فَبِمَا رَحۡمَۃٍ مِّنَ اللّٰہِ لِنۡتَ لَہُمۡ ۚ وَلَوۡ کُنۡتَ فَظًّا غَلِیۡظَ الۡقَلۡبِ لَانۡفَضُّوۡا مِنۡ حَوۡلِکَ ۪ فَاعۡفُ عَنۡہُمۡ وَاسۡتَغۡفِرۡ لَہُمۡ وَشَاوِرۡہُمۡ فِی الۡاَمۡرِ ۚ فَاِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَوَکِّلِیۡن
(হে নবী!) তারপর আল্লাহর রহমতই ছিল, যার দরুন তুমি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করেছ। তুমি যদি রূঢ় প্রকৃতির ও কঠোর হৃদয় হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে বিক্ষিপ্ত হয়ে যেত। সুতরাং তাদের ক্ষমা কর, তাদের জন্য মাগফিরাতের দু’আ কর এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করতে থাক। অতঃপর তুমি যখন কোনো বিষয়ে মন স্থির করবে, তখন আল্লাহর ওপর নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন। (আলে ইমরান: ১৫৯)
‘শূরা’ এর আভিধানিক অর্থ পরামর্শ করা। যেমন যখন সকলে একটি বিষয়ে পরামর্শ করে, তখন বলা হয়- ھذاالأمر صار القوم بین شوري (এই বিষয়টি সকলের পরামর্শক্রমে সম্পন্ন হয়েছে।) অর্থাৎ তাদের মনে যা যা উদয় হয়েছে, তারা তার ব্যাপারে পরস্পরে পরামর্শ করেছে, এতে তাড়াহুড়ো করেনি।আর পরিভাষাগত তাৎপর্য হচ্ছে, এটা ইসলামি শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি। যে সকল বিষয় জীবনযাপন ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট; ওহী, শরীয়ত বা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত কোনো বিধানের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, তার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা পরামর্শ করার আদেশ দিয়েছেন। একজন মুসলিম নেতার জীবনে শূরা বা পরামর্শ একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমাজ, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনার ক্ষেত্রে এটাই ইসলামের নীতি। আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় কিতাবে এটা বিধিবদ্ধ করেছেন এবং তাঁর নবীকে দু’বার এর ব্যাপারে আদেশ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা নিম্নোক্ত আয়াতে বলেন:
وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُون
‘এবং যারা তাদের রবের ডাকে সাড়া দেয়, নামায কায়েম করে, তাদের কার্যবিধি সম্পন্ন হয় নিজেদের মাঝে পরামর্শক্রমে এবং সেই রিযিক হতে খরচ করে, যা আমি তাদেরকে দিয়েছি।’ (শুরা: ৩৮)
ইমাম শাফেঈ রাহি. বলেন: আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আমি কখনো এমন কাউকে দেখিনি, যে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর চেয়ে অধিক নিজ সাথীদের সাথে পরামর্শ করে।’ এটা একই সাথে নেতা ও উম্মাহর জন্য পরামর্শের গুরুত্ব প্রমাণ করে।আমি এধরণের কয়েকটি গুরুত্বের কথা আলোচনা করার চেষ্টা করব, যা আল্লাহ আমার মনে ঢেলে দিয়েছেন:
১. একক রায়ের ফলে যে অহংকার, আত্মগর্ব ও আত্মপ্রবঞ্চনা সৃষ্টি হয়ে থাকে, শূরা বা পরামর্শ নেতাকে তার থেকে রক্ষা করে। একক সিদ্ধান্ত প্রদানকারী আত্মগর্বী হয়ে থাকে। সে ধারণা করে, আল্লাহ তা‘আলা সকল মুমিনদের মধ্য থেকে তাকে নির্বাচিত করেছেন স্বীয় হিদায়াত ও সঠিক রায়ের জন্য। সে-ই আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত আর অন্যরা বঞ্চিত। আর এটা, আল্লাহর কসম! ধ্বংসাত্মক।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘তিনটি জিনিস ধ্বংসাত্মক: তার মধ্যে একটি তিনি উল্লেখ করেছেন: কোনো ব্যক্তির নিজের রায় নিয়ে তুষ্ট বা আত্মতৃপ্ত হওয়া।’ (ইমাম বাযযার রাহি. তার মুসনাদ থেকে এটি বর্ণনা করেছেন)
আর উম্মাহর ওপর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও অনুরূপ মন্দ। কারণ এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক যে কাজটি করা হয়, তা হয় বরকতশূন্য। কিন্তু এর বিপরীতে যদি পরামর্শ নিয়ে করা হয়, তাহলে আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন।২. তার প্রতি প্রজাদের ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হওয়া থেকে রক্ষা করে। কারণ নেতার একক সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার ফলে মুসলমানদের অন্তর থেকে এই উম্মাহকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুভূতি চলে যায়। ফলে তাদের ওপর যে অনিষ্ঠ ও আশঙ্কা আপতিত হয়, তারা তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না। কারণ তাদের তো কোনো কর্তৃত্ব নেই। ফলে এটা তার ও মুসলিম জামা‘আতের দুর্বলতার কারণ হয়। আর এর বিপরীতে রয়েছে শক্তি, সাহায্য, ও সঠিক দিকনির্দেশনা। কারণ পরামর্শ জাতি ও সমাজকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়। সকলের মন ও চেষ্টা এক হয়। সৎ ও তাকওয়ার কাজে এবং আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি আনিল মুনকারের কাজে পরস্পরের সহযোগিতা হয়।
৩. কখনো একক রায়ের কারণে নেতাকে গুনাহর ভার বহন করতে হয়, যদি সত্য থাকে তার কথার বিপরীতে। যদিও তার নিয়ত ছিল নেক।
৪. পরামর্শ স্বেচ্ছাচারিতা, জুলুম ও মানুষের প্রতি অবজ্ঞা করা থেকে বিরত রাখে। আর এই শেষোক্তটিই ছিল ফেরাউনদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
فَاسْتَخَفَّ قَوْمَهُ فَأَطَاعُوهُ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِين
‘এভাবে সে নিজ সম্প্রদায়কে বেকুব বানাল এবং তারাও তার কথা মেনে নিল। প্রকৃতপক্ষে তারা সকলে ছিল পাপিষ্ঠ সম্প্রদায়।’ (যুখরুফ: ৫৪)
আর শান্তিকামীরা মানুষকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে, যেভাবে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন। একারণেই নেতার জন্য পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ওয়াজিব। তবে যে ব্যাপারে অকাট্য অর্থবোধক ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত শরীয়ত বর্ণনা রয়েছে, সেগুলো ছাড়া। কারণ সেগুলোর ব্যাপারে শাসককেই দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছে।
শূরার বাস্তবতা ও গুরুত্বের ব্যাপারে হযরত উমর (রা.) থেকে পূর্ণাঙ্গ ও তাৎপর্যবহ উক্তি বর্ণিত আছে। তার ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম ভাষণে বলেন:
‘জেনে রাখুন, নিশ্চয় আল্লাহ আমার মাধ্যমে আপনাদেরকে পরীক্ষায় ফেলেছেন এবং আপনাদের মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন। তাই জেনে রাখুন, আপনাদের অংশগ্রহণ ব্যতীত আমি একা এই দায়িত্ব বহন করতে পারব না। তাই আপনারা আল্লাহর নিকট আমার জন্য একটি প্রমাণ হবেন। আমি বলতে চাচ্ছি, খিলাফতের যেসকল বিষয়ে আমি পরামর্শ করতে আদিষ্ট, নিশ্চয় আমি সে সকল বিষয়ে আপনাদের সাথে পরামর্শ করেছি। আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন। আসমানের বিষয়াদী নিয়ে তাঁর নিকট ওহী অবতীর্ণ হতো, যে ওহীর মাঝে সামনে পিছনে কোনো দিক হতে বাতিল অনুপ্রবেশের সুযোগ ছিল না, এতৎসত্ত্বেও আল্লাহ তাঁর রাসূলকে পরামর্শ করতে আদেশ করেছেন। অথচ তাকে ওহীর মাধ্যমে সাহায্য করা হতো। তাহলে আমাদের জন্য তা কত প্রয়োজন। আমাদের তো কোনো নিষ্পাপত্ব নেই, যেমনটা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ছিল। আমরা মানুষ, আমরা আমাদের চিন্তা দিয়ে মতামত পেশ করি, তাতে কখনো ভুল করি, কখনো সঠিক করি।’
কোনো ব্যক্তি যখন একক সিদ্ধান্ত দিয়ে ভুল করে আর সব মানুষ তার ওপর ক্ষেপে ওঠে এবং বিপদাপদ তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, তখন এটা তার জন্য ও মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক হয়। পক্ষান্তরে যখন পুরো জামা‘আত মিলে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, অতঃপর সিদ্ধান্তটি ভুল প্রমাণিত হয়, তখন দলীয়ভাবে সকলে পূর্বমত থেকে ফিরে আসবে। কোনো একজন অভিযুক্ত হওয়া থেকে মুক্ত থাকবে। ফলে এটা জামা‘আতের জন্য ও শাসকের জন্য অধিক নিরাপদ হয়।
যে বিষয় পরামর্শ ছাড়া একজনের পক্ষ থেকে আবশ্যক করে দেওয়া হয়, তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। একক রায় হচ্ছে পুরনো সুতার ন্যায়, যা ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর দু’জনের রায় হচ্ছে দু’টি মজবুত সুতার ন্যায় আর তিনজনের রায় এমন একটি রশির ন্যায়, যা ছেঁড়া প্রায় অসম্ভব।নেতার উচিত এই পরামর্শের জন্য এমন লোকদেরকে নির্বাচিত করা, যারা ইলম, তাকওয়া, সততা ও সৎসাহসের ব্যাপারে পরিচিত। যাদের মেধা প্রখর, পক্ষপাতিত্ব ও কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত। তাই এ বৈশিষ্ট্য বহির্ভূত কাউকে পরামর্শের জন্য নির্ধারণ করবে না। এভাবেই তিনি মুসলমানদের বিশেষ কোনো দলের সদস্যদেরকে অন্যদের ওপর প্রাধান্য দেবেন না। কারণ সবাই জানেন, এই সমস্যার কারণে আমাদের জাতির অবস্থা কতটা বিভক্ত ও বিচ্ছিন্নতার দিকে গিয়েছে! কত মতের প্রাধান্যতা সৃষ্টি হয়েছে! সুতরাং দূরদর্শী নেতা তিনিই, যিনি প্রত্যেক জামা‘আত থেকে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের লোকদেরকে নির্বাচিত করেন। এভাবেই সাধারণ মুসলমানদের থেকেও নির্বাচিত করেন। যাতে সকলে মিলে এমন একটি মতের দিকে যেতে পারেন, যাতে আল্লাহর সাহায্য ও দিকনির্দেশনা থাকে। কোনো মুসলমান তার বিরোধিতা না করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাঝে যুদ্ধ-সন্ধির অনেক ঘটনায় পরামর্শের আদর্শ রেখে গেছেন। তার এ জাতীয় ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. বদর যুদ্ধে শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়া এবং অবস্থান গ্রহণ করার স্থান নির্বাচন করার বিষয়ে স্বীয় সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করা। তখন তিনি এই প্রসিদ্ধ উক্তিটি করেছিলেন: ‘হে লোক সকল! আমাকে পরামর্শ দাও।’
অতঃপর তিনি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন মুশরিকদের আগে বদরের পানি দখল করার জন্য এবং মুশরিকরা যাতে তাতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে না ফেলে। তিনি বদরের পানির সবচেয়ে নিকটবর্তী স্থানে অবস্থান গ্রহণ করলেন। এখানে এসে হুবাব ইবনুল মুনযির (রা.) একজন সমরবিশেষজ্ঞের ন্যায় দাঁড়িয়ে বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই স্থানটি কি আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, নাকি একটি মত ও কৌশল মাত্র?’
রাসূল (সা.) বললেন: ‘বরং একটি মত ও কৌশল মাত্র।’ তখন হুবাব (রা.) বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! এটা উপযুক্ত স্থান নয়। সকলকে নিয়ে চলুন, আমরা মুশরিক বাহিনীর দিক থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী পানির স্থানে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করি। তাহলে আমরা সেখানে অবস্থান গ্রহণ করে অন্যান্য কূপগুলো থেকে তার পানি বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারি। আর আমরা সেখানে একটি হাউজ খনন করে তাতে পানি ভরে রাখব। অতঃপর শত্রুর সাথে যুদ্ধ করলে আমরা পানি পাব আর তারা পানি পাবে না।’
তখন রাসূল (সা.) বললেন: ‘তুমি একটি সুন্দর পরামর্শ দিয়েছ।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) হুবাবের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করলেন। সৈন্য বাহিনী নিয়ে সেখান থেকে উঠে শত্রুদের থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী পানির নিকট অবস্থান গ্রহণ করলেন। অতঃপর সেখানে একটি কূপ খনন করে অন্যান্য সকল কূপগুলো পানিশূন্য করে দিলেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
২. বদরের বন্দীদের ব্যাপারে সাহাবাদের সাথে পরামর্শ। ইমাম মুসলিম রাহি. হযরত উমর (রা.) থেকে বদর যুদ্ধের ঘটনা প্রসঙ্গে একটি হাদিস বর্ণনা করেন। তাতে রয়েছে: রাসূল (সা.) আবু বকর, আলী ও উমর (রা.) দের থেকে পরামর্শ চাইলেন। আবু বকর (রা.) পরামর্শ দিলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! এরা আমাদেরই ভাই, চাচা ও আত্মীয়-স্বজন। আমি মনে করি, এদের থেকে মুক্তিপণ নিয়ে এদেরকে ছেড়ে দেওয়া হোক। তাহলে এদের থেকে যা পাবে, সেটা কাফিরদের বিরুদ্ধে একটি শক্তি হবে আর অতিসত্ত্বর এদেরকেও আল্লাহ হিদায়াত দিতে পারেন, তাহলে তারাও আমাদের শক্তি হয়ে যাবে।’
তারপরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘হে উমর তোমার মত কি?’ তিনি বললেন: ‘আমি বলি, আল্লাহর কসম! আবু বকর যা মনে করেন, আমি তা মনে করি না। বরং আমার মত হচ্ছে, আমাকে সুযোগ দিন, আমি অমুকের (উমর (রা.) এর জনৈক নিকটাত্মীয়) গর্দান উড়িয়ে দেই। আর আলীকে সুযোগ দিন, সে আকীলের গর্দান উড়িয়ে দেক। যাতে আল্লাহ জেনে যান যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের ব্যাপারে কোনো নমনীয়তা নেই। আর এরা হচ্ছে মুশরিকদের নেতা ও প্রধান।’
রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকর (রা.) এর কথার দিকে ধাবিত হলেন। আমার কথার প্রতি ধাবিত হলেন না। তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করলেন। অতঃপর যখন পরবর্তী দিন আসল, (উমর (রা.) বলেন:) ‘পরের দিন সকাল বেলা আমি রাসূল (সা.) ও আবু বকরের নিকট গেলাম। তারা কাঁদছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কি কারণে আপনি এবং আপনার সাথী ক্রন্দন করছেন? যদি আমারও কান্না পায়, তাহলে আমিও কাঁদবো, অন্যথায় আপনাদের কান্নার কারণে আমিও কান্নার ভান করবো।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘তোমার সাথীরা আমার নিকট মুক্তিপণ গ্রহণের যে প্রস্তাব পেশ করেছে, তার কারণে তোমাদের শাস্তি এই বৃক্ষটিরও নিকটে এসে গিয়েছিল।’
আল্লাহ তা‘আলা আয়াত নাজিল করেছেন:
مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيم
‘কোন নবীর পক্ষে এটা শোভনীয় নয় যে, সে জমিনে যতক্ষণ পর্যন্ত শত্রুদের রক্ত ব্যাপকভাবে প্রবাহিত না করবে (যাতে তাদের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে খতম হয়ে যায়), ততক্ষণ পর্যন্ত তার কাছে কয়েদী থাকবে। তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা কর আর আল্লাহ তোমাদের জন্য আখেরাতের কল্যাণ চান। আল্লাহ পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়।’
৩. উহুদ যুদ্ধে তার সাহাবাদের সাথে পরামর্শ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: আল্লাহর কসম! আমি একটি উত্তম স্বপ্ন দেখেছি, আমি আমার তলোয়ারের মাথায় একটি ছিদ্র দেখতে পেলাম এবং আমি দেখতে পেলাম, আমি একটি মজবুত লৌহবর্মে আমার হাত প্রবেশ করিয়েছি। আমি তার ব্যাখ্যা করেছি, মদীনা। তাই তোমরা যদি চাও, তাহলে এটা করতে পারি যে, তোমরা মদীনাতেই থাকবে। আর তাদের কে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেবে, তারা যেখানে ইচ্ছা অবস্থান গ্রহণ করবে। তারা যদি সেখানে অবস্থান গ্রহণ করে, তবে সেটা তাদের জন্য হবে মন্দ অবস্থান। আর যদি তারা মদীনা প্রবেশ করে, তাহলে আমরা মদীনা থেকেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূলের মতামতও ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মতের অনুরূপ। সেও এ মত পোষণ করত এবং বেরিয়ে আসাকে ভালো মনে করেনি। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও বেরিয়ে আসা অপছন্দ করছিলেন। কিন্তু মুসলমানদের মধ্য থেকে যে সকল সাহাবীগণ বদর যুদ্ধে শরিক হতে পারেননি এবং পরে উহুদ ও অন্যান্য যুদ্ধগুলোতে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছিলেন, তারা বলে উঠলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে আমাদের শত্রুদের দিকে বেরিয়ে নিয়ে চলুন। যাতে তারা এই ধারণা না করে যে, আমরা কাপুরুষ ও দুর্বল হয়ে পড়েছি।’
তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল বলল: ‘হে আল্লাহর রাসূল! মদীনাতেই থাকুন, তাদের দিকে এগিয়ে যাবেন না। আল্লাহর কসম! যখনই আমরা আমাদের শত্রুদের দিকে বেরিয়ে গিয়েছি, তখনই আমাদের শত্রুরা আমাদের পরাজিত করেছে আর যখনই শত্রুরা মদীনা প্রবেশ করেছে, তখনই আমরা তাদের পরাজিত করেছি। তাই হে আল্লাহর রাসূল! তাদেরকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিন। তারা যদি সেখানে অবস্থান গ্রহণ করে, তবে সেটা হবে তাদের জন্য মন্দ অবস্থান আর যদি মদীনা প্রবেশ করে, তাহলে আমাদের পুরুষরা তাদের সাথে মুখোমুখি হয়ে লড়াই করবে আর নারী ও শিশুরা ওপর থেকে পাথর নিক্ষেপ করবে। আর যদি তারা ফিরে যায়, তাহলে যেভাবে এসেছে, সেভাবেই ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাবে।’
তখন যেসকল সাহাবীগণের আগ্রহ ছিল শত্রুর ওপর গিয়ে আক্রমণ করা, তারা বারংবার রাসূলুল্লাহ (সা.)- কে পীড়াপীড়ি করতে লাগল। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ ঘরে গিয়ে যুদ্ধের পোশাক পরিধান করলেন। সেটা ছিল জুমু’আর দিন জুমু’আর নামাযের পর। সেদিনই মালিক ইবনে আমীর নামে এক আনসারী সাহাবী মারা যান। রাসূলুল্লাহ (সা.) জানাজা নামায পড়ে জনসম্মুখে আসলেন। ইত্যবসরে লোকজন অনুতপ্ত হলো। তারা বলতে লাগল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বাধ্য করেছি। আমাদের জন্য এটা উচিত হয়নি। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন তাদের মাঝে গেলেন, তখন সকলে বলতে লাগল: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে বাধ্য করেছি। আমাদের জন্য এটা উচিত হয়নি। তাই আপনি ইচ্ছা করলে এখানে থাকতে পারেন।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘কোন নবীর জন্য যুদ্ধের পোশাক পরিধান করে ফেলার পর যুদ্ধ করার আগ পর্যন্ত তা খুলে ফেলা শোভনীয় নয়।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) ১ হাজার সাহাবী সমবিহারে বেরিয়ে পড়লেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
৪. খন্দক যুদ্ধে সাহাবাদের সাথে পরামর্শ। সালমান ফারসি (রা.) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা পারস্য দেশে ছিলাম। সেখানে আমরা অবরোধে পড়ে গেলে আমাদের চার পাশে পরিখা খনন করে নিতাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তার সাথে একমত হলেন এবং এই সিদ্ধান্তই গ্রহণ করলেন। মদীনার চার পাশে পরিখা খনন করতে আদেশ দিলেন। সাহাবাদের মাঝে কার্যবন্টন সম্পন্ন হল। অতঃপর অত্যন্ত হিম্মত ও সংকল্পের সাথে কাজ শুরু হল। যদিও তখন প্রচন্ড শীত ও খাদ্যাভাব ছিল। উপরন্তু অবরোধকারী শত্রুদের সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম, হযরত আবু বকর (রা.) কে খিলাফতের জন্য মনোনীত করার মাধ্যমে পরামর্শের তাৎপর্যকে আরো সুদৃঢ় করেন। কারণ কেবল জনগণেরই সকলের পরামর্শ ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে খলিফা নিয়োগ দেওয়ার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার হরণ করার অধিকার কারো নেই।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি কয়েকজন মুহাজিরকে পড়াতাম। তাদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবনে আউফও ছিলেন। একদা আমি মিনায় তার বাড়িতে ছিলাম আর তিনি তার সর্বশেষ হজ্জে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর সাথে অবস্থান করছেন। একবার আবদুর রহমান সেখান থেকে ফিরে এসে আমাকে বললেন: তুমি যদি দেখতে, এক ব্যক্তি আমীরুল মুমিনীনের নিকট এসে বলল: হে আমীরুল মুমিনীন! অমুককে আপনি কি বলবেন; সে বলছে, উমার মারা গেলে আমি অমুকের হাতে বায়আত গ্রহণ করবো। কারণ আবু বকরের বায়আত তো আকস্মিকই সম্পন্ন হয়েছিল। একথা শুনে উমার (রা.) ক্রোধান্বিত হলেন। তিনি বললেন: আমি ইন শা আল্লাহ বিকাল বেলা সকলের সামনে দাঁড়িয়ে সকলকে এসকল লোকেদের সম্পর্কে সতর্ক করবো, যারা মানুষের অধিকার হরণ করতে চায়।
আবদুর রহমান বলেন: তখন আমি বললাম: হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি এখন এমনটি করবেন না। কারণ এটা এমন একটি সময়, এখানে ইতর-ভদ্র বিভিন্ন শ্রেণীর অসংখ্য মানুষ একত্রিত হয়েছে। আপনি ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তারাই সবার আগে আপনার নিকটবর্তী হয়ে থাকবে। ফলে আমার আশঙ্কা হয়, আপনি দাঁড়িয়ে একটি কথা বলবেন, আর তারা সেটাকে আপনার থেকে নিয়ে সর্বত্র ছড়াবে। অথচ তা সঠিকভাবে স্মৃতিতে ধারণ করতে ও সঠিক স্থানে রাখতে পারবে না। তাই আপনি একটু অপেক্ষা করে মদীনায় গিয়ে তা বলুন। কারণ সেটা হিজরত ও সুন্নাহর দেশ। সেখানে বুদ্ধিমান ও সম্মানিত লোকেদের সাথে একান্তে কথা বলতে পারবেন। ফলে আপনি যা বলবেন, তা দৃঢ়ভাবে বলতে পারবেন আর জ্ঞানী-গুণীরা আপনার কথাকে সঠিকভাবে স্মৃতিতে ধারণ করে সঠিক স্থানে রাখবে।
উমর (রা.) বললেন: ইন শা আল্লাহ, মদীনার সর্বপ্রথম মজলিসেই আমি এ বিষয়ে কথা বলার জন্য দাঁড়াবো। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: অতঃপর যিলহজ্জ মাসের পরে আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলাম। তারপরে পরবর্তী জুমু’আর দিন সূর্য হেলে যাওয়ার সাথে সাথে আমি দ্রুত রওয়ানা দিলাম। সাঈদ ইবনে যায়দ ইবনে আমর ইবনে নাউফালকে দেখতে পেলাম মিম্বরের পিলারের নিকট বসে আছেন। আমিও তার পাশে এভাবেই বসলাম যে, আমার হাঁটু তার হাঁটু স্পর্শ করছে। ক্ষণিক পরেই দেখলাম, উমর ইবনুল খাত্তাব বেরিয়ে এসেছেন। তাকে আসতে দেখে আমি সাঈদ ইবনে যায়দ ইবনে আমর ইবনে নাউফালকে বললাম: আজ বিকালে তিনি এমন একটি কথা বলবেন, যা খলিফা হওয়ার পর তিনি কখনো বলেননি। সাঈদ প্রত্যাখ্যান করে বললেন: মনে হয় না, এমন কিছু বলবেন, যা পূর্বে কখনো বলেননি।
অতঃপর উমর (রা.) মিম্বরে বসলেন। মুয়াযযিনের আযান শেষ হওয়ার পর তিনি দাঁড়িয়ে আল্লাহর যথাযথ প্রশংসা করলেন। তারপরে বললেন: আজ আমি এমন একটি কথা বলবো, যা আমাকে বলতেই হবে। আমি জানি না, হয়তো এটা আমার মৃত্যুর পূর্বক্ষণ। তাই যে কথাটি বুঝে সঠিকভাবে স্মৃতিতে ধারণ করতে পারবে, সে এটা সর্বত্র প্রচার করতে পারে। আর যার না বোঝার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন কাউকে আমি আমার ওপর মিথ্যা আরোপের অনুমতি দিচ্ছি না। আমার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে, আপনাদের একজন বলেছে: ‘আল্লাহর কসম! যদি উমর মারা যায়, তাহলে আমি অমুকের হাতে বাই’আত গ্রহণ করবো। আমি বলে দিচ্ছি, উক্ত ব্যক্তি যেন এই ভেবে প্রতারিত না হয় যে, আবু বকর (রা.) এর বাই’আত তো আকস্মিক সংঘটিত হয়েছিল। কারণ সেটা যদিও এমন হয়েছিল, কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা তার অনিষ্টকে প্রতিহত করেছিলেন। আর আপনাদের কেউ এমন নেই, যার প্রতি সকলের গর্দান ততোটা নত হবে, আবু বকরের প্রতি সকলের গর্দান যতটা নত হয়েছিল।
যে ব্যক্তি সমস্ত মুসলমানদের সাথে পরামর্শ ব্যতীত কারো হাতে বাই’আত গ্রহণ করে, কেউ যেন উক্ত ব্যক্তির, বা সে যার হাতে বাই’আত গ্রহণ করেছে তার অনুসরণ না করে। কারণ তাদের উভয়কে হত্যা করার আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ যখন তাঁর নবীকে উঠিয়ে নিলেন, তখন আমাদের নিকট সংবাদ পৌঁছালো যে, আনসারগণ আমাদের বিরোধিতা করে সকলে সাকিফায়ে বনী সায়ীদাতে একত্রিত হয়েছে। আর আলী, যুবাইর ও তার সঙ্গীরা আমার বিরোধিতা করছে। আর মুহাজিরগণ সকলে আবু বকরের নিকট একত্রিত হয়েছে।
আমি আবু বকরকে বললাম, চলুন, আমরা আমাদের এসকল আনসার ভাইদের নিকট যাই। অতঃপর আমরা আনসারদের উদ্দেশ্যে চললাম। আমরা তাদের কাছাকাছি হওয়ার পর তাদের দু’জন নেককার লোকের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হলো। আমি দেখতে পেলাম সকল লোকজন আমাকে নিয়েই আলোচনা করছে। উক্ত ব্যক্তিদ্বয় আমাদেরকে বললেন: হে মুহাজির সম্প্রদায়! আপনারা কোন্ দিকে যাচ্ছেন? আমি বললাম, আমরা আমাদের এসকল আনসার ভাইদের নিকট যাচ্ছি। তারা বলল: আপনারা তাদের নিকট যাওয়ার পূর্বে প্রথমত নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হন। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাদের নিকট যাব। তারপরে আমরা এগুতে এগুতে সাকিফায়ে বনী সায়ীদাতে পৌঁছলাম। সেখানে সকলের মাঝে চাদর পরিহিত একজন লোককে দেখতে পেলাম। আমি বললাম, এই ব্যক্তি কে? তারা বলল: সা‘দ ইবনে উবাদা। আমি বললাম: তার কী হয়েছে? তারা বলল: জ্বর। তারপরে সকলে বসার পর তাদের বক্তা শাহাদাহ ও আল্লাহর যথাযথ প্রশংসা করার পর বলল: “আমরা আনসার, ইসলামের সৈন্যবাহিনী। আর আপনারা মুহাজিরের ক্ষুদ্র একটি দল। কিন্তু আপনাদের সম্প্রদায়ের কিছু লোক আমাদের ঐতিহ্য নষ্ট করে দিতে এবং আমাদের থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে এগিয়ে এসেছে”। সে যখন চুপ হলো, তখন আমি কথা বলার ইচ্ছা করলাম। আমি মনে মনে কিছু কথা সাজিয়েছিলাম, যা আবু বকরের সামনে উপস্থাপন করতে আমার আনন্দবোধ হচ্ছিল। আমি তার পক্ষ থেকে কিছু আক্রমণের জবাব প্রস্তুত করেছিলাম। কিন্তু আমি যখন কথা বলার ইচ্ছা করলাম, তখন আবু বকর বললেন: থাম! আমি তাকে ক্রোধান্বিত করতে চাইনি।
তিনি কথা বলা আরম্ভ করলেন। তিনি ছিলেন আমার চেয়ে অধিক সহনশীল ও গুরুগম্ভীর। আল্লাহর কসম! যে সাজানো গোছানো কথাগুলো আমার নিকট চমৎকার মনে হচ্ছিল, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সেই রূপ বা তার চেয়েও উৎকৃষ্টমানের কথা বললেন। তারপরে নীরব হলেন।
অতঃপর আবার বললেন: “তোমরা তোমাদের মধ্যকার যে কল্যাণের আলোচনা করছো, তোমরা তার যোগ্য বটে। কিন্তু এই খিলাফতের বিষয়টি একক মাত্র কুরাইশদের জন্যেই নির্ধারিত। তারাই বংশ মর্যাদা ও অবস্থানস্থলের দিক হতে আরবের সবচেয়ে মধ্যবর্তী ও শ্রেষ্ঠ। আমি তোমাদের জন্য এই দু’জনের যে কোনো একজনকে বাছাই করছি। তোমরা এদের যে কোনো একজনের হাতে বাই’আত করো। অতঃপর তিনি আমার ও আবু উবাইদাহর হাত ধরলেন। আর তিনি তখন আমাদের মাঝে বসা ছিলেন। তখন আমার নিকট তাঁর একথাটি সবচেয়ে অপছন্দ লাগলো।
আল্লাহর কসম! আমাকে যদি হত্যার জন্য পেশ করা হতো, অতঃপর আমার গর্দান এভাবেই উড়িয়ে দেওয়া হতো যে আমার কোনো গুনাহই আর অবশিষ্ট থাকতো না, তাহলেও এটা আমার নিকট সেই কওমের আমীর হওয়ার চেয়ে অধিক প্রিয় হতো, যাতে আবু বকর বিদ্যমান থাকেন। তবে যদি মৃত্যুর সময় আমার মনে এমন কোনো বিষয় এসে পড়ে, যা এখন আমার মনে নেই, তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। তখন জনৈক আনসারী বলল: আমি এর চূড়ান্ত সমাধান ও নিষ্পত্তি মূলক কথা বলি: হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমাদের থেকে একজন আমীর হবে, আর আপনাদের থেকে একজন আমীর হবে। সঙ্গে সঙ্গে হট্টগোল ও তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। এমনকি তা বিশৃঙ্খলায় রূপ নিল। তখন আমি বললাম: হে আবু বকর! আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলে আমি তার হাতে বাই’আত গ্রহণ করলাম। তারপরে সমস্ত মুহাজিরগণ এবং অতঃপর সমস্ত আনসারগণও তার হাতে বাই’আত গ্রহণ করলেন। আর আমরা সা‘দ ইবনে উবাদার ওপর চড়াও হলাম। একজন বলল: তোমরা সা‘দ ইবনে উবাদাকে হত্যা করে ফেলেছো। আমি বললাম: আল্লাহ সা‘দ ইবনে উবাদাকে হত্যা করেছে। উমর বললেন: আল্লাহর কসম! আমরা যে বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছি, তার মধ্যে আবু বকরের বাই’আত থেকে শক্তিশালী কিছু আমরা দেখিনি। আমরা আশঙ্কা করেছিলাম, লোকজন যদি আবু বকরের হাতে বাই’আত গ্রহণ না করত, তাহলে লোকজন কারো হাতে বাই’আত না করেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। ফলে হয়তো আমাদেরকে এমন কারো হাতে বায়আত গ্রহণ করতে হতো, যার ব্যাপারে আমরা সন্তুষ্ট থাকতাম না, অথবা তার বিরোধিতা করতাম, ফলে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতো।
সুতরাং যে ব্যক্তি মুসলমানদের সাথে পরামর্শ ব্যতীত কারো হাতে বাই’আত গ্রহণ করে, কেউ যেন উক্ত ব্যক্তির, বা সে যার হাতে বাই’আত গ্রহণ করেছে তার অনুসরণ না করে। কারণ তাদের উভয়কে হত্যা করার আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ যখন তাঁর নবীকে উঠিয়ে নিলেন, তখন আমাদের নিকট সংবাদ পৌঁছালো যে, আনসারগণ আমাদের বিরোধিতা করে সকলে সাকিফায়ে বনী সায়ীদাতে একত্রিত হয়েছে। আর আলী, যুবাইর ও তার সঙ্গীরা আমার বিরোধিতা করছে। আর মুহাজিরগণ সকলে আবু বকরের নিকট একত্রিত হয়েছে। হযরত আবু বকর (রা.) এর মৃত্যু উপস্থিত হলে সমস্ত সাহাবীরা তার নিকট একত্রিত হলো এবং তিনি সকলের উদ্দেশ্যে নিজ মনের কথামালা ব্যক্ত করতে লাগলেন।
তিনি বললেন: আল্লাহর ফয়সালা আমার সামনে উপস্থিত হয়েছে, যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ। নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য এমন একজন লোক আবশ্যক, যে তোমাদের কার্যকলাপ দেখাশোনা করবে, তোমাদের সালাতের ইমামত করবে, তোমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে এবং তোমাদের গনীমত বণ্টন করবে। অতঃপর তিনি উমর (রা.)-কে সকলের সামনে পেশ করলেন। তিনি একটি ভাষণ দিলেন, যাতে হযরত উমর (রা.)-এর বৈশিষ্ট্যাবলীর বিবরণ তুলে ধরলেন। ফলে সকলে তার সিদ্ধান্ত মেনে নিল।
যার সারকথা ছিল এই: তিনি (উমর) কঠোর, তবে জালিম নন। নম্র, তবে দুর্বল নন। তালহা (রা.) আবু বকর (রা.)-এর নিকট এই বলে তার খিলাফতের বিরুদ্ধে দলিল পেশ করেছিলেন যে: আপনি শক্ত ও কঠিন হৃদয়ের লোককে আমাদের ওপর দায়িত্বশীল বানালেন। আপনি আপনার রবের সঙ্গে সাক্ষাতকালে কী জবাব দেবেন? কিন্তু পরবর্তীকালে তার অবস্থা এমন হয়েছে যে, তিনি নিজেই হযরত উমরের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়ে তার উদ্দেশ্যে বলেন: নিশ্চয়ই সমগ্র আরব আপনার হাতে সোজা হয়েছে এবং আপনার হাতেই আল্লাহ বিজয় দান করেছেন। অতঃপর তিনি উসমান ও আবদুর রহমান ইবনে আউফের সাথে মিলে আবু বকর (রা.)-এর নিকট উমরের জন্য এই বলে খিলাফতের আবেদন করেন যে, তিনিই খিলাফতের জন্য সর্বাপেক্ষা যোগ্য। অতঃপর পরামর্শ সভায় উপস্থিত অধিকাংশ সাহাবীই আমিরুল মুমিনীন হিসেবে উমরের নেতৃত্বের ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেন। অতঃপর সমস্ত উম্মতই উমরের হাতে বাই’আত গ্রহণ করেন। যদি উমরের প্রতি উম্মতের বাই’আত না থাকত এবং সকলে তার ব্যাপারে ঐক্যমত না হতেন, তাহলে কখনো তার নেতৃত্ব বিশুদ্ধ হতো না।
অগ্নিপূজক আবু লুলু (আল্লাহ তাকে উপযুক্ত শাস্তি দান করুন) যখন হযরত উমর (রা.)-কে বর্শাঘাত করল, তখন তিনি নেতৃত্বের বিষয়টি ছয়জনের পরামর্শের ওপর অর্পণ করেন। উসমান ইবনে আফফান, আলী ইবনে আবি তালিব, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনে আউফ ও সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)। আর আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে বানালেন প্রাধান্যতা নির্ধারণকারী। খিলাফতের ব্যাপারে তার কোনো অধিকার থাকবে না।
উমর (রা.) ইন্তেকালের পর এই ক্ষুদ্র দলটি একত্রিত হলো। আবদুর রহমান ইবনে আউফ নিজেকে (খিলাফতের দাবি থেকে) মুক্ত করে নিলেন। ফলে তিনি বাকিদের প্রতিযোগিতা থেকে দূরে সরে যান। আর তাদেরকে নিজের ব্যাপারে স্বাধীনতা দেন, তারা চাইলে মনোনীত করার দায়িত্ব তাকে দিতে পারেন। তারা এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) উপস্থিত সকল আনসার, মুহাজির ও সৈন্যবাহিনীর আমীরদের সাথে পরামর্শ করলেন। যারা উমর (রা.)-এর সাথে তার মৃত্যুর পূর্ববর্তী হজ্জে উপস্থিত হয়েছিলেন। তারপরে উমর (রা.) যে ক্ষুদ্র দলটিকে নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন তাদের একেক জনের সাথে পৃথক পৃথকভাবে মিলিত হলেন। তাদের পারস্পরিক পরামর্শ ও তর্ক-বিতর্কের পর সর্বশেষ পর্যায়ে মনোনীত করার বিষয়টি উসমান ও আলী (রা.)-এর মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারপরে তিনি মদীনাবাসী প্রত্যেকের ঘরে ঘরে, এমনকি নারী-শিশুদের সাথে সাথেও পরামর্শ করেন। তাতে তিনি বুঝতে পারলেন, মুসলমানগণ উসমানের প্রতি ঝুঁকছে।
উসমানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থির হয়ে যাওয়ার পর আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) আলী (রা.)-এর উদ্দেশ্যে বলেন: হে আলী! আমি মানুষের অবস্থা দেখেছি। আমি দেখছি, তারা উসমানের সমকক্ষ কাউকে মনে করে না। তাই তুমি নিজের বিরুদ্ধে কোনো পথ তৈরি করো না। ফলে আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) এবং সমস্ত সাহাবী ও মুসলিমগণ পরামর্শ ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে উসমানের হাতে বাই’আত গ্রহণ করেন। উম্মতের নেতৃত্ব এমন নীতির ওপর চলাই আবশ্যক। পরামর্শের সেই প্রকৃত তাৎপর্য ফিরিয়ে আনা আবশ্যক, যা কামড়ে থাকা রাজত্ব ও জুলুমের শাসনের কারণে উম্মত থেকে বিদায় নিয়েছে। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি মুসলমানদের জন্য এমন কাউকে প্রেরণ করুন, যিনি উম্মতকে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালিত করবেন, মুসলমানদের কাতারকে এক করবেন, তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবেন। বর্তমানে আমাদের জাতি ঐ সকল নেতাদের দ্বারা বিভিন্নভাবে পিষ্ট হচ্ছে, যারা কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশিকেই বিশ্বাস করে। তাদের অবস্থার ভাষা হলো:
مَا أُرِيكُمْ إِلَّا مَا أَرَىٰ وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرَّشَاد
“আমি তোমাদেরকে কেবল তা-ই দেখাই, যা আমি সঠিক মনে করি এবং আমি তোমাদেরকে সঠিক পথই প্রদর্শন করি।” (গাফির: ২৯)
তাদের মধ্যে রয়েছে ঐ সকল ধর্মনিপেক্ষ তাগুত শাসকগোষ্ঠী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ধার্মিকতার দাবি করে। কিছু আবেগ প্রবণ মুসলমানকে এই ভুল ধারণা দেয় যে, তাদের নেতৃত্ব লাভের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর শরীয়ত বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর দ্বীনের সাহায্য করা। এভাবে সে নিজেকে এবং তার দলবলকে ইসলামের অভিভাবকরূপে দাঁড় করায়। অথচ প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে তাদের সকল অনৈতিকতাগুলো আলোচনা করা আমাদের লক্ষ্য নয়। আমরা এখানে শুধু পরামর্শের বিষয়টি আলোচনা করব। কারণ এটাই শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি। এসকল শাসকরা পরামর্শের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপই করে না। তারা ধারণা করে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের কে এমন বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, যা বিশ্বের অন্য কাউকে তিনি দান করেননি বা করবেনও না।
প্রথম শ্রেণীর শাসকরা, তথা তাগুত ও আইন প্রণয়নকারীরা তো তাদের জনগণের চেহারাই বদলে ফেলেছে এবং তাদের কে সর্বপ্রকার উপহাসের পাত্র বানিয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বপ্রকার বিষয়াদি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। কেউ এ ব্যাপারে তাকে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। আর কেউ তাকে প্রশ্ন করবে কীভাবে? কারণ সে তো সব বিষয়ে বিশ্বের সকল মানুষের চেয়ে জ্ঞানী... জেনে রাখুন, তারাই সকল মানুষের চেয়ে অধিক অজ্ঞ হওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু তারা শক্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের ভিত্তি সুদৃঢ় করে। আর এক্ষেত্রে তাদের সহযোগী হলো তাদের প্রজারা। হ্যাঁ, হত্যা, নির্যাতন ও দারিদ্র্যের আশঙ্কায় জনগণ কর্তৃক দুর্বলতা, আনুগত্য ও হীনতা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে তাদের সহযোগীতা হয়। যেমনটি কুরআনে এসেছে:
قَالَ لَئِنِ اتَّخَذْتَ إِلَٰهًا غَيْرِي لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِين
“যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্যরূপে মেনে নাও, তাহলে তোমাকে কারারুদ্ধদের অন্তর্ভুক্ত করব।” (আশ-শুআরা: ২৯)
ইরবায ইবনে সারিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন উপদেশ দিলেন, যাতে সকলের হৃদয় কেঁপে উঠল, চক্ষু অশ্রুতে প্লাবিত হলো। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! মনে হচ্ছে এটা বিদায়ী উপদেশ! তাই আমাদেরকে শেষ অসিয়ত করুন! তিনি বললেন:
আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ভয়, শ্রবণ ও আনুগত্যের উপদেশ দিচ্ছি। অতঃপর বললেন: তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাহ এবং আমার পরবর্তী হিদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরবে। মাড়ির দাঁত দ্বারা তা আঁকড়ে থাকবে।
সুতরাং যে এই ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামের সুন্নাহ থেকে পলায়ন করে, সে ইমাম বা খলিফা নয়। যদিও সে নিজেকে খলিফা বলে উপাধি দেয়। আর যে নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে এই অনুসরণের সূচনা হবে, তা হচ্ছে পরামর্শ। এটা অবশ্যই করতে হবে। যদিও আমরা বর্তমান স্বেচ্ছাচারী শাসকদের থেকে এটা প্রত্যক্ষ করি না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মাঝে নবুয়ত থাকবে, যতদিন আল্লাহ চান তা থাকুক। অতঃপর যখন আল্লাহ তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন, তখন তা উঠিয়ে নেবেন। তারপরে আসবে খিলাফাহ আ’লা মিনহাজিন নুবুওয়্যাহ। যতদিন আল্লাহ চান তা থাকুক, ততদিন তা থাকবে। অতঃপর যখন আল্লাহ তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন, তখন উঠিয়ে নেবেন। তারপরে আসবে কামড়ে থাকা রাজত্ব। যতদিন আল্লাহ চান তা থাকুক, ততদিন তা থাকবে। অতঃপর যখন তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন, তখন উঠিয়ে নেবেন। তারপরে আসবে স্বেচ্ছাচারী শাসন। অতঃপর যতদিন আল্লাহ চান, তা থাকুক, ততদিন তা থাকবে। অতঃপর যখন আল্লাহ তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন, তখন উঠিয়ে নেবেন। তারপরে আসবে খিলাফাহ আ’লা মিনহাজিন নুবুওয়্যাহ। এই বলে তিনি চুপ রইলেন।" (বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) কাউকে খলিফা মনোনীত না করেই মারা গেছেন। যেন উম্মত নিজেই নিজেদের খলিফা নির্ধারণ করে এবং সকলে তার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ থাকে। আর আল্লাহর সেই বিধান বাস্তবায়িত হয়- ‘তাদের কার্যকলাপ সম্পন্ন হয় তাদের পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে’। আর যেন এটা পরবর্তীদের জন্য আদর্শ হয়।
আয়িশা (রা.) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) এমতাবস্থায় পরলোকগমন করেছেন যে, কাউকে খলিফা বানিয়ে যাননি। তিনি যদি কাউকে খলিফা বানিয়ে যেতেন, তাহলে অবশ্যই আবু বকর বা উমরকেই খলিফা বানাতেন। (বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ রাহি.)
আমাদের যামানায় আমরা আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদের সাহসী ভূমিকা ও পরামর্শের নমুনা পেশ করতে পারি মোল্লা মুহাম্মাদ উমর (রহ.)-কে দিয়ে। যখন আমেরিকা ইমাম আবু আব্দুল্লাহ উসামা (রহ.)-কে আমেরিকান গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে সমর্পণ করার দাবি জানায়, তিনি তখন গণ্যমান্য ও পরামর্শদাতাদের ১ হাজারের অধিক আলিমকে জমা করেন। পরামর্শে আলিমগণ এটাকে না-জায়িয বলেন।
মোল্লা মুহাম্মাদ উমরই এটাকে সমর্থন করত: আমেরিকার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে মর্যাদাবান করেন। তিনি তার সঙ্গী ও জনগণকে নিয়ে তাগুতদের মোকাবেলায় দৃঢ় ও অবিচল থাকেন। আমাদের যুগের তাগুতরা তাদের জনগণের সাথে মহিষপালকের রাখালের অনুরূপ আচরণ করে। যেমন, লক্ষ লক্ষ মহিষ হলেও রাখাল একাই সবগুলোকে পরিচালনা করে এবং চলার পথ নির্ধারণ করে।
পাঠক! মহিষপালককে আপনি দেখে থাকবেন, যখন স্থান ত্যাগ করার সময় হয়, তখন রাখাল একটি পয়েন্ট নির্ধারণ করে দেয়, যে পথ ধরে অপর পাড়ে যাওয়ার জন্য অনেক সময় নদীও অতিক্রম করতে হয়। ফলে প্রতিটি মহিষ রাখালের নির্ধারিত সে পথ ধরেই যায়। আর কুমির এসে সেই পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকে, অতঃপর সেখান দিয়ে অতিক্রমকালে অনেক মহিষকে ধরে খেয়ে ফেলে। মহিষের পাল যদি এ বিষয়টি লক্ষ্য করত, তাহলে অবশ্যই এ ক্ষতি হ্রাস করার জন্য পথ পরিবর্তন করত। কিন্তু তারা তাদের রাখালকে একক কর্তৃত্বের অধিকারী বানিয়ে দিয়েছে। ফলে এ স্থানেই তাদের অনেকের সমাধি হয়। যদিও মহিষপাল বা এরূপ প্রাণীর জন্য এমনটা সঠিক, কিন্তু নেতৃত্ব দানকারী মুসলমান জাতির জনগণের জন্য এটা জায়েয হবে না।