(১) পশ্চিমাদের হাতে মুসলিম বিশ্বের আধিপত্য খর্ব হওয়ার পর থেকে শুরু হওয়া সংঘাত ও আন্দোলনগুলোর কার্যকারণ ও পরম্পরা সম্পর্কে অসচেতনতা আমাদের দেশে ইসলামি আন্দোলনগুলোর ক্রমাগত ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। অসফল আন্দোলন বলতে কেবল গণতান্ত্রিক দলগুলোকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে, এমন নয়। বরং, গতানুগতিক ‘নিয়মতান্ত্রিক’ মেহনতের বাইরে গিয়ে যারা 'জিহাদি' চিন্তাধারার প্রস্তাবনা নিয়ে হাজির হয়েছেন বিগত চার দশকে, তারাও এতে অন্তর্ভুক্ত। সবার চেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা ও মুল্যায়নের দাবি স্মরণে রেখেই বলতে হচ্ছে- আমাদের জন্য এটা নিশ্চিত করা জরুরি যে, মুসলিমদের রক্ত আর ঘাম যেন বৃথা না যায় এবং ভবিষ্যত প্রজন্ম আত্মত্যাগের সুফল ভোগ করতে পারে। এটাও ঠিক যে, আল্লাহ তা’আলার কাছে সেক্যুলার রাজনীতির পথ ধরা গণতান্ত্রিক গোষ্ঠীর তুলনায় শারঈভাবে তাদের জবাবদিহিতা ইন শা আল্লাহ অনেক কম। তবে, যারা অন্যায় রক্তপাত ঘটিয়েছে, মানুষের সম্মান ও সম্পদের উপর অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করেছে- তাদের কথা ভিন্ন। যেমন, আহলুস সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত সংগঠন দায়েশ বা আইএস ঢালাও তাকফির ও রক্তপাতের সাথে সম্পৃক্ত এটা সবাই জানে। এছাড়াও, অন্যান্য কিছু সংগঠনের মাঝেও অন্যায় রক্তপাত ও বিভ্রান্তি প্রকাশ পেয়েছে, যার সাথে একমত পোষণ করার সুযোগ নেই। 'জিহাদি' আন্দোলনের ব্যানারে এদেশের ইসলামপন্থীদের বড় একটি অংশ নিজেদের সময়, শ্রম ও ত্যাগ নিবেদন করা সত্ত্বেও পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছে যে- ইসলাম ও জিহাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে জনপরিসরে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বাংলাদেশি 'জিহাদি' আন্দোলনের পরিণাম শেষ অবধি খুব একটা ভালো হয়েছে বলা যায় না। জিহাদের ঘোষণা দিয়ে দ্বীনি আবেগ লালনকারী যুবকদের সন্নিবেশ ঘটানোর সাময়িক ফায়দা সংগঠনগুলো কমবেশি পেলেও, বাস্তবতা এটাই যে- গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে এই সংগঠনগুলো নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। আর না পেরেছে ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমে মুসলিমদের আস্থা অর্জন করতে। বরং, বিচ্ছিন্ন সহিংসতা, ভাসাভাসা বয়ান ও অপরিপক্ক কর্মপদ্ধতির দরুণ জনবিচ্ছিন্নতাই হয়েছে সংগঠনগুলোর শেষ পরিণতি। বর্তমানে সংগঠনগুলো অনেকটা বিলুপ্তপ্রায়ই বলা যায়। তবে যেহেতু পূর্ববর্তী দলগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত বা নির্মোহ আলোচনার অভাব রয়েছে- তাই সামনের দিনে একইরকম ভুল চিন্তাধারা ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে অন্যরা হাজির হবার সম্ভাবনা থেকেই যায়। আগের দিনের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাবেই তা বলা কঠিন, তবে তা যেন আশংকাজনক মাত্রায় না পৌঁছে- সে চেষ্টাটুকু করা উচিৎ। যেন নেককার ইসলামপন্থীদের মেহনত ও আত্মত্যাগের ফসল উম্মাহর ঘরে ওঠে। শায়খ মুস্তফা নাসির নিকট অতীতের নবুওয়াতী মানহাজের উপর পরিচালিত বিপ্লবীদের তিনটি প্রজন্মে ভাগ করেছেন। এবং চলমান ৩য় প্রজন্মকে আহ্বান করেছেন আগের দুই প্রজন্মের ফিকির ও মেহনতের সাথে নিজেদের যুক্ত করতে। শুধুমাত্র হাকিমিয়্যাহ, গণতন্ত্র বা দারুল হারবের মাসআলায় সঠিক অবস্থান জানাকেই যারা মানহাজের ব্যাপারে জ্ঞান রাখা মনে করেন, তারা আসলে হকপন্থী উলামা ও নেতৃত্বের ফিকির, মেহনত ও পরিকল্পনা জানার ব্যাপারে মনোযোগ দেননি। ফলে আমরা দেখি, সালাফদের চিন্তাধারা ও আন্দোলনের আলোকে কার্যকর মানহাজের রূপরেখার আলোকে গোপন 'জিহাদি' সংগঠনগুলো পরিচালিত হয়নি। আমাদের দেশে যাদেরকে 'জিহাদি' শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়, বিগত ৩০ বছরে তাদের মেহনত, বিবৃতি, অডিও-ভিডিও, প্রবন্ধ ও প্রস্তাবনা বিশ্লেষণ করলে, এ বাস্তবতাই উঠে আসে। এ দুঃখজনক বাস্তবতার মূল কারণ হল, এই বিশুদ্ধ আন্দোলনের পতাকাবাহী সংগঠন ও নেতৃত্বের লেখনি, মেহনত ও ফিকিরের ব্যাপারে হতাশাজনক পর্যায়ের উদাসীনতা। বিষয়টি এ ধারার প্রায় সকল সংগঠনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শায়খ মুস্তফা নাসির তাঁর বইয়ে এ ব্যাপারে অত্যন্ত উপকারী আলোচনা করেছেন। যে আলোচনার নির্যাস হচ্ছে— “১৯২৪ সালে খেলাফতের পতন হয়। এরপর আমাদের স্পষ্ট দুশমনরা অর্থাৎ রোমানদের উত্তরসূরী পশ্চিমারা ও তাদের দেশীয় দালালরা আমাদের সাথে দ্বীনি, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ময়দানে যা ক্ষতিই করেছে—তার সমস্ত দিকের জ্ঞান বিপ্লবী প্রজন্মের থাকা উচিত। হক ও বাতিলের মাঝে চলমান সংঘাতের সারকথা ইতিহাস অধ্যায়নের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। যখন আপনি ইতিহাস পড়বেন এবং এই বৈশ্বিক কুফরের অনিষ্টতা, কপটতা উপলব্ধি করবেন, কেবল তখনই বুঝতে পারবেন, কেন সংঘাত ও আন্দোলন অপরিহার্য ছিল। যখন থেকে সেক্যুলার লিবারেল পশ্চিমা আধিপত্য বিশ্বে প্রবল হয়েছে, তখন থেকেই এই অপশক্তি কিভাবে মানবতা ও মানুষের হকের ক্ষতি করে আসছে, তা যখন বুঝে আসবে, তখন আন্তরিকভাবে বুঝতে পারবেন- কেন আপনারা সংগ্রাম করছেন এবং এই সংঘাত ও বিপ্লবের প্রয়োজন কেন। ভবিষ্যৎ মারহালার জন্য ধারাবাহিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ এক মানহাজ পেশ করার জন্য আমি লিখছি। অতীত অধ্যায়ন এবং এর ব্যাপারে অবগত হওয়া একটা লম্বা শিকলের ন্যায়, যা মানবজাতি ও সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে আমাদের সংযুক্ত করে। অতীত ইতিহাস ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে সাধারণ বিপ্লবী বা মুজাহিদরা যদি অজ্ঞ হয়, তাহলে তা ব্যক্তিগতভাবে তার জন্য ঠিক হতে পারে। তার জন্য এ সমস্ত কথার এত জরুরত নেই, সে আনুগত্য করে যাবে। কিন্তু সুনির্বাচিত, অগ্রগামী বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ এবং ভবিষ্যতে আগত প্রজন্মের জন্য একথার অনুমতি নেই যে, তারা এই চলে যাওয়া যুগ ও বিপ্লব, সংগ্রামের পর্যায় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে না। অতীত প্রজন্ম থেকে উপদেশ হাসিল করবে না, ঘটনাবলীর হিকমতকে বুঝবে না, এটা তাদের জন্য জায়েজ নয়। সাধারণ সদস্য বা আনুগত্যকারীর জন্য এর অনুমতি থাকতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি উম্মাহর নেতৃত্ব দিতে চায়, নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রজন্মের খেদমত করতে চায়- এসব ব্যাপারে অজ্ঞতার ব্যাপারে তার কোনো অজুহাত নেই। ইসলামি শাসন, উসমানি খেলাফতের পতন কেন হয়েছে, কোন লোকদের হাতে হয়েছে? এই ইহুদি-খ্রিস্টান পশ্চিমা সভ্যতা আমাদের কি কি ক্ষতি করেছে? এ বিষয়গুলো তার জানা থাকা উচিত। এমনকি পৃথিবীর সুচনা থেকে আজ পর্যন্ত হক ও বাতিলের মধ্যে যে লড়াই চলছে, তার দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য কী এবং তার ত্রুটি কোথায়, সবই জানা মুজাহিদদের জন্য জরুরি। তাই এই সময়ের মুসলিমদের হাতিয়ারসমূহের মধ্যে এক অতি গুরুত্বপূর্ন হাতিয়ার হলো এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। উস্তাদ আব্দুল কাদের আওদাহ বলেন, “জাহেল ব্যক্তি এই উম্মতকে চালাতে পারবে না, চাই তার যতই ইখলাস থাকুক না কেন।” অর্থাৎ, ইসলামি আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের ফিকিরের পরিচ্ছন্নতা ও বাস্তবতার যথাযথ জ্ঞানের আলোকে ভবিষ্যত কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে। নয়তো ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণে ব্যাপক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না। কিন্তু শায়খের এই সতর্কবাণী বাংলাদেশে 'জিহাদি' সংগঠনগুলোর কাছে না পৌঁছানোর কারণেই হোক আর একদেশদর্শী চিন্তার কারণেই হোক- তারা সঠিক মানহাজ ও বিশুদ্ধ ফিকিরের আলোকে আন্দোলন ও সংগঠন নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়। বিশেষত, নিদারুণ ব্যর্থতার জন্য সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকেরা এক্ষেত্রে দায় এড়াতে পারেনা। (২) সপ্তদশ শতাব্দীর ওয়েস্টফিলিয়া চুক্তি, ব্রিটেনের ‘গ্লোরিয়াস’ বিপ্লব, অষ্টাদশ শতাব্দীর মার্কিন ও ফরাসী বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ এবং উসমানী সাম্রাজ্যের পতনের ফলে, ইউরোপের জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে যায়। গত শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বে এই ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, সারা বিশ্বে এই ব্যবস্থা মজবুতভাবে জেঁকে বসেছে। এই শাসনযন্ত্রের বিপরীতে বিপ্লবী কার্যক্রম পরিচালনার প্রক্রিয়া অল্প কয়েকটি ধারাতেই সীমিত হয়ে গেছে। আবার, স্নায়ুযুদ্ধের দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়ার ফলে চলমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কার্যক্রম ও সংগঠনের রাজনৈতিক লাইনের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা নেয়ার ক্ষেত্রে এসকল সেক্যুলার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো থেকে কিছু বিশ্লেষণ মুসলিমদের গ্রহন করার প্রয়োজন হয়েছে। যেমন: ▪ পিরামিড ধাঁচের ‘হায়ারার্কিক্যাল’ গোপন সংগঠনের ধারণার বড় একটি অংশ এসেছে ভ্লাদিমির লেনিন ও রুশ বিপ্লবীদের কর্মপন্থা থেকে। ▪ হিকমাতুল্লাহ লোদীর ‘নিসাবে হারব’ চীনের বিপ্লবী গেরিলা যুদ্ধের উপর লেখা বইয়ের আলোকে রচিত।
▪ শায়খ আব্দুল্লাহ খালিদ আদমের “বৈপ্লবিক যুদ্ধসমূহ”-এ মাও সে তুং-এর এবং আরও একাধিক প্রবন্ধে প্রুশিয়ান জেনারেল ক্লাউসভিতস এর চিন্তাধারার বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ইসলামি আন্দোলনের ধারণার পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ‘চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধ’/Fourth generation warfare –এর ধারণা তিনি নিয়েছেন মার্কিন বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষকের গবেষণা থেকে।
▪ শায়খ মুস্তফা নাসির লিডারলেস বা নেতৃত্বহীন আন্দোলনের ধারণা এনেছেন মার্কিন ফার রাইট বা উগ্র ডানপন্থী আন্দোলনের তাত্ত্বিকদের থেকে।
কাজেই বিপ্লব এবং সংগঠনের কর্মপদ্ধতির মতো বিষয়গুলোতে বিভিন্ন ঘরানা থেকে প্রয়োজনমতো উপাদান গ্রহণ করার বিষয়টি ইসলামি আন্দোলনের ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।
আমাদের আলোচনার জন্য, আমরা বামপন্থী বৈপ্লবিক আন্দোলনের ধারার দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি। মার্ক্সবাদী আন্দোলনকে সাধারণত মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট আন্দোলন বলা হয়। যার বাস্তব সফলতা প্রথম দেখা যায় লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে সংঘটিত অক্টোবর বিপ্লবে।
আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ কর্তৃক নির্ধারিত অগ্রগামী ভূমিসমূহের দিকে তাকালে এবং শায়খ আবু উবাইদা আল কুরাইশি (রহ.) এর রচনাবলীর ক্ষেত্রে লক্ষ্যপাত করলে বোঝা যায় যে, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, মালি, পাকিস্তানের মতো ভূমিগুলোতে কিংবা ইরাকের ময়দানে মূলত জনযুদ্ধভিত্তিক গেরিলা আন্দোলনের ধারাকে সামনে রেখে নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিপ্লবীরা শুরু থেকেই সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকৌশলের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গড়ে তোলেন। এই সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমে স্থানীয় জনসমর্থনকে সংগঠিত করে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধযুদ্ধের কাঠামো নির্মাণ করে বিপ্লবীরা অগ্রসর হয়েছেন।
বহিঃশক্তির আগ্রাসন হলে বা স্থানীয় প্রশাসন ব্যাপকভাবে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে, বিপ্লবীরা প্রান্তীয় দুর্গম অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়বে। তারপর গেরিলা আক্রমণের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল দখলের মাধ্যমে শহর দখলের দিকে অগ্রসর হবে। কারণ প্রত্যন্ত ও গ্রামাঞ্চলে শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ দূর্বল থাকে। সংক্ষেপে এটা হল জনযুদ্ধভিত্তিক গেরিলা ধারার পদ্ধতি।
এই গেরিলা আন্দোলনের ধারা বা গোপন সহিংস আন্দোলনের ধারা—যে নামেই ডাকা হোক না কেন— আমাদের মতো দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ গেরিলা যুদ্ধের সফলতার বেশ কিছু পূর্বশর্তের ব্যাপারে মুসলিম ও অমুসলিম, সকল বিশেষজ্ঞ মোটামুটি একমত যে, এই বৈশিষ্ট্যগুলো বাংলাদেশে অনুপস্থিত।
গেরিলা আন্দোলনের পথ ধরে আমাদের দেশে ইসলামী আন্দোলনকে অগ্রসর করা সম্ভব নয়- তা মোটামুটি তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকে স্পষ্ট। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে এ ধারায় যেসব প্রচেষ্টা হয়েছে, তার প্রতিটিই ব্যর্থ হয়েছে।
এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশি 'জিহাদি' সংগঠনগুলো অনেকটা চে গুয়েভারা ও রেজিস দেব্রের ‘ফোকো পদ্ধতি’র গেরিলা আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে। ফোকো তত্ত্ব মতে, একটি ছোট গেরিলা দল (foco) গ্রামাঞ্চলে (বা শহরাঞ্চলে) সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করলে, তা ধীরে ধীরে জনগণকে আকৃষ্ট করবে এবং তা বৃহত্তর সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে পরিণত হবে।
চে গুয়েভারা লিখেন,
“It is not always necessary to wait until all conditions for making revolution exist; the insurrectional foco can create these conditions.”
অর্থাৎ, “বিপ্লবের সব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিপক্ব হওয়ার জন্য সবসময় অপেক্ষা করা আবশ্যক নয়; একটি সশস্ত্র বিপ্লবী foco (ছোট গেরিলা দল) নিজেই সেই পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।”
“A small guerrilla group can initiate the struggle and gradually develop into a larger revolutionary force.”
অর্থাৎ, “একটি ছোট গেরিলা দল সংগ্রামের সূচনা করতে পারে এবং ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হতে পারে।”
রেজিস দেব্রে লিখেন,
“It is the ‘small motor’ that sets the ‘big motor’ of the masses in motion.”
অর্থাৎ, “ছোট ইঞ্জিনই (ফোকো তথা গেরিলাদের ক্ষুদ্র দল) জনগণের ‘বড় ইঞ্জিনকে’ গতিশীল করে।”
“The smallest is the guerrilla foco, nucleus of the popular army.”
অর্থাৎ, “সবচেয়ে ক্ষুদ্র একক হলো গেরিলা ফোকো—যা গণবাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু (মূলকেন্দ্র)।”
“It is not a front which will create this nucleus, but rather the nucleus which, as it develops, will permit the creation of a national revolutionary front.”
অর্থাৎ, “কোনো বৃহৎ ফ্রন্ট এই (সাংগঠনিক) কেন্দ্রকে সৃষ্টি করবে না; বরং এই (ক্ষুদ্র গেরিলাদের) কেন্দ্রটি নিজেই বিকশিত হয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে, যার মাধ্যমে একটি জাতীয় বিপ্লবী ফ্রন্ট গড়ে উঠতে পারবে।”
অর্থাৎ, সমাজে ইসলামের ভিত্তিতে মেরুকরণ, মানুষের মাঝে বিপ্লবী ইসলামি দাওয়াহ’র বাস্তবতা স্পষ্ট থাকা এবং তীব্র গণআন্দোলন ও বিপ্লবের অনূকূল পরিস্থিতি উপস্থিত হবার আগে সহিংস হামলা যে কোনো দাওয়াহ ও সংগঠনকে জনবিচ্ছিন্ন করে দেয়- এই চিন্তার সাথে ফোকো তত্ত্বের অনুসারীরা একমত নয়। ফোকো তত্ত্বের অনুসারীরা সশস্ত্র অপারেশনের মাধ্যমে মেরুকরণ সম্পন্ন করার পক্ষপাতী।
বাংলাদেশের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর চিন্তা ছিল- প্রথমে জিহাদের ঘোষণা ও দাওয়াতকে কেন্দ্র করে যুবকশ্রেণীকে আকৃষ্ট করে গোপনে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। অত:পর, ইসলামের নামে সহিংস হামলা চলমান রাখা গেলে যুবকশ্রেনীর বড় একটি অংশ দলে দলে তাদের সাথে যোগ দিবে এবং দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলাম কায়েম হবে। যেমনটা নব্বইয়ের দশকে আফগানিস্তানে হয়েছিল।
অথচ দু:খজনক বাস্তবতা হলো- দেশীয় এই সংগঠনগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে ঢালাওভাবে কেবল আফগানিস্তানের ইসলামপন্থীদের গৃহীত সামরিক কৌশলের অনুসরণকেই যথেষ্ট মনে করেছে। ২০০১ এ আফগানিস্তান, ২০০৩ এ ইরাক বা ২০১১ তে সিরিয়াতে জনযুদ্ধ শুরু হওয়া এবং তাতে পরবর্তীতে যুবকদের ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণের মূল নিয়ামক ছিল বিদেশি আগ্রাসন বা গণআন্দোলনে সরকারের ঢালাও গুলিবর্ষণ (অনেকটা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পরবর্তী বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে নেয়া যায়) এবং তৎপরবর্তীকালে ব্যাপক অরাজকতা ও রাজনৈতিক শূণ্যতা তৈরি হওয়া। পুরো চিত্র একপাশে সরিয়ে রেখে, খন্ডিতভাবে দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরে- কোনো সংগঠন কেবল স্রেফ অস্ত্র হাতে নিয়ে বিপ্লবী আন্দোলন নির্মাণ করতে পারেনা।
বাংলাদেশের যে সকল সংগঠন গেরিলা যুদ্ধের মূলনীতিকে সামনে রেখে আফগানিস্তানের মডেলকে পূর্বাপর প্রয়োগ করেছেন, তারা খুব অধ্যায়ন করে বা বুঝেশুনে ফোকো মডেল গ্রহণ করেছেন- তা নয়। কিন্তু সাধারণভাবে তাদের গৃহীত কর্মপন্থা মূলত ফোকো পদ্ধতিকেই অনুসরণ করে।
অথচ ফোকো তত্ত্বের বড় সমস্যা হলো—শুধু গেরিলা যুদ্ধ শুরু করলেই জনগণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপ্লবে যোগ দেবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফোকো পদ্ধতির গেরিলা যুদ্ধের মডেল প্রয়োগ করতে গিয়ে চে গুয়েভারা বলিভিয়াতে ব্যর্থ হয় (১৯৬৬-৬৭) এবং রেজিস দেব্রেও পরবর্তীতে এই চিন্তাধারা থেকে সরে আসে।
বাংলাদেশে সেক্যুলারদের মধ্যেও এই ধারায় কাজের চেষ্টা হয়েছিল, তারাও ব্যর্থ হয়েছে। ষাটের দশকের একদম শেষদিকে জনযুদ্ধভিত্তিক গেরিলা যুদ্ধের লক্ষ্যে সংগঠন গড়ে তুলেছিল সিরাজ শিকদার। পরবর্তীতে জাসদের গণবাহিনীও এপথে কিছুটা চেষ্টা করেছিল। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মিলেছে ব্যর্থতা।
এ ব্যাপারে গণবাহিনীর একটি অঞ্চলের তৎকালীন নেতা, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার একটি বক্তব্য প্রাসঙ্গিক। মান্না বলেছিল–
“এ দেশে গেরিলা যুদ্ধের কোনো সুযোগ নেই।”
চীনা ধারার গ্রামকেন্দ্রিক জনযুদ্ধভিত্তিক বিপ্লব বা গেরিলা আন্দোলনের তত্ত্ব যে বাংলাদেশে অচল, এ প্রসঙ্গে বামপন্থীদের নানা বিশ্লেষণও আছে। যেমন, SUCI (Socialist Unity Center of India)-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বামপন্থী তাত্ত্বিক শিবদাস ঘোষ বলেন,
“মাও সে তুংয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রাকবিপ্লব চীনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল আধা ঔপনিবেশিক, আধা সামন্ততান্ত্রিক এবং তার চরিত্র ছিল প্রাকপুঁজিবাদী বিকেন্দ্রীভূত এবং মধ্যযুগীয় (প্রি ক্যাপিটালিস্ট ডিসেন্ট্রালাইজড মেভিয়্যাভাল নেচারের) । উপরন্তু, গোটা চীনে অখণ্ড সুসংহত কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ছিল না।
সমগ্র চীন দেশটা বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশের প্রভাবিত অঞ্চল হিসেবে আলাদা আলাদা টুকরোতে বিভাজিত ছিল এবং এই সমস্ত অঞ্চলগুলো আলাদা আলাদাভাবেই সাম্রাজ্যবাদীদের তাবেদার কতগুলো ওয়ার লর্ডদের দ্বারা শাসিত হতো।
ভারতবর্ষের বর্তমান শাসনব্যবস্থার সাথে কি এর কোন মিল আছে? বরং এখানে একটি অত্যন্ত সুসংহত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা বিদ্যমান। রাষ্ট্রের প্রকৃতির দিক থেকে আমাদের দেশের বিপ্লবের তত্ত্ব চীনের বিপ্লবের তত্ত্বের সাথে এক হতে পারে না।”
শিবদাস ঘোষের উপসংহার ছিল চীনের মতো গ্রামাঞ্চলে মুক্ত এলাকা তৈরি করে শহর দখল করার কৌশল ভারতের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। তার মন্তব্য হলো,
“লড়াইটা যে দেশেই শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিবে, সে দেশেই গেরিলা যুদ্ধের নীতি ও সংগ্রামকৌশল সেই দেশের বিপ্লবীদের গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া প্রতিটি দেশের নিজস্ব আলাদা বৈশিষ্ট্যের জন্য সেখানেই বিপ্লবী শ্রেণী শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে এই গেরিলা যুদ্ধের তত্ত্বে ও কৌশলে কিছু না কিছু সংযোজন ঘটাতে বাধ্য হবেন। তা না হলে তারাও কেবল ‘কপি’ করে চালাতে পারবেন না।
ফলে আপনারা বুঝতে পারছেন, গেরিলা যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করার সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে মুক্ত এলাকা সৃষ্টি করে শহর দখল করার সংগ্রাম কৌশল এবং জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্ব গ্রহণের, যা নকশালপন্থীরা এক করে ফেলেছেন, তার কোনো সম্পর্ক নেই।”
উম্মাহর নেতৃবৃন্দের বিশ্লেষন এবং এ ভূখন্ডের বাস্তবতার আলোকে এই অনুসিন্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, আমাদের দেশে রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে- ভারতীয় নকশালপন্থীদের মত একই কায়দায় গেরিলা আন্দোলনের কোনো সুযোগ নেই।
এমনকি চরম বৈরী হানাদার গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন সত্ত্বেও অতীত ইতিহাস এদেশে এ পদ্ধতির ব্যর্থতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। যেমন, ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামে সূর্যসেনের নেতৃত্বাধীন গেরিলা আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল।
এখানে ব্যতিক্রম হিসাবে ১৯৭১-কে টানার সুযোগ নেই। কারণ ‘৭১ এর যুদ্ধ যতটা পূর্ববাংলার, ততটাই ভারতীয়দের। এছাড়াও, স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং ১১০০ মাইল দূরের কমান্ড সেন্টার, যুদ্ধ শুরুর আগেই পশ্চিম পাকিস্তানী প্রশাসনের জেতার সম্ভাবনা শেষ করে দেয়। এর সাথে আরো যোগ করা যায় যে, ১৯৬৫ এর যুদ্ধের পর অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে আরোপিত আমেরিকান অবরোধের সুবিধা নিয়ে ভারতীয় বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার ফলে যুদ্ধ রাতারাতিই শেষ হয়ে যায়।
তাই ‘৭১ এর যুদ্ধকে ঢালাওভাবে গেরিলা যুদ্ধ বলা আসলে সঠিক না। বরং, সেমি-কনভেনশনাল দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধ বলা যেতে পারে। এতে গেরিলা যুদ্ধেরও কিছু উপাদান উপস্থিত ছিল, কিন্তু তা ঐ অর্থে গেরিলা আন্দোলন নয়। এছাড়াও, এখানে মূল নিয়ামক ছিল- তীব্র জাতীয়তাবাদী মেরুকরণ, ২৫শে মার্চের গণহত্যা ও পাকিস্তানি বাহিনীর আগ্রাসনের ফলে তৈরি হওয়া বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতা। এছাড়াও, এখানে দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের প্রেক্ষাপট আগেই তৈরি হয়েছে। গেরিলা হামলার মাধ্যমে উপস্থিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগানো হয়েছে মাত্র। গোপনে গেরিলা হামলা করে করে আওয়ামীলীগ রাজনীতি নির্মাণ করেছিল, এমন নয়। বরং, সঠিক রাজনীতি ও গণআন্দোলনের পথ ধরেই নতুন ক্ষমতা সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং এক পর্যায়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। বিচ্ছিন্ন বা আচমকা সহিংসতার পথ ধরে নতুন রাজনীতি নির্মাণের পথ অতি দুর্গম। বিশেষত বাংলাদেশে তা প্রায় অসম্ভব বলা যায়।
লক্ষণীয়, সহিংস বা সশস্ত্র আন্দোলনের প্রশ্নটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন। ১৯৭১ সালে সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক দলগুলোও সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে, ষাট ও আশির দশকের শেষ দিকে সহিংস গণঅভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিক দলগুলো নেতৃত্ব দিয়েছে। একেবারেই বিভ্রান্ত তাকফিরি, নৈরাজ্যবাদী কিংবা সুফিবাদি, গান্ধিবাদি ব্যতীত সহিংসতাকে ঢালাওভাবে ভালো বা মন্দ কেউই বলে না।
মূল বিষয় হচ্ছে- রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণমানুষের মনস্তত্ত্ব ও পরিস্থিতির তীব্রতা কি দাবী করছে, সে আলোকে কর্মকৌশল নির্ধারিত হচ্ছে কি না। কোনো ব্যক্তি বা দলই মানুষের আস্থা অর্জন না করে কেবল নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়ে পরিবর্তন ঘটিয়ে দিতে পারে না। কেবল ইসলামের পক্ষে কথা বলে আপসেই পরিবর্তন ঘটানো যাবে- এটা যেমন অবাস্তব, একইভাবে শুধু ইসলাম চাওয়ার দাবী করে সহিংসতার আশ্রয় নিলেই মানুষ কাতারে কাতারে এগিয়ে এসে ক্ষমতা অর্জনের দিকে নিয়ে যাবে- এমন চিন্তাও ভুল। উভয়টিই শারঈ ও সার্বজনীন দিক থেকে বাতিল চিন্তা।
রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে- তিউনিসিয়া, মরক্কো, মিশর বা বাংলাদেশের মতো দেশে আফগান, সোমালিয়া বা ইয়েমেনের মতো দেশগুলোর অনুসরণ করে- বিচ্ছিন্ন সহিংসতার মাধ্যমে ইসলামি শাসন ফিরিয়ে আনার চিন্তা করাটা বাস্তবসম্মত নয়।
সঠিক প্রক্রিয়ায় ইসলামী সংগঠন ও গণভিত্তি নির্মাণকে পাশ কাটিয়ে ছোট গেরিলা বাহিনী নিজেই সংগ্রামের মাধ্যমে বিপ্লবী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে—এমন ধারণা থেকে সরে আসা ছিল সময় ও নিজস্ব অভিজ্ঞতারও দাবী।
তবে বাংলাদেশের এসকল সংগঠন আসলে ফোকো পদ্ধতির মত খুব ভালোভাবে গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে কৌশলগত রূপরেখা প্রণয়ন করেছে- এমনও নয়। কেননা, ফোকো তত্ত্বের আলোকে গেরিলা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায়না।
চে গুয়েভারা লিখেন-
“নিয়মতান্ত্রিক নাগরিক বিতর্কের কাঠামোর ভেতরে থেকে সামাজিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করার চেষ্টা কতটা অসার ও নিষ্ফল, সেটা জনগণকে অবশ্যই স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে হবে। নিপীড়ক শক্তি যখন প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা না করে গায়ের জোরে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকে, তখন ধরে নিতে হবে, শান্তি আগেই লঙ্ঘিত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে গণঅসন্তোষ আরও সক্রিয় রূপ ধারণ করে। প্রতিরোধের মানসিকতা তখন প্রত্যক্ষ সংঘাতের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে, যার সূত্রপাত ঘটে কর্তৃপক্ষের আচরণের কারণেই।
যেখানে একটি সরকার জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে — তা জালিয়াতি করেই হোক বা অন্য কোনো উপায়ে এবং সাংবিধানিক বৈধতার একটি “লেবাস” বা ভান বজায় রেখেছে, সেখানে গেরিলা যুদ্ধের সূচনা করা যায় না। কারণ, শান্তিপূর্ণ সংগ্রামের সব সম্ভাবনা সেখানে এখনো ফুরিয়ে যায়নি।”
মূলত, ইতিপূর্বে বামপন্থী হঠকারী দলগুলো যে মূলনীতি গ্রহণ করেছিল, নিকট অতীতের গোপন 'জিহাদি' সংগঠনগুলো প্রায় একই মূলনীতির আলোকে পরিচালিত হয়। তাদের সবারই ধারণা- “সশস্ত্র-অভ্যুত্থান হল সংগ্রামের এমন এক রূপ, যা প্রয়োগ করা চাই সকল পরিবেশেই!”
অথচ কোনো আন্দোলনকে সফল অভ্যুত্থানে রূপ দিতে হলে-
প্রথমত, কোনো ষড়যন্ত্রের উপর নয়, কোনো একক পার্টির উপর নয়, অভ্যুত্থানের নির্ভর করতে হয় অগ্রসর শ্রেণির (যারা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে বেরিয়ে আসে) উপর।
দ্বিতীয়ত, অভ্যুত্থানকে নির্ভর করা চাই জনগণের বৈপ্লবিক তরঙ্গোচ্ছ্বাসের উপর।
তৃতীয়ত, ক্রমবর্ধমান বিপ্লবের ইতিহাসে যে সন্ধিক্ষণে জনগণের অগ্রসর কাতারগুলোর ক্রিয়া-কলাপ যখন সর্বোচ্চ মাত্রায়, আর শত্রু এবং বিপ্লবের দুর্বল, উৎসাহশূন্য, অস্থিরচিত্ত মিত্রদের কাতারগুলোতে দোদুল্যমানতা যখন সবচেয়ে প্রবল- সেই সন্ধিক্ষণের উপর অভ্যুত্থানের নির্ভর করা চাই।
পরিস্থিতি ও সময়কে আমলে না নিয়ে- সহজসরল চিন্তা থেকেই হোক, হঠকারী চিন্তা থেকেই হোক বা অন্ধানুসরণ থেকেই হোক- যত্রতত্র, যখনতখন সহিংসতা আহ্বান বা অস্ত্রের আলোচনার মাঝে রোমান্টিকতা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বরাবরই উম্মতের প্রাণশক্তি ক্ষয়ে ভূমিকা রেখেছে। পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়ে অতিবিপ্লবী পরিকল্পনা কাম্য নয়। আবার সুবিধাবাদী, সুফিবাদী ও সংশোধনবাদীদের মতো আপস আর লেজুড়বৃত্তির পথ ধরাও আত্মঘাতী। বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি উভয়ই পরিত্যাজ্য। গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক ইসলামপন্থীদের জন্য তাই জরুরি— বিশুদ্ধ মানহাজ আঁকড়ে ধরা এবং ভ্রান্ত রাজনৈতিক লাইন ত্যাগ করে সঠিক রাজনৈতিক লাইন গ্রহণ করা।
বাংলাদেশে ইসলামের স্বপক্ষে রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ, হুজ্জাহ প্রতিষ্ঠা ও গণভিত্তি অর্জন করা- ইসলামী আন্দোলনের সফলতার পূর্বশর্ত। এ বাস্তবতা গেরিলা আন্দোলনের ফিকির রাখা ব্যাক্তিবর্গ যত দ্রুত অনুধাবন করবে, ততই কল্যাণকর হবে ইন শা আল্লাহ।
আল্লাহ’ই ভালো জানেন।
اِنۡ اُرِيۡدُ اِلَّا الۡاِصۡلَاحَ مَا اسۡتَطَعۡتُ ؕ وَمَا تَوۡفِيۡقِىۡۤ اِلَّا بِاللّٰهِ ؕ عَلَيۡهِ تَوَكَّلۡتُ وَاِلَيۡهِ اُنِيۡبُ
“আমি আমার সাধ্যমতো সংশোধন চাই। আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোনো তাওফিক নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।”