প্রশ্নঃ
আমরা জানি, আপনারা মনে করেন- গণতন্ত্র বলতে যদি জনগণের সার্বভৌমত্ব বা জনগণের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা বোঝানো হয়, তাহলে তা শিরক। একইভাবে, তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়াকেও আপনারা শিরক মনে করেন। আপনারা আরও মনে করেন, আইন প্রণয়নকারী পরিষদ বা পার্লামেন্টগুলো সমসাময়িক পৌত্তলিকতার ঘাঁটি।
এ বিষয়ে আপনাদের যেসব লেখা রয়েছে, সেগুলোতে আপনারা উল্লেখ করেছেন যে- সংসদ সদস্যরা একাধিক কুফরিতে লিপ্ত হওয়ার কারণে কাফির।
তবে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন হলো:
আপনারা কি ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত সংসদ সদস্যদেরও কাফির বলে থাকেন এবং তাদের ক্ষেত্রে তাওয়ীলের উজর গ্রহণ করেন না?
উত্তরঃ
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের ওপর।
যে ব্যক্তি শিরকভিত্তিক পার্লামেন্টগুলোর বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জানে, সে জানে যে- একজন সংসদ সদস্য সেখানে একাধিক কুফরিতে লিপ্ত হয়। আমি আমার বিভিন্ন লেখায় এসব কুফরির কয়েকটি উল্লেখ করেছি। যেমনঃ শিরকপূর্ণ সংবিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শপথ করা এবং এমন রাষ্ট্রপতি, রাজা বা আমিরের প্রতি আনুগত্যের শপথ করা, যিনি আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী শাসন করেন না।
আর জানা কথা এই যে, আল্লাহ আমাদের তাগুতকে অস্বীকার করতে এবং তার থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করতে নির্দেশ দিয়েছেন; চাই তা প্রচলিত মানব রচিত কোনো আইন হোক, অথবা সেই আইন অনুযায়ী শাসনকারী কোনো শাসক হোক, কিংবা সেই আইন প্রণয়নকারী কেউ হোক।
এর ভিত্তিতে বলা যায় যে, একজন সংসদ সদস্য সংবিধানের ধারাগুলো অনুযায়ী আইন প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এমন একটি নিরংকুশ আইন প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা কেবল সংবিধানের ধারাগুলো দ্বারা সীমাবদ্ধ এবং শরিয়াহর মৌলিক উসুলগুলোর সাথে এর নূন্যতম কোন সম্পর্ক নেই। তাই, এ ধরনের দায়িত্ব গ্রহণ সুস্পষ্ট কুফর। এর দলিলগুলো সুপরিচিত এবং আমরা সেগুলো যথাস্থানে তুলে ধরেছি।
প্রকৃতপক্ষে, যারা তাদের প্রণীত ইসলামবিরোধী আইনগুলো মেনে নেয়, তাদের কাছে সংসদ সদস্যরা হলো অনেকগুলো রবের ন্যায়। তারা মানুষের জন্য দ্বীনের এমন বিধান প্রণয়ন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি।
একজন সংসদ সদস্যের আরও যেসব কাজ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো- তার যাবতীয় কাজ ও কথাবার্তায় সংবিধান এবং রাষ্ট্রের প্রচলিত মানবরচিত আইনের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া। এমনকি সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রেও সে সংবিধানের ধারা অনুযায়ীই তাদের জবাবদিহি করে এবং সংবিধান লঙ্ঘনের কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। আর এটিও তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া। এ ছাড়া আরও অনেক সুস্পষ্ট কুফরির বিষয় রয়েছে।
এই কুফরিগুলোর যেকোনো একটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট, যাতে আমরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই এই দায়িত্ব ও কাজকে কুফরি কাজ বলে হুকুম দিতে পারি। কারণ, আমরা অন্যান্য স্থানে ব্যাখ্যা করেছি যে, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে এমন কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা -যার অনুমতি আল্লাহ দেননি- সুস্পষ্ট কুফর। আর এধরনের আইন প্রণয়নকারীদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করা সুস্পষ্ট শিরক। তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়ার বিষয়টিও একই রকম। অনুরূপভাবে কাফির, তাগুত ও মুশরিকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও আনুগত্যের সম্পর্ক রাখাও একই অন্তর্ভুক্ত।
এটি হলো কাজটির (তথা সংসদ সদস্য হওয়া) ব্যাপারে আমাদের হুকুম। আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে হুকুম দেওয়ার তুলনায় কাজটির ব্যাপারে হুকুম দেওয়া সহজ। নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তাকফির করার ক্ষেত্রে সাধারণত শর্তাবলী ও প্রতিবন্ধকতাগুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন হয়। আমরা আমাদের ‘আল-রিসালাতুস সালাসিনিয়্যাহ’ কিতাবে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি।
তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি যে, কিছু সংসদ সদস্য এমনও রয়েছে, যারা তাগুতের একান্ত ঘনিষ্ঠ ও সহযোগী। তারা সাবেক মন্ত্রী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা কিংবা অন্য কেউ হতে পারে। এরা প্রকাশ্যে তাগুতকে নিরংকুশভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে এবং তার অনুসরণ করে।
একইভাবে, যেসব দেশে নির্বাচনে বিজয়ী দল রাষ্ট্র পরিচালনা করে, সেসব দেশের ক্ষমতাসীন দলের অনুসারীরাও এশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সেখানে তাগুতের তৈরি করা দল এবং সেই দলের সদস্য, ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সমর্থকরাই রাষ্ট্রের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে।
ফলে তারা এমন একটি শক্তিশালী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী বা দলে পরিণত হয়, যারা নিজেদের অস্ত্রশক্তির পাশাপাশি নিজেদের আইন ও কুফরি বিধান প্রয়োগের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়।
এশ্রেণির সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে তাকফিরের শর্তাবলি ও প্রতিবন্ধকতা বিবেচনা না করেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর কুফরের হুকুম দেওয়া হয়। কারণ, যুদ্ধরত ও শক্তি-সামর্থ্যের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানে অটল থাকা এমন গোষ্ঠীর সদস্যদের তাওবা করার সুযোগ দেওয়া হয় না।
সাধারণভাবে সকল সংসদ সদস্যের ব্যাপারে কথা হলো-
যে সংসদ সদস্য তাগুতদের প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য প্রদর্শন করে, শরিয়াহর কোনো কিছুরই পরোয়া করে না, সম্ভাব্য সব ধরনের আইন প্রণয়ন এবং পানি পান করার মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনা- সেই সংসদ সদস্য নির্দিষ্টভাবে কাফির।
কারণ, সে কোনো প্রকার ইকরাহ তথা জবরদস্তি বা তাওয়ীল ছাড়াই স্বেচ্ছায় ও জেনেশুনে সুস্পষ্ট, প্রকাশ্য ও দ্ব্যর্থহীন শিরকের বিভিন্ন দরজায় প্রবেশ করছে।
‘কথিত ইসলামী সংসদ সদস্য’দের ব্যাপারে হুকুমঃ
এখন বাকি থাকলো সেই ব্যক্তিরা, যাদের ‘ইসলামী সংসদ সদস্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রশ্নকারী মূলত তাদের সম্পর্কেই জানতে চেয়েছেন।
যদি ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো সংসদ সদস্য পূর্বে উল্লিখিত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হন, অর্থাৎ তিনি কোনো ধরনের দ্বিধা বা সংকোচ ছাড়াই আইন প্রণয়নের কাজে নিয়োজিত থাকেন এবং সংবিধানের ধারা অনুযায়ী নিরংকুশভাবে আইন প্রণয়ন করতে কোনো আপত্তি বোধ না করেন, তাহলে তাদের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য।
এ ধরনের লোক বাস্তবেই রয়েছে। তারা কোনো ধরনের সতর্কতা বা সংকোচ ছাড়াই এমন সব আইন প্রণয়ন করে, যেগুলোর অনুমতি আল্লাহ দেননি। তারা সংবিধানের কাছে বিচার-ফয়সালাও চায়। তাদের অনেকেই সংবিধানের প্রশংসা করে। বরং তাদের কেউ কেউ একে জনগণের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি মনে করে, যা সংরক্ষণ করা অপরিহার্য। একারণেই তারা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনে।
এদের একটি দল এমন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল, যেগুলোকে তারা ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। তাদের প্রস্তাবিত আইনে সংবিধান লঙ্ঘনকারী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল।
তারা একে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং মন্ত্রীদের কারসাজি থেকে জনগণের অর্জন, সম্পদ ও অধিকার সংরক্ষণের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
এ ছাড়া তাদের আরও এমন অনেক হাস্যকর কর্মকাণ্ড রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে তারা পৌত্তলিকতার ঘাঁটিতে তাওহিদকে বিসর্জন দিচ্ছে এবং পার্থিব জীবনের গৌণ স্বার্থকে সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে মহান কল্যাণের ওপর প্রাধান্য দিচ্ছে। অথচ এই মহান কল্যাণের জন্যই আল্লাহ সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করেছেন, রাসূলদের পাঠিয়েছেন এবং কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন। আর তা হলো “তাওহিদ”।
এরা পূর্বে উল্লিখিত শ্রেণিরই অন্তর্ভুক্ত। তাদের দাঁড়ি রাখা, কাপড় টাখনুর ওপর পরা কিংবা ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা কোনোটিই তাদের রক্ষা করতে পারবে না। কারণ, কুফরের এমন প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে এগুলো শরিয়তসম্মত কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়, যেগুলোর কারণে তাকফির থেকে বিরত থাকা যায়।
কথিত ‘ইসলামী’ বিরোধী দলের ব্যাপারে হুকুমঃ
এখন আমাদের সামনে এমন এক শ্রেণির লোক বাকি রইল, যারা ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকার তাদের বিরোধী দল হিসেবে গণ্য করে এবং তারাও নিজেদের বিরোধী দল হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা বিভিন্ন তাওয়ীলের ভিত্তিতে পার্লামেন্টে প্রবেশ করে।
তাদের অনেকেই স্বীকার করে যে, গণতন্ত্র শিরক এবং আল্লাহর সঙ্গে শরিককারী বিষয়ে আইন প্রণয়ন করাও শিরক, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি। তাদের দেখা যায়, সংবিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ করার সময় তারা এ ধরনের শর্তযুক্ত বাক্য ব্যবহার করেঃ ‘আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে’ অথবা ‘যা শরিয়াহর বিরোধী নয়, সে ক্ষেত্রে’ কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো বাক্য।
গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এ ধরনের শর্ত যুক্ত করা হাস্যকর ও স্ববিরোধী। কারণ, এর প্রকৃত অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে কিংবা শরিয়াহর বিরোধী নয়, এমন ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা বা আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করার শপথ করা!
এতদসত্ত্বেও, এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে- তারা পূর্ববর্তী শ্রেণির লোকদের মতো সম্পূর্ণ সংবিধানের কাছে আত্মসমর্পণ করে না। বরং তারা মনে করে, সংবিধান ও প্রচলিত আইনগুলোর মধ্যে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো থেকে সতর্ক থাকা এবং আল্লাহর শরিয়াহর বিরোধী বিষয়গুলোর প্রতি আনুগত্য ও সম্মান প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
সুতরাং, এ শ্রেণির কেউ যদি এমন আইনই প্রণয়ন করে যেগুলোকে সে শরিয়াহসম্মত বলে ব্যাখ্যা করে, অথবা মনে করে- প্রশাসনিক বিষয়গুলোতে আইন প্রণয়ন করা বৈধ কিংবা সে এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করে যে- তার উদ্দেশ্য হলো সব কুফরি আইন প্রণয়নের বিরোধিতা করা এবং রাষ্ট্র ও তার বাতিল ব্যবস্থার বিরোধিতায় নিজের পদকে কাজে লাগানো, অথবা সে দাবি করে যে- তার প্রধান দায়িত্ব হলো নিজ নির্বাচনী এলাকার নাগরিকদের সেবা করা, তাকে নির্বাচনকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং কুফরি আইন প্রণয়নের কাজে অংশগ্রহণের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই- তাহলে এ শ্রেণির লোকদের নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আমি কাফির বলি না; যতক্ষণ না -
ক) তাদের ওপর হুজ্জত প্রতিষ্ঠা করা হয়,
খ) তাদের ভ্রান্ত তাওয়ীল খণ্ডণ করা হয় এবং
গ) তাদের অবস্থা যাচাই-বাছাই করা হয়।
যারা নির্বাচনকে ক্ষমতায় যাওয়ার নিছক একটি মাধ্যম মনে করে তাদের হুকুমঃ
ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আরও একটি শ্রেণি রয়েছে। তারা কখনো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং জনগণও তাদের সমর্থন করতে পারে। কারণ, তারা চুরি ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত বলে পরিচিত। এটি এমন প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে হতে পারে, যেখানে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সংবিধান পরিবর্তন করার এবং নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নীতি ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
সুতরাং, ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু লোক যদি এধরনের ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে এবং তাদের উদ্দেশ্য হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অর্জনের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা, যাতে তারা আল্লাহর শরিয়াহ অনুযায়ী শাসন করতে পারে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা কিংবা প্রচলিত মানব রচিত সংবিধানের ধারাবলী অনুযায়ী আইন প্রণয়নে অংশগ্রহণ করা তাদের উদ্দেশ্য না হয়- তাহলে তারা প্রকাশ্য কোনো কুফরি কাজে লিপ্ত না হলে আমরা তাদের কাফির বলি না।
কারণ, শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে নির্বাচনী পদ্ধতি ব্যবহার করা আর তাগুতের শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নির্বাচন ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।
প্রথমটি গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি, প্রকৃত স্বরূপ এবং সেই সুস্পষ্ট কুফরি বিষয় নয়, যার কারণে আমরা কাউকে কাফির বলে থাকি। বরং গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ও সুস্পষ্ট কুফরি বিষয় হলো “জনগণের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এবং সার্বভৌমত্ব”, যার কারণেই মূলত আমরা তাকফির করে থাকি।
নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের একটি পদ্ধতি ও মাধ্যম মাত্র; এটি গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য, লক্ষ্য বা ফলাফল নয়।
এখানে আমাদের এ বিশ্বাসের আলোচনা বাদ দিয়েই বলছি যে- এটি সেই পথ নয়, যা আমাদের রাসূল ﷺ পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য অনুসরণ করেছেন। অথবা এটি এমন একটি মাধ্যম, যা বিশেষত মুসলিমদের জন্য কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম নয়।
তবে এখানে আমরা এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছি না; বরং বিশেষভাবে বিভিন্ন শ্রেণির সংসদ সদস্যদের তাকফিরের বিষয়টি আলোচনা করছি।
এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে আপনি বুঝতে পারবেন যে, আমরা পার্লামেন্টের সব সদস্যকে নির্দিষ্টভাবে কাফির বলি না। বরং উল্লিখিত বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী আমরা প্রত্যেক সংসদ সদস্যের অবস্থা পর্যালোচনা করি। এরপর তিনি কোন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, তা বিবেচনা করে তাঁর সঙ্গে সে অনুযায়ী আচরণ করি।
আমার অন্যান্য লেখায় এ বিষয়ে যেসব সংক্ষিপ্ত ও সাধারণ বক্তব্য এসেছে, সেগুলোকে এই বিস্তারিত ব্যাখ্যার আলোকে বুঝতে হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين
(রমজান ১৪৩৪ হিজরি, আগস্ট ২০১৩)
-----------------------------------
1 এর মধ্যে আরেকটি অন্যতম শিরক হলো- রাষ্ট্রকে ইলাহের আসনে বসানো। আর,সবচেয়ে নিকৃষ্টতর শিরক হচ্ছে- ’রাষ্ট্রের সন্তুষ্টির জন্য’ নিজেদের সকল কর্মকাণ্ডকে ‘একনিষ্ঠ করা’, রাষ্ট্রের সেবা ও সন্তুষ্টিই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে নেওয়া। ফলে এতে আর কোন সন্দেহ নেই যে, (সেক্যলার) রাষ্ট্র হল সরাসরি তাগূত। আর সেচ্ছায় তাগূতের ইবাদত করার মানে হলো সরাসরি মুশরিক হয়ে যাওয়া।
2 সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তাকফির করার ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে। ক) ইক্বামাতে হুজ্জাহ বা যে ব্যক্তিটি উক্ত কুফরটি সম্পাদন করছেন তার এই ব্যাপারে জ্ঞাণ ও যথাযথ বুঝ থাকা যে, কাজটি কুফর। খ) "উদ্দেশ্য এবং ইচ্ছাকৃতভাবে করা", অর্থাৎ, কুফরকারী বক্তিটির উদ্দেশ্যই হল উক্ত কুফরটি কিংবা সে ওই কুফরটা ইচ্ছাকৃতভাবেই করছে। গ) "নিশ্চিতভাবে ঈমান সাব্যস্ত থাকা" , অর্থাৎ, স্বাভাবিক অবস্থায় ওই ব্যক্তি কুফর করার মত কেউ না-এই ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা। কারণ শরয়ী কায়েদা হল– নিশ্চিত বিশ্বাস সন্দেহের দ্বারা দূরীভূত হয় না; বরং সমস্ত বিধান পূর্বের ইয়াকিনের ওপরই বহাল থাকে।
3 একই কথা একই লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ওই বিরোধী দলের জন্যও প্রযোজ্য যারা নিছক নির্বাচনে হেরে যাওয়ার কারণে ক্ষমতায় গিয়ে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে কুফুরি শাসন ব্যবস্থা চলমান রাখায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে পারেনি। কারণ তাদেরও উদ্দেশ্য কুফরই ছিল, তাই তাদের হুকুমও একই হবে।
4 এখানে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, যেটা শাইখ মাকদিসী হাফি. অন্যত্র স্পষ্ট করেছেন তা হলো- পার্লামেন্টে যাওয়া বা রাষ্ট্রদেবতার পূজা করা সরাসরি শিরকে আকবর। এখানে এই শিরকের ওপর জাহলতকে উজর হিসেবে গণ্য করা হয়না। বরং এসব ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে ‘ইকরাহ’ ব্যতিত অন্য কোন উজরও গ্রহনযোগ্য নয়।এখানে যে বিষয়টিকে উজর হিসেবে গন্য করা হচ্ছে সেটা হলো ‘কুফরকারী ব্যক্তির উদ্দেশ্য’। যা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, সুনির্দিষ্ট তাকফিরের ক্ষেত্রে ব্যক্তির উদ্দেশ্যকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
এখানে এসেই আমাদের সাথে মুরজিয়া ও খাওয়ারিজদের পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়। মুরজিয়ারা ব্যক্তির উদ্দেশ্যকে গোটা দলের উদ্দেশ্যের সাথে মিলিয়ে প্রয়োগ করে। ফলে, কুফর প্রতিষ্ঠাকেই উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছে এমন দলের কেউ কেউ যখন ইসলাম প্রতিষ্ঠার পক্ষে সাফাই গায়, তখন তারা ব্যক্তির উদ্দেশ্য সংক্রান্ত উসুলকে দলের উপর প্রয়োগ করে এবং উক্ত দলকে তাকফির করার ক্ষেত্রে একে প্রতিবন্ধকতা মনে করে।
অন্যদিকে খারেজিরা এর বিপরীত। তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায় এমন দলের ব্যক্তিবিশেষ যখন প্রকাশ্য কুফুরিতে লিপ্ত হয় তখন ওই ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিচ্যুতিকে তারা সমগ্র দলের উপর চাপিয়ে দিয়ে কুফর হিসেবে গণ্য করে ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকেই তাকফির করে বসে।
উলামাদের মানহাজ হল মুরজিয়া ও খারেজিদের মাঝামাঝি। তাদের মত হল– কুফর প্রতিষ্ঠাকে উদ্দেশ্য বানিয়েছে এমন দলের হুকুম হল তারা দলগতভাবে কাফের। কিন্তু এই দলের যাদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ইসলাম হবে, নিছক কোন ভুল বুঝ বা দুনিয়াবি স্বার্থে তারা উক্ত দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে তারা মুসলিম। তারা ওই দলের দলীয় হুকুমের মধ্যে পরবে না। বরং তারা তাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী বিবেচিত হবে।
অন্যদিকে, ইসলাম প্রতিষ্ঠাকে উদ্দেশ্য বানিয়েছে এমন দলের ব্যাপারে দলগত হুকুম হল তারা মুসলিম। কিন্তু ওই দলের কেউ ব্যক্তিগতভাবে কুফুরি করলে সসেই ব্যক্তি মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে। তবে তার এই রিদ্দাহ তার দলের সামগ্রিক হুকুমে কোন প্রভাব ফেলবে না। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।