আল্লাহ
তা’আলা বলেন, “মুমিনদের মধ্যে কেউ
কেউ আল্লাহর সাথে তাদের করা অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ (অঙ্গীকার পূর্ণ করে)
গত হয়েছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন করেনি।”
[1]
রাসূল
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: إنما الناس كالإبل المائة لا تكاد تجد فيها راحلة “নিশ্চয়ই
মানুষ এমন একশটি উটের ন্যায়, যেগুলোর মধ্যে হতে আরোহণযোগ্য একটি উট পাওয়া যাওয়াও
দুর্লভ।” [2] আল্লাহ
তা’আলা আমাদেরকে সমস্ত উম্মতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তিনি আমাদের পাঠিয়েছেন মানবজাতিকে
হিদায়াতের পথে নিয়ে আসার জন্য, মানবজাতির ওপর চেপে বসা সকল যুলুম-নির্যাতনের
অবসান ঘটানোর জন্য। সৃষ্টির ইবাদাত করা থেকে বের করে, কেবলমাত্র সমগ্র জাহানের সৃষ্টিকর্তা
এক আল্লাহর ইবাদাতে নিয়ে আসার জন্য। প্রত্যেক যুগের সত্যবাদী, মনোনীত ব্যক্তিরা এই
মহান দায়িত্বকে পালন করেছেন ধৈর্য এবং দৃঢ়তার সাথে। তারাই হলেন যুগের মনোনীত, মুহসিন
ব্যক্তিবর্গ! আর এই মনোনীত ব্যক্তিদের সমন্বিত ও সুসংগঠিত মেহনত ছাড়া ইসলামের দাওয়াতের
প্রতিষ্ঠার কথা ভাবাই যায় না। সুবহানাল্লাহ!
ইসলাম কতই না মহান! আর দুনিয়াতে ইসলাম ফিরিয়ে আনতে মহান ব্যক্তিদের কতই না প্রয়োজন।
আর এই মহান ব্যক্তিদের কাছে আমাদের ন্যূনতম কিছু চাহিদা রয়েছে— ·
পরিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন
ফিকির ·
উদাসীনতা ত্যাগ
ও উদ্যমী মানসিকতা ·
ইলম ও নেতৃত্বের
ভারসাম্য ·
হিম্মত যখন
কোনো মুমিন এই মহান দ্বীনের জন্য নিজ প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে শুরু করে স্বীয় জীবনকে
বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়, তখন তার জন্য অত্যাবশ্যক হলো সঠিক ফিকির ও পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। কেননা, আল্লাহ তা’আলার সুন্নাহ বা সৃষ্টিগত ব্যবস্থাপনা কারও পক্ষপাতিত্ব
করে না। ইলাহী রীতি অনুযায়ী মুমিন-কাফির সকলেই এক্ষেত্রে সমানভাবে বিচার্য হয়। মুমিন
বা কাফির উভয়ের জন্যই পানি ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটতে শুরু করবে; মুমিনের
জন্য তা ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটতে শুরু করবে না। আল্লাহ তা’আলার বিশেষ তাওফিকের
কথা ভিন্ন বিষয়। বিষয়টি
অত্যন্ত চমৎকারভাবে বোঝা যায় শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য
থেকে— “আল্লাহ
তা’আলা ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত কাফির রাষ্ট্রকে সাহায্য করেন ও টিকিয়ে রাখেন। আর অত্যাচারী
জালিম রাষ্ট্র তা মুসলিমদের হলেও পরাজিত করেন ও ধ্বংস করেন।” অর্থাৎ,
যেকোনো রাষ্ট্র, তানজীম বা ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হলো আদল ও ইনসাফ। আর আল্লাহ তা’আলার
রীতিনীতি সকলের ওপর সমানভাবে ক্রিয়াশীল। মানুষের ওপর ইলাহী রীতির যে স্রোত আছড়ে পড়ে,
তা একজন মুসলিমকেও প্রভাবিত ও ব্যথিত করে। নিয়তের বিশুদ্ধতা, উত্তম গন্তব্য বা আল্লাহর
সন্তুষ্টি কামনা ইলাহী রীতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় না, যদিও এসবই নেক আমল কবুল হওয়ার
অন্যতম শর্ত। আল্লাহ
তা’আলা স্বীয় শরীয়তে যত আদেশ-নিষেধ পছন্দনীয়-অপছন্দনীয় বিষয় সাব্যস্ত করেছেন, তার প্রতিটিতেই
জাগতিক কোনো না কোনো সমাধান আছে। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর
প্রতিটি সুন্নাহর অনুসরণ আখিরাতের সফলতার পাশাপাশি দুনিয়াবি কোনো-না-কোনো উপকারিতা
ও সমাধান নিয়ে আসে। তাই কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহ তা’আলার শরীয়তের বিধিবিধান সুন্নাহ
অনুযায়ী পরিপূর্ণভাবে মেনে চলে, তাহলে সে অবশ্যই দুনিয়াতে ইলাহী ওয়াদার বাস্তবায়ন দেখতে
পাবে। দুনিয়াতে ও আখিরাতে সে হবে সৌভাগ্যবান। যখন
কোনো বান্দা বা জামাআত দুনিয়াতে আগত বালা-মুসিবতের ফলে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে, ব্যর্থতার
পর ব্যর্থতা ছাড়া কোনোকিছুই দেখতে পায় না, তখন বুঝে নিতে হবে আল্লাহ তা’আলার হুকুম
পালনে অথবা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ বোঝা ও অনুসরণে
তার ঘাটতি রয়ে গেছে। একজন মানুষ যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন; নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইলাহী
রীতি না তার পক্ষপাতিত্ব করে, আর না বিরুদ্ধাচরণ করে। আর এমন হওয়াটা রবের পক্ষ হতে
বান্দার প্রতি তাঁর নিয়ামতের পূর্ণতার নিদর্শন। একেক মানুষের জন্য আগুন আর পানির উত্তাপ
একেক রকম হওয়া নিঃসন্দেহেই পরিস্থিতি জটিল করে তুলত। আল্লাহ তা’আলার বিশেষ বান্দাদের
জন্য বরাদ্দ তাওফিকের বিষয়টি বিশেষ ক্ষেত্র, সাধারণ বাস্তবতা না। আল্লাহ
তা’আলা দুনিয়াকে স্বীয় সুব্যবস্থাপনা দ্বারা কায়দা-কানুনের আবাস বানিয়েছেন। এ সকল কায়দা
পরিত্যাগ করা বা এর বিপরীতে চলা সঠিক নয়। তাই ইসলাম ফিরিয়ে আনার পথে যারা কাজ করবেন,
তাদের জন্য সবার আগে প্রয়োজন ফিকির ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিচ্ছন্নতা অর্জন। এছাড়াও,
ইসলামের পুনরুত্থানে অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে আগ্রহী জামাআত ও সচেষ্ট ব্যক্তিবর্গের পরিচ্ছন্ন
ফিকির, বাস্তবতা ও শারঈ ইলমের উপলব্ধি এবং উদাসীনতা পরিত্যাগের পাশাপাশি আরও প্রয়োজন
নেতৃবৃন্দ ও উলামায়ে কেরামের ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থান। ইমাম
ইবনু তাইমিয়াহ (রহিমাহুল্লাহ) সুন্দর বলেছেন, “আমীর-উমারাদের উচিৎ শারঈ অভিভাবকদের থেকে উপকৃত
হওয়া।” তবে
দ্বীনি অভিভাবকেরা যেন আমীর-উমারাদের আজ্ঞাবাহী না হয়ে ওঠেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
কেননা, তা কোনোভাবেই উত্তম ফলাফল আনবে না। মানুষের মাঝে সম্পর্ক দুই প্রকার হয়ে থাকে;
দ্বীনি সম্পর্ক এবং জাগতিক সম্পর্ক। আর মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতা এই যে, তারা অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই সম্পর্কের ব্যাপারে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না। তাই
নেতৃবৃন্দ ও উলামাদের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়া জরুরি। কেননা, নেতৃবৃন্দ
ও উলামায়ে কেরামের মাঝে যথাযথ সমন্বয় ঘটলেই ইসলামের উত্থান সম্ভব হবে। উপর্যুপরি ষড়যন্ত্র
ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ, স্থবির চিন্তাধারা এবং প্রায়োগিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের
সুযোগ না থাকায় ইলমী মারকাজগুলো থেকেই কেবল নেতৃত্ব উঠে আসার সুযোগ ও সম্ভাবনা অনেকটাই
সীমিত হয়ে পড়েছে। তাই উলামায়ে কেরাম ও নেতৃস্থানীয় ইসলামপন্থীদের সমন্বিত সম্পর্ক অত্যাবশ্যক।
আরও
প্রয়োজন হিম্মত। যা হচ্ছে—ইচ্ছাশক্তি ও কাজের বাস্তবায়ন সমন্বিত রূপ। তবে পরিষ্কার
উদ্দেশ্য, কর্মপন্থা ও ফিকির ব্যতীত কেবল হিম্মত কোনো ফলাফল নিয়ে আসতে পারে না। আমাদের
সমসাময়িক ও পূর্ববর্তী বিভিন্ন ইসলামী জামাআত আমাদের জন্য এর প্রমাণ রেখে গেছে। তবে
যদি কোনো মহান উদ্দেশ্য হাসিলের হিম্মত বা বৈপ্লবিক মানসিকতা না থাকে, তবে আমাদের জন্য
তাত্ত্বিক কিছু অর্জনের বাইরে ভিন্ন কিছু অর্জন সম্ভব হবে না। বছরের পর বছর একই বৃত্তে,
একই সমস্যার দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাওয়ার কোনো বিকল্প থাকবে না। মুসলিমদের
হিম্মতের মূল চালিকাশক্তি হতে হবে তাদের ঈমান, তাকওয়া ও গন্তব্যের সঠিকতা। আমাদের এই
পথ আসহাবুল উখদুদের পথ। যমীনে তামকীন লাভ আমাদের অনেকের বা কারও পক্ষেই দেখে না যাওয়ার
সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই শাহাদাত অর্জনের আগ পর্যন্ত পূর্বসূরিদের পথের ওপর অটল-অবিচল
থাকার মাধ্যমেই আমরা দুনিয়া-আখিরাতের সফলতা অর্জন করতে পারব। কাপুরুষতা
আমাদের মোটাতাজাও করবে না, হায়াতও বৃদ্ধি করবে না। সাহসিকতা ও সুউচ্চ হিম্মত অর্জনে
অগ্রগামী হওয়া উম্মাহর মহান ব্যক্তিদের জন্য আবশ্যক। জীবন অবসানের আগ পর্যন্ত নিজের
মেধা, শক্তি, সময় ও প্রচেষ্টার যতটুকু সম্ভব ব্যয় করার মাধ্যমেই আমরা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত
মর্যাদা হাসিল করতে পারব এবং পারব পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নির্বিঘ্নে ইসলাম পালনের
রাস্তা সহজ করতে। পরিশেষে
একথা মনে রাখা প্রয়োজন— লড়াই মানেই শুধুমাত্র অস্ত্রের ঝংকার নয়। যুদ্ধ বিবাদমান দুটি
পক্ষের চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেয়। যুদ্ধ মূলত একটি প্রতিষ্ঠানের ন্যায়। এর মাঝে রয়েছে
সুদৃঢ় ও সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপনা, রব্বানী নেতৃত্ব, মজলুম ও সালিহীনদের দু’আ, ঘাত-প্রতিঘাত,
উড়ন্ত খুলি ও রক্তাক্ত দেহের সমারোহ। তাই বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারা বা কর্মকাণ্ডকে
আঁকড়ে ধরে অগ্রসর হওয়া কাম্য নয়। (২) وَلۡتَکُنۡ مِّنۡکُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی
الۡخَیۡرِ وَیَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَیَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ
الۡمُفۡلِحُوۡنَ “তোমাদের মধ্যে এমন
একটা দল হোক, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, সৎ কাজের আদেশ করে এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ
করে আর এরাই সফলকাম।” [3] দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তি ‘বিগ ফাইভ’ (আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড)
তথা নিরাপত্তা পরিষদের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক সংগঠন ‘জাতিসংঘ’ নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থা
কায়েম হওয়ার পাশাপাশি, ইসলামপন্থীদের নানামুখী দ্বিধাবিভক্তির দরুন মুসলিম উম্মাহর
মাঝে শাসন ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পশ্চিমা মানসিকতার প্রভাব ব্যাপকতা লাভ করে। যার
ফলে, সমাজ ও রাষ্ট্রে শরীয়াহর কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে, একটি সুনির্দিষ্ট উত্তর
সবাই গ্রহণ করে নিয়েছে। সাধারণ লোক, তালিবুল ইলম থেকে নিয়ে উলামায়ে কেরাম, ইসলামপন্থী
নেতৃবৃন্দ ও সংগঠনসমূহের এক বড় অংশ এই চিন্তাধারায় আচ্ছন্ন! আর তা হচ্ছে, উম্মাহর বৃহত্তর
অংশ সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এগিয়ে না আসলে ইসলামের
বিজয় অসম্ভব! এ চিন্তাধারা উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গকে স্থবিরতায় আটকে রেখেছে। আল্লাহর
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনে আমরা দেখি যে, তিনি প্রায় বিশ বছরের
মেহনতে এমন ১৪০০ ব্যক্তি প্রস্তুতেই অধিকতর মনোযোগ দিয়েছেন, যারা পরবর্তীতে ইসলামের
আমানত বহন করে মাত্র ৮০ বছরের মাথায় তা গোটা দুনিয়াতে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। যখন
অগ্রবর্তী ব্যক্তিদের জামাআত সংগ্রাম আর সফলতার অভিমুখ ও ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ফেলে,
তখন জাতি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাদের পেছনে একতাবদ্ধ হয়ে যায়। তাই সেক্যুলার শাসকদের শোষণ
ও ক্রোধ উদ্রেককারী ঘটনাপ্রবাহের প্রতিক্রিয়ায় উম্মাহ নিজে নিজেই বিজয় এনে দেবে, এমন
চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সূরা নাসর তিলাওয়াত করে বলেন, “সেই
সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ! আজ মানুষ সেভাবে সত্য থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, যেভাবে
মক্কা বিজয়ের পর দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছিল।” আমরা
দেখতে পাই, সংগঠনগুলো, রাজনীতিবিদ ও তাত্ত্বিকরা উম্মাহকে ব্যাপকভাবে নিজ নিজ কর্মসূচিতে
সম্পৃক্ত করে ‘নিরাপদ আন্দোলন’ বা ‘সহজ জিহাদ’ এর পথ ধরে বিজয় ও শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার
কথা বলে থাকেন। বাস্তবে এই চিন্তাধারার কোনো ফলাফল কি দেখতে পাই? উম্মাহর
সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বিষয়টি (পপুলিজম) আমাদের দ্বীন, উলামায়ে কেরাম
এবং মুসলিমদের ভূমিগুলোকে লাঞ্ছিত আর অপমানিত করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর নির্ভরতা সেক্যুলার
ক্ষমতাশীল জল্লাদদের উল্লাসিত করেছে। এই মানহাজ কাঙ্ক্ষিত সফলতা এনে দিতে পারেনি। আর
যে বা যারাই উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর নির্ভর করে কর্মসূচি সাজিয়েছে, ব্যর্থতা ছাড়া
তারা কিছুই অর্জন করেনি। নিশ্চয়ই
আমরা মানুষের প্রতি লক্ষ্য রাখব; আমাদের দাওয়াতি ও রাজনৈতিক কর্মসূচির সিংহভাগই হবে
উম্মাহকেন্দ্রিক। কিন্তু মানুষের ওপর নির্ভরতা, উম্মাহর মাঝে দ্রবীভূত হয়ে যাওয়া আমাদের
আন্দোলনকে ফলপ্রসূ করবে না। বরং, এরকম আন্দোলন এক পর্যায়ে মানুষের রুটি-রুজির খোরাক
মেটানোর আন্দোলন হয়ে যায়। আমাদের সংগ্রাম তো স্রেফ রুটি-রুজির জন্য নয়। যদিও মানুষের
মৌলিক চাহিদা পূরণও আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য, তবে তা মূল বা একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। ওপরের
আলোচনা থেকে এমনটা বোঝার কারণ নেই যে, উম্মাহকে তাকফির করা হচ্ছে বা গণমানুষকে পরিত্যাগ
করার কথা বলা হচ্ছে। বরং, এখানে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সঠিক কর্মসূচির দিকে আহ্বান করা
হচ্ছে। সঠিক ও উপযোগী নেতৃত্ব মানুষকে সঠিক দ্বীনের ওপর ঐক্যবদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে আনে।
স্রেফ জনতুষ্টিবাদী তথা পপুলিমজমের পথ আঁকড়ে ধরে ক্ষমতার চূড়ায় আরোহণ করলেও দ্বীনের
বিজয় নিশ্চিত করা সম্ভব না। এতে সাময়িক সফলতা যদি আসেও, তা টিকে থাকবে না। দশকের
পর দশক সেক্যুলার শাসকদের প্রতারণা ও নোংরামির শিকার উম্মাহ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের
মাধ্যমে নিজ সভ্যতা, সংস্কৃতি প্রতিরক্ষায় সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী,
তোতাপাখিসদৃশ মিডিয়া আর দরবারী আলিমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে দ্বীন ও বাস্তবতা পাল্টে
দিতে। ফলে, উম্মাহর আক্বীদাহ’য় ব্যাপকভাবে প্রবেশ করেছে ইরজা ও শৈথিল্যপরায়ণতার জীবাণু।
সামগ্রিকভাবে মুসলিমরা মানসিকভাবে পরাজিত। সব রকমের বিপদ তাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে
ধরেছে। সাম্প্রতিক
সময়ে আমরা মিশর, তিউনিসিয়া ও অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহে লাখ লাখ মানুষকে আন্দোলন করতে
দেখেছি। আমরা দেখেছি উৎসাহী মানুষের ভিড়। দেখেছি মানুষের রাস্তায় নামা, ভাঙচুর, আস্ফালন
আর অগ্নিসংযোগ। এসবের চালিকাশক্তি ছিল ক্ষুধা, রুটি বা বৈষয়িক কোনো দুর্যোগ। আন্দোলনরত
এক ব্যক্তি যখন নিজ গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, তখন কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। জাতি
অত্যাচারী শাসকের পতনের জন্য একত্রিত হয়েছিল, বিক্ষোভ করেছিল। ফলাফল ছিল এই যে, উম্মাহর
এই আন্দোলন এক সেক্যুলার শাসককে অপসারণ করে তার স্থলে আরেক সেক্যুলার শাসককে বসিয়েছে।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্জন ছিল শুধুমাত্র চেহারায় পরিবর্তন। প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে
উম্মাহ নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি। কেননা, আদর্শ বা দ্বীনকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন
দাঁড়ায়নি। আরও
কিছু কারণ হচ্ছে, জনগণের এই বিশাল অংশটিকে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী আদর্শিক দৃঢ়তা, রাজনৈতিক
প্রজ্ঞা ও বৈপ্লবিক চেতনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সংগঠন, ভ্যানগার্ড তথা অগ্রবর্তী বাহিনীর
অনুপস্থিতি। যার ফলে, আন্দোলনসমূহের অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করছিল একই আদর্শের ভিন্ন চেহারার
অন্য কোনো সেক্যুলারেরা। শাসকগোষ্ঠী আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য বিভিন্ন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি
দিয়ে জনগণকে আন্দোলনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ব্যাপারে অমনোযোগী করে ফেলতে পারে। কেননা,
সেক্যুলার শাসনব্যবস্থার অধীনে দীর্ঘকাল অতিবাহিত করা জনগণ নিজেদের মানোন্নয়নে সক্ষম
ছিল না। আরব
বসন্তের সময় ইখওয়ানুল মুসলিমীনকে ‘মধ্যমপন্থী’ সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তারাও মিশরে জনগণের
ওপর ভর করে, জনতুষ্টির পথ ধরে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিল। এবং তারা এটি ভেবেও নিয়েছিল
যে, তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হতে চলেছে। কিন্তু
যখন জনগনের দুনিয়াবি চাহিদা পরিপূর্ণ হলো না, তখনই প্রেক্ষাপট পাল্টে গেল। ক্ষমতা থেকে
তারা অপসারিত হলো এবং তাদের নেতাদের পাশাপাশি কর্মীদেরকেও ঢালাওভাবে জেলে পাঠানো হলো।
জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের অভিশাপ দিতে লাগল। এমনকি কেউ কেউ নেতৃবৃন্দের মুখে জুতা
নিক্ষেপও করে। তাই শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। ধোঁয়াশাপূর্ণ স্লোগানের আশ্রয়ে জনগণকে সন্তুষ্ট
করার মাধ্যমে পরিচালিত আন্দোলন যেন প্রকৃত ইসলামপন্থীদের মৌলিক প্রচেষ্টা না হয়। জনচাহিদাকে
উপেক্ষা করা উচিৎ নয়, তবে জনচাহিদার লেজুড়বৃত্তি ও তোষণনীতি নিঃসন্দেহে আন্দোলনকে ইতিহাসের
আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে! প্রতিটি সুযোগকে আন্দোলনের অনুকূলে নিয়ে আসা দরকার, তবে তা
যেন আমাদের প্রতারিত না করে। বিপ্লবী চিন্তার আন্দোলনকারীদের জন্য সমীচীন নয় যে, তারা
জনগণের মাঝে দ্রবীভূত হবে। যদিও এই দ্রবীভূত হওয়াটা রাজনীতিবিদ আর তাত্ত্বিকদের খুবই
পছন্দনীয়। আরবের
মাঝে যখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আবির্ভাব ঘটে, তখন তিনি ছিলেন সকল
মানুষের মাঝে স্বর্ণতুল্য। মানুষের মাঝে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে পবিত্র। তিনি ছিলেন অনুপম
চরিত্রের অধিকারী এবং সর্বাধিক সম্মানিত। এতদসত্ত্বেও, মক্কা বিজয়ের আগ পর্যন্ত অল্প
কিছু মানুষই তাঁর অনুসরণ করেছিল। আরবের অধিকাংশই নবীজির দ্বীনের অনুসরণ থেকে বিরত ছিল।
বরং
যারা তাঁর অনুসরণকারী ছিল, এমন কোনো অত্যাচার নেই, যা তাদের ওপর চালানো হয়নি। এমনকি
অগ্রগামী মুসলিমরা নিজ দেশ থেকে হিজরত করতে বাধ্য হয়। আল্লাহপ্রদত্ত সাহায্য ও বিজয়
প্রত্যক্ষ করার আগ পর্যন্ত, আরবরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেনি। বিজয় আসার পর আগে যারা
বিরোধিতায় নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাও দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করে। কেননা, আল্লাহ সুবহানাহু
ওয়া তা’আলা দলিল-আদিল্লার পাশাপাশি ক্ষমতা, শক্তি ও বিজয়ের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মানুষকে
একত্রিত করেন। সুস্পষ্ট
বিজয়ের ফলাফলস্বরূপ আরবের অধিকাংশ লোক পরাজিত দ্বীন পরিত্যাগ করে বিজয়ী দ্বীন ইসলাম
গ্রহণ করে। আবার আমরা এ-ও দেখি যে, মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পর সংঘটিত হুনাইনের যুদ্ধে
উম্মাহর নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি রাতারাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছে যায়নি। বরং, যুদ্ধের
কঠিন মুহূর্তে তারা পালিয়েছিল। শেষ অবধি কেবল বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী অগ্রবর্তী
সাহাবাদের বাহিনীই দৃঢ় ছিলেন। যারা ছিলেন উম্মাহর সুনির্বাচিত ও অগ্রগামী অংশ। হুনাইনের
যুদ্ধের খুব বেশিদিন পরের কথা নয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের
পরপরই অধিকাংশ নওমুসলিমরা ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। আরবের লোকদের ব্যাপকভাবে দ্বীনত্যাগের
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বাধীন
উম্মাহর সুনির্বাচিত ও অগ্রগামী মুসলিমদের অংশটি। অবশেষে তরবারির মাধ্যমে যখন মুরতাদদের
প্রভাব বিনষ্ট হলো, তখন লোকজন পরাজিত হয়ে নতুন করে ইসলামে প্রবেশ করল। আসলে,
উদ্যমী ও অগ্রবর্তী ব্যক্তিবর্গ সবকালেই, সবখানেই কিছু না কিছু থাকেন, যারা দ্বীনের
প্রকৃত অভিযাত্রী। তারাই দ্বীনের আমানত বহন করেন। এই মহান ব্যক্তিদের ব্যপারে আল্লাহর
নবী ﷺ
প্রশংসা করেছেন। যেমন সহীহ বুখারিতে আছে, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাদিয়াল্লাহু
আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— “আমি
রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, “মানুষ একশত উটের ন্যায়। তবে তার মাঝে সওয়ারীযোগ্য
একটিও খুঁজে পাবে না।” ইমাম
ইবনু বাত্তাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেন— “মানুষের
সংখ্যা অনেক। তবে পছন্দসই মানুষের সংখ্যা খুবই কম।” ইমাম
আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর জামানার লোকেরা দ্বীনের অনেক নিকটবর্তী ছিল। তাঁদের সময়টা
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামানার খুব কাছাকাছি ছিল। তাদের মাঝে
যথেষ্ট উলামায়ে কেরামও ছিল। ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন তাঁর
জানাযায় লাখ লাখ লোক অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু
শাসকগোষ্ঠী যখন তাঁকে জেলে পুরে নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল, তখন এ লোকেরা কোথায় ছিল?
এ বিশাল সংখ্যক লোকগুলো তখন ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) ও অন্যান্য হক্কানী উলামায়ে
কেরামদের পরিত্যাগ করেছিল। ফলে বিদআতি শাসকগোষ্ঠী তাঁদেরকে বন্দি করে নির্যাতন করে
এবং কাউকে কাউকে হত্যাও করে। আমরা
কি এটা বলতে পারব যে, তিনি জনবিচ্ছিন্ন ছিলেন? বাস্তবতা হলো, তিনি ছিলেন অনুপম চরিত্রের
অধিকারী, আহলুস সুন্নাহর ইমাম; স্বীয় জামানায় তিনি ছিলেন অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
বরং, সাধারণ মানুষ এমনই হয়ে থাকে। অধিকাংশ মানুষ Silent Majority হয়েই দিনাতিপাত করে
থাকে। বিশেষ মুহুর্তে বা চুড়ান্ত মুহুর্তেই কেবল তারা সংগ্রামে লিপ্ত হয় বা একাত্মতা
ঘোষণা করে। তাই
লক্ষ্য যা-ই হোক না কেন জনতুষ্টিবাদী (পপুলিস্ট) আন্দোলনের শেষ পরিণতি হয় মিশর অথবা
তিউনিসিয়ার গণআন্দোলনের ন্যায়। যারা প্রতিরোধের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেদের অবস্থান নিয়ে
সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবে
আশার কথা হলো, এখনো পর্যন্ত হক্বপন্থী ইসলামপন্থীরা পতনমুখী সমাজের মাঝে দ্রবীভূত হয়ে
যায়নি। বরং, গোটা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে মুজাহিদরা বিভিন্ন ময়দানে সমাজকে স্থিতিশীল
ও পরিশুদ্ধ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সেক্যুলার শাসনব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে ইসলামী শাসনব্যবস্থা
ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আন্দোলনরত মুজাহিদরাই হচ্ছেন এই জামানার প্রভাবশালী, অগ্রবর্তী
ব্যক্তিবর্গ বা ভ্যানগার্ড; যারা নিজেদের কাঁধে উম্মাহর দায়িত্ব বহন করে চলেছেন। এই
পথ অত্যন্ত দীর্ঘ ও ধীরগতির। এতে দোষের কিছু নেই, যদিও অদূরদর্শী মানুষেরা এটাকে দূষণীয়
মনে করে। জিহাদের
পতাকাবাহী বিপ্লবীরা মনে করেন, যেহেতু উম্মাহর ওপর জগদ্দল পাথরের ন্যায় তাগুত শাসকগোষ্ঠী
চেপে বসেছে এবং সমস্ত সিস্টেমকে তারা কবজা করে রেখেছে, তাই যথাযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়,
জিহাদের ঝান্ডা উচু করে তাদের অপসারণ যুক্তিযুক্ত। দেরিতে
হলেও পরিচ্ছন্ন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারা, ভ্রান্ত গন্তব্যে চলা এবং লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থতা
থেকে উত্তম। এই পথের পথিকগণ একথা ভেবে সান্ত্বনা লাভ করেন এবং ধৈর্যধারণ করেন যে, কিয়ামতের
দিন এমন অনেক নবী আসবেন যার সাথে একজন অথবা দুইজন অনুসারী থাকবে। আবার এমন নবীও আসবেন,
যার সাথে কেউ থাকবে না। আক্বীদাহ
ও চিন্তার পরিশুদ্ধি নিয়ে অধিকাংশ আন্দোলনকর্মী, তাত্ত্বিক, নির্বাচিত প্রতিনিধি ও
সমাজের বড় অংশের কোনো মাথাব্যথাই নেই। এমনকি কিছু জিহাদের আহ্বানকারী জামাআত ও ব্যক্তিও
খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা এই নষ্ট সমাজের মাঝে দ্রবীভূত হয়ে গেছে। মানুষের অবস্থা বর্ণনা
করে, এমন আয়াতগুলো সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই অমনোযোগী। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা
বলেন, وَّلٰکِنَّ اَکۡثَرَہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ “কিন্তু তাদের অধিকাংশই
তা জানে না।” [4]
قُلِ الۡحَمۡدُ لِلّٰہِ ؕ بَلۡ اَکۡثَرُہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ “বলো, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। কিন্তু
তাদের অধিকাংশই বুঝে না।” [5] وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَشۡکُرُوۡنَ “কিন্তু অধিকাংশ মানুষই
(আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের পরও) কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না।” [6] কিছু
কিছু মানুষ কি এটাই চায় যে, সকলেই আত্মপূজারী ও নির্বোধদের মাঝে বিলীন হয়ে যাক? বরং
তাদের চাওয়া উচিৎ ছিল—উম্মাহর উত্তম ও অগ্রবর্তী অংশ যেন সমাজকে শরীয়াহর আলোকে যথাযথভাবে
পরিচালনা করেন। দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, সমাজের মাঝে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা বলা লোকের
অভাব নেই। অনেকে এটাও চায় যে, বিশাল সংখ্যা দেখে মোহাবিষ্ট হয়ে এক পর্যায়ে সবাই গণতন্ত্র
নামক আধুনিক শিরকে লিপ্ত হোক। আবশ্যক
হলো—জনসাধারণকে সব রকমের পদস্খলন থেকে রক্ষা করা এবং সাধ্যমতো জাতিকে বিশুদ্ধ মানহাজের
আলোকে পরিচালিত আন্দোলনে শরীক করা; যার ফলে একসময় তারা তাদের অগ্রগামী লোকদেরকে জাতিকে
নেতৃত্বদানের গৌরবময় মহান কাজে শরীক করবে। সাত
আসমানের ওপর থেকে নেমে আসা হক্ব গণমানুষের কাছে বিমূর্ত ও ব্যাপক সাব্যস্ত হতে পারে,
যেহেতু তা সকল সময় ও ভূমিতে সমানভাবে প্রয়োগযোগ্য হবার জন্যই রাব্বুল আলামীন নাযিল
করেছেন। আর যুগের আবর্তন বা সমাজবাস্তবতার পালাবদল সত্ত্বেও, যেকোনো সমাজকেই হক্বের
আনুগত্যে নিয়ে আসে, বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল যোগ্য দ্বীনি নেতৃত্ব। যে নেতৃত্ব
ইসলাম ও জাহিলিয়াতের বাস্তবতা তুলে ধরে, হক্বের প্রকাশ (manifestation) নিশ্চিতের মাধ্যমে
জনগণকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। (৩) প্রথম
ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে নিস্তেজ হয়ে পড়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় শক্তিগুলো নিজ উপনিবেশগুলোতে
ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হতে থাকে। আফ্রিকা ও এশিয়ার যেসব দেশে ব্রিটিশ, ডাচ বা ফ্রেঞ্চ
উপনিবেশ ছিল, সেসব দেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই
চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যায় পশ্চিমা বানরের পাল। এই সশস্ত্র বিপ্লবগুলোতে
নেতৃত্ব দিয়েছেন ওইসব সূক্ষদর্শী রাজনীতিবিদগণ। যারা কেবলমাত্র আপসরফা আর আলাপ-আলোচনাকে
মাধ্যম সাব্যস্ত করেনি। অর্থাৎ, সর্বগ্রাসী পরাধীনতার সময় বিশেষায়িত বৈপ্লবিক রাজনৈতিক
নেতৃত্ব ও সংগঠন ব্যতীত সাধারণ পরিবর্তনও সম্ভব নয়। ভারতীয়
উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিদায় নিলেও আমাদের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক
কাঠামো পুরোদস্তুর পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিক আদলেই রয়ে গেছে। তাই, বিশুদ্ধ আক্বীদাহ-মানহাজের
ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের অধীনে গঠিত অগ্রগামী বা ভ্যানগার্ড বাহিনী ব্যতীত, ব্রিটিশ
উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত সেক্যুলার শাসনের বিরুদ্ধে সাফল্যের আশা করা সঠিক নয়। আর
এমন নেতৃত্ব, বাহিনী ও আন্দোলনকে বাস্তবতায় রূপ দিতে যথাযোগ্য আক্বীদাহগত পরিশুদ্ধি
ও তারবিয়াহ অপরিহার্য। বিশুদ্ধ আক্বীদাহ-মানহাজের সংকটের পাশাপাশি সঠিক আত্মিক, রাজনৈতিক
ও সাংগঠনিক তারবিয়াহ’র অভাবেই যুগের পর যুগ আন্তরিক চেষ্টা ও কুরবানী সত্ত্বেও হাসান
আল বান্না, আবুল আ’লা মওদুদী বা তাকিউদ্দিন নাবহানিদের দ্বারা শুরু হওয়া আন্দোলনগুলো
জাতিকে নেতৃত্ব দিতে ও সংগঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। শায়খ
ডক্টর আইমান আল মিসরি বলেন, “ইসলামী
আন্দোলনের জন্য এমন ময়দান প্রয়োজন, যেটা তার জন্য ইনকিউবেটর হিসাবে কাজ করবে, যেখান
থেকে অঙ্কুরিত বীজ বেড়ে উঠে। সেখান থেকে তারা সামরিক, রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও কর্মগত
অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।” শায়খ
আব্দুল্লাহ আযযাম বলেন, “আন্দোলনের
পথে দীর্ঘ দুর্ভোগের তিক্ততা এবং বিশাল ত্যাগ অতিক্রম করার মাধ্যমে তারা নিজেদের হৃদয়কে
স্বচ্ছ করে তুলবে, ফলে তারা দুনিয়ার নিম্ন বাস্তবতা থেকে উর্ধ্বে উঠবে, তাদের মন-মানসিকতা
সামান্য টাকা-পয়সা, সাময়িক স্বার্থ ও তুচ্ছ ভোগ-সামগ্রীর বাকবিতণ্ডা থেকে উঁচু হয়ে
যাবে এবং হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে। এইভাবে তা আত্মাকে পরিষ্কার করে দেবে এবং কাফেলাকে
নিচু অবস্থান থেকে উচ্চতর অবস্থার দিকে পরিচালিত করবে, যারা দুর্গন্ধময় জাতীয়তাবাদ
ও স্বার্থান্বেষী লড়াই থেকে অনেক দূরে থাকবে। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার মাধ্যমে নেতৃত্ব
গড়ে উঠে, এর ত্যাগ ও কুরবানীর মাধ্যমে যোগ্যতা বিকশিত হয় এবং পুরুষরা তাদের বীরত্ব
ও বাহাদুরি প্রকাশ করতে পারে। আবু বকর, উমার, উসমান, আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) - তারা
তো এই মহান কর্ম ও সুউচ্চ কুরবানীর মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছিলেন। এ
কারণেই উম্মত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে খলীফা মনোনয়নের ব্যাপারে একমত হয়ে গিয়েছিল।
এর জন্য নির্বাচনী প্রচারণার প্রয়োজন হয়নি। ফলে আল্লাহর রাসূলের আত্মা সর্বোচ্চ বন্ধুর
পানে জান্নাতের উদ্দেশ্যে উড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সকলের চোখগুলো মাঠে অনুসন্ধানে
নেমে গেল। তখন তারা আবু বকর থেকে শ্রেষ্ঠ কাউকে পেল না। যে উম্মত চড়া মূল্য ব্যয়
করে পাকা ফল কুড়ায়, তাদের জন্য তাদের রক্ত-ঘামে কুড়ানো ফসলের ব্যাপারে অবহেলা করা
সহজ নয়। পক্ষান্তরে যারা (পশ্চিমা) দূতাবাসগুলোর পর্দার আড়ালে তৈরি (গণতান্ত্রিক
বা সামরিক) বিপ্লবের প্রথম বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে আসন গেড়ে বসে, তাদের
জন্য যেকোনো বিষয়েই শৈথিল্য করা সহজ। যে বিনাযুদ্ধে দেশ অধিকার করে নেয়, তার জন্য
দেশ সমর্পণ করে দেওয়াও সহজ। আর
দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রকাশ লাভ করা সেরা ব্যক্তিদের নেতৃত্বে পরিচালিত
জাতির পক্ষে তাদের নেতৃত্বের ব্যাপারে শৈথিল্য করা বা তাকে বিপর্যস্ত করার ষড়যন্ত্র
করা সহজ নয়। আর তাদের শত্রুদের পক্ষেও তাদেরকে তাদের বাহাদুরদের সম্পর্কে সন্দেহে
ফেলা সহজ নয়। দীর্ঘ আন্দোলন তাদের জাতির প্রতিটি সদস্যের মাঝে এই উপলব্ধি সৃষ্টি করে
যে, তারা মূল্য আদায় করেছে এবং ইসলামী সমাজ গঠনের জন্য কুরবানীতে অংশগ্রহণ করেছে।
ফলে তারা এই নবজন্মা সমাজের প্রহরী ও নিরাপত্তাকর্মী হয়ে যায়, যার প্রসববেদনা সমস্ত
উম্মাহকেই সহ্য করতে হয়েছে। যেকোনো ইসলামী সমাজের জন্মের জন্যই প্রসববেদনা আবশ্যক।
আর যেকোনো প্রসবকার্যের জন্য কষ্ট-পরিশ্রম আবশ্যক। আর যেকোনো পরিশ্রমের জন্য ব্যথা-বেদনা
আবশ্যক।” তিনি
আরও বলেন: “আমরা
যদি কাবুল থেকে আল-কুদসের দিকে চলার ইচ্ছা রাখি, তাহলে এ পথটি হলো ইসলামী দাওয়াতের
পথ, যা যুবকদেরকে প্রতিরোধের জন্য এবং আক্বীদাহ’র জন্য লড়াই করার চেতনায় গড়ে তুলবে,
তখনই তারা বিজয়লাভ করবে। এটা ছাড়া আমরা পানিতে চাষাবাদ করব, শূন্যে বীজ বপন করব।
তখন ব্যর্থতার পর ব্যর্থতাই আসবে। আর বিষয়টা যতক্ষণ শুধু ঘোষণা, স্লোগান, প্রবন্ধ-নিবন্ধ
ও মুখরোচক কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, ততক্ষণ অবধি তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না।” (৪) জাতি
নিজ থেকেই বিজয় ইসলামপন্থীদের হাতে উঠিয়ে দেবে, এমন বিপজ্জনক চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে
ইসলামপন্থীদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, ইসলামী আন্দোলন ও সংগ্রামের নেতৃত্ব, দিকনির্দেশনা
ও প্রতিরক্ষার কাজ সফলভাবে সম্পাদনে সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিশুদ্ধ আক্বীদাহ-মানহাজ, শক্তিশালী
ঈমান ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় সুসজ্জিত এক সংগঠিত গোষ্ঠী। প্রতিকূল পরিবেশেও এমন সংগঠিত
দল প্রস্তুতের দৃষ্টান্ত রয়েছে নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সীরাতে। আমরা
দেখি, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দারুল আরকামে তারবিয়াহ’র মাধ্যমে অগ্রগামী
সাহাবীদের পরবর্তী সময়ের সংগ্রামী জীবনের জন্য প্রস্তুত করেছেন, যে প্রক্রিয়া শেষ অবধি
চলমান ছিল। ইসলামী বিপ্লব সাধনের জন্য তাই প্রয়োজন ইসলামী আক্বীদাহ ও বিশুদ্ধ মানহাজে
সুসজ্জিত ইসলামপন্থীদের অগ্রবর্তী সংগঠন। বর্তমান
প্রেক্ষাপটেও মুসলিম উম্মাহর অগ্রগামী একটি অংশ কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত
সম্পূর্ণ শূন্য থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে ইসলামের সম্মান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
করছে। কোনো প্রকার রাষ্ট্রীয় সহায়তা ব্যতিরেকে কোনো জাতিকে পূর্বের জাহিলি শাসন থেকে
মুক্ত করতে ইসলামপন্থীদের জন্য জরুরি যে, তারা শারঈ মূলনীতির আলোকে, ফলপ্রসূ রাজনৈতিক
উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দাওয়াহ, সংগঠন, তারবিয়াহ, প্রস্তুতি গ্রহণ ও পর্যায়ক্রমিক নানামুখী
প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করবে। যার ফলে পূর্ববর্তী শাসন দুর্বল হবে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে
ইসলামপন্থীরা নিজেদেরকে প্রতিস্থাপনে সক্ষম হবে। তামকিন
অর্জনের প্রক্রিয়াকে এভাবে চিত্রিত করা যেতে পারে— দাওয়াহ
> সংগঠন > তারবিয়াহ, ইদাদ (প্রস্তুতি) ও তানজিম (জনগণকে সংগঠিতকরণ) > তীব্র
ও কার্যকর গণআন্দোলন > অভ্যুত্থান > প্রতিষ্ঠা লাভ আর
সংগ্রামের প্রতিটি স্তরেই প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে ঈমান, তাওয়াক্কুল, ইস্তি’আনা,
মুহাসাবা, সবর ও অধ্যবসায়কে আঁকড়ে ধরা। এছাড়াও, স্মরণ রাখতে হবে যে, অপরিকল্পিত, স্বতঃস্ফূর্ত
মেহনত ইসলামের জন্য কল্যাণকর হলেও, প্রতিষ্ঠা লাভে কার্যকর নয়। নির্মোহ
দৃষ্টিতে খেয়াল করলে দেখা যাবে, সফল রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা ও সংগঠনে একটি অগ্রবর্তী
বাহিনী (ভ্যানগার্ড পার্টি) থাকে, যারা জাতির দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্বের জিম্মাদারি
গ্রহণ করে। পাশাপাশি, জাতির এই অগ্রবর্তী অংশটির শারঈ ইলম, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, সাংগঠনিক
দক্ষতা ও এজিটেশনের যোগ্যতার সাথে থাকতে হয় ধীশক্তি ও যথাযথ রাজনৈতিক জ্ঞান। এর ফলে
ক্রমপরিবর্তনশীল বাস্তবতার আলোকে দ্রুত বা প্রয়োজনীয় সমস্যা/পরিস্থিতি চিহ্নিতকরতঃ
তদানুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। দুঃখজনক
বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের পূর্বের ও সমসাময়িক ইসলামী সংগঠনগুলোতে এই সমস্যাটি প্রকটাকারেই
দেখা যায়। পূর্ব অভিজ্ঞতায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আগেরজন যা বলেছেন, পরের জন তার সবই
সঠিক মনে করেছেন। কিন্তু পূর্বসূরির চিন্তাধারার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার মতো মেধা,
প্রজ্ঞা, ইচ্ছা কোনোটাই সাধারণত এর ফলে উত্তরসূরির মাঝে থাকে না। তাই দেখা যায়, নীতিনিষ্ঠ
শিষ্যের মতো সারাজীবন পূর্বসূরিদের দেখানো পথে চলতে চেষ্টা করা হয়। ব্যক্তি
বা জামাআতের সততা, নিষ্ঠা এবং তার বিশ্বাসের প্রতি আন্তরিকতা প্রশ্নাতীত থাকলেও বাস্তবতা
উপেক্ষা করা উচিত নয়। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাস্তব ময়দানে সফল হবার জন্য এসব গুণাবলিই
শেষ কথা নয়। জামাআত হিসেবে তো বটেই, এমনকি ব্যক্তিগত জায়গা থেকেও আদর্শের পতাকাবাহী
হিসেবে অনেকে তাই সফল হতে পারেন নি। কেবল
ব্যক্তিগত পরিসরে কবুলিয়াত অর্জনের চেষ্টা আর জাতির জিম্মাদারি আদায়ের মাঝে রয়েছে বহুমুখী
ও ব্যাপক ব্যবধান। আল্লাহর সাহায্যে বর্তমানে অগ্রগামী ইসলামপন্থীদের মাঝে যোগ্য ব্যক্তি
অপ্রতুল হলেও, অল্প কিছু ব্যক্তির মাধ্যমেই যে ইতিহাসের মানচিত্র পালটে দেওয়া সম্ভব,
তা ইতোমধ্যেই প্রমাণ হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। আরও প্রমাণ হয়েছে, আমাদের পথ কষ্টকর আর
দীর্ঘ হলেও তা সুস্পষ্ট। আমাদের এসময়ে আত্মনিমগ্ন সুফি দরবেশ বা তোতাপাখির প্রয়োজন
নেই। কেননা, নববী মানহাজের আলোকে পরিচালিত বিপ্লবী আন্দোলনের পথে আগত পরীক্ষা ও বিপদই
যোগ্য নেতৃত্ব ও জামাআত গড়ে তোলে। শায়খ
উমার মাহমুদ উসমান বলেন, “যদি
কোনো ইনসাফগার গবেষক এই উম্মতের সত্যবাদী লোকদের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য বা একনিষ্ঠ উলামাদের
বিশেষ কোনো নিদর্শন দেখতে চায়, তবে তিনি সুস্পষ্টভাবেই দেখতে পাবেন যে, এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য
ও বিশেষত্ব হলো (তাদের ওপর আগত) পরীক্ষা বা বিপদ। এটাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম)-এর এই বাণীর বাস্তবতা— أشد الناس بلاء الأنبياء، ثم الأمثل
فالأمثل يبتلى الرجل على قدر دينه ‘মানুষের
মধ্যে সর্বাধিক কঠিন বিপদের সম্মুখীন হন নবীগণ। তারপর যথাক্রমে যারা তাদের সাথে অধিক
সাদৃশ্য রাখে। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার দ্বীন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়।’” আরেকটি
বিষয়ও লক্ষ্য করা যায় যে, বর্তমান জামানায় ইসলামী সংগঠনগুলোতে নেতৃত্বের স্তরে পৌঁছার
জন্য, পরিচালনার আসন দখল করার পথ এমন যে, যার জন্য আদৌ বিপদ ও পরীক্ষার মাধ্যমে অতিক্রম
করতে হয় না। শায়খ
উমার মাহমুদ আরো বলেন, “আমরা
চাই বা না চাই, কিছুতেই আমরা সঠিক পরিবেশ ছাড়া প্রকৃত নেতৃত্বের জন্ম দিতে পারব না।
সেই পরিবেশ হলো (সংঘাত, কঠিন পরিস্থিতি বা) জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। তখনই এমন নেতার আত্মপ্রকাশ
ঘটবে, যার চারপাশে চরম কঠিন ও ভয়ংকর পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও দৃঢ়তার স্থানে সমস্ত জামাআত
সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। যা এক কঠিন পরিস্থিতি। যা খনিগুলোকে তার প্রকৃত অবস্থায় প্রকাশিত
করে। তখনই নেতৃত্বের খনি সকল ত্রুটি ও কলুষতা থেকে মুক্ত হয়। সে-ই হয় প্রকৃত নেতা,
যিনি এই পদের উপযুক্ত। বরং পদটিই তাকে নিয়ে গর্ব করে ও মর্যাদাবান হয়। কিন্তু
প্রচারণা ও স্থবিরতার যুগে, হীনতা ও নীচতার যুগে এবং লাঞ্ছনা ও অপমানের পরিস্থিতিতে
আমাদের সামনে এমনই নেতা উপস্থিত হয়, যার সর্বোচ্চ সম্বল হলো আবেগময়ী ও প্রতিশোধমূলক
বক্তব্যের দক্ষতা, যা শ্রোতাদের বিবেককে বন্দি করে ফেলে। ফলে সাধারণ চিন্তার লোকগুলো
দৌড়ে গিয়ে তাকে নেতা বানাতে থাকে। বিশুদ্ধ
নেতৃত্ব অনুসন্ধানের এটাই কি প্রকৃত পথ? অথবা,
আমাদের মাঝে কোনো আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রচারণা লাভের যোগ্যতাসম্পন্ন লোকের আবির্ভাব ঘটে,
চাই তা ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা, বিজ্ঞাপন প্রচার বা পত্রিকা প্রকাশের সামর্থ্যের মাধ্যমেই
হোক না কেন; এর মাধ্যমে সে মানুষের মাঝে মর্যাদা অর্জন করে। ফলে মানুষ তাকে প্রথিতযশা
লেখক বা বিচক্ষণ রাজনীতিক হিসাবে জানবে, আর সে নেতা হয়ে যাবে! এটাই কি প্রকৃত নেতৃত্ব
নির্বাচনের সঠিক পথ? এ
হলো কয়েকটি উদাহরণ। আপনি এর সাথে বাকি সবগুলোকে মিলিয়ে নিন। তাহলেই বুঝতে পারবেন যে,
প্রকৃত নেতৃত্ব শনাক্ত করা যাবে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর মাধ্যমে। কঠিন ও সংকটময় সময়গুলোতে।
ইসলামী সংগঠনগুলো সবচেয়ে কঠিন যে সমস্যাটির সম্মুখীন হয় তা হচ্ছে, সংগঠন ও দলের জন্য
উপযুক্ত নেতা ও বিশুদ্ধ মানহাজ না থাকা। নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য উপযুক্ত সময় পাওয়া সত্ত্বেও
সর্বদাই তাই পদক্ষেপগুলো ব্যর্থ হয়েছে। আমরা
দেখতে পাই, মুসলিম যুবকগণ যতদিন পর্যন্ত তাদের নেতৃবৃন্দ ও দায়িত্বশীলদের থেকে দূরে
থাকে, ততদিন পর্যন্ত তাদের প্রতি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধাশীল থাকে। তারপর যখন তার সঙ্গে
চলাফেরা ও সহাবস্থান করে, তখনই তার আস্থা নড়বড়ে হয়ে যায় এবং শ্রদ্ধা শেষ হয়ে যায়। তখন
তার নেতৃবৃন্দ ও মাশায়েখদের ভুলগুলো বলার ক্ষেত্রেই তার আওয়াজ উঁচু হতে থাকে। এটাই
জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে, এই সংগঠনগুলা যে পদ্ধতিতে নেতৃত্ব তৈরি করছে, তা ভুল ও নষ্ট
পদ্ধতি।” পরিশেষে,
গুরুত্ব বিবেচনায় পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে যে, আমাদের জন্য আবশ্যক হলো উম্মাহকে সব রকমের
পদস্খলন থেকে রক্ষা করা এবং তাদেরকে সাধ্যমতো বিশুদ্ধ মানহাজের আলোকে পরিচালিত আন্দোলনের
অনুগামী করা। যার ফলে তারা তাদের সুনির্বাচিত ও অগ্রগামী লোকদেরকে উম্মাহর নেতৃত্বদানের
গৌরবময় মহান কাজে শরীক করবে। পাশাপাশি, ইসলামপন্থীদের জন্য আরও আবশ্যক যে, তারা হয়
অগ্রবর্তী শ্রেণিকে চিহ্নিত ও মজবুত করবেন, জাতিকে সচেতন করে তুলবেন, অথবা সরাসরি অগ্রবর্তী
শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন বা চেষ্টা করবেন। কেননা, বিশুদ্ধ মানহাজের
আলোকে, আমানতদার ও সুযোগ্য নেতৃত্বের দেখানো পথ ও পন্থার ওপর সকলের মেহনতকে একত্রিত
করার মাধ্যমেই কেবল জাতি ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারে। সর্বোপরি
সবারই স্মরণে থাকা কাম্য বিধায় আবারও বলছি—দেরিতে হলেও পরিচ্ছন্ন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারা,
ভ্রান্ত গন্তব্যে চলা এবং লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থতা থেকে উত্তম। আল্লাহ
তা’আলা আমাদের বিষয়টি বোঝার তাওফিক দিন। (আমীন)
[1] সূরা আহযাব ৩৩:২৩ [2] বুখারি, মুসলিম [3] সূরা আলি ইমরান,
৩:১০৪ [4] সূরা আল-আনআম, ৬:৩৭ [5] সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৬৩ [6] সূরা আল-গাফির,
৪০:৬১