুখাপেক্ষী, যেন তা আপনাদেরই জাতির জন্য ব্যয় করা যায়। অন্যথায় আপনারা আল্লাহর শপথ দিয়ে বলুন, যদি আপনারা তাদের দায়িত্ব বহন না করেন, তাহলে কে বহন করবে? আপনারা কি শাসকদের বা পশ্চিমাদের অপেক্ষায় বসে আছেন, যে তারা উম্মাহর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়ন করবে। আমি শুধু মুসলিম জনসাধারণের উপর চাপিয়ে দেওয়া সেই দারিদ্র্যের কথা বলছি না, যা তাদেরকে তাদের সেই দায়িত্বের কথাও ভুলিয়ে দিয়েছে, যার জন্য আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন; বরং আমি সব জিনিসের মূল ও গোড়ার কথা বলছি। সেই সেনাবাহিনী, যারা উম্মাহকে সম্মানের পথে চালাতে ও বর্তমান অধঃপতন থেকে উত্তরণ করতে সর্বদা উদগ্রীব, কিন্তু দারিদ্র্য তাদেরকে থমকে দিচ্ছে। এরা তো আপনাদের বীজ, তাই আপনারা সকলে এদের মাঝে পানি সিঞ্চন করার কাজে ব্যস্ত হোন। যেন এমন বৃক্ষ দেখে আপনাদের চক্ষু শীতল হয়, যার শিকড় মাটিতে স্থির, আর শাখা-প্রশাখা আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে, যা স্বীয় প্রভুর ইশারায় সর্বদা ফল দিতে থাকে এবং যা আপনাদের সকল দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটাবে। আমার এই কথাগুলো যাদের অন্তরে সামান্য রেখাপাত করবে, তাদের নিকট আমার আবেদন: সেই সেনাবাহিনীর ব্যাপারে গভীর চিন্তা করুন, যারা শুধু মাত্র আপনাদের নবী (সা.), তার সাহাবা ও তার পরিবারবর্গের পদচিহ্ন ধরেই চলছেন!! তারা আপনাদের কাছে আমানত।