বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য, সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাথীবর্গ ও বন্ধুদের উপর। অতঃপর-

শাইখ ইউসুফ কারদাবি এই সময়ের একজন প্রসিদ্ধ আলেম। বর্তমান যুগে ইলম ও দা'ওয়াহর ময়দানে যার সম্মানিত অবস্থান আছে। বিশেষ করে শাইখ আহমদ শাকির এবং তাঁর আগে শাইখ শানক্বিতী, শাইখ দাওসারী ও অন্যান্য বড়ো বড়ো আলেমগণের ইন্তেকালের পর। তবে অন্যান্য ওলামাদের মতোই শাইখ কারদাবি তাঁর ইলমী প্রেক্ষাপট ও যে প্রেক্ষাপট ও পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন, তা দ্বারা প্রভাবিত। একারনে তিনি ইখওয়ানুল মুসলিমীন এর রাজনৈতিক পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত। তার চিন্তা-চেতনা, মন-মস্তিষ্কে ও সর্বোপরি তার মধ্যে মোটামুটি পর্যায়ের ইরজায়ী আক্বীদাহ প্রবেশে এই প্রেক্ষাপট ও পরিবেশের বিরাট প্রভাব রয়েছে। আমরা শাইখ কারদাবির পক্ষে-বিপক্ষে সবিস্তারে কোন আলোচনা করতে চাচ্ছি না। তার যেমন অনেক ভালো কাজ ও মর্যাদা আছে, তেমনিভাবে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতিও আছে। যেই ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোর মধ্যে সর্বশেষ আমরা যেটি দেখতে পাই, সেটি হল বিদেশে অবস্থানকারীদের বেলায় তাদের বসবাসের বাড়ি/ফ্লাট খরিদের জন্য সুদি ঋন গ্রহনকে বৈধতা প্রদান। এছাড়াও অনেক হারাম বিষয়ে তার ছাড় বা অনুমোদন প্রদান তো আছেই। দীর্ঘদিন ধরেই এমনটা চলছে। তিনি ইসলামে "আল-হালাল ওয়াল হালাল" নামক এক কিতাবও রচনা করেছেন! তার এরকম পরিণতি অস্বাভাবিক কিছু না, কারণ যারা জনসাধারণের রাহে টিভির পর্দায় আসা যাওয়া করে, যারা সাধারণ লোকজনদের জন্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হয়ে যায় এবং সাধারণ জনগনের সন্তুষ্টের নিমিত্তেই ফতোয়া প্রদান করে, এটা সেসব ব্যক্তিদের অনিবার্য পরিণতি! এই ধরণের ব্যক্তিরা এই আশা লালন করে থাকেন যে, জনগন তাদের ফতোয়া সাদরে গ্রহন করুক আবার সরকারও সন্তুষ্ট হোক! আর এটা এমন এক বাস্তবতা, যা কারদাবি নিজেও স্বীকার করবেন যখন তিনি ঐসব বড় বড় আলেমদের সাথে নিজের অবস্থা তুলনা করবেন, যাঁরা এ ধরণের ছাড় বা অনুমোদন দেয়া থেকে সতর্কতার সাথে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখেন। যেমন প্রসিদ্ধ ফক্বীহ, বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ, কাতারের 'মাজমাউল ফিক্বহিল ইসলামী' তে স্বয়ং কারদাবির গুরু শাইখ আলী আস-সালুস।

ইউসুফ কারদাবি যেসব বিষয়ের সমালোচনার দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিয়েছেন, তার একটি হল সাইয়্যিদ কুতুব রাহিমাহুল্লাহর চিন্তাধারা। এক্ষত্রে তিনি সাইয়্যিদ কুতুবের চিন্তাধারাকে শুধুমাত্র ইখওয়ানী ও ইরজায়ী আক্বীদাহর উপর ভর করে সমালোচনা করেছেন। এজন্য তার এই কথাগুলোকে ইরজায়ী আক্বীদার ইলমশূন্য শিষ্য, ভক্ত, অপরিপক্ক দা'ঈ ও ইরজাগ্রস্ত রোগীরা লুফে নিয়েছে! (আল্লাহ তাকে এদের খপ্পর থেকে বাঁচিয়ে রাখুন)। শুধু তাই নয়, এরা তার কথাগুলোকে জনসম্মুখে ও বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেদারসে প্রচার করে বেড়াচ্ছে। যার ফলে লোকেরা এগুলো পড়ছে এবং এগুলোতে শাইখ কারদাবির নাম দেখে খুবই অনায়াসে তা সত্যায়ন করছে! যেহেতু আমাদের বর্তমান যুগে শাইখ কারদাবির একটা অবস্থান তৈরি হয়ে গেছে এবং তার কথাগুলোর উপর ইলমী সমালোচনা ও পর্যবেক্ষণ এর আকাল পড়ে গেছে! অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বর্তমান যুগে তাওহীদকে বুঝতে ও তাওহীদের হককে সঠিকভাবে আদায় করতে যারা সচেষ্ট হয়েছেন সেসব নির্ভেজাল আলেমদের মধ্যে সাইয়্যিদ কুতুব রাহিমাহুল্লাহ অন্যতম। আর এক্ষেত্রে তিনি সাইয়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী ¹, শাইখ দাওসারী ও অন্যান্য এমনসব বড়ো বড়ো আহলে সুন্নাহর আলেমদের সহচর, যাঁদেরকে আল্লাহ এধরণের ইরজায়ী আক্বীদাহর জীবাণু থেকে নিরাপদ রেখেছেন । আল্লাহ তা'আলা এই জীবাণু থেকে বাঁচিয়েছিলেন তাঁদেরও পূর্ববর্তী আলেমদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নজদী এবং তাঁরও আগে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহর পন্ডিতগন, যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনে ক্বাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ, ইবনে কাসীর, ইবনে রজব হাম্বলী এবং তাঁদেরও পূর্বে খাইরুল কুরুনের আলেমগণকে।

আবার আমরা এটাও স্বীকার করি যে, সাইয়্যিদ কুতুব শহীদ (রাহিমাহুল্লাহ) কিছু ক্ষেত্রে সত্যের গণ্ডিকে অতিক্রম করে গেছেন। আর তা হয়েছে হয়তোবা তিনি একজন সাহিত্যিক হওয়ার কারণে। কেননা সাহিত্যিকদের কাছে অর্থের চেয়ে শব্দ বেশি গুরুত্ব পায়। যদিও ঐ শব্দ উদ্দেশ্যকে ব্যক্ত করতে ব্যর্থ হয়। অথবা তা হয়েছে তার কুরআনুল কারীমের কতিপয় আয়াতের সঠিক অর্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে। যেমন আল্লাহ তা'আলার সিফাত সংক্রান্ত কতিপয় আয়াতের মধ্যে তাঁর উল্লেখিত টিকা-টিপ্পনীর মাঝে। 'প্রত্যেক মানুষেরই কিছু কথা গ্রহণযোগ্য আর কিছু কথা পরিত্যাজ্য; কোন মানুষেরই সব কথা গ্রহণীয় নয়, রওজা মোবারকে শায়িত রাসুল সা. এর কথা ব্যতীত'- এই কথার উপর আমাদের পরিপূর্ণ আস্থা আছে এবং আমরা এর সত্যায়ন করি। আমাদের এই দাবীর সমর্থনে অচিরেই সাইয়্যিদ কুতুব রাহিমাহুল্লাহর ভুলগুলোর ব্যাপারে লিখনী প্রকাশ করব। আর এভাবেই আমরা কারদাবি, আলবানী ও তাঁদের অনুসারী আলেমগন, যাঁরা বাহ্যিকভাবে ইনসাফ ও তাকলীদহীনতার দাবী করেন; অথচ বাস্তবে তাঁরা করেন না- তাদের বিপরীত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখাবো। আর যেটুকু সময় মিলেছে, সে সময়েই আমি এই ছোট্ট পরিসরে সাইয়্যিদ কুতুব রহ. এর চিন্তাধারার ব্যাপারে শাইখ কারদাবির একটি রচনার উপর কিছু কথা সংযোজন করেছি। ইনশাআল্লাহ সময় সুযোগ হলে এ ব্যাপারে আবারও কিছু লিখার চেষ্টা করব। 

কারদাবি বলেছেন-

"এই সময়ে সাইয়্যিদ কুতুব ইখওয়ানের পাশ ঘেঁষতে শুরু করলেন। নিজ চোখে তিনি ইখওয়ানীদের উদ্যম-তৎপরতা, দায়িত্বসচেতনতা, তাদের মধ্যকার মজবুত সম্পর্ক, গভীর ভ্রাতৃত্ব, তাদের অনেকের সূক্ষ্ম জ্ঞান-বুদ্ধি, সূক্ষ্ম অনুভূতি দেখতে পেলেন। আর ইখওয়ানের প্রধান গুরু উস্তাদ হাসান হুদাইবী (১৮৯১-১৯৭৩) তাঁকে সফরের সময় সাথে রাখতেন যেন তিনি নিজ চোখে দেখেন। স্বীয় কানে শুনেন। অতঃপর বিবেক দ্বারা বিচার করেন এবং নিজের জন্য এই দলকে নির্বাচন করে নেন। এরপর সাইয়্যিদ কুতুব রহ. তাঁর পরিপূর্ণ ইচ্ছার সাথে ইখওয়ানের রাজনীতিতে যোগ দেয়াকে নির্বাচন করলেন। অবশ্য পরবর্তীতে আন্দোলনের কর্মীদের ব্যাপারে তাঁর ধারনা ভুল প্রমানিত হয়। যাদের মাঝে তিনি অনেক আশা ও স্বপ্নের বীজ বুনন করে ফেলেছিলেন! কিন্তু অবশেষে সেই আশা ও স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়, যেমন প্রেমিক কবির স্বপ্ন ভেঙ্গে গিয়েছিল। কবি বলেন-

যেমন নাকি আমি পানিকে মুষ্টিতে ধারণ করলাম পুরো রাতভর,

কিন্তু আমার সাথে প্রতারনা করল আমার আঙুলেরই ফাঁকফোকর!

এখন আমি প্রথম অংশে সাইয়্যিদ কুতুব, সাইয়্যিদ কুতুবের ইখওয়ানের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তি, দলের দা'ওয়াহ প্রকাশনা বিভাগের প্রধান পদ গ্রহণ ও ইখওয়ানের মুখপত্র ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নেয়া এবং ইখওয়ানীদের সাথে তাঁর মামলায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ও তাদের সাথে তাঁরও দশ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত হওয়া ইত্যাদি বিষয়ে যে আলোচনা করেছি- সেইসব বিষয়ের প্রতি পাঠকদের মনযোগ ফেরাতে চাই।"

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সাইয়্যিদ কুতুব একজন অনন্য সাহিত্যিক হওয়া সত্ত্বেও এবং তখনও ইসলামকে তাঁর জীবনের লক্ষ্যস্থল হিসেবে গ্রহণ না করা সত্ত্বেও ইসলামের বাস্তবতা-প্রকৃতি ও মহত্ব-শ্রেষ্ঠত্বের উপর তাঁর চক্ষুদ্বয় প্রস্ফুটিত হওয়ার পর তিনি আস্তে আস্তে তাঁর পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করেন। তাঁর এই পরিবর্তনটা ছিল ধীরগতিতে। ক্ষমাযোগ্য রূপে। আর তখনকার সময়ে আরবের আঙিনায় ইখওয়ানুল মুসলিমীনই ছিল একমাত্র বিকল্প রাজনৈতিক দল, যে দল জনসম্মুখে ইসলামকে উপস্থাপন করত। এতে ইখওয়ানের চিন্তাধারা ও মতাদর্শ চাই সবগুলোই সঠিক হোক বা বেশিরভাগ অথবা অনেক বাড়াবাড়ি থাক, যা তিনি দূর থেকে লক্ষ্য করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি ইসলামের ব্যাপারে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করলেন এবং তাওহীদের সঠিক অর্থকে অনুধাবন করলেন, তখন তিনি ইখওয়ানুল মুসলিমীনের রাজনীতি থেকে নিজেকে আলগা করে নেয়াকেই নিজের জন্য বেছে নিলেন। আর দ্বীনি ভাই শাইখ ইউসুফ কারদাবি এটা চিত্রিত করছেন এমনভাবে যে, “সাইয়্যিদ কুতুব শহীদ রহ. ইখওয়ানে যোগদান ও তাদের সাথে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে জিহাদি কার্যক্রমের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছার পর পিছু হটে যান এবং ইখওয়ান ত্যাগ করেন। আর তার ইখওয়ান ত্যাগের কারণ তার পক্ষ থেকে চিন্তা-চেতনায় একটি অসন্তুষ্টজনক পরিবর্তন, যে চিন্তা-চেতনা তাঁকে তাকফীর পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়!” এবং এই কথা ছাড়া আরও অনেক ফালতু কথা, যা আমি অচিরেই আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। অথচ প্রকৃত সত্য হল যে, সাইয়্যিদ কুতুব রহ. ইখওয়ানে যোগদান করেছিলেন তাঁর উন্নত চিন্তাধারার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে। তদুপরি সেখানে ইখওয়ানের বিকল্প দ্বিতীয় কোন ইসলামিক দল ছিল না। অতঃপর ধীরে ধীরে তাঁর চিন্তাধারা আরও উন্নতি লাভ করতে থাকে, একসময় তিনি তাঁর উন্নত চিন্তাধারার মাধ্যমে ইখওয়ানের আক্বীদাগত ত্রুটি ও ইরজায়ী দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পান, ফলে তিনি নিজেকে ইখওয়ানের রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নেন এবং ইখওয়ানকে পরিত্যাগ করে নতুন আরেকটি উন্নত চিন্তাধারায় গিয়ে পৌঁছেন- যা আমি অচিরেই আলোচনা করব। সুতরাং সাইয়্যিদ কুতুব রহ. চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে ধারাবাহিকভাবে নিম্ন থেকে উচ্চ পর্যায়ে আরোহন করতে থাকেন। ক্রমশ উন্নত থেকে উন্নততর পর্যায়ে পৌঁছতে থাকেন। কিন্তু এভাবে নয়, যেভাবে কারদাবি চিত্রিত করছেন যে, সাইয়্যিদ কুতুব চিন্তাগত দিক দিয়ে প্রথমে নিম্ন থেকে উচ্চ পর্যায়ে আরোহন করেন, অতঃপর সেই উচ্চ পর্যায় থেকে থেকে পূনরায় নিম্ন পর্যায়ে চলে আসেন!

কারদাবি বলেছেন-

"এটা হল নতুন এক ধাপ, যেথায় এসে সাইয়্যিদ কুতুবের আদর্শ আরো অগ্রসর হয়। এটাকে আমরা 'ইসলামী বিপ্লবের ধাপ' নাম দিতে পারি। অর্থাৎ প্রত্যেক ইসলামী সরকার বা যারা নিজেদের সরকার ব্যবস্থাকে ইসলামী দাবি করে, তাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব। এই বিপ্লব প্রতিটি ইসলামী সমাজ বা যারা তাদের সমাজকে ইসলামী সমাজ দাবি করে সেগুলোর বিরুদ্ধে বিপ্লব। প্রকৃত সত্য হল যে, সাইয়্যিদ কুতুবের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পৃথিবীর সব সমাজই জাহিলী সমাজ।

এই বিপ্লবী চিন্তা-চেতনা গঠিত হয়েছে তাঁর আশেপাশে লোকজন ও তাঁর পরিবেশের জন্য। এই বিপ্লব সমাজকে সমূলে তাকফীর করে! সাধারণভাবে সব মানুষকেই তাকফীর করে।"

সুবহানাল্লাহ! এসব কথা মিথ্যা এবং তাঁর উপর অপবাদ! সাইয়্যিদ কুতুব কখনোই ব্যাপকভাবে মুসলমানদের তাকফীর করেননি। এসব কথা তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, দূর্বল ও নিজ পক্ষ থেকে আবিষ্কৃত কথা, যা দ্বারা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্য! এবং অত্যন্ত হীন চেষ্টা যা বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা ও ইনসাফের চেষ্টা করার যে চিত্র শাইখ কারদাবি এ কথাগুলোর মাধ্যমে আঁকতে চেয়েছেন তার সাথে খাপ খায় না, "সর্বাবস্থায় সাইয়্যিদ কুতুব তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে মুখলিস বা নিষ্টাবান, তাঁর ইজতিহাদে তিনি পূণ্যের অধিকারী, চাই সে ইজতিহাদ সঠিক বা বেঠিক, যতোক্ষণ পর্যন্ত ইসলাম তাঁর কেন্দ্রস্থল হবে, হবে তাঁর মনজিলে মাকসুদ ও টার্গেট।"

সাইয়্যিদ কুতুব তো একথা বলেছেন যে, বর্তমান যে সমাজগুলো আল্লাহর বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করেনা, সেটা জাহেলী সমাজ। আর যেসব মুসলমান এই মানবরচিত বিধানে সন্তুষ্ট থাকে, এর সহায়তা করে এবং এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এর পতাকাতলে কাজ করে, তারা আল-ওয়ালা লিল্লাহ বা আল্লাহর সাথে বন্ধুত্বতা স্থাপনকারী নয় এবং আল্লাহর শরী'আহ বা বিধানকে অস্বীকারকারী। আর এই পুরো বক্তব্যই সঠিক, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কেননা আল্লাহর হুকুমের মূলনীতি আবশ্যিকভাবে এটা দাবি করে যে, মুসলমানদের সামাজিক জীবন চলবে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী, অন্যথায় তা হবে জাহেলী সমাজ। এই দুই দিক ব্যতীত তৃতীয় আর কোন দিক নেই। যে ব্যাক্তি আল্লাহর শরী'আহ ব্যাতীত অন্য কোন বিধান দ্বারা ফায়সালাকারী শাসকের জন্য নিজের আত্মা ও সত্বাকে সমর্পণ করবে শত্রুতা ও জিদের বশবর্তী হয়ে, এধরনের লোকেদের জন্য কাজ করবে, সহায়তা করবে এবং আল্লাহর শরী'আহ কায়েমের দিকে আহবানকারী ব্যক্তির বিরোধিতা করবে, সে ঐসকল শাসকদেরই অন্তর্ভুক্ত। আর কুরআনে আল-ওয়ালা ওয়াল বারাআহর আয়াতসমূহ এই সকল ব্যক্তিদের জন্য নাসিহা বা উপদেশ দানকারী এই কথাটাই বুঝানোর জন্য। তবে তা তাদের জন্যই, যাদের রয়েছে অনুধবাবন করার মতো অন্তর অথবা যার রয়েছে একথা শোনার মতো কান। সাইয়্যিদ কুতুব কখনও ঢালাওভাবে মুসলিম উম্মাহকে তাকফীর করেননি। প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলিমকে কাফের সাব্যস্ত করেননি। এরকম কথা থেকে আল্লাহর পানাহ চাই। আর যে তাঁর ব্যাপারে এমন কথা বলে, তার জন্য আবশ্যক হল, তার এমন কথা/লিখনী উপস্থাপন করা, যেটা ঢালাওভাবে উম্মাহকে তাকফীর করার উপর প্রমাণ বহন করে। আর এক্ষেত্রে কারদাবি অনুসরণ করেছেন আনসার-আল ইসলাম নামের দল এবং কম্যুনিষ্ট বা উদারপন্থী ড. মুহাম্মদ উমারাহ এর মতো ব্যক্তির। যে আগেই সাইয়্যিদ কুতুবের বেলায় এরকম অপবাদ আরোপ করেছিল।

আমি এবার কারদাবির বাকি আলোচনা পূর্ণ করব। কারদাবি বলেছেন-

"এই বিপ্লবী চিন্তা-চেতনা গঠিত হয়েছে তাঁর আশেপাশে লোকজন ও তাঁর পরিবেশের জন্য। এই বিপ্লব সমাজকে সমূলে তাকফীর করে! সাধারণভাবে সব মানুষকেই তাকফীর করে... কেননা তারা আল্লাহর হাকিমিয়্যাহ তথা শাসকত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং গাইরুল্লাহর শাসনকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছে। মানব রচিত নীয়ম-নীতি, মানব প্রবর্তিত আইন ও দুনিয়াবী শৃঙ্খলাকে বিধান হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। তারা দর্শন, শিক্ষানীতি, সভ্যতানীতি, মিডিয়ানীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি- সবগুলোই গ্রহণ করেছে অমুসলিমদের থেকে। অনৈসলামিক সমাজ থেকে। সুতরাং তাদের উপর দ্বীনে- ইসলাম থেকে 'রিদ্দাহ' এর হুকুম ছাড়া আর কী হুকুম লাগানো যেতে পারে?! মুরতাদ ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে?!"

সাইয়্যিদ কুতুবের উপরোক্ত কথার মাঝে কী এমন আছে আছে যে, কারদাবি কথাটাকে উল্লেখ করারা পর আশ্চর্যবোধক চিহ্ন (!) ব্যবহার করবেন?! মূলত ইখওয়ানের অন্যান্য সদস্যদের মতো কারদাবির মাঝেও শিবহে-ইরজাহর (ইরজায়ী আক্বীদাহ) আকীদা প্রবেশ করেছে। যেমন তাদের বক্তব্য, “পূর্ন সামর্থ্য ও দৃঢ় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় আমল করা যায়না", থেকে পরিলক্ষিত হয়!

এই ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, 'নিশ্চয় যে শরী'আহর উপর আমল করতে সক্ষম এবং আমল করতে আগ্রহী, তার উপর শরীয়তের উপর আমল করা আবশ্যক।' এটা এমন বিষয় যার ব্যাপারে ঐ মুরজিয়ারা ছাড়া আর কেউ সন্দেহ পোষন করতে পারে না, যারা আমলকে ঈমান থেকে পিছিয়ে রাখে। আর এটা এমন এক বিষয়, যা দীর্ঘ ব্যাখাসাপেক্ষ ব্যাপার। তবে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহর রহ, এই কথাটি থেকে কমপক্ষে বোঝা সম্ভব যে, ইখওয়ানীরা যুগের মুরজিয়া। যেহেতু কারদাবি অপরাপর ইখওয়ানীদের মতো ঐ কথাটি (পূর্ণ সামর্থ্য ও দৃঢ় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় আমল করা যায়না) মানেন, সেহেতু তিনি সাইয়্যিদ কুতুবের ব্যাপারে আশ্চর্যবোধ করছেন যে, যেহেতু মানুষদের অবস্থা এরকম, তাহলে কিভাবে তিনি মানুষদের ইসলাম থেকে মুরতাদ বলে হুকুম লাগান?!

সুবহানআল্লাহ! এখানে আমি শাইখ আহমদ শাকির রহ. এর ব্যাখ্যা উল্লেখ করছি, যা তিনি সুরা মায়িদাহর আয়াত ] ومن لم يحكم بما أنزل الله فأؤلئك هم الكافرون এর ব্যাপারে করেছেন। তদ্রুপ আমি এখানে হযরত ইবনে আব্বাস ও আবু মিজলায রা. থকে বর্ণিত আসার, যে আল্লাহর শরী'আহ অনুযায়ী বিচার না করাটাও একধরণের কুফর- তা উল্লেখ করছি বাড়তি ফায়েদার জন্য।

আহমাদ শাকির রহ. বলেন-

ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত এই আসারগুলো নিয়ে আমাদের যুগের ইলমের দাবীদার পথভ্রষ্টকারী ও দ্বীন-ইসলামের উপর স্পর্ধা প্রদর্শনকারীরা খেলতামাশা করে চলছে! তারা এই আসারগুলোকে ওজর সাব্যস্ত করছে! তারা মানবরচিত এসব আইন-কানুন, যা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে- সেগুলোকে বৈধতা দিচ্ছে!

আর এখানে আবু মিজলায রা. এর আসারটি হল ইবাদিয়্যাহ খারেজীদের সাথে তার বিতর্কের ক্ষেত্রে এমন শাসকদের ব্যাপারে, যারা তাদের বিচারকার্যে জুলুম করে এবং কিছু মোকদ্দমায় নিজের মনের খেয়ালখুশি মতো কিংবা অজ্ঞতাবশত আল্লাহর শরী'আহ অনুযায়ী বিচার করে না। খারেজীদের মাযহাব হল, কবীরাহ গুনাহয় লিপ্ত ব্যাক্তি ইসলাম থেকে বহির্ভূত-কাফের। খারেজীরা আবু মিজলায রা. এর এই হাদিসটা পেয়ে তারা তার সাথে বিতর্ক করতে চায় যে, আবু মিজলায রা. যেন তাদের সাথে সম্মত হোন ঐ সমস্ত শাসকদের কুফুরীর ব্যাপারে। যাতে ঐসব শাসকদের বিরুদ্ধে তরবারি উঠাতে এদের দলীল কায়েম হয়ে যায়। আর এই দুটি আসারকে ইমাম তাবারী রহ. বর্ণনা করেছেন। এগুলোর উপর আমার ভাই মাহমুদ শাকির মূল্যবান এক টীকা লিখেছেন। তাই আমি সংকল্প করেছি যে, প্রথমে তাবারীর বর্ণনা উল্লেখ করব অতঃপর উভয় আসারের উপর আমার ভাইয়ের লেখা টীকা উল্লেখ করব।

ইমাম তাবারী বর্ণনা করেন ইমরান বিন হায়দার থেকে বর্ণিত, যে তিনি বলেন, আমর বিন সাদুস গোত্রের কিছু লোক আবু মিজলায রা. এর কাছে এসে বলল, হে আবু মিজলায! আল্লাহর বাণী "যে ব্যাক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করেনা, সে কাফের" এর ব্যাপারে আপনার মত কি? এটা কি সত্য? আবু মিজলায বললেন, হ্যাঁ, সত্য! তারা আবার বলল, "যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করেনা, তারা ফাসেক"- এটাও কি সত্য? তিনি বললেন, হ্যাঁ! তারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, "যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করেনা, তারা জালেম"-এটাও কি সত্য? তিনি বললেন, হ্যাঁ, সত্য। এবার তারা বলল, সুতরাং এরা কি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করে? (তাদের উদ্দেশ্য ছিল, বনী উমাইয়্যার জালেম শাসকরা)। তিনি বললেন, এটা তাদের এমন দ্বীন, যার অনুসরণ তারা করে, যার কথা তারা বলে এবং যার প্রতি তারা লোকদের দাওয়াত দেয়! আর যদি তারা তাদের এই দ্বীনের কিছু ছেড়েও দেয়, তবু তারা মনে করে যে, তারা গুনাহয় লিপ্ত হয়েছে। তারা বলল, না না! আল্লাহর কসম! আপনি তো এদের মাঝে পার্থক্য করে ফেলছেন! তিনি বললেন, তোমরাই এ ব্যাপারে আমার থেকে অধিক উপযুক্ত। (আবু মিজলাযের এ কথার উদ্দেশ্য এই যে, তারাই খারেজী, তিনি নন।) আমি এটা মনে করি না। অথচ তোমরা তা মনে করছ। তোমরা বিষয়টিকে জটিল করো না।

আমার ভাই সাইয়্যিদ মাহমুদ এই দুই বর্ণনার উপর এই টীকা লিখেছেন-

“হে আল্লাহ! তোমার কাছে পথভ্রষ্টতা থেকে পানাহ চাচ্ছি! নিশ্চয় এই যামানার আলোচক ও দাঈ নামের সন্দেহবাজ ও ফিতনাবাজরা শাসকদের জন্য আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ব্যতিরেকে মানবরচিত বিধান দ্বারা বিচারকার্য সম্পাদন করার জন্য ওজর খুঁজতে শুরু করেছে! তদ্রুপ জান-মাল, মান-সম্মান ও হত্যাকান্ডসংক্রান্ত বিচারকার্যেও আল্লাহর শরীয়া ব্যতিরেকে মানব প্রবর্তিত আইনের মাধ্যমে বিচারকার্য সম্পাদন করা ও মুসলিম দেশে কাফেরদের প্রণীত আইনকে শরীয়াহ বানানোর ক্ষেত্রেও ওজর খুঁজতে শুরু করেছে! যখন তারা তাবারীর এই রেওয়ায়েতদ্বয়ের ব্যাপারে অবগত হল, তখন তারা জান-মাল, মান-সম্মান ও হত্যাকান্ডের বিচারকার্যে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ব্যতিরেকে অন্য কোন আইন দ্বারা বিচারকরণকে সঠিক বলে ফতোয়া দিতে শুরু করল। এবং এ-ও বলতে লাগল যে, সাধারণ বিচারকার্যে আল্লাহর শরীয়াহর বিরোধিতা করাটা এর সন্তুষ্টি পোষণকারী ব্যক্তি ও সম্পাদনকারী ব্যক্তিকে কাফের সাব্যস্ত করেনা! এই দুই রেওয়ায়েতের প্রতি দৃষ্টিপাতকারী ব্যক্তির জন্য জিজ্ঞাসাকারী এবং জিজ্ঞাসিত ব্যাক্তিকে না চিনলে তার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হবে না।

সুতরাংঃ আবু মিজলায হলেন নির্ভরযোগ্য তাবেয়ী। তিনি আলী রা. কে ভালবাসতেন। আর তাঁর গোত্র বনী শাইবানও আলী রা. এর দলভূক্ত ছিল জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফীনের দিন। অতঃপর যখন জঙ্গে সিফফীনের দিন দুই গ্রুপের বিচারক একটি ফয়সালায় উপণীত হলেন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে খারেজীরা আলী রা. এর দল থেকে বের হয়ে গেল, তখন আলী রা. বনূ শাইবান ও বনু সাদুস বিন শাইবান বিন যাহালের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বেরিয়েছিলেন- আবু মিজলায তাদের বিরুদ্ধে আলী রা. এর সাথে ছিলেন। অপরদিকে যারা আবু মিজলাযকে কে প্রশ্ন করেছিল, তারা বনী আমরের লোক ছিল। আর তারা ছিল ইবাদিদের একটি সম্প্রদায়। হারুরিয়‍্যাহ নামক খারেজীদের নেতা আব্দুল্লাব বিন ইবাদের অনুসারী। যার আক্বীদাহ এই ছিল যে, নিশ্চয় যে খারেজীদের বিরোধিতা করবে, সে কাফের; মুশরিক নয়। সে হিসেবে আবু মিজলায তার গোত্রের লোকদের বিরোধিতা করলেন......

আর এটা স্পষ্ট যে, যেসকল ইবাদিরা আবু মিজলাযকে প্রশ্ন করেছিল, তারা চাচ্ছিল সুলতানের দলভুক্ত হওয়ার কারণে উমারাদের তাকফীর করার ব্যাপারে আবু মিজলাযের উপর দলিল চাপিয়ে দিতে। আর যেহেতু উমারাগণ কখনো আল্লাহর অবাধ্যতা করে ফেলতে পারেন ও আল্লাহর নিষেধ না মানতে পারেন, সেই হিসেবে আবু মিজলায তাঁর থেকে বর্ণিত প্রথম আসারের মধ্যে বলেছেন, 'তারা যদি আল্লাহর কোন আদেশকে ছেড়ে দেয়, তাহলে তারা বুঝতে পারে যে, তারা এক্ষেত্রে গুনাহগার।' এবং দ্বিতীয় আসারের মধ্যে বলেছেন, 'আর তারা যা করে, তা করার ক্ষেত্রে নিজেদেরকে গুনাহগার জেনেই করে।' সুতরাং তাদের প্রশ্ন বর্তমানের বিচারিক বিদআতীরা জান-মাল, মান-সম্মান ও হত্যাকান্ডের বিচারক্ষেত্রে আল্লাহর শরীয়াহ বিরোধী যে মানবরচিত আইনের বিষয়ে দলীল দিচ্ছে, তার দলীল হবে না।

বরং তা (বর্তমানের এসব কার্যকলাপ) রাসুল সা. এর বানী অনুযায়ী আল্লাহর বিধান থেকে পৃষ্টপ্রদর্শন, দ্বীন থেকে বিমুখতা এবং আল্লাহর বিধানের উপর কুফুরী বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া। আর এটা এমন কুফর, যার ব্যাপারে কোন আহলে কিবলার সন্দেহ নেই, যদিও তাদের মাঝে এধরণের ব্যক্তিকে কাফের সাব্যস্ত করতে মতানৈক্য রয়েছে।

আর বর্তমানে আমাদের সামাজিক হালত হল যে, এখানে কোনধরণের বাছবিচার ছাড়া কুরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত আল্লাহর বিধান সম্পূর্নরূপে প্রত্যাখ্যাত! আল্লাহর শরীয়ত সমূলে বাতিল বলে গন্যকৃত! ইসলামের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি যে, কোন শাসক মনগড়া এমন কোন বিধান রচনা করেছে, যেটা অনুযায়ী ফায়সালাকে সে আবশ্যক করেছে। আর আবু মিজলাযের সময় ও তার পূর্ব ও পরে, এমন কোন শাসক গত হয়নি, যিনি নিজের মনগড়া বিধান দিয়ে ফায়সালা দিয়েছেন আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে অথবা কুফুরী বিধানকে ইসলামী বিধানের উপর প্রাধান্য দিয়ে। কিন্তু এটাই বর্তমানে হচ্ছে। ইসলামী শরীয়ার উপর কুফুরী সংবিধানকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

সুতরাং কখনোই আবু মিজলায ও তৎকালীন খারেজীদের ঘটনাকে বর্তমানের সাথে মিলানো যাবে না। যারা এই দু'টি বর্ননা এবং এর মত রেওয়ায়েত দ্বারা দলীল পেশ করে, এর অর্থের বিকৃতি ঘটায় এই উদ্দেশ্যে যে, সরকারকে সহায়তা করবে বা আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় বাধা তৈরী করবে, তাদের হুকুম হল, তারা আল্লাহর বিধান অস্বীকারকারী। এদেরকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি অনড় থেকে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করে, আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করে এবং শরীয়তে পরিবর্তন ঘটাতে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তাকে কুফরের হুকুম দেওয়া হবে।”-তাখরিজ তাফসির আত-তাবারি, ১০

এখানে আহমাদ ও মাহমুদ শাকির রাহি, দ্বয়ের আলোচনা সমাপ্ত হয়ে গেছে। আল্লাহ তাঁদের উভয়কে জাযায়ে খাইর দান করুন। যারা তাঁদের মর্যাদার ব্যাপারে অজ্ঞ, তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি। তাঁরা হলেন হাদীস, আরবী ভাষা ও তাফসীরের জগতের দু'জন দিকপাল। এই যুগের কেউই তাঁদের বরাবর হতে পারবে না। আর কারদাবি তাঁর ইলম দিয়ে তাঁদের ইলমের এক পার্শ্বও ও কর্তন করতে পারবেন না।

সম্মানিত পাঠক! 

আপনি একটু লক্ষ্য করুন, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন আহমদ শাকির ও মাহমুদ শাকির রাহি, এই আসারদ্বয়কে যেভাবে ব্যাখা করেছেন, সেভাবে যদি কেউ এই আসারদ্বয়কে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে সে ব্যক্তিকে ইলমের দাবীদার দরবারী কোন আলেম কি তাওবা করার কথা বলবে? যেমনটা জনৈক ইসলামী দলের নেতা 'দু'আত লা-কুযাত' নামক কিতাবে বলেছেন!!!( কিতাবটির লেখক হাসান আল হুদাইবি। হাসানুল বান্নার মৃত্যুর পর তিনি ইখওয়ানুল মুসলিমীনের দ্বিতীয় "মুরশিদ" বা জেনারেল গাইড মনোনীত হন) 

অথচ তিনি সরকারকে তাওবা করতে বলেননি, কারন তার দৃষ্টিতে সরকারের তাওবা করার কোন প্রয়োজনই নেই! অথচ এ ধরণের সরকারের হুকুম সামান্য জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির জানা।

কারদাবি আরো বলেছেন-

"বরং তার কাছে বাস্তবতা হল এই যে, তারা আদৌ ইসলামে প্রবেশ করেনি যে এদেরকে মুরতাদের হুকুম দেওয়া হবে। ইসলামে প্রবেশের মানে হল মুখে এই দুই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং হযরত মুহাম্মদ সা. তাঁর রাসুল। আর তারা তো শাহাদাতের মর্মই বুঝেনি! তারা বুঝেনি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ হল মুসলমানদের জীবন পরিচালনার পদ্ধতি, যা তাদেরকে অন্যান্য এমনসব জাহেলদের থেকে পৃথক করে দেয়, যাদেরকে সাধারণ লোক জ্ঞানী ও সভ্য মনে করে!

আমি (কারদাবি) বলি, এধরণের বিপ্লবী চিন্তা শুধুমাত্র অন্ধকার কারাগারের ভেতর হতে পারে। মনুষ্য সমাজে নয়। বিশেষ করে মিশর ও মিশরের অধিপতি জামাল আব্দুন নাসেরের সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ও সমাজতান্ত্রিক সমাধানের অত্যাবশ্যকীয়তা ঘোষনার পর। তদুপরি ঐ অঙ্গীকার সাব্যস্ত হওয়ার পর, যাকে কেউ কেউ কুরআনুস সাওরা বা কুরআনের বিপ্লব বলে অভিহিত করেছেন। সাথে সাথে সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে মিশরের সম্পর্ক গড়ে উঠা ও সমঝোতার পর এবং প্রচার মাধ্যম, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও চিন্তা-চেতনা বিকাশের মাধ্যমগুলোর উপর আধিপত্য বিস্তারের পর ও ঐতিহাসিক ইসলামী মিশরের চেহারা পরিবর্তনের চেষ্টার পর।"

কারদাবির উপরের কথাটার মূল বক্তব্য ও উদ্দেশ্য মিশরের নাস্তিকদের কথার অনুরূপ, যারা সাইয়্যিদ কুতুবের ব্যাপারে এই অপবাদ দিয়ে থাকে যে, সরকারের কাছ থেকে যে শাস্তি তিনি পেয়েছেন, কারাগারে তিনি যে অবস্থা দেখেচনে, তাঁর চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিই তারই ফলাফল। তাঁর আদর্শ মূলত সত্যাশ্রিত নয়।

আসলে এটা একটা সস্তা ওজর। যার মাধ্যমে কারদাবি বিষয়ের মৌলিক দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছেন এবং সংশ্লিষ্ট আদর্শের উপর সন্দেহের কালিমা লেপন করছেন। কিন্তু সকলেই এসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চালে বিভ্রান্ত হয় না, এবং এমনো অনেকে আছে যারা এসব অপকৌশজল সম্পর্কে অবগত এবং এসব কৌশল চিনতে সক্ষম। সুতরাং হে কারদাবি! আপনি যেইসব বাক্য উল্লেখ করছেন, তার উপর আপনার কতটুকু যাচাই আছে? এই বিষয়ের অশুদ্ধতার উপর কোরআন হাদীস থেকে আপনার দলীল কোথায়? (জেলের ভেতর সাইয়্যিদ কুতুবের অবস্থা, তাঁর অভিজ্ঞতা, জামাল আব্দুন নাসেরের নির্যাতন ও বিপ্লব সংক্রান্ত অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা ছাড়া!

সাইয়্যিদ কুতুব দেখতে পেয়েছিলেন, স্বয়ং কুফর আজ তার নিকাব খুলে দিয়েছে, সাধারণ জনগনকে চুপ করতে ও ভুলিয়ে রাখতে কোন প্রকার পর্দা ও ইউনিফর্মের প্রয়োজন নাই।

তারপর কারদাবি বলেছেন-

"সাইয়্যিদ কুতুব দেখতে পেলেন যে, তাকে একাই যুদ্ধে লিপ্ত হতে হবে সওয়ারী হয়ে বা পদাতিক হয়ে অথবা তলোয়ার নিয়ে। অথচ কলম ছাড়া তাঁর বিরোধীদের সাথে লড়াইয়ের জন্য ওপর কোন তরবারি তাঁর নেই! আর বিরোধীরা সংখ্যায় কতইনা বেশি! তিনি নাস্তিক, মুশরিকদের সাথে লড়াই করবেন, আল্লাহকে অস্বীকারকারী নাস্তিকদের সাথে যুদ্ধ করবেন, পৌত্তলিকদের সাথে যুদ্ধ করবেন। তিনি যুদ্ধ করবেন আহলে কিতাবী তথা ইহুদি-খৃষ্টানদের সাথে। সাথে তিনি এমনসব মুসলিমদের সাথেও যুদ্ধ করবেন, যাদেরকে জাহালাত গ্রাস করে নিয়েছে। ফলে তারা মুসলিম হয়ে বসবাস করছে ইসলাম ছাড়া। সাইয়্যিদ কুতুবের মেধা, প্রতিভা ও তাঁর অগ্রগামিতার ব্যাপারে আমার ঈর্ষা করা সত্ত্বেও, তাঁর প্রতি আমার বিরাট ভালবাসা ও সম্মানপ্রদর্শন, তাঁর ইখলাস ও একাকী হয়েও এমন চিন্তার ধারকবাহক হওয়ার কারনে তাঁর প্রতি আমার ঈমান থাকা সত্বেও, তাঁর ইজতিহাদ ও চিন্তাপ্রসবিত কর্ম সত্ত্বেও আমি তাঁর নতুন এইসব চিন্তা-চেতনার বিরোধী। যেসব চিন্তা-চেতনায় নতুন সাইয়্যিদ কুতুব পুরনো সাইয়্যিদ কুতুবের বিরোধীতা করেছেন। যেসব চিন্তা-চেতনায় সবাইকে দূরে ঠেলে নিক্ষেপকারী বিপ্লবী সাইয়্যিদ কুতুব আগের মুসলিম দাঈ সাইয়্যিদ কুতুবের বিরোধীতা করেছেন। অথবা "আল-আদালাহ” বইয়ের লেখক সাইয়্যিদ কুতুব "আল-মা'আলিম” এর লেখক সাইয়্যিদ কুতুবের বিরোধিতা করেছেন।

আমি সাইয়্যিদ কুতুবের কতিপয় মৌলিক চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে তাঁর সমালোচনা করেছি। যদিও এতে কিছু ভাই আমার নিন্দা করুক। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে আমি যা লিখেছি এবং যা সমালোচনা করেছি, তা দ্বীনের ব্যাপারে নসীহতস্বরূপ করেছি। আল্লাহর দরবারে ওজর পেশ করতে ও আমি যা হক বুঝেছি তা বর্ণনা করতে। অন্যথায় আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব, যারা ইলমকে লুকিয়ে রাখে, সত্যকে প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ করে, দ্বীনের ব্যাপারে ঢিলেমি করে এবং ব্যাক্তির সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর প্রাধান্য দেয়।

আর আমরা এটা বিশ্বাস করি যে, রাসুলের পর কেউই নিষ্পাপ নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির কিছু কথা গ্রহনীয় তো কিছু কথা পরিত্যাজ্য। আর রাসুল সা. ব্যতীত ইলমে কেউই বড়ো নন। যদি কোন আলেম ভুল করেন, এতে তাঁর সম্মান কমে না তাঁর পরিপূর্ন সৎ নিয়ত থাকলে। মুজতাহিদ ব্যাক্তি ভুল করলে তিনি মাজুর। বরং তিনি একটি সওয়াব পাবেন যেমনটা হাদীস শরীফে এসেছে। এখন চাই তাঁর ভুলটা ইলমী বা আমলী মাসআলার ক্ষেত্রে হোক। কিংবা মৌলিক বা শাখাগত বিষয়ে হোক। যেমনটা বলেছেন শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও তদীয় শাগরিদ ইবনে কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ ও অন্যান্য আলেমগন।

আর আমি তাঁর নব্য চিন্তাভাবনার যেই দিকটাকে বিপদজনক মনে করে সেটা হল, তাকফীরের প্রতি তাঁর ঝোঁক। এবং এক্ষেত্রে তার বেশি বাড়াবাড়ি। এমনকি পাঠকশ্রেণী তাঁর রচিত কিতাব "তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন" এর বিভিন্ন স্থানে এবং তাঁর কিতাব "মা'আলিম ফিত-ত্বারিক" এর মাঝেও তাঁর বাহ্যিক কথা দ্বারা বুঝে যে, বর্তমান প্রতিটি সমাজ জাহেলী হয়ে গেছে। আর জাহেলী দ্বারা তিনি কর্মগত ও পন্থাগত জাহালাত বুঝাননি, বরং আক্বীদাগত জাহালাত বুঝিয়েছেন। আর তা হল কুফর ও শিরক। কারন এই সমাজ আল্লাহর হাকিমিয়্যাহ কামনা করেনি, বরং আল্লাহর সাথে অন্যকে ইলাহ সাব্যস্ত করে নিয়েছে এবং তাদের থেকে নিয়ম-কানুন, নৈতিকতা-মূল্যবোধ, চিন্তা-চেতনা ও বুঝকে গ্রহন করেছে। আর এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর শরীয়ত, আল্লাহর কিতাব কুরআন ও রাসুলের সুন্নাহকে পরিবর্তন করে ফেলেছে।"

এখানে তো বাস্তবতার বিরোধী কিছু নেই। এই সমাজ (সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেক নাগরিক নয়) আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ছাড়া অন্য বিধানের বেলায় সন্তুষ্ট হয়েছে। (এতে কি কোন সন্দেহ আছে?)

আল্লাহর শরী'আহকে বদলে নিয়েছে। (এতে কি কোন সন্দেহ আছে?)

আল্লাহর দিকে আহবানকারীদের সাথে যুদ্ধ করেছে। (এতে কি কোন সন্দেহ আছে?)

এই সমাজ কুফরি ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট হয়ে পড়েছে, যদিও এই সমাজের প্রত্যেক নাগরিক কুফরি করেনি। আর এটা সাইয়্যিদ কুতুব কখনও বলেননি। অর্থাৎ সমাজের প্রত্যেক নাগরিককে কাফের সাব্যস্ত করেননি। কিন্তু এই সমাজের কুফরি ব্যবস্থাপনার কুফুরির ব্যাপারে তো আল্লাহ, আল্লাহর রাসুলের উপর ঈমান আনয়নকারী ও যার মাঝে ন্যূনতম জ্ঞান-বুদ্ধি আছে সে সন্দেহ করতে পারেনা। আশ্চর্যের ব্যাপার হল যে, এখানে তাঁর বক্তব্যের বিরুদ্ধে দলীল পেশ করা হয়নি। অথচ ভাবখানা এমন যে সাইয়্যিদ কুতুব এখানে শরী'আহর বিরোধী কোন কিছু উপস্থাপন করেছেন!

আজীব! দুর্বল, প্রত্যাখ্যানযোগ্য কৌশল!

কারদাবি বলেছেন-

"আর এই অবস্থার উপর ভিত্তি করে বলা যায়, সাধারণ মুসলিমদের ক্ষেত্রে জরুরী এটা নয় যে, ইসলামের সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইননীতি ইত্যাদি বিধান তাদের সামনে পেশ করতে হবে। কারন, এগুলো দিয়ে প্রকৃত মুমিনরাই উপকার হাসিল করতে পারবে। আর যে এগুলোর উপর এখনো বিশ্বাস স্থাপন করেনি, তার সামনে প্রথমে আকীদার দাওয়াত পেশ করতে হবে। যাতে সে আল্লাহকে রব হিসেবে মানে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে গ্রহন করে, মুহাম্মদ সা. কে রাসুল হিসেবে মানে আর শরী'আহকে হাকিম তথা শাসক হিসেবে গ্রহন করে।”

দেখুন সাইয়্যিদ কুতুব এব্যাপারে কী বলেছেন। তিনি বলেছেন, দায়ীর জন্য আবশ্যক হল, মানুষকে প্রথমে তাওহীদ ও তার উপর অটল থাকার দা'ওয়াহ দিবে। যাতে তার মর্ম মানুষের হৃদয়ে দৃঢ় হয়ে পড়ে। এমনভাবে দা'ওয়াহ দিবে যে, এই তিক্ত বাস্তবতা মানুষের মস্তিষ্কে স্থির হওয়া জ্ঞান-বুদ্ধিকে নাড়িয়ে দেবে। আর তাওহীদের প্রকৃত অর্থ বুঝার পর অন্তরে যে জং ধরেছিল তা বেরিয়ে আসবে। তা হাজারবার দূর হয়ে যাবে যদি আমরা ইসলামের ন্যায়পরায়ণতা, ইসলামের রহমত ইত্যাদি সামাজিক বিষয়বালী আলোচনা করি।

কারদাবি বলেছেন,

"আর এই দিকেই তিনি তাঁর "মা'আলিম” নামক কিতাবে এবং "আল-ইসলাম ওয়া মুশকিলাতুল হাযারাত” এর একটা অধ্যায়ে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি আমাদের বর্তমান সমাজকে রাসুলের মক্কী জীবনের সাথে তুলনা করেছেন। তখন রাসুল সা. বিধান ও শাসনব্যবস্থার দাওয়াত দেননি। বরং তাদের সামনে আক্বীদা ও তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন।"

এই বক্তব্যের মাঝে ভুলটা কোথায়? তিনি তো ঢালাওভাবে মুসলিমদের তাকফীর করেননি। বরং তিনি মানুষের অবস্থা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, প্রথমে তাদেরকে তাওহীদ ও তা মানুষের অন্তরে নবায়নের দাওয়াত দিয়েছেন। আর এমনটাই তিনি করেছেন। আর এমনটা তো আগে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নজদী রহ. করেছেন। মানুষকে কবরপূজা বর্জন ও শরী'আহর কাছে বিচার কামনা করার দাওয়াত দিয়েছেন। এই জন্য কি বলা হবে যে তিনিও উম্মাহকে তাকফির করলেন?!

কারদাবি আরো অগ্রসর হয়ে বলেছেন,

"এমনি ভাবে সাইয়্যেদ কুতুব মনে করতেন, বর্তমান আলেমরা ইসলামী ফিকহের উন্নয়ন ও নবায়ন এবং ইজতিহাদের প্রচলন নামে যে চেষ্টা চালাচ্ছেন, এতে কোন ফায়দা নেই। যতক্ষন মুসলিম সমাজ অনুপস্থিত থাকবে। প্রথমে একটি মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এরপর ইসলামের আলোকে আমরা এর সমস্যা সমাধানে চেষ্টা চালিয়ে যাব। আর আমি ইজতিহাদের ব্যাপারে তার যে মত, একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আগে শরীয়তে ইজতিহাদের কোন প্রয়োজন নেই- এটার সমালোচনা করেছি আমার বই "আল ইজতিহাদ ফিশ শারি'আতিল ইসলামিয়্যাহ" তে। এবং তাঁর এই চিন্তার অসারতা দলীল সহ বর্ণনা করেছি।

তদ্রুপ আমি সাইয়্যিদ কুতুবের ইজতিহাদ বিষয়ক মতের সমালোচনা করার সাথে সাথে জিহাদ নিয়ে তার আদর্শের ও সমালোচনা করেছি। বিশেষ করে তিনি ইসলামী ফিক্বহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেছেন। এতে তিনি সমসাময়িক ফকীহ ও দাঈদের বিরোধীতা করে এই আহবান করেন যে, মুসলিমদের আজ পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে, যতক্ষণ না তারা ইসলাম গ্রহন করে কিংবা আমাদের অধীনস্থ হয়ে জিযিয়া প্রদান না করবে।

আর এই ক্ষেত্রে তিনি সুরা তাওবার আয়াতসমূহকে দলীল হিসেবে পেশ করেন। যাকে অনেকেই আয়াতুস সাইফ বা তলোয়ারের আয়াত বলে নামকরণ করেছেন। তবে তিনি অনেক আয়াতের বিরোধীতা করতে মোটেও পরোয়া করেননি, যেগুলো শান্তি বা চুক্তির আহবান করে। যেগুলো আমাদেরকে কেবল তাদের বিরুদ্ধেই কিতালের নির্দেশ দেয়, যারা আমাদের সাথে কিতাল করে। যারা আমদের সাথে কিতাল করেনা ও আমাদের থেকে দূরে থাকে ও আমাদের দিকে সন্ধিচুক্তির জন্য হাত সম্প্রসারন করে, তাদের থেকে হাত গুটাতে বলে। যে আয়াতগুলো আমাদের বিরোধীদের ন্যায় ও কল্যাণের দাওয়াত দেওয়ার সবক দেয়, যখন তারা আমাদের সাথে দ্বীনের ব্যাপারে লড়াই না করে চুক্তি করে এবং যারা আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করেনি এবং এতে সাহায্য ও করেনি।"

সুবহানআল্লাহ! শাইখ কারদাবি একদম সুস্পষ্টভাবে এখানে বলছেন যে, কুরআনের কিছু আয়াত অপর কতক আয়াতের মুখালিফ বা বিরোধপূর্ণ! আবার দলীল হিসেবে কি সুরা তাওবার আয়াতগুলো যথেষ্ট নয়?! শাইখ কারদাবি এখানে 'অনেকে' বলে তাদের নাম অস্পষ্ট রেখেছেন। অথচ তারা হলেন ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনে কাসীর সহ প্রখ্যাত মুফাসসিরগন। সুতরাং চিন্তা করুন!

তদ্রুপ কারদাবি তার বক্তব্য "অনেক আয়াতের বিরোধিতা" এর দ্বারা কি সুরা তাওবার আয়াতের বিরোধীতা বুঝাতে চেয়েছেন? যেটা তাঁর ভাষাশৈলী থেকে বুঝা যায়! নাকি এটা বুঝাতে চেয়েছেন যে, সাইয়্যেদ কুতুব সুরা তাওবার আয়াতগুলোর যে মর্ম উদঘাটন করেছেন, সেটা কুরআন বিরোধী? আবার তিনি নিজে এসব আয়াতের সঠিক মর্মটি উল্লেখ করেননি। শুধু এতোটুকুই বলেছেন যে, এখানে তাওবার মুখালিফ আরো আয়াত আছে! (আল্লাহই ভালো জানেন) আবার তিনি বর্তমানে আক্রমনাত্মক জিহাদকে অবৈধ বলছেন। অথচ শরীয়তে চিরস্থিরকৃত মত হল, এটা দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বরং এটা দ্বীনের আবশ্যকীয় বিষয়াবলীর একটি। যেমনটা রাসুল সা. ও চার খলীফার জীবনীতে পাওয়া যায়। আর পারস্য ও রোম, যাদের উপত আক্রমণাত্মক হামলা করা হয়েছে- এসব জিহাদ কোথায়? এগুলোর ব্যাপারে তিনি কী বলবেন? মূলত এটা হল প্রবৃত্তির অনুসরণ। আর প্রবৃত্তি তার সাথীকে একেবারে ধ্বংস করে ছাড়ে।

কারদাবি তার নিজের কথার সমর্থনে বলেছেন,

"একথার উপর কুরআনের অসংখ্য আয়াত প্রমান বহন করে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী- তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করো তাদের সাথে, যারা তোমাদের সাথে লড়াই করে, এবং তোমর সীমালঙ্গন করোনা। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্গনকারীদের পছন্দ করেননা তোমরা তাদেরকে যেথায় পাও, সেথায় হত্যা কর। তোমরা তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দাও, যেখান থেকে তারা তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে। আর ফিতনা হত্যার চেয়েও মারাত্মক আর তোমরা তাদের সাথে মাসজিদুল হারামের কাছে লড়াই করোনা যতক্ষন না তারা তোমাদের সাথে সেথায় লড়াই করে। যদি তারা সেথায় তোমাদের সাথে লড়াই করে, তাহলে তোমরাও লড়াই করো।" -সুরা বাক্বারা, আয়াত- ১৯০-১৯১/

আর যদি তারা তোমাদের থেকে দূরে থাকে, লড়াই না করে এবং শান্তিচুক্তি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তোমাদের জন্য কোন সুযোগ রাখেননি। -সুরা নিসা, ৯০।

যদি তারা তোমাদের তোমাদের থেকে দূরে না থাকে, তোমাদের সাথে সন্ধিচুক্তি না করে এবং স্বীয় হাতকে বিরত না রাখে, তাহলে তোমরা তাদেরকে পাকড়াও কর এবং যেখানে পাও সেখানে হত্যা কর।- সুরা নিসা, আয়াত-৯১

আর যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সে দিকেই আগ্রহী হও এবং আল্লাহর উপর ভরসা কর। নিঃসন্দেহে তিনি শ্রবণকারী, পরিজ্ঞাত। -সুরা আনফাল, আয়াত- ৬১

ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচরন ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেননি। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালবাসেন। -সুরা মুমতাহিনা, আয়াত-৮

এই আয়াতগুলো সত্য, এতে কোনপ্রকার সন্দেহ নেই। কিন্তু স্থান, কাল ও পাত্রভেদে এগুলোর প্রয়োগ হবে। এখানকার আয়াতগুলো উল্লেখিত আহকামের স্তরানুক্রমিকভাবে প্রয়োগ হবে। আয়াতগুলো তার নির্দিষ্ট হকুমের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে।

"কিন্তু সাইয়্যিদ কুতুব সাহেব অত্যন্ত সহজভাবে এই সব আয়াত থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিচ্ছেন তার এই কথার মাধ্যমে যে, প্রাথমিক অবস্থায় এইসব আয়াত আমলযোগ্য ছিল। পরবর্তীতে এগুলোর আমল বন্ধ হয়ে যায়। আর আমাদেরকে শেষ অবস্থা থেকেই শিক্ষা নিতে হবে, যে পরবর্তী অবস্থাকে আগেকার তাফসীর বিশারদগণ 'নাসখ' বা রহিতকরণ বলে ব্যক্ত করেন। 'তাদের' বক্তব্য হল, এসব আয়াতগুলোকে আয়াতুস সাইফ বা হত্যানির্দেশক আয়াতসমূহ নাসখ বা রহিত করে দিয়েছে।"

'তাদের' বলতে আপনি কাদের বুঝাচ্ছেন হে শাইখ কারদাবি? আপনি 'তাদের' নাম উল্লেখ করছেননা কেন? তাদের নামকে কেন আপনি ডাষ্টবিনে ছুঁড়ে মারছেন? 'তাদের' বলে কেন তাঁদের নামকে অস্পষ্ট রাখছেন, অথচ তাঁরা হলেন নিজ নিজ যুগের তাফসীর শাস্ত্রের বড়ো বড়ো পন্ডিতগন?! আবার তাঁদেরকে অস্পষ্টভাবে উল্লেখ করছেন কেন?

আবার আপনি সম্পূর্ণ অত্যাচারমূলকভাবে সাইয়্যিদ কুতুবের উপর হামলে পড়ে বলছেন যে, তিনি নাকি বড়ো বড়ো মুহাদ্দিসীন ওলামাদের উপর হামলা করেছেন?!!!

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ! সাইয়্যিদ কুতুব উপরে উল্লেখিত আয়াতগুলোর ব্যাপারে নাসখ এর কথা বলে নিজেকে মুক্ত করে নেননি, বরং আপনি সাইয়্যিদ কুতুবের কিতাবগুলো পড়লে দেখতে পাবেন যে, সাইয়্যিদ কুতুব এর উপর যেসব আয়াতের বেলায় তিনি নাসখ এর দাবি করেছেন বলে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেসব আয়াতের বেলায় তিনি ঢালাওভাবে নাসখ এর মতাবলম্বী নন।

বরং আপনি সুরা তাওবার আয়াতুস সাইফ বা হত্যানির্দেশক আয়াতগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছেন কোনপ্রকার নাসখ এর দাবি করা ছাড়াই হে কারদাবি! কেননা পূর্ববর্তী আয়াত কখনও পরবর্তী আয়াতকে নাসখ করতে পারেনা! এরপরও আপনি কোন দলীল ছাড়াই নিজেকে মুক্ত করে নিলেন হে শাইখ কারদাবি?!

কারদাবি আরো বলেছেন,

"আর আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে সাইয়্যিদ কুতুব কুরআনের এসব আয়াতকে আয়াতুস সাইফের মাধ্যমে একেবারে বেকার করে দিচ্ছেন! অথচ তিনি একজন কুরআন গবেষণাকারী ব্যক্তি, যাঁর ব্যাখা ও চিন্তার সুশীতল ছায়ায় তিনি কাটিয়েছেনন দীর্ঘ সময়। সুতরাং যখন এই আয়াতগুলোর অর্থ বেকার সাব্যস্ত হল এবং এর প্রয়োগক্ষেত্র ও হুকুম বাতিল গন্য হল, তাহলে কুরআনে এর শব্দ অবশিষ্ট থাকার কি অর্থ?!"

পূর্বের আলোচনায় যাদের বুঝে আসেনি তাদের জন্য আবার বলছি। সাইয়্যেদ কুতুব কোন আয়াতকেই বেকার সাব্যস্ত করেননি। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে তিনি মনে করেন প্রত্যেক আয়াতের উপর তার নির্দিষ্ট স্থানেই আমল করা হবে। সুতরাং "তোমাদের হাতকে বিরত রাখো"- এই আয়াত তার নির্দিষ্ট স্থানেই কার্যকরী হবে। "সেসকল মানুষদের লড়াই করার অনুমতি প্রদান করা হল, যাদের সাথে লড়াই করা হয় এই হিসেবে যে, তারা মজলুম"- এই আয়াত তার নির্দিষ্ট স্থানেই কার্যকরী হবে। "যারা তোমাদের সাথে লড়ে তাদের সাথে লড়াই করো"- "মুশরিকদের সবাইকে হত্যা করো" এসব প্রত্যেক আয়াতকেই তার নির্দিষ্ট স্থানে প্রয়োগ করা হবে। সুতরাং এখানে বিরোধটা কোথায় হে নিজ যামানার ফক্বীহ?!

কারদাবি বলেছেন,

"সাইয়্যিদ কুতুব বলেন যে, আমরা আমাদের ধর্মীয় আকীদাকে মানুষের উপর চাপিয়ে দিব না। কেননা দ্বীনের মাঝে কোন জবরদস্তি নেই। কিন্তু আমরা তাদের উপর আমাদের শাসনব্যবস্থা ও শরীয়তকে চাপিয়ে দিব। যাতে তারা এর ছায়াতলে ইনসাফের সাথে স্বাচ্ছন্দে জীবন-যাপন করতে পারে।

কিন্তু আমরা তখন কি উত্তর দিব যখন মানুষ বলবে, আমরা আমাদের শাসন ব্যবস্থা নির্বাচনে ইচ্ছাধীন। সুতরাং তোমরা কেন তোমাদের শাসনব্যবস্থাকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছ? আর নিশ্চয় যে বিষয় মানুষের উপর তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটাকে তারা ঘৃনা করে। সেটা থেকে পলায়ন করে। যদিও তা তরল মিষ্টজাতীয় কিছু হয় না কেন!"

আমরা মানুষদের তাই বলব, একবার নয় হাজার বার- খোদার পক্ষ থেকে যেই প্রত্যাদেশ রাসুল সা. এর কাছে এসেছে যে, যতক্ষন আমাদের সামর্থ্য থাকবে আমরা আল্লাহর বিচারব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোন শাসনব্যবস্থার উপর কখনোই সন্তুষ্ট হব না, এবং এ অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করে যাবো। আর যদি এর পরিবর্তনে আমরা সক্ষম না হই, তবে আল্লাহ আমাদের সামর্থের বাইরে কিছুই চাপিয়ে দেন না!!

কারদাবি আরো বলেছেন,

"আর তখন হকুম কি হবে যখন আমরা ইহুদী, খ্রীষ্টান ও মূর্তিপূজকরা ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী, আর তোমরা মুসলিমরা দূর্বল এবং সংখ্যায় নগন্য! তোমরা কি এটা মেনে নিবে যে, আমরা জোরপূর্বক তোমাদের উপর আমাদের শাসন ব্যবস্থা ও জীবন পরিচালনার পদ্ধতি চাপিয়ে দিই? যেমনটা বর্তমান আমেরিকা করছে গোটা বিশ্বের মধ্যে!"

এই ক্ষেত্রে ফতোয়া চাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। এটাই বাস্তবতা হে উম্মাহর ফক্বীহ! কেননা আজ তারা আমাদের উপর তাদের বিধানকে চাপিয়ে দিচ্ছে। আপনার কি এই দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই? নাকি আপনি এটা দাবি করছেন যে, ইহুদী-খৃষ্টানরা মুসলিমদের নিজস্ব বিধান দিয়ে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে? পৃথিবীর কোথায় এমনটা হয়েছে? কেন এই ধূম্রজাল আর বিভ্রান্তি!

কারদাবি বলেছেন,

"আর আমরা সাইয়্যিদ কুতুবের যেসকল বিষয়াবলী অসমর্থন করি, সেগুলোর একটি হল এই যে, তিনি তাঁর সমকালীন প্রতিপক্ষ আলেমদের দুইটি বিষয়ে দোষারোপ করেন। একঃ সরলতা, উদাসীনতা ও নির্বুদ্ধিতা। এছাড়াও এমন কিছু বিষয়, যেগুলো পরিচিতি ও জ্ঞান-বুদ্ধিহীনতার সাথে সম্পৃক্ত।

দ্বিতীয়ঃ হতাশা, ব্যক্তিগত দুর্বলতা, বর্তমান পশ্চিমা বাস্তবিক চাপের সামনে ব্যক্তিগত পরাজয়। চক্রান্তকারী প্রাচ্যবাদের প্রভাব- যা ব্যক্তিগত ও চরিত্রগত দিকের সাথে সম্পর্ক রাখে। আর তিনি যাদেরকে দোষারোপ করেন, তাঁরা হচ্ছেন ইলম, ফিকহ, দা'ওয়াহ সহ সকল ময়দানে উম্মাহর বড়ো বড়ো বিদ্বান। শাইখ মুহাম্মদ আবদুহ থেকে শুরু করে শাইখ রশীদ রেযা, জামালুদ্দীন আল-কাসিমী, শাইখ মুহাম্মদ মুস্তফা মারাগী, শাইখ মাহমুদ শালতুত, শাইখ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ দাররাজ, শাইখ আহমাদ ইব্রাহিম, শাইখ আব্দুল ওয়াহহাব খাল্লাফ, শাইখ আলী আল-খাফীফ, শাইখ মুহাম্মদ আবু যাহরা, শাইখ ইউসুফ মূসা, শাইখ মুহাম্মদ আল-মাদানী, শাইখ মুহাম্মাদ মুস্তফা শালবী, শাইখ মুহাম্মদ আল-বাহী, শাইখ হাসানুল বান্না, শাইখ মোস্তফা আস-সিবায়ী, শাইখ মুস্তফা আয-যারক্বা, শাইখ মুহাম্মদ মোবারক, শাইখ আলী তানতাবী, শাইখ মা'রুফ আদ-দাওয়ালিবী, শাইখ বাহী আল-খাওলী, শাইখ মুহাম্মদ আল-গাযালী, শাইখ সায়্যিদ সাবিক্ব, শাইখ আলাল আল-ফাসী, শাইখ আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ মাহমুদ, শাইখ মুহাম্মাদ ফাতহী উসমান সহ অপরাপর আলেমে দ্বীন।

এ যাবত যাঁদের কথা বলা হল, তার মধ্যে ঐ সকল কলামিস্ট ও সভ্য চিন্তাবিদদের কথা বলা হয়নি যাঁরা শর'য়ী জ্ঞানের তেমন ধারণা রাখেনা। যেমন ড. মুহাম্মাদ হুসাইন হাইকাল, আব্বাস আল-আক্কাদ, মাহমুদ ফরীদ ওয়াজদী, আহমদ আমীন, মাহমুদ শেত খাত্তাব, আব্দুর রাহমান আযযাম, জামালুদ্দীন মাহফুজ, মুহাম্মাদ ফারাজ ছাড়াও আরবের অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ।"

সাইয়্যিদ কুতুব নির্দিষ্টভাবে কারো নামই চিহ্নিত করেননি। এতদসত্বেও নামগুলো উল্লেখ করা হল। একটা সস্তা কৌশল। তিনি শুধু এতুটুকু বলেছেন যে, এখানে অনেক 'পবিত্র' ব্যক্তি আছেন। 'পবিত্র' শব্দটিকে বন্ধনীর মাঝে এনেছেন, যাতে এতে কিছু মানুষের উদাসীনতার ব্যাপারটা বুঝে আসে। নাম চিহ্নিত করা কারদাবির কাজ, সাইয়্যিদ কুতুবের নয়। তিনি এ ধরণের হীন কাজ থেকে অনেক উর্ধ্বে।

কারদাবি আরো বলেছেন,

"আর ড. মুহাম্মাদ মাহদী আল-বদরী ভাই আমাকে বলেছেন যে, সায়্যিদ কুতুবের নিকটতম একজন ইখওয়ান কর্মী, যিনি কুতুব শহীদের সাথে ১৯৬৫ সালের বিপর্যয়ে একইসঙ্গে জেলে ছিলেন, তিনি ড. বদরীকে বলেছেন যে, সাইয়্যিদ কুতুব রহ. ঐ কর্মীকে বলেছেন, যেসব কিতাব আমার সঠিক আদর্শ বহন করে, সেগুলো হচ্ছে আমার শেষদিকের কিতাবগুলো। 'আল-মা'আলিম' ও 'তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন'র শেষের খন্ডগুলো এবং এই কিতাবের দ্বিতীয় সংস্করণের প্রাথমিক খন্ডগুলো, 'খাসাঈসুত তাসাওয়িরিল ইসলামী ওয়া মুক্বাওয়িমাতুহ' ও 'আল-ইসলাম ওয়া মুশকিলাতুল হাযারাহ' ইত্যাদি যে কিতাবগুলো তিনি জেলে থাকালীন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। আর তাঁর পুরনো কিতাবাদি, সেগুল তাঁর আদর্শ বহন করেনা। সেগুলো বেশি থেকে বেশি ইতিহাস বহন করে।

তখন তাঁর ঐ ছাত্র তাঁকে বলললেন, তাহলে তো ইমাম শাফিয়ী রহ. এর মতো আপনার দু'টি মাযহাব। একটি নতুন, আরেকটি পুরাতন। আর আপনি আপনার নতুন মাযহাবটিকে গ্রহন করেন, আর পুরাতনটিকে পরিত্যাগ করেন?! তো সাইয়্যিদ কুতুব সাহেব বলেন, হ্যাঁ! আমি পরিবর্তন করেছি যেমনটি পরিবর্তন করেছেন ইমাম শাফিয়ী রহ.। তবে ইমাম শাফিয়ী রহ. ফুরু' তথা শাখাগত মাসআলার মাঝে পরিবর্তন করেছেন আর আমি উসুল তথা মৌলিক মাসআলার মাঝে পরিবর্তন এনেছি!

সুতরাং মানুষটা বুঝতে পারছেন তাঁর চিন্তা-চেতনার পরিবর্তনের সীমানাকে! এই পরিবর্তন ছিল মৌলিক বা স্ট্রাটেজিক পরিবর্তন, যা তাঁর মতাদর্শীরা বলে থাকে!"

এটা একটা দুর্বল কথা ও অজ্ঞাত কাহিনী। একে প্রমান হিসাবে উপস্থাপন করা যায় না। সাইয়্যিদ কুতুবের পুরাতন কিতাবাদির মধ্যে এমন অনেক কিছুই ছিল অনৈসলামিক আদর্শ বহন করত। এমন অনেক কিছু ছিল যা আব্বাস আল-আক্কাদ, ড. মুহাম্মাদ হুসাইন হাইকালের আদর্শের মতো ছিল। যাদের ব্যাপারে স্বয়ং কারদাবি-ই বলছে যে তারা 'এমন সভ্য কলামিষ্ট, যাঁরা শরীয়তের ব্যাপারে তেমন ভাল জ্ঞান রাখেননা'। এই কারনেই সাইয়্যিদ কুতুব তাঁর পুরাতন কিতাবাদি থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর নতুন কিতাবগলোকে রচনা করেছেন। এগুলোর আদর্শ লালন করেছেন। আর তাঁর উসূলে পরিবর্তন ঘটানোর বাস্তবতা হল, তিনি উসূলের বুঝের মাঝে পরিবর্তন করেছেন। যেমন শাফিয়ী রহ. ফুরু' বা শাখাগত বিষয়ে তাঁর ইজতিহাদে পরিবর্তন করেছেন। এখানে শাফিয়ী রহ. বলেননি যে, তিনি মৌলিকভাবে শাখাগত মাসআলা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। বরং তিনি তাঁর ইজতিহাদ পরিবর্তন করেছেন। ঠিক তেমনি সাইয়্যিদ কুতুব এর দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন যে, উসূল ছিল এবং চিরকাল আপন অবস্থায় বহাল থাকবে, কিন্তু তিনি এখন তার হাকীকত বুঝতে পেরেছেন। শাইখ কারদাবি যে বর্ণনা দিয়েছেন, বিষয়টি তেমন নয় যে, তিনি উম্মাহর দ্বীনের উসূল পরিবর্তন করে দিয়েছেন।

আমি বলি-

আপনি উম্মাহর এক বড় আলেমকে নিয়ে বলেছেন এমন কিছু কথা যে কথার মাঝে নেই কোন শরম-হায়া,

আপনি তো এমন এক পণ্যকে বিকাতে চান, যেটাকে আগেই আমরা চিনতে ভুল করিনি যে, এটা সেই সে ইরজা।

 

 

[1] সাইয়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী বেশ কিছু ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহর আক্বীদা ও মানহাজ থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন। বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরামের রাঃ ব্যাপারে তিনি এমন কিছু অবস্থান নিয়েছেন যা একেবারেই আহলুস সুন্নাহর অবস্থানের বিপরীত, এবং যা মারাত্মক ফিতনার দরজা খুলে দেয়।