আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

وَاٰتَیۡنٰہُ الۡحِکۡمَۃَ وَ فَصۡلَ الۡخِطَابِ
‘আমি তাকে দান করেছি প্রজ্ঞা ও মীমাংসাকারী বাগ্মিতা।’ 

আল-খিতাবাহ বা ভাষণ: (خطب یخطب خطابة وخطبة فھو خطیب والمفعول مخطوب) এর উৎপত্তি ও আভিধানিক অর্থ: ‘ভাষণ’ বা ‘খিতাবাহ’। আরবি পরিভাষায় ‘খিতাবাহ’ বলা হয় এমন বক্তব্যকে, যা জনসম্মুখে পেশ করা হয়। অথবা তা বলা হয় এমন কথাকে, যা বক্তা মানুষকে জানানো ও পরিতুষ্ট করার উদ্দেশ্যে মানুষের সামনে পেশ করে। ‘বক্তৃতা’ বা ‘ভাষণ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র। শ্রোতাদের মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে। জনগণের মস্তিষ্ককে পরিতুষ্ট ও আশ্বস্ত করতে এবং তাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য এটাই প্রধান মাধ্যম।

প্রাচ্য থেকে দু’জন লোক আসল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট। তারা এমন ফুঁ ফোটানো ভাষণ দিল যে, লোকজন মন্ত্রের ন্যায় মুগ্ধ হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: নিশ্চয় কিছু বক্তৃতা জাদু। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.)

একারণে নেতাদের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন লোকজনকে তার আশপাশে ভেড়ানোর। আর এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন জনগণ তার কাজ ও কথাবার্তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখবে। তখনই তিনি তাদেরকে নিয়ে যেতে পারবেন আল্লাহর শাসনের দিকে। যেমনভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর জীবনে বক্তৃতা বা ভাষণের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি তাঁর নবী মূসা (আ.)- এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: 

قَالَ رَبِّ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونِ . وَيَضِيقُ صَدْرِي وَلَا يَنْطَلِقُ لِسَانِي فَأَرْسِلْ إِلَى هَارُونَ
‘মূসা বলল: হে আমার প্রতিপালক! আমার আশঙ্কা, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে। আমার অন্তর সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে এবং আমার জিহ্বা সাবলীল চলে না। সুতরাং হারুনের কাছেই নবুওয়াতের বার্তা পাঠান।’ (শুআরা: ১২-১৩)
 

তিনি আরও বলেন: 

وَأَخِي هَارُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّقُنِي إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونِ
‘আমার ভাই হারুনের জবান আমার অপেক্ষা বেশি স্পষ্ট। আমার সঙ্গে আমার সাহায্যকারীরূপে তাকেও পাঠিয়ে দিন। যাতে সে আমার সমর্থন করে। আমার আশঙ্কা তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।’ (কাসাস: ৩৪)

আল্লামা ইবনে সা‘দী রাহি. বলেন: তার জবানে জড়তা ছিল, তার কথা ভালোভাবে বোঝা যেত না। এজন্য তিনি আল্লাহর নিকট দু‘আ করেন, যেন আল্লাহ তার জড়তা দূর করে দেন, যাতে মানুষ তার কথা বুঝতে পারে। ফলে বক্তৃতা ও ভাষণের পরিপূর্ণ ফায়দা অর্জিত হয়। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

قَالَ قَدْ أُوتِيتَ سُؤْلَكَ يَا مُوسَى
‘আল্লাহ বললেন, হে মূসা! তুমি যা কিছু চেয়েছ, তা তোমাকে দেওয়া হলো।’
তুমি যা কিছু চেয়েছ, তা তোমাকে দেওয়া হলো।’ 

সুতরাং মুখের বক্তৃতা হলো আল্লাহ সুবহানাহুর দিকে আহ্বানের জন্য প্রথম মাধ্যম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
‘আমি যখনই কোনো রাসূল পাঠিয়েছি, তাকে তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের সামনে সত্যকে সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরতে পারে।’

যেহেতু নবীদেরকে পাঠানো হতো তাদের স্ব-স্ব কওমের ভাষাভাষী করে। যাতে তাদের নিকট হককে স্পষ্ট করতে পারেন এবং স্পষ্ট কথামালা ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনার দ্বারা তাদের ওপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। আর তা কেবল সফল ও উন্নত ভাষণের মাধ্যমে সম্ভব। যেমন নবী মূসা (আ.) দ্বীনি ও রাজনৈতিক ভাষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। একারণে স্বীয় রবের নিকট আবেদন করেছেন, যেন তিনি তার বক্ষ খুলে দেন এবং জবানের জড়তা দূর করে দেন। তারপরে তার সাথে তার ভাই হারুনকেও নবী করে প্রেরণ করলেন। কারণ তিনি তার থেকে অধিক স্পষ্টভাষী ছিলেন। ফলে আল্লাহ তার আবেদন মঞ্জুর করেন। 

আমাদের রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও এমন অনেক ঘটনা পাওয়া যায়, যা এই বিষয়টি গুরুত্ব প্রমাণ করে। সম্ভবত বনু তামীমের প্রতিনিধি দলের আগমনের ঘটনায় ইসলামি দাওয়াতের ক্ষেত্রে বক্তৃতার মহা ফলাফলের স্পষ্ট চিত্র রয়েছে। মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণ তাদের কিতাবসমূহে ঘটনাটি উল্লেখ করেন। ব্যাপকভবে প্রতিনিধি দল আগমনের বছর বনু তামীমের প্রতিনিধি দলও মদিনায় আসল। তারপরে তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তাদের দিকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানাল। নিম্নোক্ত আয়াতে তাদের কথাই বলা হয়েছে,

إِنَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِنْ وَرَاءِ الْحُجُرَاتِ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ
‘(হে রাসূল!) তোমাকে যারা কামরার বাইরে থেকে ডাকে, তাদের অধিকাংশেরই বুদ্ধি নেই।’ (হুজুরাত: ৪)
 থেকে ডাকে, তাদের অধিকাংশেরই বুদ্ধি নেই।’ (হুজুরাত: ৪)

তিনি তাদের দিকে বেরিয়ে আসলে তারা বলল: আমরা এসেছি আমাদের বক্তা ও কবির মাধ্যমে আপনার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা করার জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমি কবিতা দিয়ে প্রেরিত হইনি। আর আমাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও আদেশ করা হয়নি; তবে আপনারা আসুন।

তখন যাবারকান ইবনে বদর জনৈক যুবককে বলল: তুমি গর্ব করতে থাক এবং তোমার কওমের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা কর। তখন সে বলতে লাগল: সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদেরকে সমস্ত সৃষ্টির সেরা বানিয়ে ফেলেছেন এবং আমাদেরকে দিয়েছেন অঢেল সম্পদ, যার মাধ্যমে আমরা যাচ্ছি করি। তাই আমরা হলাম ভূ-পৃষ্ঠে সর্বশ্রেষ্ঠ। সর্বাধক জনসংখ্যা, সম্পদ ও অস্ত্রের অধিকারী। তাই যে আমাদের বিরোধিতা করে, সে আমাদের কথা থেকে উত্তম কথা নিয়ে আসুক বা এমন কোনো কীর্তি প্রকাশ করুক, যা আমাদের কীর্তি থেকে উত্তম।

তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তার বক্তা সাবিত ইবনে কাইস ইবনে শাম্মাসকে বললেন: তুমি দাঁড়াও, তার জবাব দাও! সাবিত ইবনে কায়েস বলতে লাগলেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমি তাঁর প্রশংসা বর্ণনা করছি এবং তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করছি, তাঁর ওপর ভরসা করছি এবং সাক্ষী দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আর সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল।’ 

তিনি মুহাজিরদের মধ্য থেকে তাঁর চাচাত ভাইদেরকে ডাকলেন, যারা ছিলেন সর্বোত্তম চেহারা ও সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী। তারা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে বলতে লাগলেন:

‘সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের সাহায্যকারী, তাঁর রাসূলের সহকারী এবং তাঁর দ্বীনের সম্মান প্রতিষ্ঠাকারী বানিয়েছেন। তাই আমরা মানুষের সাথে যুদ্ধ করি, যতক্ষণ না তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। সুতরাং যে তা বলে নিল, সে নিজের প্রাণ ও সম্পদ নিরাপদ করে নিল। আর যে তা অস্বীকার করে, আমরা তাকে হত্যা করি। আর তার দায়ভার আমাদের ওপর হালকা। আমি আমার এই কথা বলছি আর তার সাথে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি মুমিন নর-নারীর জন্য।’

তারপর তাদের কবি দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করল। হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) তার জবাব দিলেন। তখন প্রতিনিধি দলের সর্দার আকরা ইবনে হাবেস বলল: আল্লাহর কসম! আমি জানি না, এটা কী জিনিস? আমাদের বক্তা কথা বলল, কিন্তু দেখলাম, তাদের বক্তার কথাই শ্রেষ্ঠ। আমাদের কবি কবিতা আবৃত্তি করল, কিন্তু দেখলাম তাদের কবিই শ্রেষ্ঠ আবৃত্তিকার ও উত্তম কথা রচনাকারী। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকটবর্তী হয়ে বলল: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। 

উক্ত প্রতিনিধি দলের ইসলাম গ্রহণে এই ভাষণেরই প্রভাব ছিল। তবে ভাষণের মধ্যে কিছু শর্ত ও পছন্দনীয় বিষয় আছে, যেগুলো নেতাকে রক্ষা করে চলতে হবে। সেগুলো হলো:

১. শব্দ চয়ন করবে যত্ন সহকারে। যথাসম্ভব, তার মনে যেসব বিষয়গুলো উদিত হয়, তার আলোকেই শব্দ ব্যবহার করবে। আর বক্তা সর্বাধিক সত্যনিষ্ঠ ও নিষ্ঠাবান হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কারণ যা অন্তর থেকে বের হয়, তা-ই অন্তরে পৌঁছায়। আর এরজন্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে তাকে সম্মানিতও করা হয়। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তার হৃদয় খুলে দেন। বহু বিষয় তার সামনে অবৈধ্যভাবে আসতে থাকে, শব্দের ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতে থাকে। যেমনটা ইমাম জাহেয (রাহি.) বলেছেন। 

২. যথাসম্ভব বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করা। কারণ মানুষ অধিক কথায় বিরক্তি বোধ করে। ইমাম মুসলিম (রাহি.) ওয়াসিল ইবনে হাইয়ান থেকে বর্ণনা করেন: আম্মার আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। তিনি খুব সংক্ষিপ্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ দিলেন। তিনি যখন নামলেন, তখন আমরা বললাম: হে আবুল ইয়াকুব! আপনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়েছেন। আপনি যদি আরেকটু দীর্ঘ করতেন! তখন তিনি বললেন: আমি রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি: নিশ্চয় কারো নামায দীর্ঘ হওয়া আর বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত হওয়া তার বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ। তাই তোমরা নামায দীর্ঘ কর আর বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত কর। নিশ্চয় কিছু বক্তৃতা জাদু। 

৩. এমন রহস্যময় বিষয়াবলি পরিহার করা, যা মানুষ বোঝে না। আলী (রা.) বলেন: মানুষ যে সকল বিষয় বুঝবে, এমন বিষয়ই তাদের নিকট বর্ণনা কর। তোমরা কি চাও, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হোক? (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রাহি.)

ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: তুমি মানুষকে এমন কথা বলবে না, যার পর্যন্ত তাদের জ্ঞান পৌঁছবে না। অন্যথায় এটা তাদের কারোর জন্য ফিতনার কারণ হবে। (বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিম রহ.) 

৪. উচ্চ বিবেচনার সাথে শব্দ চয়ন করা। যাতে অর্থের চেয়ে বেশি কোনো কথা এসে না যায়, ফলে প্রত্যেকে নিজ খেয়াল খুশি মত তার ব্যাখ্যা করতে পারে।

এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করছি, যা ভাষণের মধ্যে নেতাকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে আদর্শগত ও রাজনৈতিক এবং অপরটি হচ্ছে সামরিক ও জিহাদী। 

প্রথমত: আদর্শগত ও রাজনৈতিক (দিকনির্দেশনামূলক)  

এই ভাষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বৈশিষ্ট্যটি নেতার মধ্যে থাকবে, তা হচ্ছে, প্রথম যুগের দিকে ফেরা। নবী-রাসূলগণের নিয়ে আসা প্রকৃত তাওহীদকে স্পষ্ট করা, সৃষ্টি, প্রতিপালন, উপাসনা, পূর্ণাঙ্গতার গুণাবলি, পরাক্রম, রাজত্ব, শাসন, আনুগত্য, গাম্ভীর্য, প্রভাব, ভয়, আদেশ, সৃষ্টি ও বান্দাদের ওপর কর্তৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে আল্লাহর একত্ব প্রকাশ করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের ভাষণের দিকে লক্ষ্য রাখা। যেহেতু বর্তমানে সমস্ত মানব সমাজে শিরক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

নিশ্চয় ইসলাম এসেছে রাজা-বাদশাহদের প্রভুত্ব এবং মানুষের নীতিকে অকার্যকর করার জন্য, মানুষের জন্য সরল ও সহজ দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং সৃষ্টি, রাজত্ব, প্রভুত্ব, নেতৃত্ব, শাসন, আনুগত্য ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ব বাস্তবায়নের জন্য। সম্ভবত আমাদের যামানায় সর্বজন পরিচিত শিরকের নমুনা হলো: শাসনকর্তৃত্বের শিরক, আনুগত্যের শিরক, বিধান প্রণয়নের শিরক, ইবাদতের শিরক ও রাজত্বের শিরক।

নেতাকে তার উত্তম ভাষণের মাধ্যমে এই আদর্শগত বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। কারণ উম্মাহর মাঝে পরস্পরাগতভাবে এমন কতক ধারণা চলে এসেছে, যেগুলো তারা স্থিরনীতি মনে করছে। ফলে এই ধারণা তাদেরকে অনেক দ্বীনি ও দুনিয়াবি কল্যাণের পথে এগোতে বাধা দিচ্ছে। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি ধারণা হলো: ‘শাসকের জন্য উম্মাহর কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয়ে ব্যাপক কর্তৃত্ব চর্চার অধিকার রয়েছে। যদিও তা উম্মাহর দ্বীনি বিষয়েই হোক না কেন’। শুধু এ বিষয়টির ব্যাপারে বিশেষ করে একটি শরীয়ত মূলনীতি রয়েছে, তা হচ্ছে: ‘মানুষের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ স্বাধীন’। 

আর ইসলামে মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি দাবি করা হয়, তা হচ্ছে: ‘উম্মাহর অধিকার রয়েছে শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা’। এটা নববী রাজনৈতিক ভাষণেরই একটি অন্যতম মূলনীতি। যেমন বাইআতের চুক্তির মধ্যে থাকি, ‘আমরা যেখানেই থাকি, হকের সাথে থাকব আর আল্লাহর ব্যাপারে ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনা ভয় করব না’। 

সুতরাং উম্মাহই নেতাদের জবাবদিহিতা করায়। তাই নেতার আনুগত্য নিঃশর্ত নয় বা তার সত্তার জন্যও নয়; বরং নেতা নিয়োগের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার বাস্তবায়ন করা। আর নেতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, শরীয়তের মূলনীতি ও বিবেচ্য নীতিমালার আলোকে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা। এসব মূলনীতি এখানে উল্লেখ করার সুযোগ নেই। তবে যেমনটা পূর্বেও বলেছি, নেতার অবশ্যই এ ব্যাপারে ব্যুৎপত্তি থাকতে হবে, অতঃপর তিনি স্বীয় ভাষণে এগুলো তুলে ধরবেন।

দ্বিতীয়ত: জিহাদী বা সামরিক ভাষণ 

এই ভাষণে শাসক লক্ষ্য রাখবেন, জিহাদের মূল লক্ষ্যের প্রতি, তা যেন শুধু পারস্পরিক লড়াইয়ের জন্য, গনীমত অর্জনের জন্য, নারী বন্দী লাভের জন্য বা অনেক মানুষকে গোলাম বানানোর জন্য না হয়; বরং জিহাদ হবে বান্দাদেরকে বান্দাদের রবের বান্দায় পরিণত করার জন্য এবং তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে অর্থাৎ শিরক ও কুফরির অন্ধকার থেকে তাওহীদের আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য। তাকে তার উক্ত ভাষণে জিহাদের উদ্দেশ্যবলি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে হবে। আর তা হলো: দেশ ও জনগণের ওপর সীমালঙ্ঘন প্রতিরোধ করা, পৃথিবীর অসহায়দের সাহায্যের জন্য লড়াই করা, সম্পূর্ণ দ্বীন শুধু আল্লাহর জন্য হওয়ার জন্য যুদ্ধ করা।

তাকে তার ভাষণে এ কথাটি অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে যে, জিহাদের মধ্যে যদিও জানের কষ্ট এবং মাল বিসর্জন দিতে হয়, যা মানবিক স্বভাবত: মন অপছন্দ করে, তথাপি তাতে যে সামগ্রিক লাভ এবং মানব সমাজ টিকে থাকার অত্যাবশ্যকীয় উপাদানসমূহ রয়েছে, তার কারণে তার পুরোটাই কল্যাণকর। আর কোনো যুদ্ধই মানব সমাজ এমন সব দ্বীনের শত্রু এবং অপরাধের প্রধানদের থেকে মুক্ত ছিল না, যারা জনগণকে নির্যাতন করে, শাস্তি দেয়, বিপদাপদের সম্মুখীন করে। আর শাসককে তার এই দৃষ্টিভঙ্গি কার্যত: বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই তিনি থাকবেন মুজাহিদদের সারিগুলোর অগ্রভাগে। আর এটা ব্যাপকভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের আমল হিসেবেও বর্ণিত। প্রজা ও সৈন্যদের অন্তরে এই ভাষণের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তাই এটা গুরুত্বের শীর্ষে। বিশেষ করে শত্রুর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধের সময়।  

উদাহরণস্বরূপ: মুতার যুদ্ধে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)- এর ভাষণের কথা স্মরণ করুন। মুসলমান ছিল তিন হাজার। আর তাদের নিকট সংবাদ পৌঁছেছে, হিরাক্লিয়াস এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে, আর তার সঙ্গে আরব খ্রিষ্টানদেরও পঞ্চাশ হাজার যুক্ত হয়েছে। তখন কিছু সংখ্যক মুসলিম বলল: আমরা শত্রুর সংখ্যার ব্যাপারে অবগত করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে পত্র লিখি। তারপরে তিনি আমাদেরকে যেটা আদেশ করেন, আমরা সেটুকুই করব। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন: ‘হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর কসম! তোমরা যেটির অন্বেষায় বেরিয়ে এসেছ, সেটিকে অপছন্দ করছো। নিশ্চয় তা হলো শাহাদাত। আমরা তো সংখ্যা, শক্তি বা আধিক্যের বলে যুদ্ধ করি না। আমরা তো এই দ্বীনের বলে যুদ্ধ করি, যার দ্বারা আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তাই তোমরা চলতে থাক। পরিণাম তো দু’টি কল্যাণের যেকোনো একটিই। হয়তো বিজয় নয়ত শাহাদাত’। তখন সকলে বলে উঠল, আল্লাহর কসম! ইবনে রাওয়াহা সত্য বলেছে। (তারিখে তাবারি)

নিশ্চয় নেতৃত্বশূন্যতাই উম্মাহর শত্রুদেরকে আমাদের শাসকদের পেছনে পড়ার ও তাদের সুনাম নষ্ট করার সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও ঐ সমস্ত শাসকরাও তাদের ছোট-বড় বিভিন্ন ভুলের দ্বারা নিজেদের বিরুদ্ধে শত্রুদের জন্য দলিল করে দিয়েছে, যার ফলে তারা তাদের সুনাম নষ্ট করতে পেরেছে এবং তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিতে পেরেছে। সেসব এখানে সেসব আলোচনা করার অবকাশ নেই। তাদের হত্যা ও গ্রেফতারই অনেক অজ্ঞ লোকদেরকে মুজাহিদদের কাতারসমূহে ঢুকতে জিহাদকে তার সেই প্রকৃত অর্থ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যা দিয়ে মুহাম্মাদ (সা.)-কে প্রেরণ করা হয়েছে। আমি একাধিক স্থানে এ কথাটি উল্লেখ করেছি।