একশ বছর আগে ১৯২২ সালে ইতালিতে ক্ষমতায় আসে ফ্যাসিবাদের জনক বেনিতো মুসোলিনি। মুসোলিনির এই উত্থানের বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত দিক ছিল। এই সময়টাতে ইতালির সমাজ ও রাজনীতিতে বেশ কমিউনিস্ট আধিপত্য ছিল। মুসোলিনি নিজেও প্রথমে ছিল কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও জনপ্রিয় সাংবাদিক। দলের পত্রিকা ‘Avanti!’–এর সম্পাদকও ছিল মুসোলিনি! প্রথম বিশযুদ্ধে ইতালির অংশগ্রহণের ব্যাপারে পার্টির অবস্থানের সাথে দ্বিমত করায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ১৯১৯ সালে মুসোলিনি গড়ে তোলে জাতীয় ফ্যাসিস্ট দল, এবং দক্ষতার সাথে অতি দ্রুত ক্ষমতা দখলে সক্ষম হয়। মুসোলিনি ক্ষমতায় আসার পর চরম নিপীড়ন ও অপদস্থতার স্বীকার হতে হয় বামদের।

অন্য আরও অনেকের মতো বন্দি হয় কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক অ্যান্তোনিও গ্রামসি। কারারুদ্ধ অবস্থায় গ্রামসি বামপন্থীদের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করতে শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক প্রভাব সত্ত্বেও কেন কমিউনিস্টরা ‘ভুঁইফোড়’ মুসোলিনির হাতে পরাজিত হলো? এ প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে গিয়ে গ্রামসি উপসংহার টানে—

“সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা কালচারাল হেজিমনি ক্ষমতা ও সমাজ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম নিয়ামক!”

গ্রামসির এই সামাজিক আধিপত্য তত্ত্বের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে আসিফ আদনান লিখেছেন,

“সংস্কৃতি আসলে কী?

কিছু নিয়ম, রীতিনীতি, প্রথাপ্রচলন, কিছু ট্যাবু, কিছু মূল্যবোধের সমষ্টিই তো, তাই না?

গ্রামসির মতে, কেউ যদি সমাজের ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এবং কেউ যদি জনগণকে বোঝাতে পারে—যেসব সাংস্কৃতিক রীতিনীতি (norms) আমাদের সমাজে আছে, সেটাই পৃথিবীর চিরন্তন রীতি, সবকিছু এভাবেই সবসময় ছিল অথবা এভাবেই সবসময় থাকার কথা—তাহলে মানুষ বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে আপত্তি করবে না।”

এখানে একটি বিষয় বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামসি ‘হেজিমনি’ বা ‘আধিপত্য’ শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করেছিল। গ্রামসির চিন্তায়, ‘হেজিমনি হলো এমন কর্তৃত্ব, যা কর্তৃত্বাধীনরা স্বেচ্ছায় মেনে নেয়।’ গ্রামসি তত্ত্বটি উপলব্ধি করেছিলেন কারাগারে এবং সেখানেই তিনি মারা যান। পরবর্তীকালে তার এই চিন্তাধারার বিকাশ ঘটায় জার্মানির ফ্র্যাংকফুর্টের কিছু বাম তাত্ত্বিক, যারা নিও-মার্ক্সিস্ট বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি পায়। হিটলারের শাসনামলে এই বাম তাত্ত্বিকরা নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে এসে ঘাঁটি গাড়ে আমেরিকায়। এদের চিন্তাধারাই পরে পরিচিতি লাভ করে ‘ফ্র্যাংকফুর্ট স্কুল’ নামে! যা পশ্চিমা মার্ক্সবাদ, কালচারাল মার্ক্সবাদ বা নিও-লেফট নামেও পরিচিত। এসকল চিন্তাবিদদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়রা হচ্ছেন থিওডর এডোর্নো, ম্যাক্স হর্খহেইমার, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন, হার্বার্ট মার্কিস, এরিক ফ্রম, জার্গেন হেবেরমাস প্রমুখ।

ফ্র্যাংকফুর্ট ধারার তাত্ত্বিকদের মতে, ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের পুরোনো সংস্কৃতি ভেঙে নতুন এক সংস্কৃতির উত্থান ঘটানো জরুরি। কেননা, রক্ষণশীল ও ধর্মীয় সমাজে নাস্তিক্যবাদী ও কট্টর সেক্যুলার মানসিকতা প্রবেশ করানো অসম্ভব। যার কারণে তাদের পক্ষে সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার সম্ভবও ছিল না।

“The ‘spontaneous’ consent given by the great masses of the population to the general direction imposed on social life by the dominant fundamental group…”

৩০-এর দশকে আমেরিকায় পালানো এই অল্পসংখ্যক দার্শনিকরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মার্কিন মুলুকে নিজ তত্ত্বের সফল প্রয়োগ ঘটাতে সক্ষম হয়। ব্যাপক জনপ্রিয় কিছু বই লিখা শুরু করার পর, পর্যায়ক্রমে প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডিয়াতে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে তাত্ত্বিকতা থেকে বাস্তবতায় নিয়ে আসে গ্রামসির অনুসারী ফ্র্যাংকফুর্ট স্কুল।

সমাজ ও শাসনকাঠামোতে মিডিয়া ও সংস্কৃতির প্রভাব বোঝাতে গিয়ে, কালচারাল মার্ক্সিজমের অন্যতম কান্ডারি হার্বার্ট মার্কিস তার ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত One Dimensional Man বইয়ে বলেন,

“মানুষ এখন (১৯৬৪’র আমেরিকায়) যৌনবিপ্লব, পপুলার মিউজিকসহ গণমাধ্যম নিয়ে এতটাই পরিতুষ্ট যে, তারা কোনো ধরনের (রাষ্ট্রীয়) জুলুমের ব্যাপারেই রুখে দাঁড়াতে আর আগ্রহ অনুভব করে না।”

মূলত তাদের গুরু কার্ল মার্ক্স যা আলোচনা করে যায় নি, সেদিকটি নিয়েই আলোচনা তুলেছিল কালচারাল মার্ক্সবাদীরা। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সামাজিক সাংস্কৃতিক কাঠামো, বিশেষত মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ নষ্ট করার জন্য তারা রাজনীতি, সংস্কৃতি, ভূগোল, মনোবিজ্ঞানসহ নানা ক্ষেত্রে ভিন্ন দর্শন সামনে নিয়ে আসতে শুরু করে।

এদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমের আগেকার রক্ষণশীল, ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ ছিল শাসনক্ষমতায় বামপন্থীদের কার্যকর ভূমিকা রাখার পথে অন্যতম প্রধান বাধা। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাই দর্শন ও চিন্তাধারার সংস্কার ছিল জরুরি। ‘ক্রিটিকাল থিওরি’ শিরোনামে এসকল কট্টর সেক্যুলার, কালচারাল বামরা অর্থনীতির গৎবাঁধা আলোচনা থেকে বেরিয়ে এসে জোর দিতে শুরু করে ভূরাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, সাইকো-এনালাইসিস থেকে নিয়ে জ্ঞান ও দর্শনের বহুমুখী শাখায়। 

‘কালচারাল’ বামরা শুধু তত্ত্ব হাজির করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং নিজেদের তত্ত্ব বাস্তব ময়দানে প্রয়োগেও অগ্রসর হয়। তারা উপলব্ধি করেছিল, ব্যক্তি ও সমাজকে নতুন যেকোনো কিছু গেলাতে হলে একাডেমিক পেপার, সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের সাহায্য নেওয়া বেশ উপযোগীই হবে। এতে করে তাদের নিজস্ব ঘরাণার গণমাধ্যমের প্রচার ও বুদ্ধিজীবীদের বয়ানই চলতে থাকে, যতক্ষণ না নবনির্মিত চিন্তাগুলো মানুষ গ্রহণ করে নেয় এবং এগুলোকেই ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ মনে করতে শুরু করে। 

আজ আমরা যে পশ্চিমা সমাজ ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা দেখছি; যা ক্রমশ আমাদের সমাজকে আচ্ছন্ন করছে, তার পেছনে আছে ফ্র্যাংকফুর্ট স্কুল ও কালচারাল মার্ক্সবাদের গভীর প্রভাব। যার ফলে আজ আমরা দেখছি—

পুরুষদের দাড়ি কেটে নারীর রূপধারণ কিংবা নারীদের চুল ছেটে পুরুষের রূপ ধারণ এখন স্বাভাবিক। বরং, এমনটাই এখন গ্রহণযোগ্য, প্রশংসনীয় বা আধুনিকতা। শুধু তাই না, খোদ লিঙ্গ পরিবর্তনের মতো বিষয় এখন পশ্চিমা বিশ্বে ডালভাতের মতো। পাশাপাশি আমরা দেশীয় বা পশ্চিমা সেক্যুলার সংস্কৃতির মাধ্যমে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে ছুঁড়ে ফেলার প্রবণতাও গত অর্ধশতাব্দী জুড়ে ব্যাপক হতে দেখেছি।

ম্যাক্স হর্খহেইমার ও থিওডর এডোর্নো তাদের ‘বিখ্যাত’ বই Dialectic of Enlightenment এ লিখেন,

“কালচার (ইন্ড্রাস্ট্রি) আজ সবাইকে সমানভাবে প্রভাবিত করছে; হোক তা ফিল্ম, রেডিও বা ম্যাগাজিনের মাধ্যমে... এসব মাধ্যমের একটি অপরটিকে শক্তিশালী করছে।”

ফ্র্যাংকফুর্ট স্কুলের চিন্তাধারায় গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো যৌনতা। তাদের মতে, সমাজকাঠামো পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রের শাসন ও পলিসিতে প্রভাব বিস্তার করতে হলে আগে সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। আর যেকোনো জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে ‘যৌনতা’। এ লক্ষ্যে কালচারাল বামদের অন্যতম অর্জন- ষাটের দশকে আমেরিকার ঘটা যৌন বিপ্লবের অন্যতম অনুঘটক হয়ে ওঠা। এই ঘটনা হাজার বছরের পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। 

যৌন বিপ্লবের ফলাফল হিসেবে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানদের পাশাপাশি আমেরিকার রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখতে শুরু করে কালচারাল মার্ক্সিজম দ্বারা প্রভাবিত বামপন্থী রাজনীতিবিদরা। ক্রমান্বয়ে এ প্রভাব এতই ব্যাপক হয় যে, এনলাইটেনমেন্টের পর খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের যতটুকু পশ্চিমে টিকে ছিল, এই অদম্য উদ্যমতার সামনে তাসের ঘরের মতো তাও ভেঙে পড়তে শুরু করে। কেননা, সামগ্রিকভাবে যৌনতার ব্যাপারে সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি মোটাদাগে একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে থাকে। যৌনতার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রকে। 

ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, সুস্থ ও স্বাভাবিক যৌনতা যেমন শক্তিশালী জাতি ও সমাজকাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রাখে, তেমনই বিকৃত ও বিকারগ্রস্ত যৌনতা পতন ঘটায় জাতি ও সভ্যতার। জোসেফ আনউইন তার ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত Sex and Culture বইয়ে দেখান যে,

“একটি জাতির সাংস্কৃতিক অগ্রসরতা ও যৌনসংযম পরস্পর পরিপূরক। অসংযত যৌনতাই শক্তিশালী জাতির সাংস্কৃতিক তথা সামাজিক-রাজনৈতিক অধঃপতনের কারণ… যৌন-উগ্রতা জাতির উদ্ভাবনী ও আধিপত্য বিস্তারের শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে।”

যেমনটা কবি ইকবাল বলেছেন,

“আসো, তোমাকে বলি জাতির উত্থান-পতনের সূত্র,

শুরুতে তীর-তরবারি আর শেষে শরাব-সেতার-নৃত্য!”

জোসেফ আনউইনের মতে, 

“কোনো জাতি সমৃদ্ধ হবার পর ক্রমেই যৌনতার ব্যাপারে ‘উদার’ হতে শুরু করে। অবাধ যৌনতা এবং এর ফলাফলের কারণে সেই জাতি তখন তার সামাজিক সংহতি ও স্থিতিশীলতা হারিয়ে ফেলে। হারাতে শুরু করে উদ্দীপনা ও লক্ষ্য। অবক্ষয় ও অধঃপতনের এই গতি অপরিবর্তনীয়।”

এ কারণেই বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোকে চূর্ণবিচূর্ণ করে আগাগোড়া সেক্যুলার সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে উগ্র-সেক্যুলার কালচারাল বামরা “ক্রিটিকাল থিওরি”র মোড়কে পশ্চিমের যৌন-নৈতিকতা বদলাতে জোরেশোরে মেহনত শুরু করে! 

এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যৌনতা সম্পর্কে জার্মান মনোবিশ্লেষক উইলহেম রাইশের বিভিন্ন তত্ত্ব। রাইশই সর্বপ্রথম তার বইয়ে ‘যৌনবিপ্লব’ বা ‘Sexual Revolution’ কথাটি ব্যবহার করে। বইটির নাম ছিল ‘Die Sexualität im Kulturkampf’, যার অর্থ দাঁড়ায়— ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধে যৌনতার ভূমিকা’। বইটির উপ-শিরোনাম ছিল, ‘zur sozialistischen Umstrukturierung des Menschen’, অর্থাৎ ‘সমাজতন্ত্রের উপযোগী মানুষের পুনঃনির্মাণ’। পরবর্তীকালে বইটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় Sexual Revolution নামে।

এ বইতে রাইশের মূল বক্তব্য ছিল,

“স্বৈরাচারী শাসকরা জুলুমকে স্থায়ী করতেই যৌনতাকে ব্যাপক ও স্বেচ্ছাচারী হতে দেয় না। দুর্বলকে শাসনের উদ্দেশ্যেই শাসকগোষ্ঠী ‘যৌনতার স্বাধীনতা’য় (যেমন: সমকামিতা, বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতা ইত্যাদি) হস্তক্ষেপ করে। আর যৌনক্ষেত্রে বঞ্চিত হওয়ার ফলেই, নিপীড়িত শ্রেণি পরিবর্তন বা বিপ্লবের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। তাই, শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে অবাধ যৌনতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।”

‘ক্রিটিকাল থিওরি’র আরেক গডফাদার হার্বার্ট মার্কিউস তার বই Eros and Civilization এ লিখেন,

“যৌনতার ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা বা দমন করার মানসিকতা মানবজাতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। আর যৌনতার ক্ষেত্রে ভিক্টোরিয়ান (অর্থাৎ রক্ষণশীল) মানসিকতা থেকে মুক্ত হওয়ার মাধ্যমেই একটি উন্নত বিশ্ব নির্মাণ সম্ভব!”

অর্থাৎ, কেউ যখন নিজ চাহিদাকে আল্লাহর ভয়ে বা সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের কারণে দমন করে, তখন তা সমাজ ও মানবজাতির জন্য ক্ষতি বয়ে আনে। অবাধ যৌনতাই হলো উন্নতির পথ! আমাদের দেশেও যৌনবিপ্লব ও সমাজের নৈতিকতা বদলে ফেলার দায়িত্ব এখনো নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে পোস্ট-মডার্নিস্ট হিসেবে পরিচিত বামপন্থী সেক্যুলাররা।

বামপন্থী সেক্যুলাররা স্বাভাবিক যৌনতাকে পুঁজিবাদী, ক্ষমতাসীন শ্রেণির শোষণের হাতিয়ার মনে করে। তাই ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে সমাজে অবাধ ও বিকৃত যৌনতার প্রচার-প্রসারকে তারা অপরিহার্য মনে করে। উগ্র-সেক্যুলার সমাজ কায়েমে যৌনবিপ্লবের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করতে উইলহেম রাইশ আর হার্বার্ট মার্কিউসের পর অগ্রগামী ভূমিকা রাখে মিশেল ফুকো আর জুডিথ বাটলারের মতো দার্শনিকরা। এদেশীয় বামরা (যারা  স্বঘোষিত পোস্ট-মডার্নিস্ট) কথায় কথায় এদের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে। অবশ্যই পুঁজিপতিদের বড় একটি অংশও যৌনতার ফেরিওয়ালা। কিন্তু বুঝতে হবে যে, পুজিবাদীরা ব্যবসা আর অর্থের লোভে বিকৃতিতে জড়ায়। বিপরীতে- নিও-মার্ক্সবাদী বা কালচারাল বামরা পরিবার, সমাজ ও রাজনীতিকে বদলে দিতে যৌনতাকে ব্যবহার করে, যা অনেক সুদুরপ্রসারি ও গভীর সংকট তৈরি করেছে।

সহজভাবে বললে- সমকামিতা, উভকামিতা, পশুকামিতা বা অজাচারসহ সব ধরনের বিকৃত যৌনাচার কালচারাল মার্ক্সবাদীদের কাছে বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। কারণ এসবের মাধ্যমে সমাজের যৌন-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ পরিবর্তন করা যায়। আর যৌনতার সাহায্যে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের মাধ্যমে রূপান্তরিত হতে শুরু করে সমাজ ও সংস্কৃতি। তাই পূর্ব থেকে পশ্চিম সর্বত্রই বিচিত্র ও বিকৃত সব চিন্তাধারার প্রাসাদ নির্মাণে তারা নিরন্তর মগ্ন!

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি। এখানে বিপ্লব দ্বারা যৌনবিপ্লব উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য হলো শাসনকাঠামোর খোলনলচে পাল্টে দেওয়া। যৌনবিপ্লবের কাজ হলো, মূল বিপ্লবের প্রেক্ষাপট ও উপযোগী সামজিক পরিবেশ তৈরি করা। 

মুখরোচক গালভরা তত্ত্বকথার ডালি সাজিয়ে, শাসক আর মিডিয়ার ছত্রছায়ায় কালচারাল মার্ক্সিস্ট ও পোস্ট-মডার্নিস্টরা পশ্চিম থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দিয়েছে ধর্মহীনতা, আইডেন্টিটি পলিটিক্স, যৌনবিপ্লব, আপেক্ষিক নৈতিকতা আর অপশাসনের মড়ক। তারাই আজ সমকামিতা, উভকামিতা বা ট্রান্সজেন্ডার মুভমেন্টের মতো বিকৃত মানসিকতাকে স্বাভাবিকীকরণে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। 

প্রসঙ্গত, পোস্ট-মডার্নিটির অন্যতম পুরোধা মিশেল ফুকো স্বয়ং ছিলেন বিকৃতমনা এক সমকামী। যৌনবিকৃতির এই প্রবণতা দেখা যায় উইলহেম রাইশ, জুডিথ বাটলার থেকে শুরু করে এই আন্দোলনের আরও অনেকের মধ্যে।

মুসলিম সমাজে সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারে সেক্যুলারদের অন্যতম হাতিয়ার হলো- অবাধ যৌনতা। মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে বিকৃত যৌনতার প্রসারে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা আসে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে। আদর্শিকভাবে মুসলিমরা অন্য যেকোনো জাতির চেয়ে শক্তিশালী হবার কারণে, মুসলিম সমাজে অবক্ষয়ের প্রচারে তারা বিশেষ গুরুত্ব দেয়। 

তাছাড়া মুসলিম সমাজে সেক্যুলার শাসনের আধিপত্য নিশ্চিত করার জন্যও অবাধ যৌনতার বিস্তার নিশ্চিত করা জরুরি। কেননা অবাধ যৌনতার বিষাক্ত চোরাবালিতে আটকে যাওয়া সমাজ কখনোই নিজ আদর্শ ও অধিকার আদায়ে সচেতন হতে পারবে না। এ কথাটা মুসলিমদের জন্য আরও বেশি সত্য। কারণ যৌনবিপ্লবের লাগামহীন দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি ইসলামের দেওয়া বিশুদ্ধতা, পবিত্রতা ও লজ্জাশীলতার শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। ব্যক্তিগত জীবনে যে অবাধ যৌনতার দৃষ্টিভঙ্গি আংশিক বা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করে নিয়েছে, সে কীভাবে সমাজ ও শাসনে ইসলামী শরীয়াহ’র আধিপত্য চাইবে?

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, গণমাধ্যম এবং সচিবালয়েও এসব নোংরা চরিত্রের বামদের ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়। সেক্যুলার শাসকগোষ্ঠী, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার ত্রিমুখী চক্রের ধারাবাহিক ও সমন্বিত কার্যক্রম ধীরে ধীরে আমাদের সমাজকে অবাধ যৌনতা ও যৌনবিপ্লবের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হূমায়ুন আজাদ বা সামিনা লুতফাদের সুলুক সন্ধান করলে দেখা যাবে যে, এরা ত্রিশের দশকের কালচারাল বামদেরই উত্তরসূরী।

জাতিকে যৌনতার ব্যাপারে সুস্থ, স্বাভাবিক তথা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ফিরিয়ে আনা তাই ইসলামী জাগরণ ও বিপ্লবের অন্যতম প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। আজ ইসলামপন্থীরা যদি মুসলিমদের জমিনে ইসলামের শাসন ফিরিয়ে আনতে চায়, ইসলামী বিপ্লবের জন্য জাতিকে প্রস্তুত করতে চায়, আর গড়ে তুলতে চায় উপযুক্ত জনবল, তাহলে অবশ্যই মুসলিম নারী-পুরুষকে অবাধ যৌনতার করাল গ্রাস থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। তা না হলে আত্মমর্যাদা, হিম্মত ও আত্মত্যাগের মানসিকতা অনুপস্থিত থাকায় সাহাবিদের ন্যায় গড়ে উঠবে না আদর্শ প্রজন্ম; যারা আসন্ন ইসলামী বিপ্লবের ঝাণ্ডাধারী হবে! খুঁজে পাওয়া যাবে না সেই সব মা আর স্ত্রীদের; যাদের শিক্ষা, বিনয়, হায়া ও কোমলতা জাতিকে উপহার দিতে পারে আদর্শ বিপ্লবী পুরুষ!

বিকৃত কিংবা অবাধ যৌনতায় মত্ত মুসলিমের পক্ষে ইসলামের কিছু ইবাদাত আদায় সম্ভব হলেও, নিজ জাতির কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা অসম্ভব, যতই তার নামের সাথে থাকুক নানামুখী লকব কিংবা মাথায় দর্শনীয় পাগড়ি।

যৌন-উগ্রতায় মত্ত জাতি বিপ্লবের অনুপযোগী!

অশ্লীলতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া মানুষ আত্মত্যাগে অক্ষম!

ইসলামপন্থীদের তথা মুসলিমদের আজ অপরিহার্য দায়িত্ব হলো—

  • সাংস্কৃতিক যুদ্ধের ময়দানে সেক্যুলারদের পরাজিত করতে ভূমিকা রাখতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনৈতিক ও অস্বাভাবিক যৌনতা থেকে পরিচিত-অপরিচিতদের দূরে রাখার সম্ভাব্য সকল চেষ্টা জারি রাখা। 

  • পুরুষদের দ্রুত স্বনির্ভর হওয়া এবং পঁচিশ পেরোনোর আগে বিয়ের চেষ্টা করা। অন্যথায় কম খাওয়া, কম ঘুম ও সিয়ামের অভ্যাস জারি রাখা।

সর্বোপরি, অবাধ যৌনতার বিরুদ্ধে প্রথম লড়াই ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক ময়দানে হওয়া চাই। আর চূড়ান্তভাবে এই বিকট সমস্যার সমাধান তো কেবল অশ্লীলতার সওদাগরদের রুখে দেয়া এবং ইসলামি শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই সম্ভব!