یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَکُوۡنُوۡا مَعَ الصّٰدِقِیۡنَ
হে মুমিনগণ,তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।
(আত তাওবাহ: ১১৯)
আভিধানিকভাবে ‘সিদক্ব’ অর্থ: সত্য কথা বলা। অতীতকালে হোক, ভবিষ্যৎকালে হোক। শত্রু হোক বা অন্য কেউ হোক। এটা কেবল সংবাদমূলক কথাবার্তায় হয়। পরিভাষায়: ‘সিদক্ব’ হলো গোপন-প্রকাশ্য ও জাহির-বাতিন একরকম হওয়া। যেন বান্দার অবস্থা তার কাজকে এবং তার কাজ তার অবস্থাকে মিথ্যা প্রমাণিত না করে।
সিদক্ব বা সততা প্রকৃত মুমিনের গুণ। আর এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, মানুষের মাঝে এ গুণে গুণান্বিত হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি হলো নেতা বা শাসক। কারণ আল্লাহ তাকে যে স্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন, সে অবস্থানে এর প্রয়োজন অত্যধিক। কারণ আল্লাহর তাওফিক ও সাহায্য ছাড়া তার এক মুহূর্তও চলা সম্ভব নয়।
আর কোনো মিথ্যাবাদীর পক্ষে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য আসাটা সৃষ্টিজীবের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির বিরোধী। এমন ব্যক্তির ভাগ্যে তো শুধু আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চনা-ই জুটবে, যদিও কিছুকাল পরে হয়। সুতরাং যে কাজের মাঝে মিথ্যা প্রবেশ করেছে, যার কর্তা কথা, কাজ বা নিয়তে মিথ্যা অবলম্বন করেছে, কখনো দেখবেন না যে, উক্ত কাজে বরকত লাভ হয়েছে।
কিন্তু কখনো এদের পক্ষেও কিছু আবর্তন ঘটবে এবং আল্লাহ তা'আলা তার নেককার বান্দাদেরকে যে সকল প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা তার কিছু লাভ করবে বা এজাতীয় আরও কিছু ঘটবে; কিন্তু তা সাময়িক সময়ের জন্য। আর এটা আল্লাহর বিশেষ হিকমতের কারণে, যা কেবল তিনিই জানেন। যারা সত্যবাদী নয়, আল্লাহ তাদের কোনো কল্যাণ বা ক্ষমতা দেন না। তাই সামগ্রিকভাবে এ সব সত্যবাদীদের জিহাদ ও নেক আমলের কারণেই আল্লাহ তা'আলা দেশ ও মানুষের বহুবিধ কল্যাণকর বিষয়াবলি ঘটান। কখনো তার ফলাফল বহুকাল যাবৎ অব্যহত রাখেন, যেমনটা আমরা আল্লাহ তা'আলার স্থির নীতির মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এজন্য নেতাই এ মহান গুণে গুণান্বিত হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত।
নেতাকে প্রথমে তার রবের সাথে সত্যবাদী হতে হবে। আল্লাহর সাথে সততা আর তার প্রতি একনিষ্ঠতা দু’টি ভিন্ন জিনিস। তবে পরস্পরের মাঝে আবশ্যক সম্পর্ক রয়েছে। সততা হয় আবেদন বা আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে, আর ইখলাস বা একনিষ্ঠতা হয় কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের ক্ষেত্রে।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন: সততা ও ইখলাসের মাঝে পার্থক্য হলো: বান্দার কিছু আকাঙ্ক্ষা ও কিছু কাঙ্ক্ষিত বিষয় থাকে। ইখলাস হলো কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি শুধু আল্লাহর জন্য হওয়া। আর সততা হলো আকাঙ্ক্ষাটি শুধু আল্লাহর জন্য হওয়া। সুতরাং ইখলাস হলো কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি বিভাজ্য না হওয়া। আর সততা হলো আকাঙ্ক্ষাটি বিভাজ্য না হওয়া।
তাই সততা হলো চেষ্টা ও পরিশ্রম করা। আর ইখলাস হলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যটি একক হওয়া। একারণে নেতাকে পূর্ণ চেষ্টা করতে হবে এবং সর্বসাধ্য ব্যয় করতে হবে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি নিজের মধ্যে বাস্তবায়নের ব্যাপারে। এটাই হলো আকাঙ্ক্ষার মাঝে সততা। আর এ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য নেতার উচিত, কোনো উপকরণের প্রতি ঝুঁকে না পড়া বা তা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে না পড়া। এটা হলো আল্লাহর সাথে সততার দিক। আর আল্লাহই প্রকৃত তাওফিকদাতা। এটাই মূল বিষয়। কেননা বান্দা যদি তার রবের সাথে সততা দেখাতে পারে, তাহলে সে স্বীয় প্রজাদের সাথেও সততা দেখাতে পারবে।
নেতার উচিত স্বীয় কথায় সত্যবাদী হওয়া এবং কাজকর্মে আমানতদার হওয়া। জাতির হিসাবের মধ্যে কারো প্রতি শৈথিল্য না করা। আল্লাহর ব্যাপারে কোনো ভর্ত্সনাকারীর ভর্ত্সনাকে ভয় না করা। স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত, নীতি ও পথ অবলম্বন করা। তার চরিত্র ও আচার-আচরণই তার সততার প্রমাণ দেবে। উম্মাহর সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখবে, যদিও এতে তার অনেক সময় ব্যয় করতে হয় এবং পরিশ্রম করতে হয়। কাউকে উপেক্ষা করবে না। উম্মাহকে ধোঁকা দেবে না। এমন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেবে না, যার ব্যাপারেও সে নির্বিকার; নিজ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালায় না।
প্রকৃত নেতা সে-ই, যে স্বীয় উম্মাহর সম্মান ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ফিরিয়ে আনে। উম্মাহর প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু হয়। জনগণ কর্তৃক নেতাকে ভালোবাসা এবং তার পাশে ভেড়ার ক্ষেত্রে শাসকের সততার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আর এমনটা তো হবেই। যেহেতু তারা দেখছে, সে কখনো তাদের সাথে মিথ্যা বলেনি, তাদেরকে ধোঁকা দেয়নি, প্রতারিত করেনি। আর কোনো সন্দেহ নেই যে, এই জনগণই তার সাহায্যকারী হবে এবং তার পেছনে থাকবে। কখনো তাকে সপে দেবে না, তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না বা তার সহযোগিতা ছেড়ে দেবে
পক্ষান্তরে যদি সে মিথ্যার ব্যাপারে পরিচিত হয়, তাহলে ধারণার চেয়েও দ্রুত সময়ে তার রাজত্বের ভিত ধসে পড়বে, যদিও পূর্বোক্ত ছয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَفَمَنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى تَقْوَى مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٍ خَيْرٌ أَمْ مَنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى شَفَا جُرُفٍ هَارٍ فَانْهَارَ بِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
আচ্ছা, সে ব্যক্তি উত্তম, যে আল্লাহভীতি ও তার সন্তুষ্টির ওপর নিজ গৃহের ভিত্তি স্থাপন করেছে, না সে ব্যক্তি, যে তার গৃহের ভিত্তি স্থাপন করেছে এক খাদের পতনোন্মুখ কিনারায়। ফলে সেটি তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়। আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াতপ্রাপ্ত করেন না। (তাওবা: ১০৯)
সততা সমাজের বন্ধন দৃঢ় করে, তার মাঝে ভারসাম্যতা আনয়ন করে। ফলে দুনিয়ার কোনো কিছুই তাকে টলাতে পারে না। কোনো ফিতনা-ই তার মাঝে প্রবেশ করতে পারে না। নিশ্চয়ই সততা হলো মানুষকে আল্লাহর দিকে পরিচালনাকারী নবীদের একটি বৈশিষ্ট্য। হিদায়াতের নবী মুহাম্মদ (সা.) নবুওয়াত লাভের পূর্বেই ‘সত্যবাদী ও বিশ্বাসী’ উপাধি লাভ করেছিলেন। ফলে তার জাতি তার আনীত বিষয়ের ব্যাপারে তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা সত্ত্বেও অন্য সকল বিষয়ে তাকে বিশ্বাস করত।
সাঈদ ইবনে যুবাইর (রহ.) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন। অতঃপর তার কওমকে লক্ষ্য করে বললেন: হায় প্রভাতি আক্রমণ! ফলে কুরাইশের সব লোক জমা হলো। তারা তাকে বলল: আপনার কী হয়েছে? তিনি বললেন: তোমরা বল তো! আমি যদি তোমাদেরকে সংবাদ দেই: তোমাদের শত্রুরা সকাল বেলা বা বিকাল বেলা তোমাদের ওপর আক্রমণ করবে, তাহলে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে না? তারা বলল: অবশ্যই। তখন তিনি বললেন: তাহলে আমি তোমাদেরকে আসন্ন আযাবের সম্পর্কে সতর্ক করছি। আবু লাহাব বলে উঠল: ধ্বংস তোমার! তুমি আমাদেরকে এজন্য একত্রিত করেছো?! তখন আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করলেন: تَبَّتۡ یَدَاۤ اَبِیۡ لَہَبٍ وَّتَبَّ ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দু’হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। (বর্ণনা করেছেন ইমাম নাসাঈ রাহি.)
রাসূলুল্লাহ (সা.) তার কওমকে জিজ্ঞাসা করার পর তার কওম যা বলেছিল, আমরা তার মাধ্যমে দলিল পেশ করছি। তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন: তোমরা বল তো, আমি যদি তোমাদেরকে সংবাদ দেই যে, তোমাদের শত্রুরা সকাল বেলা বা বিকাল বেলা তোমাদের ওপর আক্রমণ করবে, তাহলে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে না? আর তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর থেকে পূর্বে যেমনটা অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল, সে হিসেবেই উত্তর দিয়েছে: হ্যাঁ। অর্থাৎ তারা তার উক্ত কথায় তাকে সত্যায়ন করেছে। নেতাকেও এমন গুণেই সজ্জিত হতে হবে। যেন তার শত্রু-মিত্র সকলেই তাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করে। শত্রুরাও কখনো তার থেকে মিথ্যা দেখতে না পায় এবং বন্ধুরা-ই নয়। ফলে তার কথা নির্দ্বিধায় সত্য; মিথ্যার লেশ মাত্র নেই।
সততা হলো নবী চরিত্রের একটি মহান বৈশিষ্ট্য। এটি এমন একটি ভিত্তি, যা তাক্বওয়াকে আবশ্যকীয় করে। সুতরাং যে-ই আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যের জন্য কাজ করে, তার জন্য এ বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হওয়া অত্যাবশ্যক।
قَالَ اللّٰہُ ہٰذَا یَوۡمُ یَنۡفَعُ الصّٰدِقِیۡنَ صِدۡقُہُمۡ ؕ لَہُمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ رَضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَرَضُوۡا عَنۡہُ ؕ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ
আল্লাহ বলবেন, এটা সেই দিন, যেদিন সত্যবাদীদেরকে তাদের সততা উপকৃত করবে। তাদের জন্য রয়েছে এমন সব উদ্যান, যার তলদেশে নহর প্রবাহমান। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটাই মহা সাফল্য।
(মায়িদাহ: ১১৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) তার সাহাবীদেরকে সততার প্রতি উৎসাহ দিতেন। ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: তোমরা সততাকে আঁকড়ে ধর। কেননা সততা নেক কাজের পথ দেখায় আর নেক কাজ জান্নাতের পথ দেখায়। বান্দা সত্য বলতে থাকে এবং সত্যকে অন্বেষণ করতে থাকে, অবশেষে আল্লাহর নিকট সিদ্দীক হিসেবে তার নাম লিখিত হয়। আর তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাক। কারণ মিথ্যা পাপাচারে পথ দেখায়। আর পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়। বান্দা মিথ্যা বলতে থাকে এবং মিথ্যা অন্বেষণ করতে থাকে। অবশেষে আল্লাহর নিকট তার নাম কাযযাব (মিথ্যাবাদী) হিসেবে লিখিত হয়। (বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি প্রমুখ)