শত্রুর আদর্শিক হাতিয়ারের সামনে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নিজ আদর্শকে প্রবল করা যায় না। আমাদের দেশে বিগত ৫০ বছরের ‘ইসলামী’ গণতন্ত্র চর্চার নির্মম ইতিহাস তা-ই বলে। গণতন্ত্রের অগণিত সংজ্ঞা থাকলেও, সহজ ভাষায় বললে— “কোনো রিপাবলিক বা ‘জনসমর্থিত সরকার’ পরিবর্তনে, নির্বাচনে এবং আইন প্রণয়নে অধিকাংশের মতকে প্রাধান্য দেয়াই হচ্ছে গণতন্ত্র।” গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সরকারকে সিয়াদাহর (সার্বভৌম কর্তৃত্ব, হুকুম, নিয়ন্ত্রণ, প্রভুত্ব, আধিপত্য, বিধান নির্ধারণ) অধিকার দিয়ে থাকে। সিয়াদাহ হচ্ছে—সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব (Absolute authority), যার ওপর আর কোনো কর্তৃত্ব নেই। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় আসা শাসকগোষ্ঠীর থাকে আইনপ্রণয়নের নিরঙ্কুশ অধিকার। গণতন্ত্রে সিয়াদাহ মানুষের জন্য, জাতির জন্য। অর্থাৎ মানুষ যা চায়, যা সমর্থন করে- তার ওপর ভিত্তি করেই আইন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ হয়। আমাদের দেশের ইসলামপন্থীদের মধ্যে একটি অংশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় যাওয়ার মেহনত করলেও, বড় একটি অংশ (বিশেষত আলেমদের নের্তৃত্বাধীন মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠনগুলো) গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া প্রয়োজনবোধ করেন মূলত সমাজে ইসলামের পক্ষে কথা বলা বা মুসলিমদের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে। উভয় শ্রেণি সমান নয়। তবে নিয়ত বা পরিকল্পনা যা-ই হোক না কেন; ইসলামপন্থীদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার ফলে— ক. ইসলামের সরাসরি বিরোধিতাকারী সেক্যুলার শাসনদর্শন দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়েছে। ইসলামের পরিবর্তে পশ্চিমাদের দিয়ে যাওয়া নব্যধর্ম ‘লিবারেলিজম’ মানুষের রাজনৈতিক চিন্তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাকেও গ্রাস করে নিয়েছে। খ. শাসক নির্বাচনের শারঈ সম্ভাবনার ব্যাপারে মানুষের অসচেতনতাবোধ গাঢ় হয়েছে। আপামর মুসলিমদের মস্তিষ্ক থেকে তাওহিদের আক্বীদাহ বিদায় নিচ্ছে। মানুষ ভাবতেই পারছে না শাসনকর্তৃত্বের বৈধতা নিচ থেকে নয়, বরং ওপর থেকে আসে। গ. রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র ও পুঁজিপতিদের সমন্বয়ে গঠিত অলিগার্কি বা অভিজাততন্ত্রের (সুনির্দিষ্ট অল্প কিছু লোকের শাসন) অপশাসন ও শোষণ জনজীবনে দুর্ভোগ কেবল বাড়িয়েই চলেছে। আর, হিদায়াতের বাতিঘর ইসলামপন্থীরাও যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে, তখন মানুষের মধ্যে আত্মসমর্পিত দাসের ন্যায় সব মেনে নেওয়া, পূর্ণতা লাভ করেছে। খোদ ইসলামপন্থীরাই যখন ইউরো-আমেরিকান গণতান্ত্রিক গরল আস্বাদনে মত্ত, তখন সাধারণ মানুষ নিজেকে উন্নত মুসলিমে পরিণত করার বদলে আরও আধুনিক প্রমাণে ব্যস্ত হবে, তা বলাই বাহুল্য। আজ ইসলামবিরোধী সেক্যুলার শক্তির অন্যতম আদর্শিক হাতিয়ার গণতন্ত্রের গোলকধাঁধায় দিশেহারা ইসলামপন্থী ও মুসলিমদের বিশাল এক অংশ। গণতান্ত্রিক মানহাজের প্রস্তাবকেরা বরাবরই গণতন্ত্র কী নয়, এবং গণতন্ত্র কী এনে দিতে পারে—সে আলোচনায় ব্যতিব্যস্ত থাকেন, অন্যদেরও রাখেন। এর মাধ্যমে সরলমনা মুসলিমদের বিমূর্ত কল্পনার মায়াজালে আবিষ্ট করে রাখা যায়। তাই, গণতন্ত্র কী এবং গণতন্ত্র কী এনে দিয়েছে, সেই আলোচনা প্রয়োজন। যা কি না চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা ও অকাট্য যুক্তির বুননে প্রকৃত সত্য অনুধাবনে সহায়ক হবে। সচেতন ইসলামপন্থীসহ জনসাধারণের কাছে আজ অস্পষ্ট নয় যে- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মপন্থা মানুষকে ধীরে ধীরে সেক্যুলারিজমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা জানি, সেক্যুলার শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় কোনো বিষয় গৃহীত হওয়া শুধু জনসাধারণের অধিকার ও স্বার্থের সাথেই নির্ধারিত। নিজ অধিকার ও স্বার্থের পেছনে দৌড়ানোই হচ্ছে সেক্যুলারিজম। এমন চিন্তাকে উপড়ে না ফেলে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান ইসলামী চিন্তা ধারণ করতে পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জামায়াতে ইসলামির দাওয়াহ ও কর্মসূচি সেক্যুলার চিন্তার বীজ উপড়ে না ফেলে, সার-পানি দিয়ে পরিপুষ্ট করাতেই আগ্রহী হচ্ছে। সুধারণার দাবী থেকে বলতে হয়- এমনটা তারা অজ্ঞতা বা ভ্রান্তির শিকার হয়েই করছেন। অনেকেই এই প্রবণতাকে নতুন বা মূল অবস্থান থেকে সরে যাওয়া বলছেন। এটা অস্বীকার না করেই বলা যায়- মাওলানা মওদুদির মানহাজ, ফিকির ও রাজনৈতিক প্রস্তাবনার মাঝেই আসলে এমন বিচ্যুতি ছিল, যার ফলে জামায়াতের মেহনত ইসলামি বিপ্লবের পথে প্রতিবন্ধকতা বৃদ্ধি করতই! তাই আমাদের সময়ের বাংলাদেশ জামায়াতের হাকিকত বোঝার আগে মাওলানা মওদুদি ও জামায়াতে ইসলামীর চিন্তাধারা ও কর্মপন্থা বোঝাটা জরুরি। গণতন্ত্রের পথে ইসলামি বিপ্লব? পশ্চিমা গণতন্ত্রের মাধ্যমে (বাহ্যিক কিছু পরিবর্তন এনে ‘ইসলামী গণতন্ত্র’ নাম দিয়ে) ইসলামী বিপ্লব (অথবা ইসলামের বিজয়, শরীয়াহ প্রতিষ্ঠা, নিযামে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইত্যাদি) অর্জন করা সম্ভব কিনা, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর নেতা শাহ নেওয়াজ ফারুকী সাহেব ‘জামায়াতে ইসলামীর অতুলনীয় গবেষণামূলক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা’ শিরোনামে যে আলোচনাটি পেশ করেছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জামায়াতে ইসলামীর শক্তি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ১. মাওলানা মওদুদি (রহিমাহুল্লাহ)-এর চিন্তাধারা হলো, ইসলাম একটি জীবনব্যবস্থা, যা গোটা পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারের দাবি রাখে। জনাব ফারুকী সাহেবের বক্তব্য, ‘জামায়াতে ইসলামীর শক্তি পৃথিবীর অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি।’ ২. ইসলামী দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর আগমনকে কেন্দ্র করে যেসব প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। বরং আদর্শের পরিচয়, প্রতিরক্ষা ও উন্নতির ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর বড় একটি অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে সেক্যুলার ও কমিউনিস্টরা জামায়াতে ইসলামীকে নিজেদের আসল শত্রু মনে করে। ৩. জামায়াতে ইসলামী ছাত্র ও শ্রমিক দলগুলো থেকে কমিউনিস্ট ও লিবারেলদের আধিপত্য উপড়ে ফেলেছে। ৪. জামায়াতে ইসলামী সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। জামায়াতে ইসলামীর সহযোগিতা ছাড়া গণতান্ত্রিক ও ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। ৫. জামায়াতে ইসলামী উম্মতের ঐক্যের প্রতীক। সেইসাথে জামায়াতে ইসলামী গোটা মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার যোগ্যতা রাখে। ৬. জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বারবার নির্বাচনী পরাজয়কে বরণ করার অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে। শাহ নেওয়াজ ফারুকী সাহেবের এ মূল্যায়নের ব্যাপারে) প্রথম কথা হলো, শক্তি একটি বহুমুখী ধারণার নাম। শক্তির শাব্দিক অর্থ হলো, উদ্দেশ্য অর্জনে সফল হওয়ার যোগ্যতা। জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত লক্ষ্য হলো, আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনে দ্বীনকে প্রবল করা। তারা মনে করেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দ্বীনকে প্রবল করার জন্যে তারা যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রধান্য বিস্তার করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যত দিন যাচ্ছে এ নিযামটি ততই দুর্বল হয়ে পড়ছে। জামায়াতে ইসলামী অনেক সাধনা করে যে শক্তি অর্জন করেছিল, তা দিনদিন কমেই চলেছে। তারা যদি দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত কার্যপরিকল্পনা পুনঃবিবেচনা না করেন, তাহলে অচিরেই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তারা নিশ্চিতভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। মুহতারাম ফারুকী সাহেব জামায়াতে ইসলামীর যেসব শক্তির কথা আলোচনা করলেন, সেগুলো পর্যালোচনা করলে জামায়াতে ইসলামীর কর্মপদ্ধতির দুর্বলতাগুলো আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। এ কর্মপদ্ধতির দুর্বলতার মূল কারণ হলো, মাওলানা মওদুদি (রহিমাহুল্লাহ) পশ্চিমা দর্শনকে নিরেট জাহিলিয়্যাত সাব্যস্ত করলেও, পশ্চিমা চিন্তা-চেতনা ও কর্মপদ্ধতির ওপর তিনি যে পর্যালোচনা পেশ করেছেন, তা অপরিপূর্ণ ও আবেগী একটি পর্যালোচনা ছিল। মাওলানা মওদুদির আবেগী পর্যালোচনার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার মধ্যেই বিদ্যমান। তিনি ইসলামকে একটি পরির্পূণ জীবনব্যবস্থারূপে পেশ করেছেন ঠিক; কিন্তু এই জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও অন্যান্য সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানগুলোকেই তিনি যথেষ্ট মনে করেছেন। যা নিতান্তই পরস্পরবিরোধী একটি অবস্থান। কেমন যেন, আগুনের মাঝে পানির সন্ধান করা। তিনি যে ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছেন তার একটি সীমাবদ্ধতা হলো, ‘ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধ্বংস হওয়া জরুরি’, এটি তিনি মনে করতেন না। বরং তিনি এ-ধরনের সরকার ব্যবস্থাকেই দ্বীন বিজয়ের মাধ্যম হিসেবে জোর দিয়েছেন। তিনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রনীতি ও সেক্যুলার শাসনব্যবস্থাকে গতানুগতিক সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানসমূহের মতো মনে করেন না। বরং ইসলামী নেতৃত্বের রূপরেখার আলোচনার সময় গণতান্ত্রিক ধারার সম্রাটদের ব্যাপারে মুরতাদ হওয়ার কথা বললেও গণতন্ত্রের ব্যাপারে রিদ্দাহর ফাতওয়া দেন না। তাঁর মতে খিলাফতে রাশিদাও শরীয়াহভিত্তিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভিন্ন অন্য কিছু ছিল না! যা কিনা মাওলানার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে অনবগতিরই পরিচায়ক। মাওলানা মওদুদির চিন্তাধারাকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে (চাই তা পাকিস্তানে হোক, বাংলাদেশে হোক কিংবা ভারতে), প্রকৃতপক্ষে তা এই চিন্তাধারার ত্রুটিগুলো দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। এই চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগ থেকে পরের ১৩০০ বছর যে ইসলামী শাসন যেভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল, তা কোনোদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এটি উল্টো সেক্যুলার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ইসলামী শাসনব্যবস্থা নাম দিয়ে জায়েজ সাব্যস্ত করার নামান্তর। …এ আশঙ্কার কথা মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহী ১৯৫৭ সালে আলোচনা করেছিলেন। তিনি বলেন, “কত দল অস্তিত্ব লাভ করছে মহান লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য; কিন্তু দলগুলো প্রতিষ্ঠা লাভের পর ধাপে ধাপে তা নিজেই স্বতন্ত্র একটি লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে পরিণত হয়ে যাচ্ছে, আর আসল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।” এ থেকে প্রমাণ হয়, কর্মীদের মধ্যে ইসলামের মজবুতিতে ভূমিকা রাখার এবং শাহাদাতের আগ্রহ নিঃশেষ হতে শুরু করেছে। যত দিন যাবে সেক্যুলারাইজেশন জামায়াতে ইসলামীকে ততই একটি সাধারণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে থাকবে। চলমান প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর শক্তি বেড়েও যেতে পারে। এখানে বেড়ে যাবার অর্থ হলো, ইসলামের নামে গণতান্ত্রিক কাজকর্মকে জনসাধারণের সবাই মেনে নিবে। তবে এভাবে শরীয়াহ’র বিধান প্রতিষ্ঠা হবে না। কেননা, জনসাধারণের খাহেশাতের অনুগমন আবশ্যকীয়ভাবে আল্লাহর ইবাদাতকে নাকচ করে দেয়। জামায়াতে ইসলামীর বরং সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ইসলামী শাসনের অধীনস্ত হওয়ার যোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা দরকার। গণতান্ত্রিক মেহনত আদতে জনগণের প্রবৃত্তিপূজারই বহিঃপ্রকাশ। আর জনগণের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব ও খাহেশাতের দিকে মনোযোগ দেওয়া রবের ইবাদাত ও সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে উন্নতি দান করতে পারে না, বরং তা উদগ্র স্বাধীনতা ও প্রবৃত্তির ঘোড়া ছুটাতে সাহায্য করে। প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টার সফলতা—চাই তার ধরন ইসলামী হোক বা গাইরে ইসলামী—আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টাকে উন্নত করতে পারে না। এসব গণতান্ত্রিক আন্দোলন যখন ব্যাপক হয়, তখন ইসলামী বিপ্লবের প্রচেষ্টা আধুনিক বামপন্থী, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট বা লিবারেল আদর্শের সঙ্গে মিলে যায়। এ কথাটি লিয়াকত আলী খান সাহেব ১৯৪৯ সালে খুব ভালোভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তিনি বলেন, “পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ইসলামী নাম দিয়ে জায়েজ সাব্যস্ত করা, পাকিস্তানে একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।” তুরস্কের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রমাণ হয়েছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে কোনো ইসলামী দল রাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না; বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ইসলামী দলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আর এ কাজ বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে তো অসম্ভবই; কারণ আমরা নির্বাচনে শুধু হেরেই যাচ্ছি (এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের ওপর বড় ইহসান)। এ দিকে আরববিশ্বের বর্তমান অবস্থা ও ফলাফল তো পরিষ্কার। যদি এ কথা সঠিক হয় যে, আরবের ইসলামী আন্দোলনগুলো মাওলানা মওদুদি (রহিমাহুল্লাহ)-এর গবেষণার ফসল, তাহলে আমি আবারও বলব যে, এই চিন্তাধারা ও মানসিকতা গোটা মুসলিম বিশ্বে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ইসলামের নাম দিয়ে জায়েজ সাব্যস্ত করতে ভূমিকা রেখেছে। অপরদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক বড় অবদান রেখেছে। এই কথাটি এ বিষয়ের কারণেও পরিষ্কার যে, ইসলামী দল, ছাত্র ও শ্রমিক দলগুলোর সাথে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী দল, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টি বা ইউনিয়নসমূহের ইশতেহার ও কার্যপদ্ধতির মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য আজ দেখা যায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকরভাবে সেক্যুলারিজম বাস্তবায়ন করার সর্বোৎকৃষ্ট প্রক্রিয়া। গণতন্ত্র যখন থেকে সবার কাছে গৃহীত হতে শুরু করেছে, তখন থেকে দ্বীন ইসলামের মজবুতিও নিঃশেষ হতে শুরু করেছে। [ডক্টর জাভেদ আকবর আনসারি রচিত ’কেয়া জুমহুরিয়াত কে যারিয়ে ইসলামী ইনকিলাব মুমকিন হ্যা?’ প্রবন্ধের অনুবাদ] ব্যর্থতার ইতিহাস ইসলামি বিপ্লবী আন্দোলনের পথ ত্যাগ করে বিগত একশ বছরে বিভিন্ন দেশে ইসলামপন্থীরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে। সকল ক্ষেত্রেই তাদের দুই পরিণতির একটির শিকার হতে হয়েছে- √ উপর্যুপরি ব্যর্থতা, সেক্যুলারদের দমনপীড়নের মুখে একসময় নিঃশেষ ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া। √ অথবা পুরোদস্তুর গণতান্ত্রিক দলে পরিণত হয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে বিলীন হয়ে যাওয়া। সংক্ষেপে বিভিন্ন দেশের ইখওয়ানি-জামাতি ধারার আন্দোলনের ব্যাপারে আলোচনা করা তাই প্রয়োজন, যেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অসারতা আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। ১. ইখওয়ানুল মুসলিমীন। ১৯২৮ সালে মিশরে হাসান আল বান্না (রহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ইসলামী আন্দোলন, যারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে ও দেখিয়ে থাকে। তিউনিসিয়ার আন-নাহদা, ইয়েমেনের আল ইসলাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, উপমহাদেশের জামায়াতে ইসলামী এই আন্দোলনের নেতা ও আলিমদের মানহাজের অনুসরণ করে। তাই ইখওয়ানের ইতিহাস মূলত আমাদের দেশের জামায়াতেরই ইতিহাস, বা ‘ইসলামী’ গণতান্ত্রিক আন্দোলনেরই ইতিহাস! ইখওয়ানুল মুসলিমীন, জামায়াত বা আন-নাহদার মানহাজ বুঝতে ‘আল-মুসাওওয়ার’ ম্যাগাজিনের এক সাক্ষাৎকারে দেওয়া ইখওয়ানুল মুসলিমীনের প্রধান মুরশিদের বক্তব্য দেখা যাক। উনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “আপনারা কি পশ্চিমা গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী?” জবাবে তিনি বলেছিলেন, “আমরা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। এটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আর গণতন্ত্রই যেহেতু মানবরচিত সর্বোপযোগী ব্যবস্থা, যেখানে স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি রক্ষা হয়, তাই এর সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই।” তাকে আরও জিজ্ঞেস করা হয়, “ক্ষমতা গ্রহণের পর রায় প্রদানের কর্তৃত্ব কাদের হাতে থাকবে? আহলুল হাল্লি ওয়াল ‘আক্বদের (সুনির্দিষ্ট ইসলামী উলামা, নেতৃত্ববৃন্দ্ব) হাতে থাকবে, নাকি সংসদীয় পদ্ধতিতে নির্বাচিত সাংসদদের হাতে?” জবাবে তিনি বলেন, “ক্ষমতা দখলের আলাদা কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। তবে জনগণ আমাদেরকে নির্বাচিত করলে, আমরা সেটা প্রত্যাখ্যান করি না। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বর্তমান সময়ে জনগণের অভিব্যক্তির যথোচিত প্রতিফলনের ক্ষেত্রে সংসদীয় পদ্ধতিই সর্বাধিক উপযুক্ত মাধ্যম।” ইসলামের মৌলিক অবস্থানের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হবে, লিবারেল পশ্চিমা বিশ্ব কখনোই এটা মেনে নেয়নি ও নেবে না। এই সহজ বাস্তবতাকে বুঝতে ইখওয়ান, জামায়াত ও সমমনারা ব্যর্থ হয়েছে। এ মানহাজ অনুসরণ করে ক্ষমতার আসন গ্রহণ করার জন্য বেছে নিতে হবে অন্তঃসারশূন্য, ধর্মনিরপেক্ষ, বেহাত, বিকলাঙ্গ এক বিকৃত পন্থা। ইখওয়ানি গণতন্ত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করলে ওপরের যথার্থতা সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে। ইতিহাস ইখওয়ানের এ সমস্ত ব্যর্থ গণতান্ত্রিক উদাহরণে ভরপুর। সত্যান্বেষী ব্যক্তিরা সাম্প্রতিক ইতিহাসের অল্প কিছু পাতা উল্টালেই হতবাক হয়ে এ জাতীয় ব্যর্থ গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেখতে পাবেন। বিষয়টিকে আরও সুস্পষ্ট করার লক্ষ্যে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরছি। এসব ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা সে সমস্ত লোকদের, যাদেরকে বলা হয়ে থাকে গণতান্ত্রিক ইসলামপন্থী অথবা ‘মধ্যমপন্থী’। ২. আলজেরিয়া ইসলামপন্থীদের জন্য যে গণতন্ত্র কার্যকরী নয়, আলজেরীয় অভিজ্ঞতা তার সর্বাধিক সুস্পষ্ট উদাহরণ। আলজেরিয়ার ‘ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট’ নামের দলটি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইখওয়ানের নীতিমালা গ্রহণ করেছিল। রাজনৈতিক যুদ্ধ হিসেবে গণতন্ত্রকে গ্রহণ করেছিল পার্লামেন্টে প্রবেশ করে ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে। দলটি তাদের প্রথম নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেছিল। অতঃপর ক্ষমতা গ্রহণের দিকে কিছুদূর এগোতেই পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনে সেনা অভ্যুত্থান ঘটে । নির্বাচনের ফলাফল বাতিল হয়ে যায়। দলের প্রতীক বাজেয়াপ্ত করা হয়। নেতা-কর্মীদেরকে আটক করে নির্বাসিত করা হয় মরুভূমিতে। তাদের অপরাধ হলো, নির্বাচনে কেন তারা বিজয় অর্জন করল? আর এভাবেই জেল-জুলুমের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রহসন সমাপ্ত হয়, আর নতুন করে সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ৩. ফিলিস্তিন ‘হারাকাতুল মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়া’ বা ‘হামাস’ ফিলিস্তিনের বিধানসভা নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন করেছিল। কিন্তু তারপর কী হয়েছে? সারাবিশ্ব দ্রুত ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর অন্যায় অবরোধ আরোপ করেছে! এই অবরোধ আরোপের উদ্দেশ্য ছিল, জনগণকে দুর্বল করে দেওয়া এবং ইহুদিদের জবরদখলকৃত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে হামাসের রাজনৈতিক স্বীকৃতি কেড়ে নেওয়া। সেই তখন থেকে আজ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক এই সমস্ত প্রহসনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ৪. তিউনিসিয়া আশির দশকের শেষের দিকে প্রাথমিক নির্বাচনগুলোতে ‘হিযব আন নাহদা আল-ইখওয়ানি’ বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেছিল। আর এই বিজয়ের মাধ্যমেই ইসলামী এই সংগঠনের পতনের সূচনা হয়। দলটি ভেঙে দেওয়া হয় এবং নেতা-কর্মীদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। জনগণের পক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত নেতৃবৃন্দকে স্বদেশ থেকে উৎখাত করে প্রবাসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে “হিযবুন নাহদা আল-ইখওয়ানি” নেতৃবৃন্দের সে সময় প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় তাগুত প্রেসিডেন্ট যাইনুল আবেদীন ইবনে আলীর রোষানল থেকে আত্মরক্ষা করা। এছাড়াও, আরব বসন্তের পর ক্ষমতা চর্চার কিছুদিন পার না হতেই সেক্যুলার প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয় আন-নাহদা। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামপন্থীদেরকে আরও কোণঠাসা করা হয়। ৫. তুরস্ক ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় যাবে, তুর্কির জাহিলি মনোভাবাপন্ন লোকেরা কোনো অবস্থাতেই এটা মেনে নেয়নি। পূর্ব অভিজ্ঞতা ও ঘটনাপ্রবাহ একাধিকবার এটা প্রমাণ করেছে। তবে এক শর্তে তারা এটা মানতে রাজি ছিল, ইসলামপন্থীদের দ্বীন থেকে পুরোপুরি সরে আসতে হবে। যদি তা না করা যায়, তবে ইসলামপন্থীদের পরিণতি হচ্ছে- কারাবরণ করা, বিতাড়িত ও দেশান্তরিত হওয়া, বিচারের মুখোমুখি হওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া। নাজমুদ্দিন আরবাকান নেতৃত্বাধীন সালামা পার্টি (MSP) কয়েক দশক আগে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ লাভ করে। আরবাকান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। ইহুদি ভাবাপন্ন সামরিক বাহিনী ইসলামী আন্দোলনের এই জাগরণের মুখে সেনা অভ্যুত্থান ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় খুঁজে পেল না। তাই তারা গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে দেশে স্বৈরশাসন ফিরিয়ে আনে। সেনা অভ্যুত্থানের পর কয়েক বছর না যেতেই সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক প্রহসন শুরু করে দেয়। সালামা পার্টি ফজিলত পার্টি নাম ধারণ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট লাভ করে সেনা নিয়ন্ত্রিত কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। আঙ্কারার সিংহাসন টিকিয়ে রাখার জন্য অযৌক্তিক বহু ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও নব্য জাহিলিয়্যাত-প্রিয় তুর্কিদের মনোরঞ্জন করতে তারা সক্ষম হয়নি। সংগত কারণেই রাজনৈতিক ক্যানভাসে নতুন চিত্র আসে। নাজমুদ্দিন আরবাকানসহ দলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বিচারের মুখোমুখি হন। ইসলামী দলটি ভেঙে দেওয়া হয় এবং নাজমুদ্দিন আরবাকান ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন। এমনকি শেষ পর্যন্ত তিনি রাজনীতি থেকেই নিষিদ্ধ হন। গণতন্ত্র-প্রেমিকদের অভ্যাস অনুযায়ী তুরস্কের ইসলামপন্থীরা দ্বিতীয়বার রাজনীতিতে আসার প্রচেষ্টা চালান। এবার ‘ওয়েলফেয়ার পার্টি’ (কল্যাণ সংগঠন) নামে তারা দল ঘোষণা করেন। অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে এ দল পরাজয় বরণ করে এবং অল্প সময়ের ভেতর তা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত রজব তাইয়্যেব এরদোগান নতুন দল গঠন করেন, যার নাম দেন Adalet ve Kalkınma Partisi (AKP)। ইসলামবান্ধব ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে তিনি দলটি প্রতিষ্ঠা করেন! দলটি পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে সরকার গঠন করে। তবে সেই ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর ইসলামের লেবাস চড়ানো হয়। সবমিলিয়ে উদ্দেশ্য হলো, লিবারেল পশ্চিমা বিশ্বের মর্জি যেন রক্ষা হয়। পাশাপাশি তুরস্ক রাষ্ট্রের মূল নিয়ন্ত্রক যায়োনিস্ট সেনাবাহিনীকে তোয়াজ করে চলা যায়। ক্রোয়েশিয়া সফরকালে তুরস্ককে সকলপ্রকার দ্বীন থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখার নিশ্চয়তা দিয়ে এরদোগান বলেন, “এ ব্যাপারে আমার অবস্থান সকলেই জানেন। বাস্তবতা হচ্ছে রাষ্ট্রের উচিৎ সকল ধর্ম থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখা।” এছাড়াও, ইসরায়েলের সাথে এরদোগানের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ন্যাক্কারজনক ঘটনাও সচেতন সকলেরই জানা রয়েছে। ৬. ইয়েমেন প্রকৃতপক্ষে ইয়েমেনে ইখওয়ানুল মুসলিমীনের পরিণতি হৃদয়দগ্ধ করা মর্মান্তিক এক অভিজ্ঞতা। আব্দুল মাজিদ আল-জিনদানির নেতৃত্বে ইখওয়ান (ইয়েমেনে ‘আল ইসলাহ’ নামে পরিচিত) ক্ষমতা গ্রহণের দিকে কিছুদূর অগ্রসর হতে না হতেই এই জামাআত ইতিহাস হয়ে যায়। সেক্যুলার, আমেরিকান দাস আলী আব্দুল্লাহ সালেহকে নিঃশেষ করার জন্য দশ লক্ষ সশস্ত্র ইয়েমেনি প্রেসিডেন্ট ভবন ঘেরাও করেছিল। কিন্ত আব্দুল মাজিদ আল-জিনদানির ‘হেকমতের’ কারণে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। প্রকারান্তরে, তিনি ইয়েমেনের এই তাগুতকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন মুসলিমদের ঘাড়ে চেপে বসার জন্য। আব্দুল মাজিদ আল-জিনদানির হেকমত দশ লক্ষ সদস্যের সেই দলটি ভেঙে দিল; যাদের দাবি ছিল, (ইসলামী) শরীয়তই হবে আইনপ্রণয়নের প্রধান উৎস। এরপর সরকার গঠন হলো। জিনদানি সে দেশের উপপ্রধান হয়ে গেলেন। আর এদিকে আলী আব্দুল্লাহ সালেহ ষড়যন্ত্র করে সালেম আলবাইদ্ব-এর নেতৃত্বে পরিচালিত দক্ষিণাঞ্চলের সংকট মোকাবিলায় ইখওয়ানকে ব্যবহার করতে লাগল। দক্ষিণাঞ্চলের নেতৃবৃন্দকে পার্লামেন্টে রাজনৈতিকভাবে বয়কট করা হলো। আলবাইদ্ব ও তার অনুচরেরা ওই অবস্থায় উত্তরাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখল না। যুদ্ধ শুরু হলো। সেই যুদ্ধে ইখওয়ানের যুবকেরা ত্যাগের বিরাট দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। যুদ্ধে অল্প সময়ের ভেতর দক্ষিণাঞ্চল পরাজিত হলো। উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে তা পুনরায় যুক্ত হলো। দ্বিতীয়বার নির্বাচন দেওয়া হলো। তখন বিভিন্ন সেবামূলক মন্ত্রণালয়ের দায়-দায়িত্ব ইখওয়ানের লোকদের কাঁধে অর্পণ করা হলো। এদিকে তাদের মন্ত্রণালয়ের কাজে অর্থ খরচ করতে বাধা দেওয়া হলো। উদ্দেশ্য ছিল, জনগণের সামনে তাদেরকে ব্যর্থ হিসেবে উপস্থাপন করা। নিজেদের মন্ত্রণালয় পরিচালনায় তারা অক্ষম; অর্পিত দায়িত্ব পালনে তারা অপারগ—মানুষকে এমনটা বোঝানো। বাস্তবেই কুচক্রী আলী আব্দুল্লাহ সালেহ যা চেয়েছিল তাই হয়েছে। ধীরে ধীরে ইখওয়ানের বলয় সঙ্কুচিত হয়ে আসলো। সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের অবদান রাখার সুযোগ কমে গেল। অথচ একসময় তারা শাসন ক্ষমতা প্রায় লাভ করেই বসেছিল। আরব বসন্ত পরবর্তী বাস্তবতায় ইখওয়ান ক্ষমতার বলয় থেকে তো বটেই, ইসলামি আন্দোলনের ময়দানেও একদমই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। ৭. মিশর দীর্ঘ প্রায় ৯০ বছর পর, আরব বসন্তের বদৌলতে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আরোহণ করা ইখওয়ান এক বছরেও রাষ্ট্রকে ইসলামী আইনের অধীনে আনতে সক্ষম হয়নি। বরং ২০১৩ এর লিবারেল পশ্চিমা বিশ্ব সমর্থিত সামরিক ক্যু-এর মাধ্যমে ইখওয়ান অপসারিত হয়। প্রেসিডেন্ট মুরসি, মুরশিদে আম মাহদি আকেফ (রহিমাহুল্লাহ) বন্দি অবস্থায় মারা যান। গণহত্যা ও গণবন্দিত্বের এই ফলাফল ইখওয়ানের পরিণতি আলজেরিয়ার ঘটনারই পুনরাবৃত্তি মাত্র! ৮. বাংলাদেশ জিয়াউর রহমানের আমলে গোলাম আজমের নেতৃত্বে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করা ইখওয়ানি মানহাজের দল ‘জামায়াতে ইসলামী’ কখনো বিএনপি আবার কখনো আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে সামান্য ক্ষমতা চর্চার বাইরে বিশেষ কিছু অর্জন করতে পারেনি। ২০০১ সালে চার দলীয় জোটের অন্যতম শরিক হিসেবে সংসদ ও মন্ত্রীসভায় জামায়াত নেতাদের অংশ থাকলেও, পাঁচ বছরে একটিও ইসলামী আইন বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তারপর ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর, আওয়ামী সরকার জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেয়। এবং এক পর্যায়ে দলের নিবন্ধন বাতিল করে। ঠিক যেন ইয়েমেন, আলজেরিয়া আর মিশরেরই পুনরাবৃত্তি। ব্যর্থ গণতন্ত্রের এমন উদাহরণ অনেক দেওয়া যাবে। হয় সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতারা মুজাহিদ ও অন্যান্য ইসলামপন্থীদের উত্থান ঠেকাতে আদর্শিক আপসে সম্মত হওয়া ইখওয়ানিদের ক্ষমতার কোণে সাময়িক জায়গা দিয়েছে। অতঃপর আবার ছুঁড়ে ফেলেছে, অথবা কুসুম-কোমল বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর নিরাপদ সংগ্রামীদের কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠে আবদ্ধ করেছে। অর্থাৎ, ইসলামী বিশ্বের পূর্ব থেকে পশ্চিমের ইখওয়ানি ধারার ইসলামী গণতান্ত্রিক দলসমূহের পরিণতি দুটির একটিই হয়েছে, ক) আদর্শের সাথে আপস। শরীয়াহ’র স্থলে সেক্যুলার রাজনীতিতে বিলীন হয়ে যাওয়া। অথবা, খ) গণতান্ত্রিক রাজনীতি থেকেই বিদায়। তাই, আদতেই যদি কেউ সত্যকে ভালোবাসেন, দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এসে মুক্তমনে ইসলাম ও মুসলিমদের ওপর গণতন্ত্রের কুফল নিয়ে চিন্তা করেন, তবে ইন শা আল্লাহ বাস্তবতা অনুধাবন করা সম্ভব হবে। সবশেষে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ইসলামপন্থীদের জন্য শায়খ সামি আল উরাইদির পুরোনো কথাটিই স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায়— “বুদ্ধিমান তো সেই ব্যক্তি, যে অন্যের পরিণতি দেখে শিক্ষা নেয়। আর হতভাগ্য তো সেই ব্যক্তি, যে নিজে আক্রান্ত হয়েও শিক্ষা নেয় না।”